ঢাকা ০৯:১৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ০৩ অক্টোবর ২০২৬

৫ বছরে ২০ ভাগ বরফ হারিয়েছে সুইজারল্যান্ড

  • ডেস্ক রিপোর্ট
  • প্রকাশিত : ০৬:০০:১৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩ অক্টোবর ২০২৬
  • ৯ বার দেখা হয়েছে

শীতকালে অপর্যাপ্ত তুষারপাত এবং এই গ্রীষ্মে ইউরোপজুড়ে রেকর্ড পরিমাণ তাপমাত্রার প্রভাবে সুইজারল্যান্ডের হিমবাহগুলো দ্রুত সংকুচিত হচ্ছে। সব মিলিয়ে সুইজারল্যান্ড মাত্র পাঁচ বছরে তার হিমবাহের বরফের প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ হারিয়েছে।

সুইস গ্লেসিয়ার মনিটরিং নেটওয়ার্ক এবং সুইস একাডেমি অব সায়েন্সেসের সুইস কমিশন ফর ক্রায়োস্ফিয়ার অবজারভেশনের প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে গবেষকরা জানিয়েছেন যে, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে সমাপ্ত হাইড্রোলজিক্যাল বছরে সুইস হিমবাহগুলো তাদের বরফের আয়তনের ৫.৫ শতাংশ হারিয়েছে, যা ২০২১ সাল থেকে হিসাব করলে প্রায় ২০ শতাংশ।

কিন্তু কেন এভাবে বরফ গলছে আল্পস ঘেরা সুইজারল্যান্ডে, আর এর পরিণতিই বা দেশটির জন্য কতটা ভয়াবহ?

কী দেখতে পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা?
গ্রীষ্মের শেষভাগে বরফ গলা এবং তুষার জমার পরিমাণ পরিমাপ করতে সেপ্টেম্বর মাসে সুইজারল্যান্ডের ২৩টি হিমবাহ পরিদর্শনে যান গ্ল্যামোস-এর একদল গবেষক।

পশ্চিম সুইস আল্পসের ‘স্কেক্স রুজ’ নামের একটি হিমবাহ পরিদর্শনের অভিজ্ঞতা শেয়ার করেন গ্ল্যামোস প্রধান এবং প্রতিবেদনের অন্যতম গবেষক ম্যাথিয়াস হাস। তিনি বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানান, দলকে রেফারেন্স পয়েন্ট বা পরিমাপের নির্দিষ্ট ভিত্তি দেওয়ার জন্য জুলাই মাসে বরফের মধ্যে প্রায় চার মিটার (১৩ ফুট) উঁচু একটি পরিমাপক পোল বা খুঁটি পোঁতা হয়েছিল।

তিনি বলেন, ‘সেপ্টেম্বরের শুরুতে যখন আমরা আবার সেখানে গেলাম, দেখলাম পোলটি তিন মিটার (১০ ফুট) বাইরে বেরিয়ে এসেছে। অর্থাৎ, জুন ও জুলাইয়ের দাবদাহ বাদ দিয়ে কেবল আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসেই প্রায় ৩,০০০ মিটার উচ্চতায় তিন মিটার বরফ গলে গেছে।’

তিনি বলেন, এটা পরিষ্কারভাবে বোঝায় যে সুইজারল্যান্ডের ছোট পর্বতগুলোর জন্য এ আবহাওয়া কতটা অসামঞ্জস্যপূর্ণ।

সুইজারল্যান্ডের ওপর এর প্রভাব কী?
সুইজারল্যান্ডের পরিচিতি ও অর্থনীতি বহুলাংশে আল্পাইন পর্যটন এবং শীতকালীন খেলাধুলার ওপর নির্ভরশীল। দেশটির মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৪ শতাংশ আসে এই পর্যটন খাত থেকে।

ম্যাথিয়াস বলেন, এটি কেবল পর্যটনেই প্রভাব ফেলছে না, বরঞ্চ আমাদের পর্বতের রূপই বদলে দিচ্ছে। সাদা শুভ্র পর্বতগুলো এখন ধীরে ধীরে ধূসর আর কালো হয়ে উঠছে।

