ঢাকা ১০:৪৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১১ অগাস্ট ২০২৬

একটি নক্ষত্রের বিদায়: মাগুরার প্রিয় মুখ জায়েদ বিন কবির নিশান আর নেই

  • ডেস্ক রিপোর্ট
  • প্রকাশিত : ০৮:২৫:৪৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১১ অগাস্ট ২০২৬
  • ৫ বার দেখা হয়েছে

বিশেষ প্রতিনিধি: কিছু মানুষের চলে যাওয়া কেবল একটি পরিবারের শোক হয়ে থাকে না; তাঁদের প্রস্থান একটি জনপদের পরিচিত দৃশ্যপটকে বদলে দেয়। কোনো কোনো মানুষ তাঁর পদ-পদবি দিয়ে নয়, বরং মানুষের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক, আচরণ, সততা, কর্মনিষ্ঠা ও মানবিকতার মধ্য দিয়ে একটি আলাদা পরিচয় নির্মাণ করেন। তাঁরা চলে গেলে মনে হয় শুধু একজন মানুষ নয়, আমাদের পরিচিত সময়ের একটি অংশও যেন হারিয়ে গেল। জায়েদ বিন কবির নিশানের চলে যাওয়া তেমনই এক বেদনাবিধুর অধ্যায়।

মাগুরার বিশিষ্ট সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, সমাজসেবক, পরোপকারী, ধর্মপ্রাণ, সৎ, দক্ষ ও সদালাপী মানুষ জায়েদ বিন কবির নিশান (৫৮) মঙ্গলবার ১১ আগস্ট দুপুর ২টা ১৬ মিনিটে ঢাকার বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (পিজি হাসপাতাল)-এর আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মহান আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে না-ফেরার দেশে পাড়ি জমিয়েছেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।

তাঁর মৃত্যু সংবাদে মাগুরা ও ঢাকায় তাঁর দীর্ঘদিনের সহকর্মী, বন্ধু, শুভাকাঙ্ক্ষী, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের মানুষ এবং স্বজনদের মধ্যে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া।
নিশান ছিলেন একটি আলাদা ধরনের মানুষ
জায়েদ বিন কবির নিশানকে শুধু ‘সামাজিক ব্যক্তিত্ব’ বললে তাঁর পরিচয়ের পূর্ণতা পাওয়া যায় না। তিনি ছিলেন একই সঙ্গে একজন সৎ মানুষ, দক্ষ সংগঠক, দায়িত্বশীল কর্মী, সংস্কৃতিপ্রেমী, ক্রীড়ানুরাগী, পরোপকারী এবং সর্বোপরি একজন মানবিক মানুষ।

তাঁর সবচেয়ে বড় গুণ ছিল তিনি নিজেকে কখনো বড় করে দেখানোর চেষ্টা করতেন না। অথচ তাঁর ব্যক্তিত্বে এমন এক স্বাভাবিক দৃঢ়তা ছিল, যা তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করে তুলত। স্মার্ট ও পরিপাটি ব্যক্তিত্বের অধিকারী নিশান ছিলেন সময়ের সঙ্গে চলতে জানা একজন আধুনিক মানুষ। কিন্তু আধুনিকতার সঙ্গে তিনি কখনো তাঁর মূল্যবোধের আপস করেননি। মানুষের সঙ্গে কথা বলার সময় তাঁর ভদ্রতা, আচরণে সৌজন্য এবং দায়িত্ব পালনে নিষ্ঠা তাঁকে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য করে তুলেছিল। তিনি ছিলেন এমন একজন মানুষ, যাঁর সঙ্গে একবার পরিচয় হলে তাঁকে সহজে ভুলে যাওয়া যায় না।

দুই দশকের বেশি সময় টাউন হল ক্লাবের সঙ্গে
মাগুরার ঐতিহ্যবাহী টাউন হল ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দুই দশকেরও বেশি সময় দায়িত্ব পালন করেছেন জায়েদ বিন কবির নিশান। দীর্ঘ এই পথচলা নিছক একটি সাংগঠনিক পদে থাকার ইতিহাস নয়; এটি মাগুরার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের সঙ্গে তাঁর গভীর সম্পৃক্ততার এক দীর্ঘ অধ্যায়।
টাউন হল ক্লাবের বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়া আয়োজনকে প্রাণবন্ত করে তুলতে তাঁর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। ক্লাবের শতবর্ষ উদযাপনেও তিনি দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করেন। ঐতিহ্যবাহী এই প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল অনেকটা আত্মিক। টাউন হল ক্লাবের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তাঁকে সাধারণ সম্পাদক হিসেবে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে দেখা যায়। ক্লাবের অন্তঃকক্ষ ক্রীড়া প্রতিযোগিতা থেকে শুরু করে শতবর্ষ উদযাপনের মতো বড় আয়োজন সবখানেই ছিল তাঁর সাংগঠনিক উপস্থিতি।
একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে দুই দশকের বেশি সময় যুক্ত থাকা এবং সেই প্রতিষ্ঠানের ঐতিহ্যকে নিজের জীবনের অংশ করে নেওয়া সহজ বিষয় নয়। নিশান সেটিই করেছিলেন নিষ্ঠা ও ভালোবাসা দিয়ে।

