ঢাকা ১২:৫৪ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৫ অগাস্ট ২০২৬

পুতুল থেকে দেশমাতা আস্থার হিমাদ্রি আপসহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জন্মদিনে হৃদয়ের শ্রদ্ধাঞ্জলি

  • ডেস্ক রিপোর্ট
  • প্রকাশিত : ১১:০৫:৩৯ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৪ অগাস্ট ২০২৬
  • ৪ বার দেখা হয়েছে

জুবাইয়া বিন্তে কবির: পুতুল থেকে দেশমাতা এ রূপান্তর কেবল একজন নারীর জীবনের গল্প নয়, এটি বাংলাদেশের রাজনীতির এক দীপ্ত, বেদনাময় ও অনন্য অধ্যায়। দিনাজপুরের শান্ত-সৌম্য কিশোরী খালেদা খানম থেকে আপসহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ায় উত্তরণ ছিল সময়, ইতিহাস ও সংগ্রামের এক দীর্ঘ মহাকাব্য; যেখানে ব্যক্তিগত সুখের চেয়ে বড় হয়ে উঠেছিল দেশ, গণতন্ত্র আর জনগণের অধিকার। স্বামী শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আদর্শ, দুই সন্তানকে ঘিরে মমতা, আর রাজনৈতিক জীবনের প্রতিটি বাঁকে প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে থাকার অসাধারণ দৃঢ়তা—এসব মিলেই তিনি হয়ে উঠেছিলেন এক অবিচল উচ্চারণ, এক অনমনীয় অধ্যায়। তাঁর বিরুদ্ধে উচ্চারিত বহু মিথ্যা মামলা, দীর্ঘ কারাবরণ, নিঃসঙ্গতা, স্বাস্থ্যগত দুর্ভোগ এবং নির্যাতনের নীরব ইতিহাস আজও স্মৃতিতে জ্বলজ্বল করে। তবু তিনি ভেঙে পড়েননি; বরং প্রতিটি আঘাতকে মর্যাদা, ধৈর্য ও সাহসের আলোয় অতিক্রম করেছেন। গত ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫ তিনি রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে দীর্ঘ অসুস্থতার পর ইন্তেকাল করেছেন। বয়স হয়েছিল ৮০ বছর। তাঁর চলে যাওয়ার পর প্রথমবারের মতো তাঁর জন্মদিন এসেছে তাই তাঁকে স্মরণ করা মানে শুধু একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে শ্রদ্ধা জানানো নয়, বরং বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সংগ্রাম, নারী নেতৃত্বের উত্থান এবং অদম্য ব্যক্তিত্বের প্রতি হৃদয়ের গভীরতম কৃতজ্ঞতা নিবেদন করা।

ফজরের আজান আর শেষ বিদায়ের ভোর : ৩০ ডিসেম্বরের সেই ভোরটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে চিরকাল এক বেদনার ভোর হয়ে থাকবে। দীর্ঘদিনের অসুস্থতার সঙ্গে লড়াই শেষে এভারকেয়ার হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন বেগম খালেদা জিয়া। তাঁর মৃত্যুর সংবাদ ছড়িয়ে পড়তেই রাজধানী থেকে প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত নেমে আসে শোকের ছায়া। যে নারী জীবনের প্রায় অর্ধশতাব্দী দেশের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন, তাঁর শেষ বিদায়ের সংবাদে রাজপথ স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। মানুষ কাঁদছিল, দোয়া করছিল, আর স্মরণ করছিল একজন নেত্রীকে যাঁর পরিচয় শেষ পর্যন্ত কেবল রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ থাকেনি।

পুতুল একটি সরল শৈশবের নাম : রাজনীতির উত্তাল সমুদ্রের বহু আগে তিনি ছিলেন এক সাধারণ কিশোরী পরিবারের আদরের ‘পুতুল’। তাঁর জন্মনাম খালেদা খানম। জন্মতারিখ ও জন্মসন নিয়ে বিভিন্ন নথি ও জীবনীতে ভিন্নতা রয়েছে; তবে ১৫ আগস্ট তাঁর জন্মদিন হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত। দিনাজপুরে বেড়ে ওঠা সেই শান্ত, ঘরোয়া মেয়েটি একদিন বাংলাদেশের রাজনীতির অন্যতম শক্তিশালী নারী নেতৃত্বে পরিণত হবেন তখন কে-ই বা তা জানত? ইতিহাসের সবচেয়ে বিস্ময়কর গল্পগুলো হয়তো এভাবেই শুরু হয় নিরাভরণ, নীরব, একেবারে সাধারণভাবে।

সংসার থেকে ইতিহাসের মঞ্চে : ১৯৬০ সালে সেনাবাহিনীর তরুণ কর্মকর্তা জিয়াউর রহমানের সঙ্গে তাঁর বিবাহ। তারপর সংসার, সন্তান, স্বামীর কর্মজীবন সব মিলিয়ে তাঁর জীবন ছিল একেবারেই পারিবারিক। কিন্তু ইতিহাস কখনো কখনো মানুষকে নিজের নির্ধারিত পথের বাইরে নিয়ে যায়। ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ, স্বামী জিয়াউর রহমানের যুদ্ধে যোগদান, সন্তানদের নিয়ে অনিশ্চয়তা সবকিছু তাঁর জীবনে এক গভীর ছাপ রেখে যায়। মুক্তিযুদ্ধের সেই অস্থির সময়ে তাঁর দৃঢ়তার কিছু ঘটনাও পরবর্তীকালে বিভিন্ন বর্ণনায় উঠে এসেছে।

