ঢাকা ০৪:৩৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬

ঢেউয়ের গ্রাসে কুয়াকাটার বন, ভাঙন ঠেকাতে বাঁশের বাঁধের পরীক্ষা

  • ডেস্ক রিপোর্ট
  • প্রকাশিত : ০৩:৩১:৫০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর ২০২৬
  • ৪ বার দেখা হয়েছে

পটুয়াখালী প্রতিনিধি: সাগরের ঢেউয়ে প্রতিদিন একটু একটু করে হারিয়ে যাচ্ছে কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকতের বালুচর। ভাঙনের মুখে পড়ছে পর্যটকদের আকর্ষণের জায়গাগুলো। সাগরে বিলীন হচ্ছে সৈকতসংলগ্ন সংরক্ষিত বনভূমি। উপড়ে পড়ছে গাছ, কোথাও কোথাও নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে সবুজের চিহ্ন। ভাঙন ঠেকাতে নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও থামানো যাচ্ছে না সাগরের এই আগ্রাসন।

এমন পরিস্থিতিতে উপকূল রক্ষায় এবার ভিন্ন একটি পদ্ধতি পরীক্ষা করে দেখছে বন বিভাগ। কংক্রিটের কাঠামোর বাইরে গিয়ে স্থানীয় বাঁশ, কাঠের খুঁটি ও গাছের ডালপালা দিয়ে তৈরি করা হচ্ছে ফাঁকযুক্ত বেষ্টনী। এই প্রতিরোধ বেষ্টনী নির্মাণ করতে বাশেঁর খুটি মাটির নিচে ৩ মিটার ও উপরে দেড় মিটার ধরা হয়েছে। লক্ষ্য, ঢেউয়ের গতি কমানো, পানির সঙ্গে ভেসে আসা পলি আটকে রাখা এবং ধীরে ধীরে নতুন ভূমি গঠনের পরিবেশ তৈরি করা। সেই জমিতে গাছপালা জন্মালে উপকূলীয় বনও ফিরে পেতে পারে তার হারানো বিস্তৃতি।
পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার গঙ্গামতি সৈকত এবং বরগুনার টেংরাগিরী সৈকতে পরীক্ষামূলকভাবে এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। জাপান সরকারের আর্থিক সহায়তায় পরিচালিত ‘প্রকৃতিনির্ভর বন ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে উপকূলীয় অঞ্চলের সহনশীলতা বৃদ্ধিকরণ’ প্রকল্পের আওতায় চলছে এই কাজ।
তবে প্রশ্ন রয়েছে—উত্তাল সাগরের ঢেউয়ের সামনে বাঁশের এই বেষ্টনী কতটা টিকবে? এটি কি সত্যিই ভাঙন কমিয়ে পলি জমাতে পারবে? নাকি প্রকৃতিনির্ভর এই উদ্যোগও শেষ পর্যন্ত ঢেউয়ের তোড়ে হারিয়ে যাবে? এসব প্রশ্নের উত্তর মিলবে মাঠপর্যায়ের পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষার ফলাফলে।

