পটুয়াখালী প্রতিনিধি: চলতি শুকনো মৌসুমে নাব্যতা সংকটে পড়েছে পটুয়াখালী-ঢাকা নৌরুট। পটুয়াখালী লঞ্চঘাট এলাকাসহ এ রুটের বিভিন্ন স্থানে পলি জমে বালুচর জেগে ওঠায় স্বাভাবিক লঞ্চ চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। এতে যাত্রী, শ্রমিক, চালক ও ঘাটকেন্দ্রিক ব্যবসায়ীরা পড়েছেন চরম বিপাকে।
এক সময় পটুয়াখালীসহ দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের রাজধানী যাতায়াতের অন্যতম প্রধান মাধ্যম ছিল এই নৌবন্দর। তবে পদ্মা সেতু চালুর ফলে ঢাকার সঙ্গে সরাসরি সড়ক যোগাযোগ তৈরি হওয়ায় নৌপথে যাত্রী সংখ্যা কিছুটা কমেছে। তবুও ঈদ ও কোরবানির সময় বিপুল সংখ্যক যাত্রী এখনও এই নদীপথ ব্যবহার করেন। তাই ঈদের আগেই নদী খনন করে লঞ্চ চলাচল স্বাভাবিক করার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
বৃহস্পতিবার (৫ মার্চ) পটুয়াখালী লঞ্চঘাট এলাকায় সরেজমিনে দেখা যায়, নদীর বেশ কয়েকটি অংশে বালুচর তৈরি হওয়ায় লঞ্চ ভিড়তে গিয়ে প্রায়ই আটকে যাচ্ছে। ঘাটের পল্টনের সামনের বড় অংশজুড়ে বালুময় চর ভেসে উঠেছে, যা ভাটার সময় সম্পূর্ণ উন্মুক্ত হয়ে পড়ে। এতে ভাটার সময় পরিস্থিতি আরও নাজুক হয়ে ওঠে। লঞ্চগুলোকে তখন জোয়ারের পানির জন্য অপেক্ষা করতে হয়। ফলে যাত্রীরা দীর্ঘ সময় ভোগান্তিতে থাকছেন এবং মালিক-শ্রমিকরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন।

শুধু ঘাটসংলগ্ন অংশই নয়, মূল নৌচ্যানেলের পরের অংশেও একই চিত্র দেখা গেছে। কোথাও কোথাও নদীর তীর থেকে ৬০ থেকে ৭০ ফুট পর্যন্ত পানিশূন্য হয়ে বালুচর দৃশ্যমান হয়েছে। কয়েকটি ছোট নৌযানকে চরে আটকে থাকতে দেখা যায়। একটি ছোট ড্রেজার দিয়ে সীমিত পরিসরে খনন কাজ চললেও স্থানীয়দের মতে, তা সংকট মোকাবিলায় যথেষ্ট নয়।
এই রুটের দোতলা যাত্রীবাহী লঞ্চ এমভি প্রিন্স কামাল-১ এর চালক মো. নাসির উদ্দিন খান বলেন, তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে লঞ্চ চালালেও এমন পরিস্থিতি খুব কম দেখেছেন। এখন জোয়ার-ভাটার হিসাব করেই লঞ্চ চালাতে হচ্ছে। ভাটার সময় রওনা দিলে মাঝপথে চরে আটকে ৪ থেকে ৫ ঘণ্টা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। এতে যাত্রীরা বিরক্ত হন এবং চালক-শ্রমিকদের নানা সমালোচনার মুখে পড়তে হয়। দ্রুত কার্যকর খনন না হলে এই রুটে লঞ্চ চলাচল টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, জেলায় পর্যটন কেন্দ্র্র কুয়াকাটা, পায়রা সমুদ্রবন্দর এবং কলাপাড়ার তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র থাকায় একসময় বিপুল সংখ্যক মানুষ এই নৌপথ ব্যবহার করতেন। পাশাপাশি মালামাল পরিবহনে এ পথ ছিল সাশ্রয়ী। প্রতিদিন চারটি করে দোতলা লঞ্চ পটুয়াখালী-ঢাকা রুটে চলাচল করত।
প্রতিদিনের যাতায়াত ও দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ এই নৌরুট সচল রাখতে দ্রুত কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি নদী খনন প্রকল্প গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
পটুয়াখালীর বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব সৈয়দ মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, নদীবেষ্টিত এই শহরের সৌন্দর্য ও অর্থনীতি অনেকাংশেই নদীনির্ভর। কিন্তু দখল, ¯্রােত হ্রাস এবং অপরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার কারণে নদীর নাব্যতা মারাত্মকভাবে কমে গেছে। ড্রেজিং কার্যক্রমের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, খননকাজকে সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার আওতায় আনা প্রয়োজন।
অপর ব্যবসায়ী মো. হারুণ-অর-রশিদ বলেন, একসময় নদীটি ছিল প্রশস্ত ও গভীর। পদ্মা সেতু চালুর পর সড়ক যোগাযোগ সহজ হওয়ায় যাত্রী কিছুটা কমলেও অনেকেই এখনও লঞ্চে যাতায়াত করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। এছাড়া পরিবহন খরচ তুলনামূলক কম হওয়ায় ব্যবসা-বাণিজ্য এখনও অনেকটাই লঞ্চনির্ভর। তবে নাব্যতা সংকটের কারণে পণ্য ও যাত্রী পরিবহন কমে গিয়ে ঘাটকেন্দ্রিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

