জলবায়ু পরিবর্তন কথাটি নবীন থেকে প্রবীন সকলের কাছে চেনা শব্দ, কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের কারণ, সমস্যা ও ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে অনেকেরই অজানা হলেও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ভয়ংকর ও জরাজীর্ণ পরিস্থিতির সম্মুখীন বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় অঞ্চলের স্থানীয় জনগোষ্ঠী। কেউ নিজের পৈত্রিক সম্পত্তি হারিয়ে ভূমিহীন হচ্ছে, কেউ সব হারিয়ে উদ্বাস্তু হচ্ছে বা শহরে অনিশ্চিত জীবনের দিকে হাটছেন, শিকার হচ্ছেন বঞ্চনার। আবার কেউ সব হারিয়ে পরিবর্তিত পরিবেশে টিকে থাকতে যুদ্ধ করে যাচ্ছেন নিরান্তর।
সাতক্ষীরার উপকূলের শ্যামনগর উপজেলার আটুলিয়া ইউনিয়নের খোলপেটুয়া নদীর তীরবর্তী দক্ষিণ বড়কুপট গ্রামের একপাশ নদী এবং অন্য পাশ লোনা পানির ঘের দ্বারা বেষ্টিত। এখানকার মাটি, পানি ও বাতাসে লবনাক্ততার প্রভাব উপলদ্ধি করা যায়। কিন্তু এই লবনের প্রভাব দিন দিন বেড়েই চলেছে। যা জনজীবনকে আরো বেশি দুর্বিসহ করে তুলেছে। গ্রামের বাসিন্দারা জানান ২০০৯ সালে প্রলয়ংকরী ঘূর্নিঝড় আইলার কারণে ভাঙনের মুখে পড়ে গ্রামটি। স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মতে আইলার পরে এলাকার কিছু মানুষ সব হারিয়ে স্থানান্তরিত হয়েছে, আবার কেউবা নদী ভাংগনসহ প্রাকৃতিক দূর্যোগের প্রকোপ থেকে বাঁচতে শহরমূখী হয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য বর্তমান গ্রামটিতে প্রায় ৩ শতাধিক পরিবার বসবাস করেন। যারা প্রতিনিয়ত প্রাকৃতিক দূর্যোগ ও লবনাক্ততাসহ নানাবিধ সমস্যা মোকাবিলা করে টিকে থাকার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। তাদের মধ্যে অনেকেই এলাকার মানুষ, প্রাণ-প্রকৃতি ও জীব বৈচিত্র্য সুরক্ষা করার পাশাপাশি নারীদের সক্ষমতা তৈরীতে কাজ করে যাচ্ছেন। তেমনি এক অদম্য, আগ্রহী ও উদ্যোমী নারী বড় কুপোট গ্রামের পারুল রানী(৩৫)। যিনি প্রতিনিয়ত প্রাণ বৈচিত্র্য সুরক্ষা এবং উপকূলের প্রতিকূল পরিবেশে খাপ খাওয়াতে চেষ্টা করে যাচ্ছেন এবং অন্যকেও উদ্বুদ্ধ করে যাচ্ছেন।

পারুল রানী বলেন ২০২৪ সালে তিনি গবেষণা প্রতিষ্ঠান বারসিকের সাথে যুক্ত হন। এ সংগঠনের পরামর্শ, অভিজ্ঞতা বিনিময় ও বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশগ্রহনের মাধ্যমে জৈব পদ্ধতিতে চাষাবাদ, স্থানীয় জাতের বীজ সংরক্ষণ, জৈব সার ও বালাইনাশক তৈরী, নারী সংগঠনের গুরুত্ব ও সুবিধা সম্পর্কে জানতে পারেন। মাটির লবনাক্ততার ভিত্তিতে শস্য ফসল চাষাবাদ বিষয়ে মতবিনিময় ও নানামূখী কর্মসূচির মাধ্যমে তিনি লবনসহনশীল জাত সম্পর্কে জানতে পারেন। এর পর নিজেই চেষ্টা চালিয়ে নিজের বাড়িটি একটি প্রাণবৈচিত্র্য সমৃদ্ধ বাড়ি তৈরী করেছেন। তিনি