স্বামীর মৃত্যু, জীবনের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা :
১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর তাঁর জীবনে নেমে আসে এক গভীর ব্যক্তিগত শূন্যতা। দুই সন্তানকে নিয়ে একজন বিধবা নারী তখন কী করবেন সেটিই ছিল স্বাভাবিক প্রশ্ন। কিন্তু নিয়তির নির্মমতা তাঁকে ব্যক্তিগত শোকের গণ্ডিতে থাকতে দেয়নি। স্বামীর প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল তখন নানা সংকটে। সামরিক শাসনের কঠিন বাস্তবতায় গণতন্ত্রের দাবিও ক্রমে জোরালো হচ্ছিল। সেই সময়ই ইতিহাসের মঞ্চে প্রবেশ করেন খালেদা জিয়া।

গৃহবধূ থেকে ‘আপসহীন নেত্রী’ : ১৯৮০-এর দশকে এরশাদবিরোধী আন্দোলনের রাজপথে যে খালেদা জিয়াকে দেখা গেল, তিনি আর কেবল শহীদ জিয়ার সহধর্মিণী নন। তিনি নিজেই হয়ে উঠলেন একটি রাজনৈতিক শক্তির প্রতীক। গ্রেপ্তার, গৃহবন্দিত্ব, হুমকি কিংবা দমন-পীড়ন কোনোটিই তাঁকে সহজে পিছু হটাতে পারেনি। ১৯৮৬ সালের নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্ত তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানের দৃঢ়তার অন্যতম আলোচিত দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। সেই সময় থেকেই ‘আপসহীন নেত্রী’ অভিধাটি ধীরে ধীরে তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গে স্থায়ীভাবে জড়িয়ে যায়।

নব্বইয়ের গণআন্দোলন ও গণতন্ত্রের প্রত্যাবর্তন :
এরশাদবিরোধী গণআন্দোলনের শেষ পর্বে খালেদা জিয়া ছিলেন অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক নেতৃত্ব। ১৯৯০-এর গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে সামরিক শাসনের অবসান এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রত্যাবর্তনের পথ তৈরি হয়। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিজয়ের পর তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। একই বছর সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংসদীয় সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়।

প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী এক নতুন ইতিহাস :
একজন নারী হিসেবে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ ছিল নিজেই একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। তাঁর প্রথম সরকারের সময়ে বাধ্যতামূলক ও অবৈতনিক প্রাথমিক শিক্ষা এবং মেয়েদের শিক্ষায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার মতো উদ্যোগ নেওয়া হয়। মেয়েদের মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষায় অংশগ্রহণ বাড়ানোর নীতিও পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের সামাজিক পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাঁর অবদান নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক থাকলেও নারীশিক্ষা ও নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণের ইতিহাসে তাঁর সময়কে আলাদা করে দেখতে হয়।

ক্ষমতার রাজনীতি ও বিতর্ক একটি পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন : কোনো রাষ্ট্রনায়কের জীবনই কেবল সাফল্যের গল্প নয়। খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনও ছিল সাফল্য, ব্যর্থতা, বিতর্ক, সংঘাত ও সমালোচনায় পূর্ণ। তাঁর সরকারের সময় রাজনৈতিক অস্থিরতা, বিরোধী দলের আন্দোলন, জঙ্গিবাদ, দুর্নীতির অভিযোগসহ নানা প্রশ্ন উঠেছিল। তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নিয়ে দেশে আজও মতভেদ আছে। কিন্তু একজন মতামত লেখকের দায়িত্ব হলো প্রশংসার পাশাপাশি বিতর্ককেও ইতিহাসের অংশ হিসেবে স্বীকার করা। কারণ মানুষকে দেবী বানালে ইতিহাস ছোট হয়; আর মানুষ হিসেবে মূল্যায়ন করলেই তাঁর সংগ্রাম, ভুল, সাফল্য ও ত্যাগ—সবকিছু পূর্ণতা পায়।

দ্বিতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব : ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচন এবং পরবর্তী রাজনৈতিক সংকটের পর অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি পদত্যাগ করেন। পরে ১৯৯৬ সালের জুনের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে। কিন্তু ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট বড় জয় পেলে খালেদা জিয়া আবার প্রধানমন্ত্রী হন। ২০০১ থেকে ২০০৬ এই সময়টি তাঁর রাজনৈতিক জীবনের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ শাসনপর্ব। তিনি বাংলাদেশের তিনবারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নেন।