অর্থনীতির স্বার্থে হিমবাহ থেকে পাওয়া পানির ভূমিকাও অপরিসীম। তিনি বলেন, হাইড্রো পাওয়ার লেকগুলোতে পানি ধরে রেখে আমরা পরিচ্ছন্ন বিদ্যুৎ উৎপাদন করি, যা পুরো ইউরোপের বড় বড় নদীতে পানির প্রবাহ বজায় রাখে। হিমবাহগুলো এখনো টিকে আছে বলে আমরা এই পানি পাচ্ছি, তবে এই সুবিধা বেশি দিন থাকবে না।

ভ্রিজে ইউনিভার্সিটি ব্রাসেলসের পানি ও জলবায়ু বিভাগের গ্লেসিওলজিস্ট এবং সহযোগী গবেষণা অধ্যাপক হ্যারি জেকোলারিও একই ধরনের মতামত ব্যক্ত করেছেন।

অধ্যাপক হ্যারি জেকোলারি বলেন, হিমবাহগুলো গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক পানি সরবরাহকারী। গ্রীষ্মের উত্তপ্ত ও শুষ্ক সময়ে হিমবাহগুলো পানি যোগায়।

‘জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে শুরুতে হিমবাহ দ্রুত গলে অতিরিক্ত পানি সরবরাহ করে। কিন্তু বরফ যত কমে আসবে, গলার মতো বরফও আর অবশিষ্ট থাকবে না। ফলে গ্রীষ্মকালীন পানির যোগানও কমতে থাকবে। ইউরোপীয় আল্পসের হিমবাহগুলোর ক্ষেত্রে পানি পাওয়ার সেই সর্বোচ্চ সীমা ইতোমধ্যেই পেরিয়ে গেছে। আগামী বছরগুলোতে পানির প্রবাহ কেবল কমতেই থাকবে’, বলেন জেকোলারি।

তিনি আরও বলেন, এ ছাড়াও, হিমবাহ গলে যাওয়ার ফলে সৃষ্টি হতে পারে প্রাকৃতিক দুর্যোগ। আর গলে যাওয়া পানি সমুদ্রে গিয়ে মেশায় এর চূড়ান্ত প্রভাব পড়তে পারে বিশ্বজুড়ে উপকূলীয় অঞ্চলগুলোতে।

এর কি কোনো সমাধান আছে?
উত্তরটা হচ্ছে হ্যাঁ, পাহাড়ের বরফ ধরে রাখার উপায় এখনো আছে বলে মনে করেন জলবায়ু বিজ্ঞানীরা। তবে তার জন্য বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি রোধে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে।

অধ্যাপক জেকোলারি জানান, বিশ্ব যদি এখনই কার্বন নিঃসরণ বন্ধ করতে পারে, তবে ইউরোপীয় আল্পস ও সুইজারল্যান্ডের হিমবাহের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বরফ বাঁচানো সম্ভব। তবে বিশ্বব্যাপী উষ্ণায়ন এভাবে চলতে থাকলে ২১০০ সালের মধ্যে এই হিমবাহগুলোর ৯০ শতাংশের বেশি বরফ চিরতরে হারিয়ে যাবে।

বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের হিমবাহগুলো কিছুটা বেশি সহনশীল হলেও বৈশ্বিক পরিস্থিতিও খুব একটা আশাব্যঞ্জক নয়। নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণে থাকলে শতকের শেষ নাগাদ বিশ্বজুড়ে ২৫ শতাংশ হিমবাহ হারাতে হতে পারে, আর নিয়ন্ত্রণে না থাকলে এই ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াবে ৫০ শতাংশে।

এই বিজ্ঞানী সতর্ক করেন, ২১০০ সালের পরেও দীর্ঘমেয়াদে হিমবাহের এই ক্ষয় চলতে থাকবে। তবে আমরা ভবিষ্যৎ তাপমাত্রা কতটা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারছি, তার ওপরই নির্ভর করছে কতটা বরফ টিকে থাকবে। বৈশ্বিক তাপমাত্রা ০.১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধিও এখানে বড় তফাত গড়ে দেয়।

