ঢাকা ১০:৫০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ০৭ অগাস্ট ২০২৬

১ মিনিটের চিকিৎসায় ফিরছে না আস্থা, ধুঁকছে স্বাস্থ্যব্যবস্থা

  • ডেস্ক রিপোর্ট
  • প্রকাশিত : ০৯:৫২:৫৪ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৭ অগাস্ট ২০২৬
  • ৪ বার দেখা হয়েছে

জুবাইয়া বিন্তে কবির: হাসপাতালের দীর্ঘ লাইনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষার পর চিকিৎসকের কক্ষে প্রবেশ করেই যদি একজন রোগী মাত্র এক মিনিট সময় পান, তাহলে সেই চিকিৎসাসেবা কতটা কার্যকর হতে পারে এই প্রশ্ন আজ বাংলাদেশের কোটি মানুষের। অন্যদিকে একই সময়ে একজন চিকিৎসককে যদি প্রতিদিন ১০০ থেকে ১৫০ জন রোগী দেখতে হয়, তাহলে তাঁর পক্ষে প্রত্যেক রোগীর জন্য পর্যাপ্ত সময়, মনোযোগ ও মানবিক যোগাযোগ নিশ্চিত করাও কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়ে। ফলে রোগী ও চিকিৎসক উভয়েই এক গভীর সংকটের মধ্যে অবস্থান করছেন। একজন চিকিৎসা পেয়ে সন্তুষ্ট নন, অন্যজন নিজের পেশাগত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে না পারার মানসিক চাপে ক্লান্ত। বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতের বর্তমান বাস্তবতা তাই কেবল অবকাঠামো বা অর্থায়নের সংকট নয়; এটি মূলত আস্থা, দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং মানবিক যোগাযোগের সংকট।

চিকিৎসা শুধু প্রেসক্রিপশন নয়, বিশ্বাসেরও নাম :
চিকিৎসাবিজ্ঞান বহুদিন ধরেই বলে আসছে, একজন রোগীর চিকিৎসা শুরু হয় তাঁর কথা মনোযোগ দিয়ে শোনার মধ্য দিয়ে। রোগের ইতিহাস, জীবনযাপন, মানসিক অবস্থা এবং শারীরিক পরীক্ষা সবকিছু মিলিয়েই সঠিক রোগ নির্ণয় সম্ভব। অথচ যখন পুরো সাক্ষাৎকারটি এক মিনিটেরও কম সময়ে শেষ হয়ে যায়, তখন চিকিৎসা একটি যান্ত্রিক প্রেসক্রিপশনে পরিণত হয়। রোগী মনে করেন তাঁর কথা শোনা হয়নি। চিকিৎসক মনে করেন তিনি নিজের পেশাগত দায়িত্ব পূর্ণভাবে পালন করতে পারেননি। এই দুই বঞ্চনার মধ্যেই ভেঙে পড়ে চিকিৎসা ব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি পারস্পরিক আস্থা।

কেন এক মিনিটের চিকিৎসা? এক মিনিটে চিকিৎসা দেওয়া কোনো চিকিৎসকের ব্যক্তিগত পছন্দ নয়; অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এটি একটি ত্রুটিপূর্ণ ব্যবস্থার ফল। কার্যকর রেফারেল ব্যবস্থা না থাকায় সর্দি-কাশি থেকে শুরু করে জটিল রোগ—সব ধরনের রোগী একই সঙ্গে বিভাগীয় ও জাতীয় বিশেষায়িত হাসপাতালে ভিড় করেন। ফলে বহির্বিভাগে অস্বাভাবিক চাপ সৃষ্টি হয়। অপর্যাপ্ত চিকিৎসক, সীমিত কক্ষ, অপরিকল্পিত রোগী ব্যবস্থাপনা এবং দীর্ঘদিনের জনবল সংকট মিলিয়ে এমন এক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে যেখানে চিকিৎসকের হাতে সময় থাকে না, আর রোগীর ধৈর্যেরও শেষ থাকে না।

স্বাস্থ্যখাতে সংকটের প্রকৃত উৎস : বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার সংকটকে অনেকেই কেবল বাজেটের ঘাটতি হিসেবে দেখেন। কিন্তু বাস্তবতা আরও জটিল। বহু গবেষণায় উঠে এসেছে, বরাদ্দের পাশাপাশি দক্ষ ব্যবস্থাপনার অভাব, চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীর ঘাটতি, রক্ষণাবেক্ষণের দুর্বলতা, কার্যকর জবাবদিহির অভাব এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার দুর্বল কাঠামোই বর্তমান সংকটের মূল কারণ।অনেক সরকারি হাসপাতালে আধুনিক যন্ত্রপাতি থাকলেও সেগুলো পরিচালনার জন্য পর্যাপ্ত মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট নেই। কোথাও যন্ত্র বিকল, কোথাও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে অকেজো। ফলে রোগীকে বাধ্য হয়ে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের শরণাপন্ন হতে হয়, যা তাঁর চিকিৎসা ব্যয় বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

স্বাস্থ্যব্যয়: মানুষের কাঁধে সবচেয়ে বড় বোঝা : বাংলাদেশে স্বাস্থ্যসেবার ব্যয়ের বড় অংশ এখনো সরাসরি নাগরিকদের নিজেদের বহন করতে হয়। চিকিৎসা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, ওষুধ, যাতায়াত এবং হাসপাতালে থাকার ব্যয় অনেক পরিবারের জন্য আর্থিক বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর জন্য একটি বড় অসুস্থতা কখনও কখনও দারিদ্র্যের নতুন চক্র তৈরি করে। স্বাস্থ্য অর্থনীতির গবেষণা বলছে, যখন মানুষের ব্যক্তিগত ব্যয়ের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা তৈরি হয়, তখন চিকিৎসা গ্রহণে অনীহা বাড়ে, রোগ জটিল হয় এবং শেষ পর্যন্ত স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা কমতে থাকে।

হাসপাতালের করিডোরে অপেক্ষা, কক্ষের ভেতরে মাত্র এক মিনিট : সকালের আলো ফোটার আগেই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজারো মানুষ ছুটে আসেন জেলা সদর হাসপাতাল, মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কিংবা জাতীয় বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে। হাতে একটি টিকিট, চোখে সুস্থ হওয়ার প্রত্যাশা। কিন্তু ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষার পর চিকিৎসকের কক্ষে প্রবেশ করে অনেকেই হতাশ হয়ে বের হন। কারণ, নিজের অসুস্থতার ইতিহাস, আগের চিকিৎসা কিংবা বর্তমান সমস্যার বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়ার সুযোগই পান না। বহির্বিভাগের অধিকাংশ চিকিৎসক প্রতিদিন অস্বাভাবিক সংখ্যক রোগী দেখেন। ফলে রোগী ও চিকিৎসকের মধ্যে প্রয়োজনীয় কথোপকথন গড়ে ওঠে না। অথচ চিকিৎসাবিজ্ঞানে রোগ নির্ণয়ের অন্যতম প্রধান উপাদানই হলো রোগীর কাছ থেকে বিস্তারিত ইতিহাস গ্রহণ।

মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা যে প্রশ্ন তোলে : সরেজমিন পর্যবেক্ষণে দেশের বড় সরকারি হাসপাতালগুলোতে প্রায় একই ধরনের চিত্র দেখা যায়। কোথাও রোগীর দীর্ঘ সারি, কোথাও পরীক্ষার জন্য সপ্তাহব্যাপী অপেক্ষা, কোথাও আবার প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি থাকলেও তা অকেজো। অনেক হাসপাতালে একই সময়ে একাধিক রোগীকে চিকিৎসকের কক্ষে প্রবেশ করতে দেখা যায়, যা রোগীর ব্যক্তিগত গোপনীয়তা এবং চিকিৎসার মান উভয়ের জন্যই প্রশ্ন তৈরি করে। আল্ট্রাসনোগ্রাম, এক্স-রে কিংবা অন্যান্য পরীক্ষার সীমিত সক্ষমতার কারণে অনেক রোগীকে বাধ্য হয়ে বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে যেতে হয়। এতে চিকিৎসা ব্যয় কয়েক গুণ বেড়ে যায় এবং দরিদ্র মানুষের জন্য স্বাস্থ্যসেবা আরও দূরের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।

রোগীর অভিযোগ: শুধু সময় নয়, আচরণও গুরুত্বপূর্ণ :
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের রোগীদের সঙ্গে কথা বললে একটি অভিযোগ প্রায় সবার মুখেই শোনা যায়—“ডাক্তার আমাদের কথা শোনেন না।” এই অভিযোগের পেছনে কেবল সময়ের স্বল্পতা নয়, অনেক ক্ষেত্রে যোগাযোগের ঘাটতিও কাজ করে। একজন অসুস্থ মানুষ যখন হাসপাতালে আসেন, তখন তিনি শুধু ওষুধ নয়, কিছুটা মানসিক আশ্বাসও প্রত্যাশা করেন। চিকিৎসক যদি কয়েকটি বাক্যে রোগের প্রকৃতি, চিকিৎসার উদ্দেশ্য এবং করণীয় বুঝিয়ে দেন, তাহলে রোগীর আস্থা বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। অন্যদিকে কোথাও কোথাও অসৌজন্যমূলক আচরণ, অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার অভিযোগ কিংবা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে যাওয়ার পরামর্শ মানুষের মধ্যে অবিশ্বাস সৃষ্টি করছে। যদিও সব চিকিৎসকের ক্ষেত্রে এমন অভিযোগ প্রযোজ্য নয়, তবুও বিচ্ছিন্ন অনিয়ম পুরো পেশার ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

চিকিৎসকরাও এক কঠিন বাস্তবতার শিকার : রোগীদের দুর্ভোগের পাশাপাশি চিকিৎসকদের বাস্তবতাও সমানভাবে বিবেচনার দাবি রাখে। একজন সরকারি চিকিৎসককে প্রতিদিন কয়েক ঘণ্টার মধ্যে শতাধিক রোগী দেখতে হয়। এরপর ইনডোর রোগী, জরুরি বিভাগ, প্রশাসনিক দায়িত্ব, শিক্ষাদান এবং প্রশিক্ষণের কাজও সামলাতে হয়। এভাবে দীর্ঘদিন কাজ করতে করতে অনেক চিকিৎসক শারীরিক ও মানসিক ক্লান্তিতে আক্রান্ত হন। আন্তর্জাতিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে একে বলা হয় ‘বার্নআউট সিনড্রোম’—যেখানে অতিরিক্ত কর্মচাপ একজন চিকিৎসকের কর্মদক্ষতা, মানসিক সুস্থতা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতাকে প্রভাবিত করে। ফলে বর্তমান সংকটকে কেবল চিকিৎসকের ব্যর্থতা হিসেবে দেখলে বাস্তবতার একটি বড় অংশ আড়ালেই থেকে যায়।

চিকিৎসক-রোগী সম্পর্ক কেন ভেঙে যাচ্ছে? একসময় চিকিৎসক ছিলেন সমাজের সবচেয়ে বিশ্বস্ত পেশাজীবীদের একজন। রোগীরা চিকিৎসকের কাছে শুধু চিকিৎসা নয়, নৈতিক সাহস ও মানসিক শক্তিও পেতেন। কিন্তু বর্তমানে সেই সম্পর্ক নানা কারণে দুর্বল হয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যাচাই-বাছাই ছাড়াই ছড়িয়ে পড়া তথ্য, কিছু আলোচিত চিকিৎসা-অবহেলার ঘটনা, কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ, চিকিৎসকদের ওপর হামলা, হাসপাতালের নিরাপত্তাহীনতা এবং রোগীর ক্রমবর্ধমান প্রত্যাশা—সব মিলিয়ে উভয় পক্ষের মধ্যেই অবিশ্বাস তৈরি হয়েছে। এই অবিশ্বাস দূর করতে হলে কেবল আইন নয়; প্রয়োজন পারস্পরিক সম্মান, জবাবদিহি এবং মানবিক যোগাযোগ।

পরবর্তী পথ: সংস্কারের দাবি : বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও গবেষক অধ্যাপক ড. মোঃ মোর্শেদ হাসান খান দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষা, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং রাষ্ট্রীয় সেবার মানোন্নয়নের প্রশ্নে জবাবদিহি, দক্ষতা ও মানবিক মূল্যবোধভিত্তিক সংস্কারের ওপর গুরুত্বারোপ করে আসছেন। তাঁর মতে, রাষ্ট্রের উন্নয়ন তখনই টেকসই হয়, যখন শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং প্রশাসনিক সেবায় দক্ষতা ও জবাবদিহি একসঙ্গে প্রতিষ্ঠিত হয়। স্বাস্থ্যখাতেও এই নীতির বাস্তব প্রয়োগ সময়ের দাবি। আজ প্রয়োজন এমন একটি স্বাস্থ্যব্যবস্থা, যেখানে রোগী সম্মান পাবেন, চিকিৎসক নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ কর্মপরিবেশ পাবেন এবং রাষ্ট্র এমন একটি কাঠামো গড়ে তুলবে, যেখানে চিকিৎসাসেবা নাগরিকের মৌলিক অধিকার হিসেবে বাস্তবে প্রতিফলিত হবে। স্বাস্থ্যখাত সংস্কারের প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রী দেশনায়ক তারেক রহমান এবং সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও নীতিনির্ধারকদের প্রতি নাগরিকদের প্রত্যাশা এই সংকটকে সাময়িক প্রশাসনিক সমস্যা হিসেবে নয়, বরং একটি জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করে দীর্ঘমেয়াদি ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার কার্যক্রম গ্রহণ করা। কারণ একটি দেশের অর্থনীতি, শিক্ষা ও উৎপাদনশীলতার ভিত্তি শেষ পর্যন্ত নির্ভর করে তার জনগণের সুস্বাস্থ্যের ওপর।