এক-এগারো, কারাবাস ও নিঃসঙ্গতার দিন : ২০০৭-০৮ সালের রাজনৈতিক সংকট তাঁর জীবনের আরেকটি কঠিন অধ্যায়। গ্রেপ্তার, কারাবাস এবং পরে ২০১৮ সালের দুর্নীতি মামলায় সাজা—সব মিলিয়ে তাঁর জীবনের শেষ দেড় দশক ছিল গভীর সংকটময়। তাঁর দল ও সমর্থকেরা মামলাগুলোকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছিল; অন্যদিকে আদালতের রায়ও তাঁর রাজনৈতিক জীবনে বড় আঘাত হানে। অসুস্থতা বাড়তে থাকায় কারাগার থেকে মুক্তির পর দীর্ঘদিন তিনি বাসায় চিকিৎসাধীন ছিলেন।

অসুস্থতার সঙ্গে দীর্ঘ লড়াই : জীবনের শেষ বছরগুলোতে বেগম খালেদা জিয়া নানা জটিল স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগেছেন। ২০২৫ সালের নভেম্বরের শেষ দিকে তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। দীর্ঘ চিকিৎসা, বিশেষজ্ঞদের প্রচেষ্টা এবং পরিবারের উদ্বেগের মধ্যেও শেষ পর্যন্ত তাঁকে ধরে রাখা যায়নি। ৩০ ডিসেম্বর ভোরে তিনি চলে গেলেন। একটি দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের যেমন সমাপ্তি হলো, তেমনি শেষ হলো বাংলাদেশের রাজনীতির এক দীর্ঘ অধ্যায়।

শেষ যাত্রায় জনতার ঢল : তাঁর মৃত্যুর পর যে দৃশ্য বাংলাদেশ দেখেছে, তা নিঃসন্দেহে স্মরণীয়। ৩১ ডিসেম্বর জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজা ও আশপাশের এলাকায় জানাজায় বিপুল জনসমাগম হয়। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়, লাখো মানুষ ঢাকায় ছুটে এসেছিলেন; অনেকে দূরদূরান্ত থেকে রাতভর যাত্রা করে জানাজায় অংশ নেন। স্থানীয়ভাবে আরও বড় সংখ্যার দাবি উঠলেও নির্ভরযোগ্যভাবে ‘অর্ধকোটি’ মানুষের উপস্থিতি নিশ্চিত করা যায়নি। তাই সংখ্যার চেয়ে বড় সত্যটি হলো মানুষের সেই ঢল ছিল অভাবনীয়।

শেষ কাতারে জাতির নানা শ্রেণি : জানাজার সেই বিশাল সমাবেশে রাজনৈতিক কর্মী-সমর্থকের পাশাপাশি সাধারণ মানুষ, আলেম, পেশাজীবী, ছাত্র, শ্রমিক, কৃষকসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ উপস্থিত ছিলেন। বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রীয় ও কূটনৈতিক প্রতিনিধিরাও তাঁর শেষ বিদায়ে অংশ নেন। এ দৃশ্য দেখিয়ে দিয়েছে রাজনীতির সঙ্গে মতপার্থক্য থাকতে পারে, কিন্তু দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে একজন নেতার সঙ্গে মানুষের যে আবেগের সম্পর্ক তৈরি হয়, মৃত্যুর মুহূর্তে সেটিই অনেক সময় সবচেয়ে বড় হয়ে ওঠে।

স্বামীর পাশে চিরনিদ্রা : রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় জানাজা শেষে বেগম খালেদা জিয়াকে ঢাকার শেরেবাংলা নগরে তাঁর স্বামী শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সমাধির পাশে দাফন করা হয়। জীবনের দীর্ঘ পথচলায় যাঁর সঙ্গে তাঁর সংসার, সংগ্রাম ও বিচ্ছেদের গল্প জড়িয়ে ছিল, মৃত্যুর পরও শেষ ঠিকানা হলো সেই মানুষের পাশেই। কবরের মাটিতে যখন শেষ মুঠো মাটি পড়ল, তখন যেন একটি দীর্ঘ রাজনৈতিক উপাখ্যানেরও পর্দা নামল।

আমার ও আমার পরিবারের কাছে তিনি : ব্যক্তিগত অনুভূতির জায়গা থেকে বললে বেগম খালেদা জিয়া শুধু বাংলাদেশের একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী কিংবা বিএনপির চেয়ারপারসন ছিলেন না; আমার এবং আমার পরিবারের প্রতিটি সদস্যের কাছে তিনি ছিলেন অত্যন্ত পছন্দের, শ্রদ্ধার এবং ভালোবাসার একজন মানুষ। তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান, দৃঢ়তা, প্রতিকূলতার মধ্যেও মাথা উঁচু করে থাকার মানসিকতা আমাদের গভীরভাবে আকৃষ্ট করেছে। তাঁকে নিয়ে আমাদের অনুভূতি কোনো দলীয় স্লোগানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি হৃদয়ের একান্ত জায়গায় রাখা একজন প্রিয় মানুষের প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা।

