পটুয়াখালী প্রতিনিধি: প্রান্তিক কৃষক মো. হানিফ চৌকিদার এবছর ১৩ একর জমিতে আমনের আবাদ করার প্রস্তুতি নিয়েছেন। ইতিমধ্যে ৪ মন ধানের বীজতলা করেছেন। ৪ মন বীজ ধানের বীজতলা করতে তার ২২ হাজার টাকার বীজধান কিনতে হয়েছে। তার পর বীজ খ্সেথ তৈরি করতে খরচ।
কিন্তু গত এক সপ্তাহের ভারী বর্ষনে তার বীজতলা পুরোটাই তলিয়ে গিয়ে ডুবে গিয়েছে। সাতদিন পর আজ মঙ্গলবার থেকে পানি কিছুটা কমলেও বীজতলা রক্ষা করতে পারবে কিনা তা নিয়ে চিন্তিত তিনি। কৃষক হানিফের বাড়ি পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলার চর কাজল ইউনিয়নের চর কাজল গ্রামে।
ওই গ্রামের আরেক কৃষক এছিন মৃধা। তিনি এবছর ৫ একর জমিতে আমন ফসলের আবাদ করার প্রস্তুতি নিয়েছেন। ১১ হাজার টাকার বীজধান কিনে বীজতলা করেছিলেন।
তার খেত অতিবৃষ্টিতে ডুবে গিয়েছিল। জলাবদ্ধতায় খেতের বীজতলা ব্যাপক ক্ষতি হওয়ার আশংকা রয়েছে। তিনি জানান, মৌসুমের শুরুতেই বীজতলায় বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছেন তারা ।
এই ভারী বর্ষনে শুধু আমনের বীজতলাই নয় গ্রীষ্মকালীন সবজি নিয়ে দুচিন্তায় কৃষক। কৃষকদের সাথে কথা বলে জানা যায়, অধিকাংশ কৃষকই তাদের কষ্টার্জিত সবজি নিয়ে চিন্তায় রয়েছেন।
জেলার রাঙ্গাবালী উপজেলার চর গঙ্গা এলাকার কৃষক রাসেল হাওলাদার ৫ শতাংশ জমিতে পুঁই শাক, ঢেরস, বটবটি, পেঁপে, লালশাকসহ নানা ধরনের সবজির আবাদ করেছিলেন। এতে তার খরচ হয়েছিলো ১১ হাজার টাকা। ইতিমধ্যে খেতের সবজি বিক্রি করে ৭ হাজার টাকা তুলেছেন। এখন খেতে যে পরিমান সবজি রয়েছে তা প্রায় ৩০ হাজার টাকা বিক্রি হতো। কিন্তু ভারী বৃষ্টিতে তার সবজি খেত তলিয়ে রয়েছে। শুধু পেঁপে ছাড়া অন্য কোন সবজি বাঁচাতে পারবেন কিনা তা নিয়ে ।নিশ্চতায় রয়েছেন তিনি।
দক্ষিন বাহের চর গ্রামের সুপন মাহমুদও তার ১০ শতাংশ জমিতে নানা ধরনের সবজির আবাদ করেছিলন। খরচ হয়েছিল ১৫ হাজার টাকা। শুধু মাত্র দেড় হাহার টাকার সবজি বিক্রি করতে পেরেছিলেন তিনি। এখন পুরো খেত ডুবে রয়েছে। কিভাবে ফসল রক্ষা করবেন তাও তিনি জানেন না।
শুধু কৃষক হানিফ, সুপন মাহমুদই নয় এক সপ্তাহের প্রভাবে অতিবৃষ্টিতে পটুয়াখালী জেলায় ২ হাজার ৮০৫ হেক্টর ফসলের খেতভারী বর্ষনে আক্রান্ত হয়েছে। তবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে সাকসবজি ও আমনের বীজতলা।
পটুয়াখালী কৃষি বিভাগ জানায়, গত ৬ জুলাই থেকে কখনো হালকা, আবার কখনো ভারী বৃষ্টিপাত হয়েছে। ১২ জুলাই পর্য়ন্ত ছিল অবিরাম বৃষ্টির পানিতে জেলার নিন্মাঞ্চলের আউশ, আমন বীজতলাসহ অন্যান্য ফসলের খেতে ডুবে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। ৬ জুলাই থেকে ১২ জুলাই এক সপ্তাহে জেলার উপকূলীয় এলাকায় ৪৪৮ দশমিক ৩১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে বলে কৃষি বিভাগ জানিয়েছে।
কৃষি বিভাগ আরো জানায়, জেলায় আমন আবাদের লক্ষমাত্রা ধরা হয়েছে এক লক্ষ ৮৯ হাজার ৮৩৮ হেক্টর। এর জন্য ১৩ হাজার ৮০১ হেক্টর বীজতলা প্রয়োজন।
তবে কৃষি কর্মকর্তাদের মতে, এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে আউশ ধান, গ্রীষ্মকালীন সবজি ও আমনের বীজতলায়। তবে বীজতলা শুধু মাত্র শুরু হয়েছে।
আমনের চারা নষ্ট হলে অনেক এলাকায় কৃষকদের নতুন করে বীজতলা তৈরি করতে হতে পারে। এতে আমন চাষের সময়সূচি পিছিয়ে যেতে পারে।
একই সঙ্গে মাঠে থাকা সবজি নষ্ট হলে বাজারে সরবরাহ কমে দাম বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে।
পটুয়াখালী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, পটুয়াখালী কার্যালয় জানায়, জেলায় আউশের আবাদ হয়েছে ১০ হাজার ৪১৭ হেক্টর। এর মধ্যে ভারী বর্ষনে ডুবে গেছে ৫২০ হেক্টর। আমন বীজতলা ৯৭০ হেক্টর ও শাকসবজি ৮৫০ হেক্টর পুরোটাই ডুবে রয়েছে। পান ৬১২ হেক্টরের মধ্যে ১২০ হেক্টর বৃষ্টিতে আক্রান্ত হয়েছে। কলা ২৫০ হেক্টরের মধ্যে ৮০ হেক্টর আক্রান্ত, সাম্মান ফসল ৬০ হেক্টরের মধ্যে ৪০ হেক্টর আক্রান্ত। গ্রীষ্মকালীন তরমুজ ৪ হেক্টর ও পেঁপে ২২০ হেক্টর পুরোটাই আক্রান্ত এবং গ্রীষ্মকালীন মরিচ এক হেক্টরের মধ্যে দশমিক ৫ হেক্টর আক্রান্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারন অধিদপ্তর, পটুয়াখালীর উপ-পরিচালক ড. মোহাম্মদ আমানুল ইসলাম বলেন, এক সপ্তাহের ভারী বর্ষনে জেলার নিচু খেতগুলো জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। এখন পর্ন্তক ক্ষয়ক্ষতির কোন তথ্য আসেনি। পানি নিস্কাসিত হওয়ার পর ফসলের ক্ষয়-ক্ষতির সঠিক পরিমান জানা যাবে।

ডেস্ক রিপোর্ট 