মাগুরার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য নিয়ে তাঁর ভাবনা
জায়েদ বিন কবির নিশান শুধু সামাজিক সংগঠক ছিলেন না; মাগুরার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য নিয়েও তাঁর ছিল গভীর ভাবনা। মাগুরার ঐতিহ্যবাহী মধুমতি সিনেমা হলের সঙ্গেও তাঁর সম্পৃক্ততা ছিল। তাঁর চিন্তার বিশেষ দিক ছিল ঐতিহ্যকে সংরক্ষণ করতে হবে, কিন্তু কেবল অতীতকে আঁকড়ে ধরে থাকলে চলবে না। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নতুন সাংস্কৃতিক অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে। এই চিন্তাধারাই প্রমাণ করে, তিনি শুধু একজন সংগঠক ছিলেন না; তিনি ছিলেন ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে জানা একজন সচেতন সামাজিক মানুষ।

কর্মজীবনে সততা ও দক্ষতার দৃষ্টান্ত : জায়েদ বিন কবির নিশানের কর্মজীবনও ছিল বৈচিত্র্যময় ও গৌরবময়। পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, তিনি বাংলাদেশ নৌবাহিনীর একজন কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে প্রভাতী ইন্স্যুরেন্সের যশোর, মাগুরা ও ঝিনাইদহ জোনের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। কর্মক্ষেত্রে তাঁর পরিচয় ছিল একজন সৎ, দক্ষ, দায়িত্বশীল ও যোগ্য কর্মকর্তা হিসেবে। দায়িত্ব পালনে তিনি ছিলেন আপসহীন; একই সঙ্গে সহকর্মীদের প্রতি ছিলেন আন্তরিক ও সহযোগিতাপ্রবণ।

তিনি বিশ্বাস করতেন, কোনো পদ মানুষকে বড় করে না; বরং পদে থেকে মানুষ কীভাবে দায়িত্ব পালন করেন, সেটিই তাঁর প্রকৃত পরিচয় তৈরি করে। তাঁর কর্মজীবন সেই বিশ্বাসেরই প্রতিফলন।
মানুষের পাশে দাঁড়ানো ছিল তাঁর স্বভাব
নিশানের সবচেয়ে বড় পরিচয় ছিল তাঁর মানবিকতা।

তিনি প্রচার চাননি। মানুষের জন্য কিছু করলে সেটিকে নিজের কৃতিত্ব হিসেবে তুলে ধরার প্রবণতা তাঁর ছিল না। অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো, বিপদগ্রস্তকে সহযোগিতা করা কিংবা কারও প্রয়োজনের সময় একটি ফোন করা—এই ছোট ছোট মানবিক কাজের মধ্যেই তিনি আনন্দ খুঁজে পেতেন।

তাঁর পরিচিতজনেরা বলেন, তাঁর কাছে মানুষে মানুষে বিভাজনের চেয়ে মানুষের প্রয়োজনটাই ছিল বড়। তিনি ছিলেন সহজে কাছে যাওয়া যায় এমন একজন মানুষ। তাঁর সঙ্গে কথা বললে মনে হতো, বহুদিনের পরিচিত কারও সঙ্গে কথা বলা হচ্ছে।

ধর্মীয় মূল্যবোধে ছিলেন অবিচল : ব্যক্তিজীবনে জায়েদ বিন কবির নিশান ছিলেন ধর্মপ্রাণ ও পরহেজগার। নামাজ-রোজায় নিষ্ঠা, সংযত জীবনযাপন এবং মানুষের প্রতি মমত্ববোধ তাঁর চরিত্রের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল। তাঁর ধর্মীয় বিশ্বাস কখনো তাঁকে সংকীর্ণ করেনি; বরং আরও মানবিক করেছে। মানুষের প্রতি সহানুভূতি, বিনয় ও ক্ষমাশীলতা তাঁর আচরণে প্রতিফলিত হতো।
একজন মানুষের ধর্মীয় পরিচয়ের সবচেয়ে সুন্দর প্রকাশ ঘটে তাঁর আচরণে নিশানের ক্ষেত্রে সেটিই ছিল দৃশ্যমান।