তাঁর উত্তরাধিকার শুধু রাজনীতি নয় : খালেদা জিয়ার উত্তরাধিকার নিয়ে ভবিষ্যতে বহু গবেষণা হবে। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা, নারী নেতৃত্ব, সংসদীয় রাজনীতি, নির্বাচনব্যবস্থা, অর্থনৈতিক নীতি, শিক্ষা এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় তাঁর ভূমিকা নিয়ে ইতিহাসবিদেরা বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে মূল্যায়ন করবেন। ২০২৬ সালে তাঁকে মরণোত্তর বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক রাষ্ট্রীয় সম্মান স্বাধীনতা পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। তাঁর নাতনি ব্যারিস্টার জাইমা রহমান তাঁর পক্ষে পুরস্কার গ্রহণ করেন। সরকার তাঁর স্বাধীনতা, গণতন্ত্র, নারীশিক্ষা ও রাষ্ট্রগঠনে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে এ সম্মান দেয়।

তাঁর জন্মদিনে সবচেয়ে বড় শ্রদ্ধা : জন্মদিনে আমরা সাধারণত প্রিয় মানুষকে শুভেচ্ছা জানাই। কিন্তু আজ তাঁর জন্মদিনের প্রাক্কালে শুভেচ্ছা জানানোর ভাষা বদলে গেছে। ফুলের তোড়া নয়, কেক নয়, আনুষ্ঠানিক অভিনন্দন নয়—আজ তাঁর জন্য প্রয়োজন দোয়া। প্রয়োজন তাঁর দীর্ঘ সংগ্রামী জীবনকে স্মরণ করা। প্রয়োজন তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সাফল্য ও বিতর্ক—দুটোকেই ইতিহাসের আলোয় বিচার করা। আর প্রয়োজন তাঁর রেখে যাওয়া গণতন্ত্র, মানবিকতা ও দেশপ্রেমের আকাঙ্ক্ষাকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া।

পুতুল থেকে দেশমাতা : দিনাজপুরের সেই ‘পুতুল’ একদিন হয়ে উঠলেন খালেদা জিয়া। তারপর বিএনপির চেয়ারপারসন, তিনবারের প্রধানমন্ত্রী, গণতন্ত্রের আন্দোলনের অন্যতম প্রধান নেতা। জীবনের প্রতিটি বাঁকে তিনি হারিয়েছেন স্বামীকে, ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোকে, স্বাধীনতা, স্বাভাবিক জীবন, এমনকি জীবনের শেষ সময়ের অনেক স্বস্তিও। তবু তাঁর রাজনৈতিক অভিধানে সবচেয়ে উজ্জ্বল শব্দ হয়ে রইল ‘আপসহীন’। তাই পুতুল থেকে দেশমাতা হয়ে ওঠার গল্পটি আসলে একজন নারীর ব্যক্তিগত জীবনের গল্প নয়; এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসেরও এক দীর্ঘ, বেদনাময় ও মহাকাব্যিক অধ্যায়।

পরিশেষে, আজ তাঁর জন্মদিনে আমার এবং আমার পরিবারের পক্ষ থেকে প্রিয় বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি রইল অন্তরের গভীরতম শ্রদ্ধা। তিনি রয়েছেন মানুষের হৃদয়ে, জাতীয় স্মৃতিতে এবং রাজনৈতিক ইতিহাসের পাতায় তিনি থাকবেন এক অম্লান নাম আপসহীন নেত্রী, দেশমাতা বেগম খালেদা জিয়া। পৃথিবীর মায়া ছেড়ে তিনি চলে গেছেন মহান আল্লাহর দরবারে। তাই প্রিয় নেত্রীর জন্য মহান রবের কাছে নামাজে বলি হে মহান আল্লাহ, আপনি বেগম খালেদা জিয়ার জীবনের সব কষ্ট, দুঃখ, অপমান ও অশ্রুকে তাঁর জন্য সওয়াবে পরিণত করুন। তাঁর কবরকে নূরে ভরে দিন, কবরকে প্রশস্ত ও শান্তিময় করুন। তাঁর সকল গুনাহ মাফ করে দিন। তাঁকে জান্নাতুল ফেরদৌসের সর্বোচ্চ মেহমান হিসেবে কবুল করুন। তাঁর মর্যাদা বৃদ্ধি করুন এবং তাঁর পরিবার, সন্তান-সন্ততি, স্বজন ও অগণিত শুভাকাঙ্ক্ষীকে সবর দান করুন। দেশমাতা বেগম খালেদা জিয়া আপনি আজ আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু মানুষের হৃদয়ে কিছু মানুষ মৃত্যুর পরও বেঁচে থাকেন। আপনি তেমনই একজন। আপনার জন্মদিনে তাই আমাদের একটাই কথা পুতুল থেকে দেশমাতা হয়ে ওঠা আপনার এই মহাকাব্য শেষ হয়নি; মানুষের স্মৃতিতে, ইতিহাসের পাতায় এবং ভালোবাসার অমলিন ভুবনে আপনি বেঁচে থাকবেন। মা, আপনার প্রতি আমাদের ঋণ শোধ করার সাধ্য নেই। আছে শুধু শ্রদ্ধা, ভালোবাসা আর দোয়া। আল্লাহুম্মাগফির লাহা, ওয়ারহামহা, ওয়া’ফু আনহা। হে আল্লাহ, বেগম খালেদা জিয়াকে জান্নাতুল ফেরদৌসের মেহমান হিসেবে কবুল করুন। আমিন।

লেখক : জুবাইয়া বিন্তে কবির
অর্থনীতিবিদ, গবেষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট

জনপ্রিয় সংবাদ

যুবদলের শুভেচ্ছা মিছিল সরকারের ১৮০ দিন পূর্তিতে

পুতুল থেকে দেশমাতা আস্থার হিমাদ্রি আপসহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জন্মদিনে হৃদয়ের শ্রদ্ধাঞ্জলি

প্রকাশিত : ১১:০৫:৩৯ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৪ অগাস্ট ২০২৬

জুবাইয়া বিন্তে কবির: পুতুল থেকে দেশমাতা এ রূপান্তর কেবল একজন নারীর জীবনের গল্প নয়, এটি বাংলাদেশের রাজনীতির এক দীপ্ত, বেদনাময় ও অনন্য অধ্যায়। দিনাজপুরের শান্ত-সৌম্য কিশোরী খালেদা খানম থেকে আপসহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ায় উত্তরণ ছিল সময়, ইতিহাস ও সংগ্রামের এক দীর্ঘ মহাকাব্য; যেখানে ব্যক্তিগত সুখের চেয়ে বড় হয়ে উঠেছিল দেশ, গণতন্ত্র আর জনগণের অধিকার। স্বামী শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আদর্শ, দুই সন্তানকে ঘিরে মমতা, আর রাজনৈতিক জীবনের প্রতিটি বাঁকে প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে থাকার অসাধারণ দৃঢ়তা—এসব মিলেই তিনি হয়ে উঠেছিলেন এক অবিচল উচ্চারণ, এক অনমনীয় অধ্যায়। তাঁর বিরুদ্ধে উচ্চারিত বহু মিথ্যা মামলা, দীর্ঘ কারাবরণ, নিঃসঙ্গতা, স্বাস্থ্যগত দুর্ভোগ এবং নির্যাতনের নীরব ইতিহাস আজও স্মৃতিতে জ্বলজ্বল করে। তবু তিনি ভেঙে পড়েননি; বরং প্রতিটি আঘাতকে মর্যাদা, ধৈর্য ও সাহসের আলোয় অতিক্রম করেছেন। গত ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫ তিনি রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে দীর্ঘ অসুস্থতার পর ইন্তেকাল করেছেন। বয়স হয়েছিল ৮০ বছর। তাঁর চলে যাওয়ার পর প্রথমবারের মতো তাঁর জন্মদিন এসেছে তাই তাঁকে স্মরণ করা মানে শুধু একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে শ্রদ্ধা জানানো নয়, বরং বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সংগ্রাম, নারী নেতৃত্বের উত্থান এবং অদম্য ব্যক্তিত্বের প্রতি হৃদয়ের গভীরতম কৃতজ্ঞতা নিবেদন করা।

ফজরের আজান আর শেষ বিদায়ের ভোর : ৩০ ডিসেম্বরের সেই ভোরটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে চিরকাল এক বেদনার ভোর হয়ে থাকবে। দীর্ঘদিনের অসুস্থতার সঙ্গে লড়াই শেষে এভারকেয়ার হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন বেগম খালেদা জিয়া। তাঁর মৃত্যুর সংবাদ ছড়িয়ে পড়তেই রাজধানী থেকে প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত নেমে আসে শোকের ছায়া। যে নারী জীবনের প্রায় অর্ধশতাব্দী দেশের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন, তাঁর শেষ বিদায়ের সংবাদে রাজপথ স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। মানুষ কাঁদছিল, দোয়া করছিল, আর স্মরণ করছিল একজন নেত্রীকে যাঁর পরিচয় শেষ পর্যন্ত কেবল রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ থাকেনি।

পুতুল একটি সরল শৈশবের নাম : রাজনীতির উত্তাল সমুদ্রের বহু আগে তিনি ছিলেন এক সাধারণ কিশোরী পরিবারের আদরের ‘পুতুল’। তাঁর জন্মনাম খালেদা খানম। জন্মতারিখ ও জন্মসন নিয়ে বিভিন্ন নথি ও জীবনীতে ভিন্নতা রয়েছে; তবে ১৫ আগস্ট তাঁর জন্মদিন হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত। দিনাজপুরে বেড়ে ওঠা সেই শান্ত, ঘরোয়া মেয়েটি একদিন বাংলাদেশের রাজনীতির অন্যতম শক্তিশালী নারী নেতৃত্বে পরিণত হবেন তখন কে-ই বা তা জানত? ইতিহাসের সবচেয়ে বিস্ময়কর গল্পগুলো হয়তো এভাবেই শুরু হয় নিরাভরণ, নীরব, একেবারে সাধারণভাবে।

সংসার থেকে ইতিহাসের মঞ্চে : ১৯৬০ সালে সেনাবাহিনীর তরুণ কর্মকর্তা জিয়াউর রহমানের সঙ্গে তাঁর বিবাহ। তারপর সংসার, সন্তান, স্বামীর কর্মজীবন সব মিলিয়ে তাঁর জীবন ছিল একেবারেই পারিবারিক। কিন্তু ইতিহাস কখনো কখনো মানুষকে নিজের নির্ধারিত পথের বাইরে নিয়ে যায়। ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ, স্বামী জিয়াউর রহমানের যুদ্ধে যোগদান, সন্তানদের নিয়ে অনিশ্চয়তা সবকিছু তাঁর জীবনে এক গভীর ছাপ রেখে যায়। মুক্তিযুদ্ধের সেই অস্থির সময়ে তাঁর দৃঢ়তার কিছু ঘটনাও পরবর্তীকালে বিভিন্ন বর্ণনায় উঠে এসেছে।