বসতভিটা ও ঘেরের রাস্তায় সারা বছর বিভিন্ন অভিযোজন চর্চার মাধ্যমে বৈচিত্র্যময় ফসল চাষাবাদ করেন এবং রাসায়নিক সার কীটনাশক ব্যতিত জৈব সার ব্যবহার করে ফসল উৎপাদন করে পারিবারিক চাহিদা পূরণের পাশাপাশি বাড়তি ফসল বিক্রয় করে সংসারে অর্থনৈতিক সহায়তা করে থাকেন। তিনি বলেন এ বছর বাড়ীতে শীতকালিন শাক-সবজি বিক্রী করে ১৬ হাজার টাকা আয় করেছেন। একইসাথে ১৪ প্রকার সবজীর বীজ সংরক্ষণ করেছেন। এছাড়া এলাকার উন্নয়নে একত্রিত এবং সংগঠিত করে নারীদের সক্ষমতা ও ক্ষমতায়নে নারীদের নিয়ে খোলপেটুয়া পায়রা নারী উন্নয়ন সংগঠন গঠন করেছেন। তিনি বলেন তার সবজি চাষ পদ্ধতি ও স্থানীয় জাতের ধান চাষ প্রক্রিয়া দেখে গ্রামের কৃষক প্রভাতি বৈদ্য, পারুল বৈদ্য, শিশির মন্ডল, উত্তম মন্ডল উদ্বুদ্ধ হয়ে নিজেরা বাড়ীতে চাষ করেছেন আবার অনেকে করছেন। তার আয় দিয়ে বাড়ীতে লবন মুক্ত সবজি চাষ করতে টাওয়ার পদ্ধতি, মাচা পদ্ধতি, সানসেট পদ্ধতি উপকরণ ক্রয় করেছেন, বাড়ীতে নিরাপত্তায় পাকা প্রাচীর নির্মাণ করেছেন।
তিনি বলেন বর্তমানে চিংড়ি ঘেরে প্রথম মৌসুমে চিংড়ি উৎপাদন ঠিকঠাক হলেও বর্ষা মৌসুমে চিংড়ি মাছ কম উৎপাদিত হয়। এজন্য তিনি ২০২৫ সালে চিংড়ি ঘেরে মাছের সাথে লবন সহনশীল দেশী ধান চাষাবাদের উদ্যোগ নেন। এ বিষয়ে স্থানীয়দের সাথে তিনি আলোচনা করেন, কিন্তু কেউ খুব বেশি আগ্রহ প্রকাশ করেন না। কিন্তু তিনি হাল ছাড়ে দেন না, সকল প্রতিবন্ধকতা মোকাবেলা করে বারসিকের থেকে যোগাযোগ করে স্থানীয় জাতের ধান বীজ সংগ্রহ করে বীজ তলা তৈরী করেন এবং যথা সময়ে তার চিংড়ি ঘেরে স্বল্প পরিসরে ৬ রকম নোনাকচি, তালমুগুর, আইতি ভরত, খেজুরছড়ি, দার শাইল, বজ্র মুড়ি দেশী ধান রোপন করেন। ধানগুলো বিনা রাসায়নিক সার কীটনাশকে লবন পানিতে বেড়ে ওঠে এবং পুষ্ট ও বলিষ্ট পরিপক্ক শীষ আসে। কিন্তু শীষ আসার মূহুর্তে খালে লবন পানির জোয়ার দেওয়ায় ধান ডুবে যায়, এতে অধিকাংশ ধান চিটে হয়ে যায় এবং ফসল নষ্ট হয়ে যায়।
তিনি বলেন, এসব ধানের মধ্যে সবচেয়ে বেশি লবণ সহনশীল জাত হল তালমুগুর ও নোনা কচি। এলাকায় সকলে ধান চাষে উদ্যোগী হলে চিংড়ি ও অন্যান্য মাছ চাষের সাথে দেশী ধান এবং ঘেরের রাস্তায় ফসল চাষাবাদ করলে কৃষক লাভবান হবেন। তিনি আরও বলেন বিভিন্ন সময়ে উপজেলা কৃষি অফিসের উপ-সহকারী কৃষি অফিসারবৃন্দ তার সবজি বাগান পরিদর্শন করে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন এবং কৃষি অফিসে বিভিন্ন সময়ে প্রশিক্ষণে আহব্বান জানান।
পারুল রানী আশা প্রকাশ করে বলেন সকলেই চাইলে এলাকার পরিবর্তন আনা সম্ভব তার জন্য আমাদের একত্রিত হয়ে উদ্যোগ গ্রহন করতে হবে। একই সাথে কৃষিতে জৈব প্রযুক্তি ও স্থানীয় জাতের ব্যবহার বৃদ্ধি করার কথা বলেন।

ডেস্ক রিপোর্ট 






















