পটুয়াখালী প্রতিনিধি: ‘বাবার কবরটাও কি এবার নদীতে চলে যাবে?’ তেঁতুলিয়া নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন পটুয়াখালীর দশমিনা উপজেলার হাজিরহাট এলাকার বাসিন্দা নিজামুদ্দিন। গত বছর মারা গেছেন তাঁর বাবা খলিল মিয়া। পরিবারের অন্য স্বজনদের কবরের সঙ্গে বাবার কবরটিও রয়েছে নদীর পাড়ঘেঁষা এলাকায়। মঙ্গলবার রাত থেকে তীব্র স্রোতে যেভাবে পাড় ভাঙছে, তাতে সেই কবরও এখন নদীগর্ভে হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় নিজামুদ্দিন।
শুধু বাবার কবর নয়-নদীর ইতোমধ্যে অন্তত ২০টি কবর বিলীন হয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। ভাঙনের মুখে পড়েছে গাছপালা, পাকা সড়ক ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) ফেলা জিওব্যাগ। আর এসবের ঠিক পাশেই দাঁড়িয়ে আছে হাজিরহাট জামে মসজিদ। কয়েকশ গজের মধ্যে রয়েছে ব্যস্ত হাজিরহাট বাজার।
এক পাশে তেঁতুলিয়া নদীর তীব্র স্রোতে, অন্য পাশে জনবসতি ও যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক। মাঝখানে এখন টিকে থাকার লড়াই করছে একটি মসজিদ, একটি বাজার এবং নদীপাড়ের মানুষের ঘরবাড়ি।
সরেজমিনে দেখা যায়, হাজিরহাট লঞ্চঘাট ও মসজিদসংলগ্ন এলাকায় নদীর পাড়ের মাটি ধসে পড়ছে। কোথাও কোথাও পাড়ে তৈরি হয়েছে গভীর গর্ত। ভাঙন ঠেকাতে পাউবো যে জিওব্যাগ ফেলেছিল, তার অনেকগুলোই স্রোতের টানে সরে গেছে কিংবা নদীতে তলিয়ে গেছে।
মসজিদের পাশ দিয়ে যাওয়া পাকা সড়কের কিনারার মাটিও সরে গেছে। কোথাও কোথাও পিচের অংশ ঝুলে আছে। নদীর অব্যাহত থাকলে সড়কের আরও বড় অংশ নদীগর্ভে চলে যেতে পারে বলে আশঙ্কা স্থানীয়দের।
স্থানীয় বাসিন্দা নিজামুদ্দিন বলেন, “নদী এভাবে ভাঙতে থাকলে সামনে কী হবে, আমরা বুঝতে পারছি না। চোখের সামনে সড়ক ভাঙছে, জিওব্যাগ নদীতে চলে যাচ্ছে। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে মসজিদ ও বাজার রক্ষা করা কঠিন হবে।”
নিজামুদ্দিন বলেন, তাঁর বাবা খলিল মিয়া গত বছর মারা গেছেন। এখন বাবাসহ স্বজনদের কবর নদীভাঙনের ঝুঁকিতে। পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলে কবরগুলোর বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা ভাবছেন তাঁরা।
তাঁর কথায়, “বাবাকে তো আর ফিরিয়ে আনতে পারব না। অন্তত তাঁর কবরটা যেন নদীতে না যায়-এটাই এখন আমাদের চাওয়া।”
হাজিরহাটের এই বাজারটি স্থানীয় মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি বাণিজ্যিক কেন্দ্র। নদীপথের পাশাপাশি সড়ক যোগাযোগের কারণেও এখানে প্রতিদিন মানুষের চলাচল থাকে।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, নদীভাঙন আরও এগিয়ে এলে প্রথমে সড়ক, এরপর মসজিদসংলগ্ন এলাকা এবং ধীরে ধীরে বাজারের অংশবিশেষ ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, নদীর প্রতিদিন পাড়ের নতুন নতুন অংশে আঘাত করছে। ফলে কখন কোথায় ধস নামবে, তা নিয়ে আতঙ্কে রয়েছেন ব্যবসায়ী, পথচারী ও আশপাশের বাসিন্দারা।