স্বামীর মৃত্যু, জীবনের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা :
১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর তাঁর জীবনে নেমে আসে এক গভীর ব্যক্তিগত শূন্যতা। দুই সন্তানকে নিয়ে একজন বিধবা নারী তখন কী করবেন সেটিই ছিল স্বাভাবিক প্রশ্ন। কিন্তু নিয়তির নির্মমতা তাঁকে ব্যক্তিগত শোকের গণ্ডিতে থাকতে দেয়নি। স্বামীর প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল তখন নানা সংকটে। সামরিক শাসনের কঠিন বাস্তবতায় গণতন্ত্রের দাবিও ক্রমে জোরালো হচ্ছিল। সেই সময়ই ইতিহাসের মঞ্চে প্রবেশ করেন খালেদা জিয়া।

গৃহবধূ থেকে ‘আপসহীন নেত্রী’ : ১৯৮০-এর দশকে এরশাদবিরোধী আন্দোলনের রাজপথে যে খালেদা জিয়াকে দেখা গেল, তিনি আর কেবল শহীদ জিয়ার সহধর্মিণী নন। তিনি নিজেই হয়ে উঠলেন একটি রাজনৈতিক শক্তির প্রতীক। গ্রেপ্তার, গৃহবন্দিত্ব, হুমকি কিংবা দমন-পীড়ন কোনোটিই তাঁকে সহজে পিছু হটাতে পারেনি। ১৯৮৬ সালের নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্ত তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানের দৃঢ়তার অন্যতম আলোচিত দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। সেই সময় থেকেই ‘আপসহীন নেত্রী’ অভিধাটি ধীরে ধীরে তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গে স্থায়ীভাবে জড়িয়ে যায়।

নব্বইয়ের গণআন্দোলন ও গণতন্ত্রের প্রত্যাবর্তন :
এরশাদবিরোধী গণআন্দোলনের শেষ পর্বে খালেদা জিয়া ছিলেন অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক নেতৃত্ব। ১৯৯০-এর গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে সামরিক শাসনের অবসান এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রত্যাবর্তনের পথ তৈরি হয়। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিজয়ের পর তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। একই বছর সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংসদীয় সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়।

প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী এক নতুন ইতিহাস :
একজন নারী হিসেবে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ ছিল নিজেই একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। তাঁর প্রথম সরকারের সময়ে বাধ্যতামূলক ও অবৈতনিক প্রাথমিক শিক্ষা এবং মেয়েদের শিক্ষায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার মতো উদ্যোগ নেওয়া হয়। মেয়েদের মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষায় অংশগ্রহণ বাড়ানোর নীতিও পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের সামাজিক পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাঁর অবদান নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক থাকলেও নারীশিক্ষা ও নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণের ইতিহাসে তাঁর সময়কে আলাদা করে দেখতে হয়।

ক্ষমতার রাজনীতি ও বিতর্ক একটি পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন : কোনো রাষ্ট্রনায়কের জীবনই কেবল সাফল্যের গল্প নয়। খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনও ছিল সাফল্য, ব্যর্থতা, বিতর্ক, সংঘাত ও সমালোচনায় পূর্ণ। তাঁর সরকারের সময় রাজনৈতিক অস্থিরতা, বিরোধী দলের আন্দোলন, জঙ্গিবাদ, দুর্নীতির অভিযোগসহ নানা প্রশ্ন উঠেছিল। তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নিয়ে দেশে আজও মতভেদ আছে। কিন্তু একজন মতামত লেখকের দায়িত্ব হলো প্রশংসার পাশাপাশি বিতর্ককেও ইতিহাসের অংশ হিসেবে স্বীকার করা। কারণ মানুষকে দেবী বানালে ইতিহাস ছোট হয়; আর মানুষ হিসেবে মূল্যায়ন করলেই তাঁর সংগ্রাম, ভুল, সাফল্য ও ত্যাগ—সবকিছু পূর্ণতা পায়।

দ্বিতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব : ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচন এবং পরবর্তী রাজনৈতিক সংকটের পর অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি পদত্যাগ করেন। পরে ১৯৯৬ সালের জুনের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে। কিন্তু ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট বড় জয় পেলে খালেদা জিয়া আবার প্রধানমন্ত্রী হন। ২০০১ থেকে ২০০৬ এই সময়টি তাঁর রাজনৈতিক জীবনের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ শাসনপর্ব। তিনি বাংলাদেশের তিনবারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নেন।