ঘাটের শ্রমিক জসিম হাওলাদার জানান, প্রায় চার দশক ধরে তিনি এই ঘাটে কাজ করছেন। আগে যেখানে প্রতিদিন ৮০ থেকে ৯০ জন শ্রমিক ব্যস্ত
থাকতেন, এখন কাজের পরিমাণ কমে যাওয়ায় মাত্র ৮ থেকে ১০ জন শ্রমিক কাজ করছেন। লঞ্চ ঠিকমতো ভিড়তে না পারায় যাত্রী ও মালামাল কম আসছে। ফলে অনেক শ্রমিক অন্য পেশায় চলে যেতে বাধ্য হয়েছেন।
পটুয়াখালী চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি মো. কামাল হোসেন বলেন, পটুয়াখালী লঞ্চঘাট কার্যত নাব্যতা হারিয়ে ফেলেছে। লঞ্চ ছাড়ার সময় ঘাটের মোড় অতিক্রম করতেই দীর্ঘ সময় লেগে যায়, কারণ ঘোরার সময় তলদেশ চরে লেগে যায়। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে এ ঘাট কেবল অতীতের স্মৃতি হয়ে থাকবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিটিএ) এর বরিশাল বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী (ড্রেজিং) মো. মামুন-উর-রশীদ জানান, নদীর ¯্রােত কমে যাওয়ায় স্বাভাবিকভাবে পলি অপসারণ হচ্ছে না। ফলে তলদেশে পলি জমে নাব্যতা কমে যাচ্ছে। চলতি অর্থবছরে ড্রেজিং কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রায় ২৫০ ফুট প্রস্থের একটি নৌচ্যানেল সচল রাখার চেষ্টা চলছে।
এদিকে পটুয়াখালী-১ আসনের সংসদ সদস্য এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) আলতাফ হোসেন চৌধুরী নদীবন্দরের প্রবেশমুখে পলি জমে চর জেগে ওঠা স্থান পরিদর্শন করেছেন। তিনি নদী খনন কাজও পরিদর্শন করেন। এ সময় তিনি বলেন, “স্থায়ী নদীশাসনের জন্য একটি প্রকল্প নেওয়া হবে। অতীতে নদীশাসন ও ড্রেজিংয়ের নামে ব্যাপক লুটপাট হয়েছে। ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের অনিয়ম না হয়, সে বিষয়ে আমরা সজাগ থাকব।”

ডেস্ক রিপোর্ট 