পরিবারের কাছে ছিলেন ভালোবাসার কেন্দ্র
সামাজিক অঙ্গনে তিনি যতটা পরিচিত ছিলেন, পরিবারের কাছে তাঁর পরিচয় ছিল তার চেয়েও গভীর। জায়েদ বিন কবির নিশান দুই মেয়ে ও এক ছেলের জনক। তাঁর দুই মেয়েই মাস্টার্স সম্পন্ন করেছেন। একমাত্র ছেলে বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ায় উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করছেন।
সন্তানদের শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁর ছিল গভীর আগ্রহ ও স্বপ্ন। সন্তানদের নিজের পায়ে দাঁড় করানো এবং তাঁদের সুন্দর ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করাই ছিল তাঁর জীবনের অন্যতম বড় প্রত্যাশা।

তিনি ছিলেন পাঁচ বোনের একমাত্র ভাই। ফলে শৈশব থেকেই পরিবারে তাঁর অবস্থান ছিল বিশেষ। সময়ের সঙ্গে সেই পারিবারিক বন্ধন আরও গভীর হয়েছে। ভাই হিসেবে বোনদের প্রতি দায়িত্ব, আর পরিবারের অভিভাবক হিসেবে সবার প্রতি মমতা এই সম্পর্কগুলো তাঁর জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

আজ তাঁর চলে যাওয়ায় সেই পরিবারে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা কোনো শব্দ দিয়ে প্রকাশ করা সম্ভব নয়। একজন বাবার স্বপ্নের অসমাপ্ত অধ্যায়
দুই মেয়ের উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন হওয়া এবং একমাত্র ছেলের অস্ট্রেলিয়ায় উচ্চশিক্ষা গ্রহণ এগুলো ছিল নিশানের জীবনের বড় অর্জনগুলোর একটি। সন্তানদের সাফল্যের পেছনে একজন বাবার যে নীরব শ্রম, উদ্বেগ, ত্যাগ ও স্বপ্ন থাকে, তার সাক্ষ্য বহন করে তাঁদের বর্তমান অবস্থান।
হয়তো তিনি আরও কিছুদিন তাঁদের পাশে থাকতে চেয়েছিলেন। হয়তো ছেলের উচ্চশিক্ষা শেষ করে দেশে ফেরার দিনটি দেখতে চেয়েছিলেন। হয়তো মেয়েদের জীবনের আরও অনেক আনন্দের মুহূর্তের সাক্ষী হতে চেয়েছিলেন। কিন্তু মহান আল্লাহর সিদ্ধান্তের কাছে মানুষের সব পরিকল্পনাই ক্ষণস্থায়ী।

তাঁর মৃত্যুতে বিশিষ্টজনদের শোক : জায়েদ বিন কবির নিশানের মৃত্যুতে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার বিশিষ্ট ব্যক্তিরা গভীর শোক প্রকাশ করেছেন।
তাঁর মৃত্যুতে শোক ও সমবেদনা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সেক্রেটারি জনাব মোঃ আতিকুর রহমান রুমন, প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী (প্রতিমন্ত্রী পদমর্জাদা) ডা. এস. এম. জিয়া হায়দার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাদা দলের সভাপতি ও ইউট্যাবের মহাসচিব প্রফেসর ড. মোঃ মোর্শেদ হাসান খান, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভাইস-চ্যান্সেলর প্রফেসর ডা. নজরুল ইসলাম, ভূমিমন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনু, আইনমন্ত্রী মোঃ আসাদুজ্জামান, কেন্দ্রীয় যুব দলের সাধারণ সম্পাদক মোঃ নুরুল ইসলাম নয়ন এমপি, প্রভাতী ইন্স্যুরেন্স পিএলসির
চেয়ারম্যান মোঃ মফিজুর রহমান, ভাইস চেয়ারম্যান মারুফ সাত্তার আলী, ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো: জাহিদুল ইসলাম, অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাখাওয়াত হোসেন মামুন, অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. সাইফুল ইসলাম (আজাদ), কনসালটেন্ট মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম সহ উর্ধ্বতন কর্মকর্তা। ভাইয়া গ্রুপের উপদেষ্টা, দৈনিক বাংলা কাগজের নির্বাহী সম্পাদক মো.আফজাল হোসেন, তার বোন সিলেট-২ আসনের জাতীয় সংসদ সদস্য তাহশিনা রুশদির লুনাসহ বিভিন্ন ধর্মীয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন, বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ, সহকর্মী, বন্ধু ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা তাঁর মৃত্যুতে গভীর শোক ও সমবেদনা জানিয়েছেন।
তাঁদের শোকবার্তায় মরহুমের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানানো হয়েছে।

শেষ বিদায়ের প্রস্তুতি : জায়েদ বিন কবির নিশানের প্রথম জানাজা আজ বাদ মাগরিব ঢাকার আজিমপুর ছাপরা মসজিদের সামনে অনুষ্ঠিত হয়। আগামীকাল বুধবার সকাল সাড়ে ৯টায় মাগুরা পারনান্দুয়ালী ওয়াজেদা স. প্রা. বিদ্যালয় মাঠে তাঁর দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। জানাজা শেষে তাঁকে মাগুরা সদর উপজেলার পারনান্দুয়ালী মুন্সিবাড়ির পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হবে। শেষ বিদায়ে তাঁর দীর্ঘদিনের সহকর্মী, বন্ধু, স্বজন, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের মানুষ এবং অসংখ্য শুভাকাঙ্ক্ষী উপস্থিত থাকবেন।