কলাপাড়ার গঙ্গামতি সৈকতের ভাঙনকবলিত এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, বালুচরে সারি সারি বাঁশের খুঁটি পুঁতে তৈরি করা হচ্ছে বেষ্টনী। খুঁটিগুলোর সঙ্গে আড়াআড়িভাবে বাঁশ বেঁধে নির্মাণ করা হয়েছে ফাঁকযুক্ত কাঠামো। এর মধ্য দিয়ে পানি চলাচল করতে পারবে। একই সঙ্গে ঢেউয়ের শক্তি কিছুটা কমে আসবে এবং পানির সঙ্গে বয়ে আসা পলি আটকে জমার সুযোগ তৈরি হবে—এমনটাই আশা করছেন প্রকল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
এই পদ্ধতির উদ্দেশ্য শুধু তাৎক্ষণিকভাবে ভাঙন ঠেকানো নয়। বরং উপকূলের প্রাকৃতিক ভূমি গঠনের প্রক্রিয়াকে সহায়তা করা। পলি জমে মাটি স্থিতিশীল হলে সেখানে স্থানীয় পরিবেশের উপযোগী ম্যানগ্রোভজাতীয় গাছ লাগানো কিংবা প্রাকৃতিকভাবে গাছপালার বিস্তার ঘটানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। গাছের শিকড় মাটি আঁকড়ে ধরে রাখলে উপকূলের স্থিতিশীলতাও বাড়তে পারে।
উপকূলীয় বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গঙ্গামতি সৈকতে ৬০ মিটার এবং বরগুনার টেংরাগিরী সৈকতে ৮০ মিটার এলাকায় পরীক্ষামূলকভাবে এ ধরনের প্রতিরোধক কাঠামো নির্মাণ করা হচ্ছে।
বন বিভাগের কর্মকর্তাদের মতে, স্থানীয়ভাবে পাওয়া বাঁশ, কাঠ ও গাছের ডালপালা ব্যবহারের ফলে কিছু ক্ষেত্রে নির্মাণব্যয় কমানো সম্ভব। পলি জমার অনুকূল পরিবেশ তৈরি হলে মাছ, কাঁকড়া ও অন্যান্য উপকূলীয় প্রাণীর আবাসস্থল গড়ে ওঠার সম্ভাবনাও রয়েছে। তবে এসব সুফল নির্ভর করবে ঢেউয়ের প্রকৃতি, জোয়ার-ভাটার প্রবাহ, পলি জমার পরিমাণ এবং কাঠামোর স্থায়িত্বের ওপর।
পটুয়াখালীর সর্বদক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের তীরে প্রায় ১৮ কিলোমিটার দীর্ঘ কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকত। একই জায়গা থেকে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখার সুযোগ থাকায় দেশের পর্যটন মানচিত্রে এর রয়েছে বিশেষ পরিচিতি। কিন্তু দীর্ঘদিনের উপকূলীয় ভাঙন সেই সৌন্দর্য ও প্রাকৃতিক সম্পদকে ক্রমেই হুমকির মুখে ফেলছে।
উপকূলীয় বন বিভাগের পটুয়াখালী কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, কুয়াকাটার বনভূমির আয়তন একসময় ছিল প্রায় ১ হাজার ৬১৩ হেক্টর। বর্তমানে সেখানে প্রায় ৬০০ হেক্টর বনভূমি অবশিষ্ট রয়েছে। অর্থাৎ, বন বিভাগের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, বনভূমির আয়তন কমেছে প্রায় ১ হাজার ১৩ হেক্টর।
বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ২০০৭ সালে ঘূর্ণিঝড় সিডরের পর থেকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, সামুদ্রিক ঢেউ ও উপকূলীয় ভাঙনে বনাঞ্চল ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকে। ২০০৭-০৮ অর্থবছরে সৈকতসংলগ্ন এলাকায় ঝাউবাগান গড়ে তোলা হয়। পরে ২০১০ সাল থেকে নতুন বাগান সৃজনের কাজও চলে। একই বছর কুয়াকাটাকে জাতীয় উদ্যান ঘোষণা করা হয়।
তবে বিভিন্ন সময়ের বনভূমির আয়তন ও ক্ষয়ক্ষতির হিসাবের ভিত্তি যাচাই করা প্রয়োজন। এ বিষয়ে নির্ভরযোগ্য তুলনামূলক তথ্য পাওয়া গেলে বন হারানোর প্রকৃত পরিমাণ আরও স্পষ্ট হবে।
১৯৯৮ সালে পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে ঘোষণার পর কুয়াকাটায় গড়ে উঠেছে অসংখ্য হোটেল, মোটেল ও পর্যটন অবকাঠামো। বেড়েছে বিনিয়োগ ও পর্যটকের আনাগোনা। কিন্তু সৈকত সংকুচিত হওয়া এবং সংরক্ষিত বন সাগরে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা পর্যটনের ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বেগ তৈরি করছে।

জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) সহায়তায় পরিচালিত প্রকল্পটির লক্ষ্য উপকূলীয় বন ও প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্র সংরক্ষণের মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়ানো। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, লবণাক্ততা ও উপকূলীয় ভাঙনের মতো ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রকৃতিনির্ভর ব্যবস্থাপনাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। প্রকল্পটির মেয়াদ ২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৯ সালের মার্চ পর্যন্ত।
পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান ও দুর্য়োগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের ডিন অধ্যাপক ড. মো. নূরুল আমিন বলেন, প্রকৌশলগত পরিকল্পনার সঙ্গে প্রকৃতিনির্ভর পদ্ধতি ও স্থানীয় পরিবেশবান্ধব উপকরণের সমন্বয়ই এ ধরনের ব্যবস্থার মূল ধারণা। এর মাধ্যমে উপকূলীয় ভাঙন কমানো, ভূমি সংরক্ষণ এবং পরিবেশের সহনশীলতা বাড়ানোর চেষ্টা করা হয়।
তিনি বলেন, “প্রকৃতির উপাদান ব্যবহার করে প্রকৃতিকে রক্ষা করা, ভূমিক্ষয় রোধ করা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি কমানোই এ পদ্ধতির লক্ষ্য। এ ক্ষেত্রে সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে হচ্ছে। তবে এর কার্যকারিতা বুঝতে পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন প্রয়োজন।”

পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) কলাপাড়া সার্কেলের প্রকৌশলী মো. শাহ আলম বলেন, ২০১৫ সালের ডিসেম্বর থেকে কুয়াকাটার ভাঙন রোধে বিভিন্ন প্রকল্প ও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সৈকতের ক্ষয় কমানো, সমুদ্রের লোনা পানি প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ এবং পর্যায়ক্রমে জিওটিউব বসিয়ে সৈকতের প্রশস্ততা বাড়ানোর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। কুয়াকাটার মতো পর্যটননির্ভর এলাকায় উপকূল রক্ষায় প্রচলিত প্রকৌশলগত ব্যবস্থার পাশাপাশি প্রকৃতিনির্ভর পদ্ধতির কার্যকারিতা যাচাইয়ের বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে।
উপকূলীয় বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা ড. মো. জাহিদুর রহমান মিয়া বলেন, কুয়াকাটার গঙ্গামতি সৈকতে এবং বরগুনার টেংরাগিরী সৈকতে পরীক্ষামূলকভাবে এ পদ্ধতিতে প্রতিরোধক বাঁধ নির্মাণ করা হচ্ছে। স্থানীয় উপকরণ ব্যবহার করে কম খরচে পরিবেশবান্ধব ও দীর্ঘ মেয়াদে টেকসই ব্যবস্থা গড়ে তোলাই এর লক্ষ্য। তাঁর আশা, এই উদ্যোগ উপকূলীয় বনভূমি রক্ষা এবং ভাঙনজনিত ক্ষয়ক্ষতি কমাতে ভূমিকা রাখবে।

জনপ্রিয় সংবাদ

ভারতে পাচারের জন্য দুই কিশোরকে অপহরণের দায়ে ২ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড

ঢেউয়ের গ্রাসে কুয়াকাটার বন, ভাঙন ঠেকাতে বাঁশের বাঁধের পরীক্ষা

প্রকাশিত : ০৩:৩১:৫০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর ২০২৬

পটুয়াখালী প্রতিনিধি: সাগরের ঢেউয়ে প্রতিদিন একটু একটু করে হারিয়ে যাচ্ছে কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকতের বালুচর। ভাঙনের মুখে পড়ছে পর্যটকদের আকর্ষণের জায়গাগুলো। সাগরে বিলীন হচ্ছে সৈকতসংলগ্ন সংরক্ষিত বনভূমি। উপড়ে পড়ছে গাছ, কোথাও কোথাও নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে সবুজের চিহ্ন। ভাঙন ঠেকাতে নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও থামানো যাচ্ছে না সাগরের এই আগ্রাসন।

এমন পরিস্থিতিতে উপকূল রক্ষায় এবার ভিন্ন একটি পদ্ধতি পরীক্ষা করে দেখছে বন বিভাগ। কংক্রিটের কাঠামোর বাইরে গিয়ে স্থানীয় বাঁশ, কাঠের খুঁটি ও গাছের ডালপালা দিয়ে তৈরি করা হচ্ছে ফাঁকযুক্ত বেষ্টনী। এই প্রতিরোধ বেষ্টনী নির্মাণ করতে বাশেঁর খুটি মাটির নিচে ৩ মিটার ও উপরে দেড় মিটার ধরা হয়েছে। লক্ষ্য, ঢেউয়ের গতি কমানো, পানির সঙ্গে ভেসে আসা পলি আটকে রাখা এবং ধীরে ধীরে নতুন ভূমি গঠনের পরিবেশ তৈরি করা। সেই জমিতে গাছপালা জন্মালে উপকূলীয় বনও ফিরে পেতে পারে তার হারানো বিস্তৃতি।
পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার গঙ্গামতি সৈকত এবং বরগুনার টেংরাগিরী সৈকতে পরীক্ষামূলকভাবে এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। জাপান সরকারের আর্থিক সহায়তায় পরিচালিত ‘প্রকৃতিনির্ভর বন ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে উপকূলীয় অঞ্চলের সহনশীলতা বৃদ্ধিকরণ’ প্রকল্পের আওতায় চলছে এই কাজ।
তবে প্রশ্ন রয়েছে—উত্তাল সাগরের ঢেউয়ের সামনে বাঁশের এই বেষ্টনী কতটা টিকবে? এটি কি সত্যিই ভাঙন কমিয়ে পলি জমাতে পারবে? নাকি প্রকৃতিনির্ভর এই উদ্যোগও শেষ পর্যন্ত ঢেউয়ের তোড়ে হারিয়ে যাবে? এসব প্রশ্নের উত্তর মিলবে মাঠপর্যায়ের পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষার ফলাফলে।

