ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি: হাওড়বেষ্টিত জনপদ ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলা। গ্রামীণ অর্থনীতি ও ঐতিহ্যের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে দেশীয় প্রজাতির ছোট মাছ, বিশেষ করে পুঁটি মাছ। বর্ষার রেশ কাটতেই এবং হেমন্তের শুরু থেকে এখানকার নদনদী ও হাওড় তীরের জেলে পাড়াগুলোতে শুরু হয় উৎসবমুখর কর্মযজ্ঞ। শত শত মানুষের জীবিকা আর প্রাচীন ঐতিহ্যের সুতোয় গাঁথা এই জনপদের দিনকাল এখন কাটছে দারুণ ব্যস্ততায়।
উপজেলার সদর ইউনিয়নের গাংকুলপাড়া সহ বিভিন্ন জেলে পাড়ায় গিয়ে দেখা যায়, লঙ্গন নদী ও আশপাশের জলাশয় থেকে ধরা পড়া এবং হাওড়ের সুস্বাদু পুঁটিসহ নানা জাতের দেশীয় মাছে সয়লাব চারপাশ। নদীর তীর ঘেঁষে বাঁশের মাচা তৈরি করে চলছে ঐতিহ্যবাহী শুঁটকি ও চ্যাপা শুঁটকি প্রক্রিয়াজাতকরণের কাজ। ভোর থেকে শুরু হয়ে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলে মাছ ধোয়া, বাছাই করা, রোদে শুকানো এবং সংরক্ষণের কাজ।
স্থানীয় জেলে ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আশ্বিন থেকে মাঘ মাস পর্যন্ত—এই চার মাস শুঁটকি উৎপাদনের মোক্ষম মৌসুম। এ সময়ে শুধু পুঁটি মাছকে কেন্দ্র করেই নাসিরনগরে গড়ে ওঠে জমজমাট অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। কোনো ধরনের ক্ষতিকর কীটনাশক বা রাসায়নিক ব্যবহার না করে সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপায়ে প্রথাগত পদ্ধতিতে এখানে শুঁটকি তৈরি করা হয়।
এখানকার উৎপাদিত পুঁটি ও অন্যান্য মাছের শুঁটকির খ্যাতি শুধু স্থানীয় পর্যায়েই সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা দেশের গণ্ডি পেরিয়ে রাজধানীসহ বিভিন্ন অঞ্চলের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে।
এই কর্মযজ্ঞের সবচেয়ে বড় দিক হলো নারী শ্রমিকদের স্বাবলম্বিতা। শুঁটকি তৈরির মাচাগুলোতে তিন শতাধিক নারী ও পুরুষ শ্রমিক প্রতিদিন শ্রম দিচ্ছেন। পরিবারের গৃহিণীরা ঘরের কাজের পাশাপাশি মাছ বাছাই ও শুকানোর কাজে অংশ নিয়ে গ্রামীণ অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। মৌসুমজুড়ে এই পেশায় ব্যাপক কর্মসংস্থান তৈরি হওয়ায় এলাকার অনেক পরিবারই এখন অর্থনৈতিকভাবে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে।
শুঁটকি ব্যবসায়ী সুধাংশু দাস জানান, এ বছর আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় পুঁটি মাছের শুঁটকির উৎপাদন বেশ ভালো হচ্ছে। মাচা প্রতি প্রতি মাসে বিপুল পরিমাণ শুঁটকি প্রক্রিয়াজাত করা হয়, যার বাজারমূল্যও বেশ সন্তোষজনক। তবে পুঁজি সংকট ও আধুনিক সংরক্ষণের সুযোগের অভাবের মতো কিছু চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও পূর্বপুরুষের এই পেশা পরম যত্নে টিকিয়ে রেখেছেন তারা।
এ বিষয়ে নাসিরনগর উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা ফাহিমুল আরেফিন জানান, স্থানীয় শুঁটকি ব্যবসায়ীদের আরও স্বাস্থ্যসম্মত ও আধুনিক উপায়ে শুঁটকি উৎপাদনে উদ্বুদ্ধ করতে প্রশিক্ষণ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকারি ও দাপ্তরিক এই সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে নাসিরনগরের এই ঐতিহ্যবাহী পুঁটি মাছের শুঁটকি শিল্প জাতীয় অর্থনীতিতে আরও বড় ভূমিকা রাখতে পারবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ডেস্ক রিপোর্ট 






