মানুষটি থাকবেন তাঁর কর্মে : মানুষের জীবন আসলে কত দীর্ঘ তা বছর দিয়ে মাপা যায় না। একটি জীবন কত মানুষের উপকারে এসেছে, কত মানুষের মুখে হাসি ফুটিয়েছে, কত মানুষের বিপদে পাশে দাঁড়িয়েছে সেটিই হয়তো জীবনের প্রকৃত পরিমাপ। জায়েদ বিন কবির নিশান সেই পরীক্ষায় নিজের জায়গা করে নিয়েছেন।
তিনি ছিলেন সৎ। তিনি ছিলেন দক্ষ। তিনি ছিলেন যোগ্য। তিনি ছিলেন স্মার্ট ও আধুনিক চিন্তার মানুষ। তিনি ছিলেন পরোপকারী। তিনি ছিলেন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের একজন নিবেদিতপ্রাণ কর্মী। আর সবকিছুর ঊর্ধ্বে তিনি ছিলেন একজন ভালো মানুষ। একজন ভালো মানুষের সবচেয়ে বড় স্মৃতিস্তম্ভ কোনো পাথরের ফলক নয়; মানুষের হৃদয়। নিশানের জন্য সেই স্মৃতিস্তম্ভ ইতোমধ্যেই নির্মিত হয়ে গেছে তাঁর পরিবার, বন্ধু, সহকর্মী এবং মাগুরার অসংখ্য মানুষের হৃদয়ে।

আজ তিনি নেই। নেই তাঁর পরিচিত হাসি, নেই স্নেহমাখা কণ্ঠ, নেই কোনো সামাজিক আয়োজনে তাঁর প্রাণবন্ত উপস্থিতি। কিন্তু তাঁর কর্ম আছে, তাঁর ভালোবাসা আছে, তাঁর স্মৃতি আছে। সময় একদিন তাঁর প্রজন্মকে দূরে নিয়ে যাবে। কিন্তু মাগুরার সামাজিক-সাংস্কৃতিক ইতিহাসের একটি অধ্যায়ে জায়েদ বিন কবির নিশান নামটি থেকে যাবে একজন সৎ, দক্ষ, মানবিক ও নিবেদিতপ্রাণ মানুষের স্মৃতি হিসেবে। বিদায়, মাগুরার সবার
প্রিয় নিশান, আপনি চলে গেলেন। পৃথিবীর মায়া ছেড়ে পাড়ি দিলেন অনন্তের পথে। আপনার প্রিয়জনেরা আজ শূন্য চোখে তাকিয়ে আছেন। আপনার পরিচিত মানুষগুলো বিশ্বাস করতে পারছেন না—যে মানুষটি এতদিন সবার পাশে ছিলেন, তিনি আজ আর কারও ডাকে সাড়া দেবেন না।

কিন্তু আপনি পুরোপুরি হারিয়ে যাননি।
আপনি আছেন আপনার সন্তানদের সাফল্যে,
আছেন আপনার বোনদের ভালোবাসায়,
আছেন বন্ধুদের স্মৃতিতে, আছেন সহকর্মীদের শ্রদ্ধায়, আছেন টাউন হল ক্লাবের দীর্ঘ ইতিহাসে,
আছেন মাগুরার সামাজিক-সাংস্কৃতিক অঙ্গনের স্মৃতিতে, আর আছেন অসংখ্য মানুষের হৃদয়ে।
মহান আল্লাহ আপনার সকল নেক আমল কবুল করুন। আপনার জীবনের ভুল-ত্রুটি ক্ষমা করে দিন। কবরকে প্রশস্ত ও নূরে ভরিয়ে দিন। কবরের আজাব থেকে হেফাজত করুন। রহমতের চাদরে আবৃত করুন। আপনাকে জান্নাতুল ফেরদৌসের সর্বোচ্চ মর্যাদা দান করুন। আপনার সন্তান, পরিবার, পাঁচ বোন, আত্মীয়স্বজন, বন্ধু, সহকর্মী এবং অসংখ্য গুণগ্রাহীকে এই কঠিন শোক সহ্য করার শক্তি দিন। হে আল্লাহ, একজন ভালো মানুষ আপনার কাছে ফিরে এসেছেন আপনি তাঁকে আপনার রহমতের সর্বোচ্চ আশ্রয়ে স্থান দিন। আমিন, ইয়া রাব্বাল আলামিন।
বিদায়, জায়েদ বিন কবির নিশান।
আপনার পার্থিব পথচলা শেষ হয়েছে;
কিন্তু আপনার মানবিকতার গল্প শেষ হবে না।

