ঢাকা ০৬:৩১ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বিলাসিতা নয়, শান্তি ও নিরাপত্তাই কি জীবনের আসল প্রাপ্তি?

  • ডেস্ক রিপোর্ট
  • প্রকাশিত : ০৩:৫৭:৩৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • ৩২ বার দেখা হয়েছে

মো: আফজাল হোসেন: বিদেশে বসবাসের স্বপ্ন আমাদের সমাজে নতুন কিছু নয়। বিশেষ করে ইউরোপ, কানাডা কিংবা উন্নত বিশ্বের কোনো দেশে স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগকে অনেকেই জীবনের বড় সাফল্য হিসেবে দেখেন। কিন্তু বিদেশে বসবাস মানেই কি কেবল অর্থ, বিলাসিতা কিংবা উন্নত জীবন?

বাস্তব অভিজ্ঞতা হয়তো আমাদের আরও গভীর একটি উত্তর দেয়।
দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে ইউরোপেন বসবাস করা একজনের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে একটি কথা বিশেষভাবে মনে দাগ কাটল—তিনি বলেছেন, “কেউ বিলাসিতা বেছে নেয়, আমি বেছে নিয়েছি শান্তি, নিরাপত্তা ও সুখ।”
একটি বাক্যের মধ্যে যেন অভিবাসী জীবনের একটি বড় দর্শন লুকিয়ে আছে।
বিদেশে যাওয়ার আগে আমরা অনেক সময় কেবল অর্থনৈতিক দিকটি দেখি। উন্নত রাস্তা, আধুনিক বাড়ি, ভালো গাড়ি, উন্নত প্রযুক্তি—এসব আমাদের চোখে পড়ে। কিন্তু একটি সমাজের প্রকৃত মান নির্ধারিত হয় মানুষের দৈনন্দিন নিরাপত্তা, নাগরিক অধিকার, শিক্ষা, চিকিৎসা, কর্মপরিবেশ, সামাজিক মূল্যবোধ এবং ব্যক্তিগত স্বাধীনতার মতো বিষয়গুলো দিয়ে।

ইউরোপে দীর্ঘদিন বসবাসের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি মনে করেন, শিক্ষা, চিকিৎসা, রাজনীতি, জীবনযাপন, সামাজিক মূল্যবোধ এবং কাজের সংস্কৃতিতে বাংলাদেশ ও ইউরোপের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে। অবশ্যই প্রতিটি দেশ ও সমাজের নিজস্ব বাস্তবতা আছে। ইউরোপও সমস্যামুক্ত নয়। তবু একজন মানুষ যখন দুই ভিন্ন সমাজকে কাছ থেকে দেখেন, তখন তাঁর পর্যবেক্ষণ আমাদের নিজেদের সমাজ সম্পর্কে নতুন করে ভাবতে সাহায্য করতে পারে।
আরেকটি বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। বিদেশে গিয়ে জীবন শুরু করা সবসময় সহজ নয়। নতুন ভাষা, নতুন সংস্কৃতি, নতুন কর্মপরিবেশ এবং নতুন সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে হয়। কখনো কখনো একাধিক ভাষাও শিখতে হয়। নিজের পরিস্থিতির প্রয়োজনে একজন মানুষ যখন নতুন ভাষা শেখেন, তখন শুধু একটি ভাষাই শেখেন না—তিনি নতুন একটি সমাজকে বোঝার দরজাও খুলে দেন।
তবে বিদেশে দীর্ঘদিন বসবাস করলেই সবার অভিজ্ঞতা এক হয় না। কারও কাছে বিদেশ মানে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, কারও কাছে পেশাগত সাফল্য, কারও কাছে সন্তানদের ভবিষ্যৎ, আবার কারও কাছে শান্তিপূর্ণ ও নিরাপদ জীবন। প্রত্যেক মানুষের গল্প আলাদা।
বিশেষ করে বৈধ নাগরিকত্ব বা পাসপোর্ট, বৈধ রেসিডেন্সি এবং একটি স্থায়ী পূর্ণকালীন চাকরি—এই তিনটি বিষয় বিদেশে বসবাসকারী একজন মানুষের জীবনকে অনেক বেশি স্থিতিশীল করে তুলতে পারে। তখন বিদেশের জীবনকে অনেকের কাছে সত্যিই স্বস্তিদায়ক মনে হয়। কিন্তু এই অবস্থানে পৌঁছানোর পেছনে থাকে দীর্ঘ সংগ্রাম, পরিশ্রম, মানিয়ে নেওয়া এবং ধৈর্যের গল্প।
তাই বিদেশে বসবাসকারীদের জীবনকে শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ছবি দেখে বিচার করা উচিত নয়। একটি সুন্দর ছবির পেছনে থাকতে পারে বহু বছরের পরিশ্রম, একাকিত্ব, ভাষা শেখার সংগ্রাম এবং নতুন সমাজে নিজের জায়গা তৈরি করার চেষ্টা।
একই সঙ্গে আমাদের নিজেদের দেশ নিয়েও ভাবতে হবে।