কলাপাড়ার গঙ্গামতি সৈকতের ভাঙনকবলিত এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, বালুচরে সারি সারি বাঁশের খুঁটি পুঁতে তৈরি করা হচ্ছে বেষ্টনী। খুঁটিগুলোর সঙ্গে আড়াআড়িভাবে বাঁশ বেঁধে নির্মাণ করা হয়েছে ফাঁকযুক্ত কাঠামো। এর মধ্য দিয়ে পানি চলাচল করতে পারবে। একই সঙ্গে ঢেউয়ের শক্তি কিছুটা কমে আসবে এবং পানির সঙ্গে বয়ে আসা পলি আটকে জমার সুযোগ তৈরি হবে—এমনটাই আশা করছেন প্রকল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
এই পদ্ধতির উদ্দেশ্য শুধু তাৎক্ষণিকভাবে ভাঙন ঠেকানো নয়। বরং উপকূলের প্রাকৃতিক ভূমি গঠনের প্রক্রিয়াকে সহায়তা করা। পলি জমে মাটি স্থিতিশীল হলে সেখানে স্থানীয় পরিবেশের উপযোগী ম্যানগ্রোভজাতীয় গাছ লাগানো কিংবা প্রাকৃতিকভাবে গাছপালার বিস্তার ঘটানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। গাছের শিকড় মাটি আঁকড়ে ধরে রাখলে উপকূলের স্থিতিশীলতাও বাড়তে পারে।
উপকূলীয় বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গঙ্গামতি সৈকতে ৬০ মিটার এবং বরগুনার টেংরাগিরী সৈকতে ৮০ মিটার এলাকায় পরীক্ষামূলকভাবে এ ধরনের প্রতিরোধক কাঠামো নির্মাণ করা হচ্ছে।
বন বিভাগের কর্মকর্তাদের মতে, স্থানীয়ভাবে পাওয়া বাঁশ, কাঠ ও গাছের ডালপালা ব্যবহারের ফলে কিছু ক্ষেত্রে নির্মাণব্যয় কমানো সম্ভব। পলি জমার অনুকূল পরিবেশ তৈরি হলে মাছ, কাঁকড়া ও অন্যান্য উপকূলীয় প্রাণীর আবাসস্থল গড়ে ওঠার সম্ভাবনাও রয়েছে। তবে এসব সুফল নির্ভর করবে ঢেউয়ের প্রকৃতি, জোয়ার-ভাটার প্রবাহ, পলি জমার পরিমাণ এবং কাঠামোর স্থায়িত্বের ওপর।
পটুয়াখালীর সর্বদক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের তীরে প্রায় ১৮ কিলোমিটার দীর্ঘ কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকত। একই জায়গা থেকে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখার সুযোগ থাকায় দেশের পর্যটন মানচিত্রে এর রয়েছে বিশেষ পরিচিতি। কিন্তু দীর্ঘদিনের উপকূলীয় ভাঙন সেই সৌন্দর্য ও প্রাকৃতিক সম্পদকে ক্রমেই হুমকির মুখে ফেলছে।
উপকূলীয় বন বিভাগের পটুয়াখালী কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, কুয়াকাটার বনভূমির আয়তন একসময় ছিল প্রায় ১ হাজার ৬১৩ হেক্টর। বর্তমানে সেখানে প্রায় ৬০০ হেক্টর বনভূমি অবশিষ্ট রয়েছে। অর্থাৎ, বন বিভাগের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, বনভূমির আয়তন কমেছে প্রায় ১ হাজার ১৩ হেক্টর।
বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ২০০৭ সালে ঘূর্ণিঝড় সিডরের পর থেকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, সামুদ্রিক ঢেউ ও উপকূলীয় ভাঙনে বনাঞ্চল ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকে। ২০০৭-০৮ অর্থবছরে সৈকতসংলগ্ন এলাকায় ঝাউবাগান গড়ে তোলা হয়। পরে ২০১০ সাল থেকে নতুন বাগান সৃজনের কাজও চলে। একই বছর কুয়াকাটাকে জাতীয় উদ্যান ঘোষণা করা হয়।
তবে বিভিন্ন সময়ের বনভূমির আয়তন ও ক্ষয়ক্ষতির হিসাবের ভিত্তি যাচাই করা প্রয়োজন। এ বিষয়ে নির্ভরযোগ্য তুলনামূলক তথ্য পাওয়া গেলে বন হারানোর প্রকৃত পরিমাণ আরও স্পষ্ট হবে।
১৯৯৮ সালে পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে ঘোষণার পর কুয়াকাটায় গড়ে উঠেছে অসংখ্য হোটেল, মোটেল ও পর্যটন অবকাঠামো। বেড়েছে বিনিয়োগ ও পর্যটকের আনাগোনা। কিন্তু সৈকত সংকুচিত হওয়া এবং সংরক্ষিত বন সাগরে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা পর্যটনের ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বেগ তৈরি করছে।

জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) সহায়তায় পরিচালিত প্রকল্পটির লক্ষ্য উপকূলীয় বন ও প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্র সংরক্ষণের মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়ানো। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, লবণাক্ততা ও উপকূলীয় ভাঙনের মতো ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রকৃতিনির্ভর ব্যবস্থাপনাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। প্রকল্পটির মেয়াদ ২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৯ সালের মার্চ পর্যন্ত।
পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান ও দুর্য়োগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের ডিন অধ্যাপক ড. মো. নূরুল আমিন বলেন, প্রকৌশলগত পরিকল্পনার সঙ্গে প্রকৃতিনির্ভর পদ্ধতি ও স্থানীয় পরিবেশবান্ধব উপকরণের সমন্বয়ই এ ধরনের ব্যবস্থার মূল ধারণা। এর মাধ্যমে উপকূলীয় ভাঙন কমানো, ভূমি সংরক্ষণ এবং পরিবেশের সহনশীলতা বাড়ানোর চেষ্টা করা হয়।
তিনি বলেন, “প্রকৃতির উপাদান ব্যবহার করে প্রকৃতিকে রক্ষা করা, ভূমিক্ষয় রোধ করা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি কমানোই এ পদ্ধতির লক্ষ্য। এ ক্ষেত্রে সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে হচ্ছে। তবে এর কার্যকারিতা বুঝতে পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন প্রয়োজন।”

পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) কলাপাড়া সার্কেলের প্রকৌশলী মো. শাহ আলম বলেন, ২০১৫ সালের ডিসেম্বর থেকে কুয়াকাটার ভাঙন রোধে বিভিন্ন প্রকল্প ও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সৈকতের ক্ষয় কমানো, সমুদ্রের লোনা পানি প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ এবং পর্যায়ক্রমে জিওটিউব বসিয়ে সৈকতের প্রশস্ততা বাড়ানোর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। কুয়াকাটার মতো পর্যটননির্ভর এলাকায় উপকূল রক্ষায় প্রচলিত প্রকৌশলগত ব্যবস্থার পাশাপাশি প্রকৃতিনির্ভর পদ্ধতির কার্যকারিতা যাচাইয়ের বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে।
উপকূলীয় বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা ড. মো. জাহিদুর রহমান মিয়া বলেন, কুয়াকাটার গঙ্গামতি সৈকতে এবং বরগুনার টেংরাগিরী সৈকতে পরীক্ষামূলকভাবে এ পদ্ধতিতে প্রতিরোধক বাঁধ নির্মাণ করা হচ্ছে। স্থানীয় উপকরণ ব্যবহার করে কম খরচে পরিবেশবান্ধব ও দীর্ঘ মেয়াদে টেকসই ব্যবস্থা গড়ে তোলাই এর লক্ষ্য। তাঁর আশা, এই উদ্যোগ উপকূলীয় বনভূমি রক্ষা এবং ভাঙনজনিত ক্ষয়ক্ষতি কমাতে ভূমিকা রাখবে।