জনপ্রিয় সংবাদ

মধ্যনগরে ক্বওমী মাদ্রাসার শিক্ষার মানোন্নয়নে অভিভাবক সমাবেশ

৫ বছরে ২০ ভাগ বরফ হারিয়েছে সুইজারল্যান্ড

প্রকাশিত : ০৬:০০:১৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩ অক্টোবর ২০২৬

শীতকালে অপর্যাপ্ত তুষারপাত এবং এই গ্রীষ্মে ইউরোপজুড়ে রেকর্ড পরিমাণ তাপমাত্রার প্রভাবে সুইজারল্যান্ডের হিমবাহগুলো দ্রুত সংকুচিত হচ্ছে। সব মিলিয়ে সুইজারল্যান্ড মাত্র পাঁচ বছরে তার হিমবাহের বরফের প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ হারিয়েছে।

সুইস গ্লেসিয়ার মনিটরিং নেটওয়ার্ক এবং সুইস একাডেমি অব সায়েন্সেসের সুইস কমিশন ফর ক্রায়োস্ফিয়ার অবজারভেশনের প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে গবেষকরা জানিয়েছেন যে, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে সমাপ্ত হাইড্রোলজিক্যাল বছরে সুইস হিমবাহগুলো তাদের বরফের আয়তনের ৫.৫ শতাংশ হারিয়েছে, যা ২০২১ সাল থেকে হিসাব করলে প্রায় ২০ শতাংশ।

কিন্তু কেন এভাবে বরফ গলছে আল্পস ঘেরা সুইজারল্যান্ডে, আর এর পরিণতিই বা দেশটির জন্য কতটা ভয়াবহ?

কী দেখতে পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা?
গ্রীষ্মের শেষভাগে বরফ গলা এবং তুষার জমার পরিমাণ পরিমাপ করতে সেপ্টেম্বর মাসে সুইজারল্যান্ডের ২৩টি হিমবাহ পরিদর্শনে যান গ্ল্যামোস-এর একদল গবেষক।

পশ্চিম সুইস আল্পসের ‘স্কেক্স রুজ’ নামের একটি হিমবাহ পরিদর্শনের অভিজ্ঞতা শেয়ার করেন গ্ল্যামোস প্রধান এবং প্রতিবেদনের অন্যতম গবেষক ম্যাথিয়াস হাস। তিনি বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানান, দলকে রেফারেন্স পয়েন্ট বা পরিমাপের নির্দিষ্ট ভিত্তি দেওয়ার জন্য জুলাই মাসে বরফের মধ্যে প্রায় চার মিটার (১৩ ফুট) উঁচু একটি পরিমাপক পোল বা খুঁটি পোঁতা হয়েছিল।

তিনি বলেন, ‘সেপ্টেম্বরের শুরুতে যখন আমরা আবার সেখানে গেলাম, দেখলাম পোলটি তিন মিটার (১০ ফুট) বাইরে বেরিয়ে এসেছে। অর্থাৎ, জুন ও জুলাইয়ের দাবদাহ বাদ দিয়ে কেবল আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসেই প্রায় ৩,০০০ মিটার উচ্চতায় তিন মিটার বরফ গলে গেছে।’

তিনি বলেন, এটা পরিষ্কারভাবে বোঝায় যে সুইজারল্যান্ডের ছোট পর্বতগুলোর জন্য এ আবহাওয়া কতটা অসামঞ্জস্যপূর্ণ।

সুইজারল্যান্ডের ওপর এর প্রভাব কী?
সুইজারল্যান্ডের পরিচিতি ও অর্থনীতি বহুলাংশে আল্পাইন পর্যটন এবং শীতকালীন খেলাধুলার ওপর নির্ভরশীল। দেশটির মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৪ শতাংশ আসে এই পর্যটন খাত থেকে।

ম্যাথিয়াস বলেন, এটি কেবল পর্যটনেই প্রভাব ফেলছে না, বরঞ্চ আমাদের পর্বতের রূপই বদলে দিচ্ছে। সাদা শুভ্র পর্বতগুলো এখন ধীরে ধীরে ধূসর আর কালো হয়ে উঠছে।