যদি একজন মানুষ শান্তি, নিরাপত্তা, সম্মানজনক কর্মপরিবেশ, ভালো শিক্ষা, উন্নত চিকিৎসা এবং সুন্দর সামাজিক পরিবেশের জন্য বিদেশকে বেছে নেন, তাহলে প্রশ্নটি শুধু “মানুষ কেন বিদেশে যাচ্ছে?”—এখানে থেমে থাকা উচিত নয়।
আমাদের প্রশ্ন হওয়া উচিত—কী করলে আমাদের দেশেও মানুষ নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে একই রকম নিরাপত্তা ও আস্থাবোধ করতে পারবে?
বিদেশে যাওয়া মানুষের সংখ্যা নিয়ে আফসোস করার চেয়ে তাঁদের অভিজ্ঞতা থেকে শেখা হয়তো বেশি জরুরি। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে থাকা বাংলাদেশিরা শুধু অর্থ পাঠান না; তাঁরা বিভিন্ন সমাজ, সংস্কৃতি, প্রশাসন, শিক্ষা ও কর্মব্যবস্থার অভিজ্ঞতাও অর্জন করেন।
সেই অভিজ্ঞতাগুলো যদি আমরা ইতিবাচকভাবে শুনতে ও বিশ্লেষণ করতে পারি, তাহলে প্রবাসীরা শুধু দেশের অর্থনীতির অংশীদার নন—তাঁরা দেশের সামাজিক ও চিন্তাগত পরিবর্তনেরও গুরুত্বপূর্ণ উৎস হতে পারেন।
শেষ পর্যন্ত জীবনের সাফল্য হয়তো সবার কাছে এক নয়।
কেউ বিলাসিতা চান, কেউ সম্পদ চান, কেউ ক্যারিয়ার চান। আবার কেউ চান শুধু একটু শান্তি, নিরাপত্তা এবং নিজের মতো করে বাঁচার সুযোগ।
সম্ভবত মানুষের প্রকৃত সুখের সংজ্ঞা এখানেই—সে কোথায় থাকে, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সে সেখানে কতটা নিরাপদ, স্বাধীন, সম্মানিত এবং শান্তিতে থাকতে পারে।
বিদেশে বসবাসকারী ব্যক্তি তার দীর্ঘ জীবনের অভিজ্ঞতা আমাদের অন্তত এই প্রশ্নটি নতুন করে ভাবতে শেখায়।

ইঞ্জিনিয়ার মো. আফজাল হোসেন
সম্পাদক, প্রকাশক ও শিল্পোদ্যোক্তা।

পাকুয়াখালী গণহত্যা দিবসে পিসিসিপির স্মরণ ও আলোচনা সভা

বিলাসিতা নয়, শান্তি ও নিরাপত্তাই কি জীবনের আসল প্রাপ্তি?

প্রকাশিত : ০৩:৫৭:৩৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মো: আফজাল হোসেন: বিদেশে বসবাসের স্বপ্ন আমাদের সমাজে নতুন কিছু নয়। বিশেষ করে ইউরোপ, কানাডা কিংবা উন্নত বিশ্বের কোনো দেশে স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগকে অনেকেই জীবনের বড় সাফল্য হিসেবে দেখেন। কিন্তু বিদেশে বসবাস মানেই কি কেবল অর্থ, বিলাসিতা কিংবা উন্নত জীবন?

বাস্তব অভিজ্ঞতা হয়তো আমাদের আরও গভীর একটি উত্তর দেয়।
দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে ইউরোপেন বসবাস করা একজনের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে একটি কথা বিশেষভাবে মনে দাগ কাটল—তিনি বলেছেন, “কেউ বিলাসিতা বেছে নেয়, আমি বেছে নিয়েছি শান্তি, নিরাপত্তা ও সুখ।”
একটি বাক্যের মধ্যে যেন অভিবাসী জীবনের একটি বড় দর্শন লুকিয়ে আছে।
বিদেশে যাওয়ার আগে আমরা অনেক সময় কেবল অর্থনৈতিক দিকটি দেখি। উন্নত রাস্তা, আধুনিক বাড়ি, ভালো গাড়ি, উন্নত প্রযুক্তি—এসব আমাদের চোখে পড়ে। কিন্তু একটি সমাজের প্রকৃত মান নির্ধারিত হয় মানুষের দৈনন্দিন নিরাপত্তা, নাগরিক অধিকার, শিক্ষা, চিকিৎসা, কর্মপরিবেশ, সামাজিক মূল্যবোধ এবং ব্যক্তিগত স্বাধীনতার মতো বিষয়গুলো দিয়ে।