পরিসংখ্যান বলছে—সংকট কাঠামোগত, বিচ্ছিন্ন নয় :বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতের সংকটকে কেবল ব্যক্তিগত ব্যর্থতা বা কোনো একটি প্রতিষ্ঠানের সীমাবদ্ধতা দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। সাম্প্রতিক সরকারি ও আন্তর্জাতিক তথ্য বলছে, এটি একটি দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সমস্যা। সরকারি স্বাস্থ্য বুলেটিন অনুযায়ী, দেশে মোট স্বাস্থ্য ব্যয় জিডিপির প্রায় ২.৮ শতাংশ হলেও মাথাপিছু স্বাস্থ্য ব্যয় মাত্র ৫৪ মার্কিন ডলার। এর মধ্যে মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের প্রায় ৬৮.৫ শতাংশই জনগণকে নিজের পকেট থেকে বহন করতে হয়, যা আর্থিক সুরক্ষার দিক থেকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক। স্বাস্থ্যসেবার এই ব্যয় কাঠামো শুধু দরিদ্র নয়, মধ্যবিত্ত পরিবারকেও আর্থিক ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে অনেক পরিবার ঋণ নিচ্ছে, সম্পদ বিক্রি করছে অথবা প্রয়োজনীয় চিকিৎসাই বাদ দিচ্ছে—যা দীর্ঘমেয়াদে জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি।

চিকিৎসক আছেন, কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় এখনও কম :
সরকারি তথ্য অনুযায়ী দেশে নিবন্ধিত চিকিৎসকের সংখ্যা বেড়েছে। তবুও জনসংখ্যার তুলনায় চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীর ঘাটতি এখনও প্রকট। ২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী দেশে প্রতি এক হাজার মানুষের বিপরীতে চিকিৎসক প্রায় ০.৯২ জন এবং নার্স প্রায় ০.৬৩ জন। সরকারি খাতে কর্মরত চিকিৎসকের সংখ্যা আরও সীমিত হওয়ায় অনেক হাসপাতালেই একজন চিকিৎসককে বিপুল সংখ্যক রোগীর দায়িত্ব নিতে হয়। সংখ্যাগত ঘাটতির পাশাপাশি রয়েছে ভৌগোলিক বৈষম্য। রাজধানী ও বড় শহরে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের ঘনত্ব বেশি হলেও প্রত্যন্ত উপজেলা ও চরাঞ্চলে দক্ষ চিকিৎসকের উপস্থিতি এখনও অপর্যাপ্ত। ফলে সাধারণ মানুষ বাধ্য হয়ে জেলা কিংবা ঢাকার হাসপাতালে ছুটে আসেন।

রেফারেল ব্যবস্থা না থাকাই সবচেয়ে বড় সংকটগুলোর একটি : উন্নত স্বাস্থ্যব্যবস্থার অন্যতম ভিত্তি হলো কার্যকর রেফারেল ব্যবস্থা। অর্থাৎ রোগী প্রথমে প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা পারিবারিক চিকিৎসকের কাছে যাবেন; প্রয়োজন হলে উপজেলা, তারপর জেলা এবং শেষে বিশেষায়িত হাসপাতালে পাঠানো হবে। বাংলাদেশে এই ধাপভিত্তিক ব্যবস্থা কার্যকর না থাকায় অনেক রোগী সরাসরি মেডিকেল কলেজ বা জাতীয় বিশেষায়িত হাসপাতালে চলে আসেন। ফলে যেসব রোগী প্রকৃত অর্থে উচ্চতর চিকিৎসার প্রয়োজন, তারাও দীর্ঘ অপেক্ষা ও অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে বঞ্চিত হন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালী করা এবং কার্যকর রেফারেল পথ গড়ে তোলার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে।

আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা আমাদের কী শেখায় : যুক্তরাজ্যে অধিকাংশ রোগী প্রথমে পারিবারিক চিকিৎসক (General Practitioner)-এর কাছে যান। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার আগে সেই চিকিৎসকের রেফারেল প্রয়োজন হয়। একই ধরনের ব্যবস্থা থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, জাপান এবং ইউরোপের অনেক দেশেও কার্যকরভাবে চালু রয়েছে। ভারতের কেরালায় প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোকে শক্তিশালী করার ফলে জেলা ও মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওপর চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। রোগীর চিকিৎসার ধারাবাহিকতা, ইলেকট্রনিক স্বাস্থ্য রেকর্ড এবং ফলো-আপ ব্যবস্থাও সেখানে তুলনামূলকভাবে সুসংগঠিত।
বাংলাদেশেও যদি ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও জেলা হাসপাতালকে কার্যকরভাবে সক্ষম করা যায়, তবে রাজধানীকেন্দ্রিক চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।

স্বাস্থ্য অর্থনীতি বলছে বরাদ্দের পাশাপাশি সুশাসনও জরুরি : স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ; তবে কেবল অর্থ বাড়ালেই সমস্যার সমাধান হবে না। বরাদ্দের যথাযথ ব্যবহার, জনবল পরিকল্পনা, যন্ত্রপাতির রক্ষণাবেক্ষণ, ওষুধ সরবরাহ, ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসবে না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বাংলাদেশের জন্য যে সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা (Universal Health Coverage) রোডম্যাপ নিয়ে কাজ করছে, সেখানে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালী করা, স্বাস্থ্যকর্মী বৃদ্ধি, ওষুধ ও রোগনির্ণয় সুবিধা সম্প্রসারণ এবং জনগণের ব্যক্তিগত ব্যয় কমানোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশের সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা সূচক ১০০-এর মধ্যে ৫৪ এবং বিপুল জনগোষ্ঠী চিকিৎসা ব্যয়ের কারণে আর্থিক কষ্টে পড়ছে। স্বাস্থ্য অর্থনীতির দৃষ্টিতে, একটি কার্যকর স্বাস্থ্যব্যবস্থা শুধু মানুষের জীবনই রক্ষা করে না; এটি উৎপাদনশীলতা বাড়ায়, দারিদ্র্য কমায় এবং দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় অর্থনীতিকেও শক্তিশালী করে।

আস্থা ফিরিয়ে আনতে মানবিক চিকিৎসা সংস্কৃতি গড়তে হবে : চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতি যতই হোক, একজন রোগীর কাছে সবচেয়ে বড় ওষুধ এখনো চিকিৎসকের আন্তরিকতা, মনোযোগ এবং মানবিক আচরণ। একটি হাসিমুখ, কয়েক মিনিট মনোযোগ দিয়ে রোগীর কথা শোনা কিংবা সহজ ভাষায় রোগের অবস্থা ব্যাখ্যা করে দেওয়া—এসবের কোনো আর্থিক মূল্য নেই, কিন্তু চিকিৎসার সফলতার ক্ষেত্রে এর গুরুত্ব অপরিসীম। আজ বাংলাদেশে চিকিৎসক-রোগীর সম্পর্কে যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে, তা কমাতে উভয় পক্ষকেই এগিয়ে আসতে হবে। রোগীদেরও বুঝতে হবে যে অতিরিক্ত রোগীর চাপের মধ্যে চিকিৎসকদের কাজ করতে হয়। একই সঙ্গে চিকিৎসকদেরও মনে রাখতে হবে, একজন অসুস্থ মানুষের কাছে মানবিক ব্যবহার চিকিৎসারই অংশ।

ডিজিটাল স্বাস্থ্যব্যবস্থা এখন সময়ের অপরিহার্য দাবি :বিশ্বের অনেক দেশ স্বাস্থ্যসেবাকে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নিয়ে এসেছে। অনলাইন অ্যাপয়েন্টমেন্ট, ইলেকট্রনিক স্বাস্থ্য রেকর্ড, কেন্দ্রীয় রোগী ডাটাবেজ এবং ডিজিটাল রেফারেল ব্যবস্থা রোগীর সময়, অর্থ ও ভোগান্তি উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়েছে। বাংলাদেশেও ধাপে ধাপে একটি সমন্বিত জাতীয় ডিজিটাল স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। একজন রোগীর পরীক্ষার রিপোর্ট, পূর্ববর্তী প্রেসক্রিপশন এবং চিকিৎসার ইতিহাস যদি দেশের যেকোনো সরকারি হাসপাতালে তাৎক্ষণিকভাবে দেখা যায়, তাহলে একই পরীক্ষা বারবার করার প্রয়োজন কমবে এবং রোগ নির্ণয়ও হবে আরও দ্রুত ও নির্ভুল।

হাসপাতাল ব্যবস্থাপনায় আমূল সংস্কার ছাড়া বিকল্প নেই :
আজ দেশের অধিকাংশ সরকারি হাসপাতালের প্রধান সমস্যা শুধু চিকিৎসক সংকট নয়; ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বহির্বিভাগে রোগীর দীর্ঘ লাইন, পরীক্ষার জন্য সীমিত সক্ষমতা, যন্ত্রপাতি রক্ষণাবেক্ষণের দুর্বলতা, শয্যা সংকট, দালালচক্রের দৌরাত্ম্য এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা না থাকা—সব মিলিয়ে একটি জটিল বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বড় মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলোতে আধুনিক আউটডোর কমপ্লেক্স, পর্যাপ্ত মেডিকেল অফিসার, আলাদা ট্রায়াজ ব্যবস্থা, দ্রুত ল্যাব সুবিধা এবং তিন শিফটে বহির্বিভাগ পরিচালনার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত। একই সঙ্গে প্রতিটি হাসপাতালে স্বাধীন রোগী সহায়তা ও অভিযোগ নিষ্পত্তি সেল গঠন করলে সেবার মান ও জবাবদিহি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।

শিক্ষাবিদদের দৃষ্টিতে স্বাস্থ্যখাতে মানবসম্পদই সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ : বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও গবেষক অধ্যাপক ড. মোঃ মোর্শেদ হাসান খান দীর্ঘদিন ধরে মানবসম্পদ উন্নয়নকে রাষ্ট্রের টেকসই অগ্রগতির মূল ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, শিক্ষা, গবেষণা এবং দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নে বিনিয়োগ ছাড়া কোনো রাষ্ট্র দীর্ঘমেয়াদে উন্নত হতে পারে না। এই দর্শন স্বাস্থ্যখাতেও সমানভাবে প্রযোজ্য। স্বাস্থ্যসেবা কেবল হাসপাতাল নির্মাণ বা আধুনিক যন্ত্রপাতি কেনার বিষয় নয়; এটি দক্ষ চিকিৎসক, প্রশিক্ষিত নার্স, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট, স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপক এবং গবেষকদের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা একটি সমন্বিত ব্যবস্থা। তাই চিকিৎসা শিক্ষার মানোন্নয়ন, নিয়মিত পেশাগত প্রশিক্ষণ, গবেষণা সহায়তা, নৈতিকতা শিক্ষা এবং জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনাকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

পরিশেষে, বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাত আজ এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে আংশিক সংস্কার দিয়ে আর পরিস্থিতির পরিবর্তন সম্ভব নয়। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি, প্রাতিষ্ঠানিক এবং তথ্যভিত্তিক সংস্কার। সরকার ইতোমধ্যে নতুন চিকিৎসক নিয়োগসহ স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে। তবে এর পাশাপাশি কার্যকর রেফারেল ব্যবস্থা চালু, উপজেলা ও জেলা হাসপাতাল শক্তিশালী করা, চিকিৎসক-নার্স-টেকনোলজিস্টের শূন্যপদ পূরণ, হাসপাতাল ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহি নিশ্চিত করা, ডিজিটাল স্বাস্থ্যব্যবস্থা চালু, চিকিৎসকদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা এবং রোগীদের আর্থিক সুরক্ষা বাড়ানোর মতো পদক্ষেপ সমানভাবে জরুরি। প্রধানমন্ত্রী দেশনায়ক তারেক রহমান এবং সরকারের সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকদের প্রতি নাগরিক সমাজের প্রত্যাশা—স্বাস্থ্যখাতকে কেবল একটি প্রশাসনিক খাত হিসেবে নয়, বরং জাতীয় উন্নয়নের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করে একটি দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা। কারণ একটি সুস্থ জনগোষ্ঠী ছাড়া কোনো দেশের অর্থনীতি, শিক্ষা, শিল্প কিংবা প্রযুক্তিগত অগ্রগতি টেকসই হতে পারে না। বাংলাদেশের মানুষ আধুনিক হাসপাতাল যেমন চায়, তেমনি চায় মানবিক চিকিৎসক, দক্ষ ব্যবস্থাপনা, সাশ্রয়ী চিকিৎসা ব্যয় এবং সর্বোপরি একটি বিশ্বাসযোগ্য স্বাস্থ্যব্যবস্থা। আজ সেই আস্থা ফিরিয়ে আনার সময়। রাষ্ট্র, চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী এবং নাগরিক সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায়ই কেবল একটি ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও মানসম্মত স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব।

লেখক : জুবাইয়া বিন্তে কবির
সাংবাদিক, গবেষক ও কলামিস্ট

জনপ্রিয় সংবাদ

১ মিনিটের চিকিৎসায় ফিরছে না আস্থা, ধুঁকছে স্বাস্থ্যব্যবস্থা

প্রকাশিত : ০৯:৫২:৫৪ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৭ অগাস্ট ২০২৬

জুবাইয়া বিন্তে কবির: হাসপাতালের দীর্ঘ লাইনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষার পর চিকিৎসকের কক্ষে প্রবেশ করেই যদি একজন রোগী মাত্র এক মিনিট সময় পান, তাহলে সেই চিকিৎসাসেবা কতটা কার্যকর হতে পারে এই প্রশ্ন আজ বাংলাদেশের কোটি মানুষের। অন্যদিকে একই সময়ে একজন চিকিৎসককে যদি প্রতিদিন ১০০ থেকে ১৫০ জন রোগী দেখতে হয়, তাহলে তাঁর পক্ষে প্রত্যেক রোগীর জন্য পর্যাপ্ত সময়, মনোযোগ ও মানবিক যোগাযোগ নিশ্চিত করাও কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়ে। ফলে রোগী ও চিকিৎসক উভয়েই এক গভীর সংকটের মধ্যে অবস্থান করছেন। একজন চিকিৎসা পেয়ে সন্তুষ্ট নন, অন্যজন নিজের পেশাগত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে না পারার মানসিক চাপে ক্লান্ত। বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতের বর্তমান বাস্তবতা তাই কেবল অবকাঠামো বা অর্থায়নের সংকট নয়; এটি মূলত আস্থা, দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং মানবিক যোগাযোগের সংকট।

চিকিৎসা শুধু প্রেসক্রিপশন নয়, বিশ্বাসেরও নাম :
চিকিৎসাবিজ্ঞান বহুদিন ধরেই বলে আসছে, একজন রোগীর চিকিৎসা শুরু হয় তাঁর কথা মনোযোগ দিয়ে শোনার মধ্য দিয়ে। রোগের ইতিহাস, জীবনযাপন, মানসিক অবস্থা এবং শারীরিক পরীক্ষা সবকিছু মিলিয়েই সঠিক রোগ নির্ণয় সম্ভব। অথচ যখন পুরো সাক্ষাৎকারটি এক মিনিটেরও কম সময়ে শেষ হয়ে যায়, তখন চিকিৎসা একটি যান্ত্রিক প্রেসক্রিপশনে পরিণত হয়। রোগী মনে করেন তাঁর কথা শোনা হয়নি। চিকিৎসক মনে করেন তিনি নিজের পেশাগত দায়িত্ব পূর্ণভাবে পালন করতে পারেননি। এই দুই বঞ্চনার মধ্যেই ভেঙে পড়ে চিকিৎসা ব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি পারস্পরিক আস্থা।

কেন এক মিনিটের চিকিৎসা? এক মিনিটে চিকিৎসা দেওয়া কোনো চিকিৎসকের ব্যক্তিগত পছন্দ নয়; অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এটি একটি ত্রুটিপূর্ণ ব্যবস্থার ফল। কার্যকর রেফারেল ব্যবস্থা না থাকায় সর্দি-কাশি থেকে শুরু করে জটিল রোগ—সব ধরনের রোগী একই সঙ্গে বিভাগীয় ও জাতীয় বিশেষায়িত হাসপাতালে ভিড় করেন। ফলে বহির্বিভাগে অস্বাভাবিক চাপ সৃষ্টি হয়। অপর্যাপ্ত চিকিৎসক, সীমিত কক্ষ, অপরিকল্পিত রোগী ব্যবস্থাপনা এবং দীর্ঘদিনের জনবল সংকট মিলিয়ে এমন এক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে যেখানে চিকিৎসকের হাতে সময় থাকে না, আর রোগীর ধৈর্যেরও শেষ থাকে না।

স্বাস্থ্যখাতে সংকটের প্রকৃত উৎস : বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার সংকটকে অনেকেই কেবল বাজেটের ঘাটতি হিসেবে দেখেন। কিন্তু বাস্তবতা আরও জটিল। বহু গবেষণায় উঠে এসেছে, বরাদ্দের পাশাপাশি দক্ষ ব্যবস্থাপনার অভাব, চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীর ঘাটতি, রক্ষণাবেক্ষণের দুর্বলতা, কার্যকর জবাবদিহির অভাব এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার দুর্বল কাঠামোই বর্তমান সংকটের মূল কারণ।অনেক সরকারি হাসপাতালে আধুনিক যন্ত্রপাতি থাকলেও সেগুলো পরিচালনার জন্য পর্যাপ্ত মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট নেই। কোথাও যন্ত্র বিকল, কোথাও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে অকেজো। ফলে রোগীকে বাধ্য হয়ে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের শরণাপন্ন হতে হয়, যা তাঁর চিকিৎসা ব্যয় বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

স্বাস্থ্যব্যয়: মানুষের কাঁধে সবচেয়ে বড় বোঝা : বাংলাদেশে স্বাস্থ্যসেবার ব্যয়ের বড় অংশ এখনো সরাসরি নাগরিকদের নিজেদের বহন করতে হয়। চিকিৎসা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, ওষুধ, যাতায়াত এবং হাসপাতালে থাকার ব্যয় অনেক পরিবারের জন্য আর্থিক বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর জন্য একটি বড় অসুস্থতা কখনও কখনও দারিদ্র্যের নতুন চক্র তৈরি করে। স্বাস্থ্য অর্থনীতির গবেষণা বলছে, যখন মানুষের ব্যক্তিগত ব্যয়ের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা তৈরি হয়, তখন চিকিৎসা গ্রহণে অনীহা বাড়ে, রোগ জটিল হয় এবং শেষ পর্যন্ত স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা কমতে থাকে।

হাসপাতালের করিডোরে অপেক্ষা, কক্ষের ভেতরে মাত্র এক মিনিট : সকালের আলো ফোটার আগেই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজারো মানুষ ছুটে আসেন জেলা সদর হাসপাতাল, মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কিংবা জাতীয় বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে। হাতে একটি টিকিট, চোখে সুস্থ হওয়ার প্রত্যাশা। কিন্তু ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষার পর চিকিৎসকের কক্ষে প্রবেশ করে অনেকেই হতাশ হয়ে বের হন। কারণ, নিজের অসুস্থতার ইতিহাস, আগের চিকিৎসা কিংবা বর্তমান সমস্যার বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়ার সুযোগই পান না। বহির্বিভাগের অধিকাংশ চিকিৎসক প্রতিদিন অস্বাভাবিক সংখ্যক রোগী দেখেন। ফলে রোগী ও চিকিৎসকের মধ্যে প্রয়োজনীয় কথোপকথন গড়ে ওঠে না। অথচ চিকিৎসাবিজ্ঞানে রোগ নির্ণয়ের অন্যতম প্রধান উপাদানই হলো রোগীর কাছ থেকে বিস্তারিত ইতিহাস গ্রহণ।

মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা যে প্রশ্ন তোলে : সরেজমিন পর্যবেক্ষণে দেশের বড় সরকারি হাসপাতালগুলোতে প্রায় একই ধরনের চিত্র দেখা যায়। কোথাও রোগীর দীর্ঘ সারি, কোথাও পরীক্ষার জন্য সপ্তাহব্যাপী অপেক্ষা, কোথাও আবার প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি থাকলেও তা অকেজো। অনেক হাসপাতালে একই সময়ে একাধিক রোগীকে চিকিৎসকের কক্ষে প্রবেশ করতে দেখা যায়, যা রোগীর ব্যক্তিগত গোপনীয়তা এবং চিকিৎসার মান উভয়ের জন্যই প্রশ্ন তৈরি করে। আল্ট্রাসনোগ্রাম, এক্স-রে কিংবা অন্যান্য পরীক্ষার সীমিত সক্ষমতার কারণে অনেক রোগীকে বাধ্য হয়ে বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে যেতে হয়। এতে চিকিৎসা ব্যয় কয়েক গুণ বেড়ে যায় এবং দরিদ্র মানুষের জন্য স্বাস্থ্যসেবা আরও দূরের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।

রোগীর অভিযোগ: শুধু সময় নয়, আচরণও গুরুত্বপূর্ণ :
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের রোগীদের সঙ্গে কথা বললে একটি অভিযোগ প্রায় সবার মুখেই শোনা যায়—“ডাক্তার আমাদের কথা শোনেন না।” এই অভিযোগের পেছনে কেবল সময়ের স্বল্পতা নয়, অনেক ক্ষেত্রে যোগাযোগের ঘাটতিও কাজ করে। একজন অসুস্থ মানুষ যখন হাসপাতালে আসেন, তখন তিনি শুধু ওষুধ নয়, কিছুটা মানসিক আশ্বাসও প্রত্যাশা করেন। চিকিৎসক যদি কয়েকটি বাক্যে রোগের প্রকৃতি, চিকিৎসার উদ্দেশ্য এবং করণীয় বুঝিয়ে দেন, তাহলে রোগীর আস্থা বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। অন্যদিকে কোথাও কোথাও অসৌজন্যমূলক আচরণ, অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার অভিযোগ কিংবা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে যাওয়ার পরামর্শ মানুষের মধ্যে অবিশ্বাস সৃষ্টি করছে। যদিও সব চিকিৎসকের ক্ষেত্রে এমন অভিযোগ প্রযোজ্য নয়, তবুও বিচ্ছিন্ন অনিয়ম পুরো পেশার ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

চিকিৎসকরাও এক কঠিন বাস্তবতার শিকার : রোগীদের দুর্ভোগের পাশাপাশি চিকিৎসকদের বাস্তবতাও সমানভাবে বিবেচনার দাবি রাখে। একজন সরকারি চিকিৎসককে প্রতিদিন কয়েক ঘণ্টার মধ্যে শতাধিক রোগী দেখতে হয়। এরপর ইনডোর রোগী, জরুরি বিভাগ, প্রশাসনিক দায়িত্ব, শিক্ষাদান এবং প্রশিক্ষণের কাজও সামলাতে হয়। এভাবে দীর্ঘদিন কাজ করতে করতে অনেক চিকিৎসক শারীরিক ও মানসিক ক্লান্তিতে আক্রান্ত হন। আন্তর্জাতিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে একে বলা হয় ‘বার্নআউট সিনড্রোম’—যেখানে অতিরিক্ত কর্মচাপ একজন চিকিৎসকের কর্মদক্ষতা, মানসিক সুস্থতা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতাকে প্রভাবিত করে। ফলে বর্তমান সংকটকে কেবল চিকিৎসকের ব্যর্থতা হিসেবে দেখলে বাস্তবতার একটি বড় অংশ আড়ালেই থেকে যায়।

চিকিৎসক-রোগী সম্পর্ক কেন ভেঙে যাচ্ছে? একসময় চিকিৎসক ছিলেন সমাজের সবচেয়ে বিশ্বস্ত পেশাজীবীদের একজন। রোগীরা চিকিৎসকের কাছে শুধু চিকিৎসা নয়, নৈতিক সাহস ও মানসিক শক্তিও পেতেন। কিন্তু বর্তমানে সেই সম্পর্ক নানা কারণে দুর্বল হয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যাচাই-বাছাই ছাড়াই ছড়িয়ে পড়া তথ্য, কিছু আলোচিত চিকিৎসা-অবহেলার ঘটনা, কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ, চিকিৎসকদের ওপর হামলা, হাসপাতালের নিরাপত্তাহীনতা এবং রোগীর ক্রমবর্ধমান প্রত্যাশা—সব মিলিয়ে উভয় পক্ষের মধ্যেই অবিশ্বাস তৈরি হয়েছে। এই অবিশ্বাস দূর করতে হলে কেবল আইন নয়; প্রয়োজন পারস্পরিক সম্মান, জবাবদিহি এবং মানবিক যোগাযোগ।

পরবর্তী পথ: সংস্কারের দাবি : বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও গবেষক অধ্যাপক ড. মোঃ মোর্শেদ হাসান খান দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষা, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং রাষ্ট্রীয় সেবার মানোন্নয়নের প্রশ্নে জবাবদিহি, দক্ষতা ও মানবিক মূল্যবোধভিত্তিক সংস্কারের ওপর গুরুত্বারোপ করে আসছেন। তাঁর মতে, রাষ্ট্রের উন্নয়ন তখনই টেকসই হয়, যখন শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং প্রশাসনিক সেবায় দক্ষতা ও জবাবদিহি একসঙ্গে প্রতিষ্ঠিত হয়। স্বাস্থ্যখাতেও এই নীতির বাস্তব প্রয়োগ সময়ের দাবি। আজ প্রয়োজন এমন একটি স্বাস্থ্যব্যবস্থা, যেখানে রোগী সম্মান পাবেন, চিকিৎসক নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ কর্মপরিবেশ পাবেন এবং রাষ্ট্র এমন একটি কাঠামো গড়ে তুলবে, যেখানে চিকিৎসাসেবা নাগরিকের মৌলিক অধিকার হিসেবে বাস্তবে প্রতিফলিত হবে। স্বাস্থ্যখাত সংস্কারের প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রী দেশনায়ক তারেক রহমান এবং সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও নীতিনির্ধারকদের প্রতি নাগরিকদের প্রত্যাশা এই সংকটকে সাময়িক প্রশাসনিক সমস্যা হিসেবে নয়, বরং একটি জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করে দীর্ঘমেয়াদি ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার কার্যক্রম গ্রহণ করা। কারণ একটি দেশের অর্থনীতি, শিক্ষা ও উৎপাদনশীলতার ভিত্তি শেষ পর্যন্ত নির্ভর করে তার জনগণের সুস্বাস্থ্যের ওপর।

পরিসংখ্যান বলছে—সংকট কাঠামোগত, বিচ্ছিন্ন নয় :বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতের সংকটকে কেবল ব্যক্তিগত ব্যর্থতা বা কোনো একটি প্রতিষ্ঠানের সীমাবদ্ধতা দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। সাম্প্রতিক সরকারি ও আন্তর্জাতিক তথ্য বলছে, এটি একটি দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সমস্যা। সরকারি স্বাস্থ্য বুলেটিন অনুযায়ী, দেশে মোট স্বাস্থ্য ব্যয় জিডিপির প্রায় ২.৮ শতাংশ হলেও মাথাপিছু স্বাস্থ্য ব্যয় মাত্র ৫৪ মার্কিন ডলার। এর মধ্যে মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের প্রায় ৬৮.৫ শতাংশই জনগণকে নিজের পকেট থেকে বহন করতে হয়, যা আর্থিক সুরক্ষার দিক থেকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক। স্বাস্থ্যসেবার এই ব্যয় কাঠামো শুধু দরিদ্র নয়, মধ্যবিত্ত পরিবারকেও আর্থিক ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে অনেক পরিবার ঋণ নিচ্ছে, সম্পদ বিক্রি করছে অথবা প্রয়োজনীয় চিকিৎসাই বাদ দিচ্ছে—যা দীর্ঘমেয়াদে জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি।

চিকিৎসক আছেন, কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় এখনও কম :
সরকারি তথ্য অনুযায়ী দেশে নিবন্ধিত চিকিৎসকের সংখ্যা বেড়েছে। তবুও জনসংখ্যার তুলনায় চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীর ঘাটতি এখনও প্রকট। ২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী দেশে প্রতি এক হাজার মানুষের বিপরীতে চিকিৎসক প্রায় ০.৯২ জন এবং নার্স প্রায় ০.৬৩ জন। সরকারি খাতে কর্মরত চিকিৎসকের সংখ্যা আরও সীমিত হওয়ায় অনেক হাসপাতালেই একজন চিকিৎসককে বিপুল সংখ্যক রোগীর দায়িত্ব নিতে হয়। সংখ্যাগত ঘাটতির পাশাপাশি রয়েছে ভৌগোলিক বৈষম্য। রাজধানী ও বড় শহরে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের ঘনত্ব বেশি হলেও প্রত্যন্ত উপজেলা ও চরাঞ্চলে দক্ষ চিকিৎসকের উপস্থিতি এখনও অপর্যাপ্ত। ফলে সাধারণ মানুষ বাধ্য হয়ে জেলা কিংবা ঢাকার হাসপাতালে ছুটে আসেন।

রেফারেল ব্যবস্থা না থাকাই সবচেয়ে বড় সংকটগুলোর একটি : উন্নত স্বাস্থ্যব্যবস্থার অন্যতম ভিত্তি হলো কার্যকর রেফারেল ব্যবস্থা। অর্থাৎ রোগী প্রথমে প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা পারিবারিক চিকিৎসকের কাছে যাবেন; প্রয়োজন হলে উপজেলা, তারপর জেলা এবং শেষে বিশেষায়িত হাসপাতালে পাঠানো হবে। বাংলাদেশে এই ধাপভিত্তিক ব্যবস্থা কার্যকর না থাকায় অনেক রোগী সরাসরি মেডিকেল কলেজ বা জাতীয় বিশেষায়িত হাসপাতালে চলে আসেন। ফলে যেসব রোগী প্রকৃত অর্থে উচ্চতর চিকিৎসার প্রয়োজন, তারাও দীর্ঘ অপেক্ষা ও অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে বঞ্চিত হন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালী করা এবং কার্যকর রেফারেল পথ গড়ে তোলার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে।

আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা আমাদের কী শেখায় : যুক্তরাজ্যে অধিকাংশ রোগী প্রথমে পারিবারিক চিকিৎসক (General Practitioner)-এর কাছে যান। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার আগে সেই চিকিৎসকের রেফারেল প্রয়োজন হয়। একই ধরনের ব্যবস্থা থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, জাপান এবং ইউরোপের অনেক দেশেও কার্যকরভাবে চালু রয়েছে। ভারতের কেরালায় প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোকে শক্তিশালী করার ফলে জেলা ও মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওপর চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। রোগীর চিকিৎসার ধারাবাহিকতা, ইলেকট্রনিক স্বাস্থ্য রেকর্ড এবং ফলো-আপ ব্যবস্থাও সেখানে তুলনামূলকভাবে সুসংগঠিত।
বাংলাদেশেও যদি ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও জেলা হাসপাতালকে কার্যকরভাবে সক্ষম করা যায়, তবে রাজধানীকেন্দ্রিক চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।

স্বাস্থ্য অর্থনীতি বলছে বরাদ্দের পাশাপাশি সুশাসনও জরুরি : স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ; তবে কেবল অর্থ বাড়ালেই সমস্যার সমাধান হবে না। বরাদ্দের যথাযথ ব্যবহার, জনবল পরিকল্পনা, যন্ত্রপাতির রক্ষণাবেক্ষণ, ওষুধ সরবরাহ, ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসবে না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বাংলাদেশের জন্য যে সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা (Universal Health Coverage) রোডম্যাপ নিয়ে কাজ করছে, সেখানে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালী করা, স্বাস্থ্যকর্মী বৃদ্ধি, ওষুধ ও রোগনির্ণয় সুবিধা সম্প্রসারণ এবং জনগণের ব্যক্তিগত ব্যয় কমানোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশের সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা সূচক ১০০-এর মধ্যে ৫৪ এবং বিপুল জনগোষ্ঠী চিকিৎসা ব্যয়ের কারণে আর্থিক কষ্টে পড়ছে। স্বাস্থ্য অর্থনীতির দৃষ্টিতে, একটি কার্যকর স্বাস্থ্যব্যবস্থা শুধু মানুষের জীবনই রক্ষা করে না; এটি উৎপাদনশীলতা বাড়ায়, দারিদ্র্য কমায় এবং দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় অর্থনীতিকেও শক্তিশালী করে।

আস্থা ফিরিয়ে আনতে মানবিক চিকিৎসা সংস্কৃতি গড়তে হবে : চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতি যতই হোক, একজন রোগীর কাছে সবচেয়ে বড় ওষুধ এখনো চিকিৎসকের আন্তরিকতা, মনোযোগ এবং মানবিক আচরণ। একটি হাসিমুখ, কয়েক মিনিট মনোযোগ দিয়ে রোগীর কথা শোনা কিংবা সহজ ভাষায় রোগের অবস্থা ব্যাখ্যা করে দেওয়া—এসবের কোনো আর্থিক মূল্য নেই, কিন্তু চিকিৎসার সফলতার ক্ষেত্রে এর গুরুত্ব অপরিসীম। আজ বাংলাদেশে চিকিৎসক-রোগীর সম্পর্কে যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে, তা কমাতে উভয় পক্ষকেই এগিয়ে আসতে হবে। রোগীদেরও বুঝতে হবে যে অতিরিক্ত রোগীর চাপের মধ্যে চিকিৎসকদের কাজ করতে হয়। একই সঙ্গে চিকিৎসকদেরও মনে রাখতে হবে, একজন অসুস্থ মানুষের কাছে মানবিক ব্যবহার চিকিৎসারই অংশ।

ডিজিটাল স্বাস্থ্যব্যবস্থা এখন সময়ের অপরিহার্য দাবি :বিশ্বের অনেক দেশ স্বাস্থ্যসেবাকে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নিয়ে এসেছে। অনলাইন অ্যাপয়েন্টমেন্ট, ইলেকট্রনিক স্বাস্থ্য রেকর্ড, কেন্দ্রীয় রোগী ডাটাবেজ এবং ডিজিটাল রেফারেল ব্যবস্থা রোগীর সময়, অর্থ ও ভোগান্তি উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়েছে। বাংলাদেশেও ধাপে ধাপে একটি সমন্বিত জাতীয় ডিজিটাল স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। একজন রোগীর পরীক্ষার রিপোর্ট, পূর্ববর্তী প্রেসক্রিপশন এবং চিকিৎসার ইতিহাস যদি দেশের যেকোনো সরকারি হাসপাতালে তাৎক্ষণিকভাবে দেখা যায়, তাহলে একই পরীক্ষা বারবার করার প্রয়োজন কমবে এবং রোগ নির্ণয়ও হবে আরও দ্রুত ও নির্ভুল।

হাসপাতাল ব্যবস্থাপনায় আমূল সংস্কার ছাড়া বিকল্প নেই :
আজ দেশের অধিকাংশ সরকারি হাসপাতালের প্রধান সমস্যা শুধু চিকিৎসক সংকট নয়; ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বহির্বিভাগে রোগীর দীর্ঘ লাইন, পরীক্ষার জন্য সীমিত সক্ষমতা, যন্ত্রপাতি রক্ষণাবেক্ষণের দুর্বলতা, শয্যা সংকট, দালালচক্রের দৌরাত্ম্য এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা না থাকা—সব মিলিয়ে একটি জটিল বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বড় মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলোতে আধুনিক আউটডোর কমপ্লেক্স, পর্যাপ্ত মেডিকেল অফিসার, আলাদা ট্রায়াজ ব্যবস্থা, দ্রুত ল্যাব সুবিধা এবং তিন শিফটে বহির্বিভাগ পরিচালনার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত। একই সঙ্গে প্রতিটি হাসপাতালে স্বাধীন রোগী সহায়তা ও অভিযোগ নিষ্পত্তি সেল গঠন করলে সেবার মান ও জবাবদিহি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।

শিক্ষাবিদদের দৃষ্টিতে স্বাস্থ্যখাতে মানবসম্পদই সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ : বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও গবেষক অধ্যাপক ড. মোঃ মোর্শেদ হাসান খান দীর্ঘদিন ধরে মানবসম্পদ উন্নয়নকে রাষ্ট্রের টেকসই অগ্রগতির মূল ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, শিক্ষা, গবেষণা এবং দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নে বিনিয়োগ ছাড়া কোনো রাষ্ট্র দীর্ঘমেয়াদে উন্নত হতে পারে না। এই দর্শন স্বাস্থ্যখাতেও সমানভাবে প্রযোজ্য। স্বাস্থ্যসেবা কেবল হাসপাতাল নির্মাণ বা আধুনিক যন্ত্রপাতি কেনার বিষয় নয়; এটি দক্ষ চিকিৎসক, প্রশিক্ষিত নার্স, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট, স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপক এবং গবেষকদের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা একটি সমন্বিত ব্যবস্থা। তাই চিকিৎসা শিক্ষার মানোন্নয়ন, নিয়মিত পেশাগত প্রশিক্ষণ, গবেষণা সহায়তা, নৈতিকতা শিক্ষা এবং জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনাকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

পরিশেষে, বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাত আজ এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে আংশিক সংস্কার দিয়ে আর পরিস্থিতির পরিবর্তন সম্ভব নয়। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি, প্রাতিষ্ঠানিক এবং তথ্যভিত্তিক সংস্কার। সরকার ইতোমধ্যে নতুন চিকিৎসক নিয়োগসহ স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে। তবে এর পাশাপাশি কার্যকর রেফারেল ব্যবস্থা চালু, উপজেলা ও জেলা হাসপাতাল শক্তিশালী করা, চিকিৎসক-নার্স-টেকনোলজিস্টের শূন্যপদ পূরণ, হাসপাতাল ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহি নিশ্চিত করা, ডিজিটাল স্বাস্থ্যব্যবস্থা চালু, চিকিৎসকদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা এবং রোগীদের আর্থিক সুরক্ষা বাড়ানোর মতো পদক্ষেপ সমানভাবে জরুরি। প্রধানমন্ত্রী দেশনায়ক তারেক রহমান এবং সরকারের সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকদের প্রতি নাগরিক সমাজের প্রত্যাশা—স্বাস্থ্যখাতকে কেবল একটি প্রশাসনিক খাত হিসেবে নয়, বরং জাতীয় উন্নয়নের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করে একটি দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা। কারণ একটি সুস্থ জনগোষ্ঠী ছাড়া কোনো দেশের অর্থনীতি, শিক্ষা, শিল্প কিংবা প্রযুক্তিগত অগ্রগতি টেকসই হতে পারে না। বাংলাদেশের মানুষ আধুনিক হাসপাতাল যেমন চায়, তেমনি চায় মানবিক চিকিৎসক, দক্ষ ব্যবস্থাপনা, সাশ্রয়ী চিকিৎসা ব্যয় এবং সর্বোপরি একটি বিশ্বাসযোগ্য স্বাস্থ্যব্যবস্থা। আজ সেই আস্থা ফিরিয়ে আনার সময়। রাষ্ট্র, চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী এবং নাগরিক সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায়ই কেবল একটি ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও মানসম্মত স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব।

লেখক : জুবাইয়া বিন্তে কবির
সাংবাদিক, গবেষক ও কলামিস্ট