অর্থনীতির স্বার্থে হিমবাহ থেকে পাওয়া পানির ভূমিকাও অপরিসীম। তিনি বলেন, হাইড্রো পাওয়ার লেকগুলোতে পানি ধরে রেখে আমরা পরিচ্ছন্ন বিদ্যুৎ উৎপাদন করি, যা পুরো ইউরোপের বড় বড় নদীতে পানির প্রবাহ বজায় রাখে। হিমবাহগুলো এখনো টিকে আছে বলে আমরা এই পানি পাচ্ছি, তবে এই সুবিধা বেশি দিন থাকবে না।

ভ্রিজে ইউনিভার্সিটি ব্রাসেলসের পানি ও জলবায়ু বিভাগের গ্লেসিওলজিস্ট এবং সহযোগী গবেষণা অধ্যাপক হ্যারি জেকোলারিও একই ধরনের মতামত ব্যক্ত করেছেন।

অধ্যাপক হ্যারি জেকোলারি বলেন, হিমবাহগুলো গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক পানি সরবরাহকারী। গ্রীষ্মের উত্তপ্ত ও শুষ্ক সময়ে হিমবাহগুলো পানি যোগায়।

‘জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে শুরুতে হিমবাহ দ্রুত গলে অতিরিক্ত পানি সরবরাহ করে। কিন্তু বরফ যত কমে আসবে, গলার মতো বরফও আর অবশিষ্ট থাকবে না। ফলে গ্রীষ্মকালীন পানির যোগানও কমতে থাকবে। ইউরোপীয় আল্পসের হিমবাহগুলোর ক্ষেত্রে পানি পাওয়ার সেই সর্বোচ্চ সীমা ইতোমধ্যেই পেরিয়ে গেছে। আগামী বছরগুলোতে পানির প্রবাহ কেবল কমতেই থাকবে’, বলেন জেকোলারি।

তিনি আরও বলেন, এ ছাড়াও, হিমবাহ গলে যাওয়ার ফলে সৃষ্টি হতে পারে প্রাকৃতিক দুর্যোগ। আর গলে যাওয়া পানি সমুদ্রে গিয়ে মেশায় এর চূড়ান্ত প্রভাব পড়তে পারে বিশ্বজুড়ে উপকূলীয় অঞ্চলগুলোতে।

এর কি কোনো সমাধান আছে?
উত্তরটা হচ্ছে হ্যাঁ, পাহাড়ের বরফ ধরে রাখার উপায় এখনো আছে বলে মনে করেন জলবায়ু বিজ্ঞানীরা। তবে তার জন্য বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি রোধে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে।

অধ্যাপক জেকোলারি জানান, বিশ্ব যদি এখনই কার্বন নিঃসরণ বন্ধ করতে পারে, তবে ইউরোপীয় আল্পস ও সুইজারল্যান্ডের হিমবাহের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বরফ বাঁচানো সম্ভব। তবে বিশ্বব্যাপী উষ্ণায়ন এভাবে চলতে থাকলে ২১০০ সালের মধ্যে এই হিমবাহগুলোর ৯০ শতাংশের বেশি বরফ চিরতরে হারিয়ে যাবে।

বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের হিমবাহগুলো কিছুটা বেশি সহনশীল হলেও বৈশ্বিক পরিস্থিতিও খুব একটা আশাব্যঞ্জক নয়। নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণে থাকলে শতকের শেষ নাগাদ বিশ্বজুড়ে ২৫ শতাংশ হিমবাহ হারাতে হতে পারে, আর নিয়ন্ত্রণে না থাকলে এই ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াবে ৫০ শতাংশে।

এই বিজ্ঞানী সতর্ক করেন, ২১০০ সালের পরেও দীর্ঘমেয়াদে হিমবাহের এই ক্ষয় চলতে থাকবে। তবে আমরা ভবিষ্যৎ তাপমাত্রা কতটা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারছি, তার ওপরই নির্ভর করছে কতটা বরফ টিকে থাকবে। বৈশ্বিক তাপমাত্রা ০.১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধিও এখানে বড় তফাত গড়ে দেয়।