ইউরোপে দীর্ঘদিন বসবাসের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি মনে করেন, শিক্ষা, চিকিৎসা, রাজনীতি, জীবনযাপন, সামাজিক মূল্যবোধ এবং কাজের সংস্কৃতিতে বাংলাদেশ ও ইউরোপের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে। অবশ্যই প্রতিটি দেশ ও সমাজের নিজস্ব বাস্তবতা আছে। ইউরোপও সমস্যামুক্ত নয়। তবু একজন মানুষ যখন দুই ভিন্ন সমাজকে কাছ থেকে দেখেন, তখন তাঁর পর্যবেক্ষণ আমাদের নিজেদের সমাজ সম্পর্কে নতুন করে ভাবতে সাহায্য করতে পারে।
আরেকটি বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। বিদেশে গিয়ে জীবন শুরু করা সবসময় সহজ নয়। নতুন ভাষা, নতুন সংস্কৃতি, নতুন কর্মপরিবেশ এবং নতুন সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে হয়। কখনো কখনো একাধিক ভাষাও শিখতে হয়। নিজের পরিস্থিতির প্রয়োজনে একজন মানুষ যখন নতুন ভাষা শেখেন, তখন শুধু একটি ভাষাই শেখেন না—তিনি নতুন একটি সমাজকে বোঝার দরজাও খুলে দেন।
তবে বিদেশে দীর্ঘদিন বসবাস করলেই সবার অভিজ্ঞতা এক হয় না। কারও কাছে বিদেশ মানে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, কারও কাছে পেশাগত সাফল্য, কারও কাছে সন্তানদের ভবিষ্যৎ, আবার কারও কাছে শান্তিপূর্ণ ও নিরাপদ জীবন। প্রত্যেক মানুষের গল্প আলাদা।
বিশেষ করে বৈধ নাগরিকত্ব বা পাসপোর্ট, বৈধ রেসিডেন্সি এবং একটি স্থায়ী পূর্ণকালীন চাকরি—এই তিনটি বিষয় বিদেশে বসবাসকারী একজন মানুষের জীবনকে অনেক বেশি স্থিতিশীল করে তুলতে পারে। তখন বিদেশের জীবনকে অনেকের কাছে সত্যিই স্বস্তিদায়ক মনে হয়। কিন্তু এই অবস্থানে পৌঁছানোর পেছনে থাকে দীর্ঘ সংগ্রাম, পরিশ্রম, মানিয়ে নেওয়া এবং ধৈর্যের গল্প।
তাই বিদেশে বসবাসকারীদের জীবনকে শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ছবি দেখে বিচার করা উচিত নয়। একটি সুন্দর ছবির পেছনে থাকতে পারে বহু বছরের পরিশ্রম, একাকিত্ব, ভাষা শেখার সংগ্রাম এবং নতুন সমাজে নিজের জায়গা তৈরি করার চেষ্টা।
একই সঙ্গে আমাদের নিজেদের দেশ নিয়েও ভাবতে হবে।

যদি একজন মানুষ শান্তি, নিরাপত্তা, সম্মানজনক কর্মপরিবেশ, ভালো শিক্ষা, উন্নত চিকিৎসা এবং সুন্দর সামাজিক পরিবেশের জন্য বিদেশকে বেছে নেন, তাহলে প্রশ্নটি শুধু “মানুষ কেন বিদেশে যাচ্ছে?”—এখানে থেমে থাকা উচিত নয়।
আমাদের প্রশ্ন হওয়া উচিত—কী করলে আমাদের দেশেও মানুষ নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে একই রকম নিরাপত্তা ও আস্থাবোধ করতে পারবে?
বিদেশে যাওয়া মানুষের সংখ্যা নিয়ে আফসোস করার চেয়ে তাঁদের অভিজ্ঞতা থেকে শেখা হয়তো বেশি জরুরি। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে থাকা বাংলাদেশিরা শুধু অর্থ পাঠান না; তাঁরা বিভিন্ন সমাজ, সংস্কৃতি, প্রশাসন, শিক্ষা ও কর্মব্যবস্থার অভিজ্ঞতাও অর্জন করেন।
সেই অভিজ্ঞতাগুলো যদি আমরা ইতিবাচকভাবে শুনতে ও বিশ্লেষণ করতে পারি, তাহলে প্রবাসীরা শুধু দেশের অর্থনীতির অংশীদার নন—তাঁরা দেশের সামাজিক ও চিন্তাগত পরিবর্তনেরও গুরুত্বপূর্ণ উৎস হতে পারেন।
শেষ পর্যন্ত জীবনের সাফল্য হয়তো সবার কাছে এক নয়।
কেউ বিলাসিতা চান, কেউ সম্পদ চান, কেউ ক্যারিয়ার চান। আবার কেউ চান শুধু একটু শান্তি, নিরাপত্তা এবং নিজের মতো করে বাঁচার সুযোগ।
সম্ভবত মানুষের প্রকৃত সুখের সংজ্ঞা এখানেই—সে কোথায় থাকে, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সে সেখানে কতটা নিরাপদ, স্বাধীন, সম্মানিত এবং শান্তিতে থাকতে পারে।
বিদেশে বসবাসকারী ব্যক্তি তার দীর্ঘ জীবনের অভিজ্ঞতা আমাদের অন্তত এই প্রশ্নটি নতুন করে ভাবতে শেখায়।

ইঞ্জিনিয়ার মো. আফজাল হোসেন
সম্পাদক, প্রকাশক ও শিল্পোদ্যোক্তা।