এক-এগারো, কারাবাস ও নিঃসঙ্গতার দিন : ২০০৭-০৮ সালের রাজনৈতিক সংকট তাঁর জীবনের আরেকটি কঠিন অধ্যায়। গ্রেপ্তার, কারাবাস এবং পরে ২০১৮ সালের দুর্নীতি মামলায় সাজা—সব মিলিয়ে তাঁর জীবনের শেষ দেড় দশক ছিল গভীর সংকটময়। তাঁর দল ও সমর্থকেরা মামলাগুলোকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছিল; অন্যদিকে আদালতের রায়ও তাঁর রাজনৈতিক জীবনে বড় আঘাত হানে। অসুস্থতা বাড়তে থাকায় কারাগার থেকে মুক্তির পর দীর্ঘদিন তিনি বাসায় চিকিৎসাধীন ছিলেন।

অসুস্থতার সঙ্গে দীর্ঘ লড়াই : জীবনের শেষ বছরগুলোতে বেগম খালেদা জিয়া নানা জটিল স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগেছেন। ২০২৫ সালের নভেম্বরের শেষ দিকে তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। দীর্ঘ চিকিৎসা, বিশেষজ্ঞদের প্রচেষ্টা এবং পরিবারের উদ্বেগের মধ্যেও শেষ পর্যন্ত তাঁকে ধরে রাখা যায়নি। ৩০ ডিসেম্বর ভোরে তিনি চলে গেলেন। একটি দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের যেমন সমাপ্তি হলো, তেমনি শেষ হলো বাংলাদেশের রাজনীতির এক দীর্ঘ অধ্যায়।

শেষ যাত্রায় জনতার ঢল : তাঁর মৃত্যুর পর যে দৃশ্য বাংলাদেশ দেখেছে, তা নিঃসন্দেহে স্মরণীয়। ৩১ ডিসেম্বর জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজা ও আশপাশের এলাকায় জানাজায় বিপুল জনসমাগম হয়। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়, লাখো মানুষ ঢাকায় ছুটে এসেছিলেন; অনেকে দূরদূরান্ত থেকে রাতভর যাত্রা করে জানাজায় অংশ নেন। স্থানীয়ভাবে আরও বড় সংখ্যার দাবি উঠলেও নির্ভরযোগ্যভাবে ‘অর্ধকোটি’ মানুষের উপস্থিতি নিশ্চিত করা যায়নি। তাই সংখ্যার চেয়ে বড় সত্যটি হলো মানুষের সেই ঢল ছিল অভাবনীয়।

শেষ কাতারে জাতির নানা শ্রেণি : জানাজার সেই বিশাল সমাবেশে রাজনৈতিক কর্মী-সমর্থকের পাশাপাশি সাধারণ মানুষ, আলেম, পেশাজীবী, ছাত্র, শ্রমিক, কৃষকসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ উপস্থিত ছিলেন। বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রীয় ও কূটনৈতিক প্রতিনিধিরাও তাঁর শেষ বিদায়ে অংশ নেন। এ দৃশ্য দেখিয়ে দিয়েছে রাজনীতির সঙ্গে মতপার্থক্য থাকতে পারে, কিন্তু দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে একজন নেতার সঙ্গে মানুষের যে আবেগের সম্পর্ক তৈরি হয়, মৃত্যুর মুহূর্তে সেটিই অনেক সময় সবচেয়ে বড় হয়ে ওঠে।

স্বামীর পাশে চিরনিদ্রা : রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় জানাজা শেষে বেগম খালেদা জিয়াকে ঢাকার শেরেবাংলা নগরে তাঁর স্বামী শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সমাধির পাশে দাফন করা হয়। জীবনের দীর্ঘ পথচলায় যাঁর সঙ্গে তাঁর সংসার, সংগ্রাম ও বিচ্ছেদের গল্প জড়িয়ে ছিল, মৃত্যুর পরও শেষ ঠিকানা হলো সেই মানুষের পাশেই। কবরের মাটিতে যখন শেষ মুঠো মাটি পড়ল, তখন যেন একটি দীর্ঘ রাজনৈতিক উপাখ্যানেরও পর্দা নামল।

আমার ও আমার পরিবারের কাছে তিনি : ব্যক্তিগত অনুভূতির জায়গা থেকে বললে বেগম খালেদা জিয়া শুধু বাংলাদেশের একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী কিংবা বিএনপির চেয়ারপারসন ছিলেন না; আমার এবং আমার পরিবারের প্রতিটি সদস্যের কাছে তিনি ছিলেন অত্যন্ত পছন্দের, শ্রদ্ধার এবং ভালোবাসার একজন মানুষ। তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান, দৃঢ়তা, প্রতিকূলতার মধ্যেও মাথা উঁচু করে থাকার মানসিকতা আমাদের গভীরভাবে আকৃষ্ট করেছে। তাঁকে নিয়ে আমাদের অনুভূতি কোনো দলীয় স্লোগানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি হৃদয়ের একান্ত জায়গায় রাখা একজন প্রিয় মানুষের প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা।