হাজিরহাট জামে মসজিদটি তাঁদের কাছে শুধু একটি উপাসনালয় নয়; দীর্ঘদিনের স্মৃতি ও সামাজিক জীবনেরও অংশ। নদী যত এগিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে মসজিদটি হারানোর ভয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ভাঙন ঠেকাতে জিওব্যাগ ফেলা হলেও তীব্র স্রোতের কাছে সেগুলো টিকছে না। তাই তাঁরা জরুরি ভিত্তিতে আরও জিওব্যাগ ফেলার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি নদীশাসন ও স্থায়ী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা চান।
পাউবো সূত্র বলছে, হাজিরহাট এলাকা আগে থেকেই ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত ছিল।
পটুয়াখালী পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী এমরান হোসেন বলেন, সম্প্রতি প্রায় ১৫০ মিটার এলাকায় ৫৮ লাখ টাকা ব্যয়ে জিওব্যাগ ফেলা হয়েছে। আরও ২০০ মিটার এলাকায় জিওব্যাগ ফেলার পরিকল্পনাও ছিল।
কিন্তু মঙ্গলবার রাতে হঠাৎ তীব্র ভাঙনে দুটি পয়েন্টে অন্তত ৫০ মিটার এলাকার মধ্যে কয়েকটি কবরসহ বেশ কিছু জায়গা নদীতে বিলীন হয়েছে বলে জানান তিনি।
এমরান হোসেন বলেন, বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। নির্দেশনা পেলে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ভাঙনের খবর পেয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন দশমিনা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মাহমুদ হাসান মৃধা এবং দশমিনা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আতিকুল ইসলাম।
ইউএনও বলেন, নদীর তীব্র স্রোতে সড়কের বাকি সংযোগটুকুও যেকোনো সময় নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যেতে পারে। বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে পটুয়াখালী পানি উন্নয়ন বোর্ডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানানো হয়েছে এবং দ্রুত প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম নিয়ে কাজ শুরু করার জন্য অনুরোধ করা হয়েছে।
নদীতীরবর্তী ঝুঁকিপূর্ণ বাড়িঘর থেকে কয়েকটি পরিবারকে সরিয়ে ইউনিয়ন পরিষদ ও সাইক্লোন শেল্টারে আশ্রয় নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি। ক্ষতিগ্রস্তদের খাবারের ব্যবস্থা এবং নদীভাঙনে বসতভিটা ও জমিজমা হারানো পরিবারগুলোর পুনর্বাসনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন ইউএনও।
হাজিরহাটের মানুষের কাছে এখন সময়টা শুধু একটি সড়ক রক্ষার লড়াই নয়। তাঁদের কাছে এটি স্মৃতি, ধর্মীয় স্থাপনা, কবরস্থান, ব্যবসা ও বসতভিটা-সবকিছু টিকিয়ে রাখার লড়াই।
আজ যে সড়কের কিনারা ভাঙছে, কাল সেটিই হয়তো নদীর অংশ হয়ে যাবে। এরপর নদীর স্রোতে পৌঁছে যেতে পারে মসজিদের আরও কাছে। তারপর বাজার।
স্থানীয়দের প্রশ্ন তাই একটাই-নদীর স্রোতে আর কতটা এগিয়ে এলে স্থায়ী প্রতিরোধের ব্যবস্থা নেওয়া হবে?
তাঁদের ভয়, উত্তর খুঁজতে খুঁজতে যেন হাজিরহাটের আরেকটি অংশ তেঁতুলিয়া নদীর গর্ভে হারিয়ে না যায়।

ডেস্ক রিপোর্ট 






