জনপ্রিয় সংবাদ

একটি নক্ষত্রের বিদায়: মাগুরার প্রিয় মুখ জায়েদ বিন কবির নিশান আর নেই

প্রকাশিত : ০৮:২৫:৪৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১১ অগাস্ট ২০২৬

বিশেষ প্রতিনিধি: কিছু মানুষের চলে যাওয়া কেবল একটি পরিবারের শোক হয়ে থাকে না; তাঁদের প্রস্থান একটি জনপদের পরিচিত দৃশ্যপটকে বদলে দেয়। কোনো কোনো মানুষ তাঁর পদ-পদবি দিয়ে নয়, বরং মানুষের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক, আচরণ, সততা, কর্মনিষ্ঠা ও মানবিকতার মধ্য দিয়ে একটি আলাদা পরিচয় নির্মাণ করেন। তাঁরা চলে গেলে মনে হয় শুধু একজন মানুষ নয়, আমাদের পরিচিত সময়ের একটি অংশও যেন হারিয়ে গেল। জায়েদ বিন কবির নিশানের চলে যাওয়া তেমনই এক বেদনাবিধুর অধ্যায়।

মাগুরার বিশিষ্ট সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, সমাজসেবক, পরোপকারী, ধর্মপ্রাণ, সৎ, দক্ষ ও সদালাপী মানুষ জায়েদ বিন কবির নিশান (৫৮) মঙ্গলবার ১১ আগস্ট দুপুর ২টা ১৬ মিনিটে ঢাকার বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (পিজি হাসপাতাল)-এর আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মহান আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে না-ফেরার দেশে পাড়ি জমিয়েছেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।

তাঁর মৃত্যু সংবাদে মাগুরা ও ঢাকায় তাঁর দীর্ঘদিনের সহকর্মী, বন্ধু, শুভাকাঙ্ক্ষী, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের মানুষ এবং স্বজনদের মধ্যে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া।
নিশান ছিলেন একটি আলাদা ধরনের মানুষ
জায়েদ বিন কবির নিশানকে শুধু ‘সামাজিক ব্যক্তিত্ব’ বললে তাঁর পরিচয়ের পূর্ণতা পাওয়া যায় না। তিনি ছিলেন একই সঙ্গে একজন সৎ মানুষ, দক্ষ সংগঠক, দায়িত্বশীল কর্মী, সংস্কৃতিপ্রেমী, ক্রীড়ানুরাগী, পরোপকারী এবং সর্বোপরি একজন মানবিক মানুষ।

তাঁর সবচেয়ে বড় গুণ ছিল তিনি নিজেকে কখনো বড় করে দেখানোর চেষ্টা করতেন না। অথচ তাঁর ব্যক্তিত্বে এমন এক স্বাভাবিক দৃঢ়তা ছিল, যা তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করে তুলত। স্মার্ট ও পরিপাটি ব্যক্তিত্বের অধিকারী নিশান ছিলেন সময়ের সঙ্গে চলতে জানা একজন আধুনিক মানুষ। কিন্তু আধুনিকতার সঙ্গে তিনি কখনো তাঁর মূল্যবোধের আপস করেননি। মানুষের সঙ্গে কথা বলার সময় তাঁর ভদ্রতা, আচরণে সৌজন্য এবং দায়িত্ব পালনে নিষ্ঠা তাঁকে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য করে তুলেছিল। তিনি ছিলেন এমন একজন মানুষ, যাঁর সঙ্গে একবার পরিচয় হলে তাঁকে সহজে ভুলে যাওয়া যায় না।

দুই দশকের বেশি সময় টাউন হল ক্লাবের সঙ্গে
মাগুরার ঐতিহ্যবাহী টাউন হল ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দুই দশকেরও বেশি সময় দায়িত্ব পালন করেছেন জায়েদ বিন কবির নিশান। দীর্ঘ এই পথচলা নিছক একটি সাংগঠনিক পদে থাকার ইতিহাস নয়; এটি মাগুরার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের সঙ্গে তাঁর গভীর সম্পৃক্ততার এক দীর্ঘ অধ্যায়।
টাউন হল ক্লাবের বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়া আয়োজনকে প্রাণবন্ত করে তুলতে তাঁর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। ক্লাবের শতবর্ষ উদযাপনেও তিনি দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করেন। ঐতিহ্যবাহী এই প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল অনেকটা আত্মিক। টাউন হল ক্লাবের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তাঁকে সাধারণ সম্পাদক হিসেবে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে দেখা যায়। ক্লাবের অন্তঃকক্ষ ক্রীড়া প্রতিযোগিতা থেকে শুরু করে শতবর্ষ উদযাপনের মতো বড় আয়োজন সবখানেই ছিল তাঁর সাংগঠনিক উপস্থিতি।
একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে দুই দশকের বেশি সময় যুক্ত থাকা এবং সেই প্রতিষ্ঠানের ঐতিহ্যকে নিজের জীবনের অংশ করে নেওয়া সহজ বিষয় নয়। নিশান সেটিই করেছিলেন নিষ্ঠা ও ভালোবাসা দিয়ে।