তাঁর উত্তরাধিকার শুধু রাজনীতি নয় : খালেদা জিয়ার উত্তরাধিকার নিয়ে ভবিষ্যতে বহু গবেষণা হবে। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা, নারী নেতৃত্ব, সংসদীয় রাজনীতি, নির্বাচনব্যবস্থা, অর্থনৈতিক নীতি, শিক্ষা এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় তাঁর ভূমিকা নিয়ে ইতিহাসবিদেরা বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে মূল্যায়ন করবেন। ২০২৬ সালে তাঁকে মরণোত্তর বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক রাষ্ট্রীয় সম্মান স্বাধীনতা পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। তাঁর নাতনি ব্যারিস্টার জাইমা রহমান তাঁর পক্ষে পুরস্কার গ্রহণ করেন। সরকার তাঁর স্বাধীনতা, গণতন্ত্র, নারীশিক্ষা ও রাষ্ট্রগঠনে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে এ সম্মান দেয়।

তাঁর জন্মদিনে সবচেয়ে বড় শ্রদ্ধা : জন্মদিনে আমরা সাধারণত প্রিয় মানুষকে শুভেচ্ছা জানাই। কিন্তু আজ তাঁর জন্মদিনের প্রাক্কালে শুভেচ্ছা জানানোর ভাষা বদলে গেছে। ফুলের তোড়া নয়, কেক নয়, আনুষ্ঠানিক অভিনন্দন নয়—আজ তাঁর জন্য প্রয়োজন দোয়া। প্রয়োজন তাঁর দীর্ঘ সংগ্রামী জীবনকে স্মরণ করা। প্রয়োজন তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সাফল্য ও বিতর্ক—দুটোকেই ইতিহাসের আলোয় বিচার করা। আর প্রয়োজন তাঁর রেখে যাওয়া গণতন্ত্র, মানবিকতা ও দেশপ্রেমের আকাঙ্ক্ষাকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া।

পুতুল থেকে দেশমাতা : দিনাজপুরের সেই ‘পুতুল’ একদিন হয়ে উঠলেন খালেদা জিয়া। তারপর বিএনপির চেয়ারপারসন, তিনবারের প্রধানমন্ত্রী, গণতন্ত্রের আন্দোলনের অন্যতম প্রধান নেতা। জীবনের প্রতিটি বাঁকে তিনি হারিয়েছেন স্বামীকে, ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোকে, স্বাধীনতা, স্বাভাবিক জীবন, এমনকি জীবনের শেষ সময়ের অনেক স্বস্তিও। তবু তাঁর রাজনৈতিক অভিধানে সবচেয়ে উজ্জ্বল শব্দ হয়ে রইল ‘আপসহীন’। তাই পুতুল থেকে দেশমাতা হয়ে ওঠার গল্পটি আসলে একজন নারীর ব্যক্তিগত জীবনের গল্প নয়; এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসেরও এক দীর্ঘ, বেদনাময় ও মহাকাব্যিক অধ্যায়।

পরিশেষে, আজ তাঁর জন্মদিনে আমার এবং আমার পরিবারের পক্ষ থেকে প্রিয় বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি রইল অন্তরের গভীরতম শ্রদ্ধা। তিনি রয়েছেন মানুষের হৃদয়ে, জাতীয় স্মৃতিতে এবং রাজনৈতিক ইতিহাসের পাতায় তিনি থাকবেন এক অম্লান নাম আপসহীন নেত্রী, দেশমাতা বেগম খালেদা জিয়া। পৃথিবীর মায়া ছেড়ে তিনি চলে গেছেন মহান আল্লাহর দরবারে। তাই প্রিয় নেত্রীর জন্য মহান রবের কাছে নামাজে বলি হে মহান আল্লাহ, আপনি বেগম খালেদা জিয়ার জীবনের সব কষ্ট, দুঃখ, অপমান ও অশ্রুকে তাঁর জন্য সওয়াবে পরিণত করুন। তাঁর কবরকে নূরে ভরে দিন, কবরকে প্রশস্ত ও শান্তিময় করুন। তাঁর সকল গুনাহ মাফ করে দিন। তাঁকে জান্নাতুল ফেরদৌসের সর্বোচ্চ মেহমান হিসেবে কবুল করুন। তাঁর মর্যাদা বৃদ্ধি করুন এবং তাঁর পরিবার, সন্তান-সন্ততি, স্বজন ও অগণিত শুভাকাঙ্ক্ষীকে সবর দান করুন। দেশমাতা বেগম খালেদা জিয়া আপনি আজ আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু মানুষের হৃদয়ে কিছু মানুষ মৃত্যুর পরও বেঁচে থাকেন। আপনি তেমনই একজন। আপনার জন্মদিনে তাই আমাদের একটাই কথা পুতুল থেকে দেশমাতা হয়ে ওঠা আপনার এই মহাকাব্য শেষ হয়নি; মানুষের স্মৃতিতে, ইতিহাসের পাতায় এবং ভালোবাসার অমলিন ভুবনে আপনি বেঁচে থাকবেন। মা, আপনার প্রতি আমাদের ঋণ শোধ করার সাধ্য নেই। আছে শুধু শ্রদ্ধা, ভালোবাসা আর দোয়া। আল্লাহুম্মাগফির লাহা, ওয়ারহামহা, ওয়া’ফু আনহা। হে আল্লাহ, বেগম খালেদা জিয়াকে জান্নাতুল ফেরদৌসের মেহমান হিসেবে কবুল করুন। আমিন।

লেখক : জুবাইয়া বিন্তে কবির
অর্থনীতিবিদ, গবেষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট