ঢাকা ০৫:২৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ০৮ অগাস্ট ২০২৬

সরকারি সেবা অচল, বেসরকারি ভাড়ার দাপট পাঁচটি অ্যাম্বুলেন্সের একটিও চলছে না

  • ডেস্ক রিপোর্ট
  • প্রকাশিত : ০৪:০৯:৪৯ অপরাহ্ন, শনিবার, ৮ অগাস্ট ২০২৬
  • ৪ বার দেখা হয়েছে

পটুয়াখালী প্রতিনিধি: অসুস্থ স্বজনকে দ্রুত বরিশালের শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিতে হবে। সময়ের সঙ্গে তখন জীবন-মৃত্যুর লড়াই। কিন্তু পটুয়াখালী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে আব্দুল জব্বার জানতে পারেন, সরকারি কোনো অ্যাম্বুলেন্সই চলছে না। শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করতে হয়। মাত্র ৪০ কিলোমিটারের পথ পাড়ি দিতে গুনতে হয়েছে সাড়ে তিন হাজার টাকা।
জব্বারের কণ্ঠে ক্ষোভ, “চলতি বছরের জানুয়ারিতে সরকারি অ্যাম্বুলেন্সে একই পথে রোগী নিতে দুই হাজার টাকাই লেগেছিল। কিন্তু ৩১ জুলাই একই পথে দেড় হাজার টাকা বেশি গুনতে হয়েছে। সরকারি গাড়ি বন্ধ থাকায় আমাদের মতো সাধারণ মানুষ অসহায় হয়ে পড়েছে।”
জব্বারের এই অভিজ্ঞতা এখন ব্যতিক্রম নয়; বরং পটুয়াখালী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রতিদিনের বাস্তবতা।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, হাসপাতালের জন্য বরাদ্দ পাঁচটি সরকারি অ্যাম্বুলেন্সের মধ্যে তিনটি প্রায় তিন বছর ধরে বিকল অবস্থায় পড়ে আছে। বাকি দুটি সচল থাকলেও চালক না থাকায় সেগুলোও দীর্ঘদিন ধরে গ্যারেজেই দাঁড়িয়ে। ফলে জেলার সবচেয়ে বড় সরকারি হাসপাতালটি এখন কার্যত সরকারি অ্যাম্বুলেন্স সেবাশূন্য।
এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে রোগী ও তাদের স্বজনদের ওপর। সরকারি সেবা বন্ধ থাকায় রোগী পরিবহনের পুরো দায়িত্ব চলে গেছে বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্সের হাতে। অভিযোগ উঠেছে, এই সুযোগে ভাড়াও বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে।
রোগীর স্বজন ও হাসপাতাল সূত্র জানায়, পটুয়াখালী থেকে বরিশালের শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যেতে এখন বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্সে তিন হাজার থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকা পর্যন্ত ভাড়া নেওয়া হচ্ছে। অথচ সরকারি অ্যাম্বুলেন্সে একই পথে খরচ ছিল প্রায় দুই হাজার টাকা।
শুধু বরিশাল নয়, ঢাকাগামী রোগীদের ক্ষেত্রেও একই চিত্র। আগে সরকারি অ্যাম্বুলেন্সে ঢাকায় রোগী নিতে প্রায় ১০ হাজার টাকা লাগলেও এখন বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্সে গুনতে হচ্ছে ১৪ থেকে ১৫ হাজার টাকা।

সম্প্রতি সদর উপজেলার আউলিয়াপুর গ্রামের অলিউল্লাহকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিতে তার পরিবারকে ১৫ হাজার টাকা ভাড়া দিতে হয়েছে।
রোগীর স্বজন আব্দুল মালেক বলেন, “সরকারি অ্যাম্বুলেন্স থাকলে অনেক কম খরচে রোগী ঢাকায় নিতে পারতাম। এখন বাধ্য হয়ে বেশি টাকা দিতে হচ্ছে। আমাদের মতো নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য এটি বড় বোঝা।”

সদ্য অবসরপ্রাপ্ত সরকারি অ্যাম্বুলেন্স চালক আব্দুস সালাম বলেন, সরকারি ব্যবস্থায় নির্ধারিত ভাড়ায় রোগী পরিবহন করা হতো। এখন সেই সুযোগ না থাকায় রোগীর পরিবারকে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে।
অন্যদিকে বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স চালক সজল কুমার বলেন, “সরকারি চালকেরা নিয়মিত বেতন-ভাতা পান। আমাদের গাড়ির জ্বালানি, রক্ষণাবেক্ষণ ও অন্যান্য সব খরচ নিজেরাই বহন করি। তাই ভাড়া কিছুটা বেশি হয়।”
তবে স্থানীয়দের অভিযোগ শুধু বাড়তি ভাড়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাদের দাবি, সরকারি অ্যাম্বুলেন্স সেবা বন্ধ হয়ে যাওয়ার সুযোগে বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স চালকদের একটি সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। ফলে কোনো চালক চাইলে কম ভাড়ায় রোগী পরিবহন করতে পারেন না।
স্বাস্থ্যসেবা বিশ্লেষকদের মতে, সরকারি হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্স কেবল একটি যানবাহন নয়; এটি জরুরি চিকিৎসাসেবার অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই সেবা দীর্ঘদিন অচল থাকলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত রোগীরা, যাদের জন্য প্রতিটি অতিরিক্ত টাকাই বড় চাপ।
এখন প্রশ্ন উঠেছে, প্রায় তিন বছর ধরে বিকল পড়ে থাকা তিনটি অ্যাম্বুলেন্স কবে মেরামত হবে? আর চালক সংকট কবে দূর হবে? ততদিন পর্যন্ত কি পটুয়াখালীর রোগীদের জরুরি চিকিৎসার পথ আরও ব্যয়বহুল ও অনিশ্চিতই থেকে যাবে?
হাসপাতাল সূত্র জানায়, হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্স চালক আ, রাজ্জাক ২০২১ সালের ১ জানুয়ারি অবসরে চলে যান। এর পর আব্দুস ছালাম নামে অপর চালক অ্যামউলেন্স সেবা দিয়ে আসছিল। তিনিও চলতি বছর ৩০ জুন অবসরে গেছেন। চালক না থাকায় অ্যামউলেন্স সেবা বন্ধ হয়ে পড়ে। অচল অ্যাম্বুলেন্স সচল করা ও চালক না থাকার বিষয়টি ু পদায়নের জন্য একাধিকবার উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বরাবরে চিঠি পাঠানো হয়েছে। সর্বশেষ ১১ জুলাই স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ও বরিশাল বিভাগের স্বাস্থ্য পরিচালক বরাবরে চিঠি পাঠানো হয়েছে।
পটুয়াখালী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক (সুপার) ডা. দিলরুবা ইয়াসমিন লিজা বলেন, সচল দুটি অ্যাম্বুলেন্সে দীর্ঘদিন একজন মাত্র চালক দায়িত্ব পালন করছিলেন। গত ৩০ জুন চালক আব্দুস সালাম অবসরে যাওয়ার পর থেকেই সরকারি অ্যাম্বুলেন্স সেবা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।
তিনি বলেন, “বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। দ্রুত চালক নিয়োগ এবং বিকল অ্যাম্বুলেন্সগুলো মেরামতের জন্য অনুরোধ করা হয়েছে।”

জনপ্রিয় সংবাদ

বক্স অফিসে ইতিহাস গড়ল ‘স্পাইডার-ম্যান’

সরকারি সেবা অচল, বেসরকারি ভাড়ার দাপট পাঁচটি অ্যাম্বুলেন্সের একটিও চলছে না

প্রকাশিত : ০৪:০৯:৪৯ অপরাহ্ন, শনিবার, ৮ অগাস্ট ২০২৬

পটুয়াখালী প্রতিনিধি: অসুস্থ স্বজনকে দ্রুত বরিশালের শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিতে হবে। সময়ের সঙ্গে তখন জীবন-মৃত্যুর লড়াই। কিন্তু পটুয়াখালী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে আব্দুল জব্বার জানতে পারেন, সরকারি কোনো অ্যাম্বুলেন্সই চলছে না। শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করতে হয়। মাত্র ৪০ কিলোমিটারের পথ পাড়ি দিতে গুনতে হয়েছে সাড়ে তিন হাজার টাকা।
জব্বারের কণ্ঠে ক্ষোভ, “চলতি বছরের জানুয়ারিতে সরকারি অ্যাম্বুলেন্সে একই পথে রোগী নিতে দুই হাজার টাকাই লেগেছিল। কিন্তু ৩১ জুলাই একই পথে দেড় হাজার টাকা বেশি গুনতে হয়েছে। সরকারি গাড়ি বন্ধ থাকায় আমাদের মতো সাধারণ মানুষ অসহায় হয়ে পড়েছে।”
জব্বারের এই অভিজ্ঞতা এখন ব্যতিক্রম নয়; বরং পটুয়াখালী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রতিদিনের বাস্তবতা।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, হাসপাতালের জন্য বরাদ্দ পাঁচটি সরকারি অ্যাম্বুলেন্সের মধ্যে তিনটি প্রায় তিন বছর ধরে বিকল অবস্থায় পড়ে আছে। বাকি দুটি সচল থাকলেও চালক না থাকায় সেগুলোও দীর্ঘদিন ধরে গ্যারেজেই দাঁড়িয়ে। ফলে জেলার সবচেয়ে বড় সরকারি হাসপাতালটি এখন কার্যত সরকারি অ্যাম্বুলেন্স সেবাশূন্য।
এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে রোগী ও তাদের স্বজনদের ওপর। সরকারি সেবা বন্ধ থাকায় রোগী পরিবহনের পুরো দায়িত্ব চলে গেছে বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্সের হাতে। অভিযোগ উঠেছে, এই সুযোগে ভাড়াও বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে।
রোগীর স্বজন ও হাসপাতাল সূত্র জানায়, পটুয়াখালী থেকে বরিশালের শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যেতে এখন বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্সে তিন হাজার থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকা পর্যন্ত ভাড়া নেওয়া হচ্ছে। অথচ সরকারি অ্যাম্বুলেন্সে একই পথে খরচ ছিল প্রায় দুই হাজার টাকা।
শুধু বরিশাল নয়, ঢাকাগামী রোগীদের ক্ষেত্রেও একই চিত্র। আগে সরকারি অ্যাম্বুলেন্সে ঢাকায় রোগী নিতে প্রায় ১০ হাজার টাকা লাগলেও এখন বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্সে গুনতে হচ্ছে ১৪ থেকে ১৫ হাজার টাকা।

সম্প্রতি সদর উপজেলার আউলিয়াপুর গ্রামের অলিউল্লাহকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিতে তার পরিবারকে ১৫ হাজার টাকা ভাড়া দিতে হয়েছে।
রোগীর স্বজন আব্দুল মালেক বলেন, “সরকারি অ্যাম্বুলেন্স থাকলে অনেক কম খরচে রোগী ঢাকায় নিতে পারতাম। এখন বাধ্য হয়ে বেশি টাকা দিতে হচ্ছে। আমাদের মতো নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য এটি বড় বোঝা।”

সদ্য অবসরপ্রাপ্ত সরকারি অ্যাম্বুলেন্স চালক আব্দুস সালাম বলেন, সরকারি ব্যবস্থায় নির্ধারিত ভাড়ায় রোগী পরিবহন করা হতো। এখন সেই সুযোগ না থাকায় রোগীর পরিবারকে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে।
অন্যদিকে বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স চালক সজল কুমার বলেন, “সরকারি চালকেরা নিয়মিত বেতন-ভাতা পান। আমাদের গাড়ির জ্বালানি, রক্ষণাবেক্ষণ ও অন্যান্য সব খরচ নিজেরাই বহন করি। তাই ভাড়া কিছুটা বেশি হয়।”
তবে স্থানীয়দের অভিযোগ শুধু বাড়তি ভাড়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাদের দাবি, সরকারি অ্যাম্বুলেন্স সেবা বন্ধ হয়ে যাওয়ার সুযোগে বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স চালকদের একটি সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। ফলে কোনো চালক চাইলে কম ভাড়ায় রোগী পরিবহন করতে পারেন না।
স্বাস্থ্যসেবা বিশ্লেষকদের মতে, সরকারি হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্স কেবল একটি যানবাহন নয়; এটি জরুরি চিকিৎসাসেবার অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই সেবা দীর্ঘদিন অচল থাকলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত রোগীরা, যাদের জন্য প্রতিটি অতিরিক্ত টাকাই বড় চাপ।
এখন প্রশ্ন উঠেছে, প্রায় তিন বছর ধরে বিকল পড়ে থাকা তিনটি অ্যাম্বুলেন্স কবে মেরামত হবে? আর চালক সংকট কবে দূর হবে? ততদিন পর্যন্ত কি পটুয়াখালীর রোগীদের জরুরি চিকিৎসার পথ আরও ব্যয়বহুল ও অনিশ্চিতই থেকে যাবে?
হাসপাতাল সূত্র জানায়, হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্স চালক আ, রাজ্জাক ২০২১ সালের ১ জানুয়ারি অবসরে চলে যান। এর পর আব্দুস ছালাম নামে অপর চালক অ্যামউলেন্স সেবা দিয়ে আসছিল। তিনিও চলতি বছর ৩০ জুন অবসরে গেছেন। চালক না থাকায় অ্যামউলেন্স সেবা বন্ধ হয়ে পড়ে। অচল অ্যাম্বুলেন্স সচল করা ও চালক না থাকার বিষয়টি ু পদায়নের জন্য একাধিকবার উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বরাবরে চিঠি পাঠানো হয়েছে। সর্বশেষ ১১ জুলাই স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ও বরিশাল বিভাগের স্বাস্থ্য পরিচালক বরাবরে চিঠি পাঠানো হয়েছে।
পটুয়াখালী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক (সুপার) ডা. দিলরুবা ইয়াসমিন লিজা বলেন, সচল দুটি অ্যাম্বুলেন্সে দীর্ঘদিন একজন মাত্র চালক দায়িত্ব পালন করছিলেন। গত ৩০ জুন চালক আব্দুস সালাম অবসরে যাওয়ার পর থেকেই সরকারি অ্যাম্বুলেন্স সেবা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।
তিনি বলেন, “বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। দ্রুত চালক নিয়োগ এবং বিকল অ্যাম্বুলেন্সগুলো মেরামতের জন্য অনুরোধ করা হয়েছে।”