মাগুরার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য নিয়ে তাঁর ভাবনা
জায়েদ বিন কবির নিশান শুধু সামাজিক সংগঠক ছিলেন না; মাগুরার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য নিয়েও তাঁর ছিল গভীর ভাবনা। মাগুরার ঐতিহ্যবাহী মধুমতি সিনেমা হলের সঙ্গেও তাঁর সম্পৃক্ততা ছিল। তাঁর চিন্তার বিশেষ দিক ছিল ঐতিহ্যকে সংরক্ষণ করতে হবে, কিন্তু কেবল অতীতকে আঁকড়ে ধরে থাকলে চলবে না। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নতুন সাংস্কৃতিক অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে। এই চিন্তাধারাই প্রমাণ করে, তিনি শুধু একজন সংগঠক ছিলেন না; তিনি ছিলেন ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে জানা একজন সচেতন সামাজিক মানুষ।

কর্মজীবনে সততা ও দক্ষতার দৃষ্টান্ত : জায়েদ বিন কবির নিশানের কর্মজীবনও ছিল বৈচিত্র্যময় ও গৌরবময়। পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, তিনি বাংলাদেশ নৌবাহিনীর একজন কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে প্রভাতী ইন্স্যুরেন্সের যশোর, মাগুরা ও ঝিনাইদহ জোনের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। কর্মক্ষেত্রে তাঁর পরিচয় ছিল একজন সৎ, দক্ষ, দায়িত্বশীল ও যোগ্য কর্মকর্তা হিসেবে। দায়িত্ব পালনে তিনি ছিলেন আপসহীন; একই সঙ্গে সহকর্মীদের প্রতি ছিলেন আন্তরিক ও সহযোগিতাপ্রবণ।

তিনি বিশ্বাস করতেন, কোনো পদ মানুষকে বড় করে না; বরং পদে থেকে মানুষ কীভাবে দায়িত্ব পালন করেন, সেটিই তাঁর প্রকৃত পরিচয় তৈরি করে। তাঁর কর্মজীবন সেই বিশ্বাসেরই প্রতিফলন।
মানুষের পাশে দাঁড়ানো ছিল তাঁর স্বভাব
নিশানের সবচেয়ে বড় পরিচয় ছিল তাঁর মানবিকতা।

তিনি প্রচার চাননি। মানুষের জন্য কিছু করলে সেটিকে নিজের কৃতিত্ব হিসেবে তুলে ধরার প্রবণতা তাঁর ছিল না। অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো, বিপদগ্রস্তকে সহযোগিতা করা কিংবা কারও প্রয়োজনের সময় একটি ফোন করা—এই ছোট ছোট মানবিক কাজের মধ্যেই তিনি আনন্দ খুঁজে পেতেন।

তাঁর পরিচিতজনেরা বলেন, তাঁর কাছে মানুষে মানুষে বিভাজনের চেয়ে মানুষের প্রয়োজনটাই ছিল বড়। তিনি ছিলেন সহজে কাছে যাওয়া যায় এমন একজন মানুষ। তাঁর সঙ্গে কথা বললে মনে হতো, বহুদিনের পরিচিত কারও সঙ্গে কথা বলা হচ্ছে।

ধর্মীয় মূল্যবোধে ছিলেন অবিচল : ব্যক্তিজীবনে জায়েদ বিন কবির নিশান ছিলেন ধর্মপ্রাণ ও পরহেজগার। নামাজ-রোজায় নিষ্ঠা, সংযত জীবনযাপন এবং মানুষের প্রতি মমত্ববোধ তাঁর চরিত্রের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল। তাঁর ধর্মীয় বিশ্বাস কখনো তাঁকে সংকীর্ণ করেনি; বরং আরও মানবিক করেছে। মানুষের প্রতি সহানুভূতি, বিনয় ও ক্ষমাশীলতা তাঁর আচরণে প্রতিফলিত হতো।
একজন মানুষের ধর্মীয় পরিচয়ের সবচেয়ে সুন্দর প্রকাশ ঘটে তাঁর আচরণে নিশানের ক্ষেত্রে সেটিই ছিল দৃশ্যমান।

পরিবারের কাছে ছিলেন ভালোবাসার কেন্দ্র
সামাজিক অঙ্গনে তিনি যতটা পরিচিত ছিলেন, পরিবারের কাছে তাঁর পরিচয় ছিল তার চেয়েও গভীর। জায়েদ বিন কবির নিশান দুই মেয়ে ও এক ছেলের জনক। তাঁর দুই মেয়েই মাস্টার্স সম্পন্ন করেছেন। একমাত্র ছেলে বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ায় উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করছেন।
সন্তানদের শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁর ছিল গভীর আগ্রহ ও স্বপ্ন। সন্তানদের নিজের পায়ে দাঁড় করানো এবং তাঁদের সুন্দর ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করাই ছিল তাঁর জীবনের অন্যতম বড় প্রত্যাশা।

তিনি ছিলেন পাঁচ বোনের একমাত্র ভাই। ফলে শৈশব থেকেই পরিবারে তাঁর অবস্থান ছিল বিশেষ। সময়ের সঙ্গে সেই পারিবারিক বন্ধন আরও গভীর হয়েছে। ভাই হিসেবে বোনদের প্রতি দায়িত্ব, আর পরিবারের অভিভাবক হিসেবে সবার প্রতি মমতা এই সম্পর্কগুলো তাঁর জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

আজ তাঁর চলে যাওয়ায় সেই পরিবারে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা কোনো শব্দ দিয়ে প্রকাশ করা সম্ভব নয়। একজন বাবার স্বপ্নের অসমাপ্ত অধ্যায়
দুই মেয়ের উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন হওয়া এবং একমাত্র ছেলের অস্ট্রেলিয়ায় উচ্চশিক্ষা গ্রহণ এগুলো ছিল নিশানের জীবনের বড় অর্জনগুলোর একটি। সন্তানদের সাফল্যের পেছনে একজন বাবার যে নীরব শ্রম, উদ্বেগ, ত্যাগ ও স্বপ্ন থাকে, তার সাক্ষ্য বহন করে তাঁদের বর্তমান অবস্থান।
হয়তো তিনি আরও কিছুদিন তাঁদের পাশে থাকতে চেয়েছিলেন। হয়তো ছেলের উচ্চশিক্ষা শেষ করে দেশে ফেরার দিনটি দেখতে চেয়েছিলেন। হয়তো মেয়েদের জীবনের আরও অনেক আনন্দের মুহূর্তের সাক্ষী হতে চেয়েছিলেন। কিন্তু মহান আল্লাহর সিদ্ধান্তের কাছে মানুষের সব পরিকল্পনাই ক্ষণস্থায়ী।

তাঁর মৃত্যুতে বিশিষ্টজনদের শোক : জায়েদ বিন কবির নিশানের মৃত্যুতে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার বিশিষ্ট ব্যক্তিরা গভীর শোক প্রকাশ করেছেন।
তাঁর মৃত্যুতে শোক ও সমবেদনা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সেক্রেটারি জনাব মোঃ আতিকুর রহমান রুমন, প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী (প্রতিমন্ত্রী পদমর্জাদা) ডা. এস. এম. জিয়া হায়দার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাদা দলের সভাপতি ও ইউট্যাবের মহাসচিব প্রফেসর ড. মোঃ মোর্শেদ হাসান খান, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভাইস-চ্যান্সেলর প্রফেসর ডা. নজরুল ইসলাম, ভূমিমন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনু, আইনমন্ত্রী মোঃ আসাদুজ্জামান, কেন্দ্রীয় যুব দলের সাধারণ সম্পাদক মোঃ নুরুল ইসলাম নয়ন এমপি, প্রভাতী ইন্স্যুরেন্স পিএলসির
চেয়ারম্যান মোঃ মফিজুর রহমান, ভাইস চেয়ারম্যান মারুফ সাত্তার আলী, ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো: জাহিদুল ইসলাম, অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাখাওয়াত হোসেন মামুন, অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. সাইফুল ইসলাম (আজাদ), কনসালটেন্ট মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম সহ উর্ধ্বতন কর্মকর্তা। ভাইয়া গ্রুপের উপদেষ্টা, দৈনিক বাংলা কাগজের নির্বাহী সম্পাদক মো.আফজাল হোসেন, তার বোন সিলেট-২ আসনের জাতীয় সংসদ সদস্য তাহশিনা রুশদির লুনাসহ বিভিন্ন ধর্মীয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন, বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ, সহকর্মী, বন্ধু ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা তাঁর মৃত্যুতে গভীর শোক ও সমবেদনা জানিয়েছেন।
তাঁদের শোকবার্তায় মরহুমের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানানো হয়েছে।

শেষ বিদায়ের প্রস্তুতি : জায়েদ বিন কবির নিশানের প্রথম জানাজা আজ বাদ মাগরিব ঢাকার আজিমপুর ছাপরা মসজিদের সামনে অনুষ্ঠিত হয়। আগামীকাল বুধবার সকাল সাড়ে ৯টায় মাগুরা পারনান্দুয়ালী ওয়াজেদা স. প্রা. বিদ্যালয় মাঠে তাঁর দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। জানাজা শেষে তাঁকে মাগুরা সদর উপজেলার পারনান্দুয়ালী মুন্সিবাড়ির পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হবে। শেষ বিদায়ে তাঁর দীর্ঘদিনের সহকর্মী, বন্ধু, স্বজন, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের মানুষ এবং অসংখ্য শুভাকাঙ্ক্ষী উপস্থিত থাকবেন।

মানুষটি থাকবেন তাঁর কর্মে : মানুষের জীবন আসলে কত দীর্ঘ তা বছর দিয়ে মাপা যায় না। একটি জীবন কত মানুষের উপকারে এসেছে, কত মানুষের মুখে হাসি ফুটিয়েছে, কত মানুষের বিপদে পাশে দাঁড়িয়েছে সেটিই হয়তো জীবনের প্রকৃত পরিমাপ। জায়েদ বিন কবির নিশান সেই পরীক্ষায় নিজের জায়গা করে নিয়েছেন।
তিনি ছিলেন সৎ। তিনি ছিলেন দক্ষ। তিনি ছিলেন যোগ্য। তিনি ছিলেন স্মার্ট ও আধুনিক চিন্তার মানুষ। তিনি ছিলেন পরোপকারী। তিনি ছিলেন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের একজন নিবেদিতপ্রাণ কর্মী। আর সবকিছুর ঊর্ধ্বে তিনি ছিলেন একজন ভালো মানুষ। একজন ভালো মানুষের সবচেয়ে বড় স্মৃতিস্তম্ভ কোনো পাথরের ফলক নয়; মানুষের হৃদয়। নিশানের জন্য সেই স্মৃতিস্তম্ভ ইতোমধ্যেই নির্মিত হয়ে গেছে তাঁর পরিবার, বন্ধু, সহকর্মী এবং মাগুরার অসংখ্য মানুষের হৃদয়ে।

আজ তিনি নেই। নেই তাঁর পরিচিত হাসি, নেই স্নেহমাখা কণ্ঠ, নেই কোনো সামাজিক আয়োজনে তাঁর প্রাণবন্ত উপস্থিতি। কিন্তু তাঁর কর্ম আছে, তাঁর ভালোবাসা আছে, তাঁর স্মৃতি আছে। সময় একদিন তাঁর প্রজন্মকে দূরে নিয়ে যাবে। কিন্তু মাগুরার সামাজিক-সাংস্কৃতিক ইতিহাসের একটি অধ্যায়ে জায়েদ বিন কবির নিশান নামটি থেকে যাবে একজন সৎ, দক্ষ, মানবিক ও নিবেদিতপ্রাণ মানুষের স্মৃতি হিসেবে। বিদায়, মাগুরার সবার
প্রিয় নিশান, আপনি চলে গেলেন। পৃথিবীর মায়া ছেড়ে পাড়ি দিলেন অনন্তের পথে। আপনার প্রিয়জনেরা আজ শূন্য চোখে তাকিয়ে আছেন। আপনার পরিচিত মানুষগুলো বিশ্বাস করতে পারছেন না—যে মানুষটি এতদিন সবার পাশে ছিলেন, তিনি আজ আর কারও ডাকে সাড়া দেবেন না।

কিন্তু আপনি পুরোপুরি হারিয়ে যাননি।
আপনি আছেন আপনার সন্তানদের সাফল্যে,
আছেন আপনার বোনদের ভালোবাসায়,
আছেন বন্ধুদের স্মৃতিতে, আছেন সহকর্মীদের শ্রদ্ধায়, আছেন টাউন হল ক্লাবের দীর্ঘ ইতিহাসে,
আছেন মাগুরার সামাজিক-সাংস্কৃতিক অঙ্গনের স্মৃতিতে, আর আছেন অসংখ্য মানুষের হৃদয়ে।
মহান আল্লাহ আপনার সকল নেক আমল কবুল করুন। আপনার জীবনের ভুল-ত্রুটি ক্ষমা করে দিন। কবরকে প্রশস্ত ও নূরে ভরিয়ে দিন। কবরের আজাব থেকে হেফাজত করুন। রহমতের চাদরে আবৃত করুন। আপনাকে জান্নাতুল ফেরদৌসের সর্বোচ্চ মর্যাদা দান করুন। আপনার সন্তান, পরিবার, পাঁচ বোন, আত্মীয়স্বজন, বন্ধু, সহকর্মী এবং অসংখ্য গুণগ্রাহীকে এই কঠিন শোক সহ্য করার শক্তি দিন। হে আল্লাহ, একজন ভালো মানুষ আপনার কাছে ফিরে এসেছেন আপনি তাঁকে আপনার রহমতের সর্বোচ্চ আশ্রয়ে স্থান দিন। আমিন, ইয়া রাব্বাল আলামিন।
বিদায়, জায়েদ বিন কবির নিশান।
আপনার পার্থিব পথচলা শেষ হয়েছে;
কিন্তু আপনার মানবিকতার গল্প শেষ হবে না।