ঢাকা ১১:৫৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৬ অগাস্ট ২০২৬

ছয় মাসে স্বপ্নের পথে বাংলাদেশ: দেশনায়ক তারেক রহমানের সরকারের নতুন অভিযাত্রা

  • ডেস্ক রিপোর্ট
  • প্রকাশিত : ১০:৪৮:৫৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৬ অগাস্ট ২০২৬
  • ৩ বার দেখা হয়েছে

জুবাইয়া বিন্তে কবির: বাংলাদেশের রাজনৈতিক আকাশে যখন দীর্ঘ অন্ধকারের ছায়া ঘনীভূত হয়েছিল, তখন জনগণের হৃদয়ে জেগে উঠেছিল এক নতুন প্রভাতের আকাঙ্ক্ষা। সেই আকাঙ্ক্ষারই মূর্ত প্রতীক হয়ে এসেছেন জননন্দিত প্রধানমন্ত্রী, দেশনায়ক তারেক রহমান। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপির ঐতিহাসিক বিজয় এবং ১৭ ফেব্রুয়ারি তাঁর নেতৃত্বে সরকার গঠনের পর আজ ১৭ আগস্ট—মাত্র ছয় মাস। কিন্তু এই ছয় মাস শুধু ক্যালেন্ডারের পাতা নয়; এটি এক নতুন রাষ্ট্রচিন্তার জন্মলগ্ন, এক নতুন সংস্কৃতির সূচনা এবং এক নতুন সম্ভাবনার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের কাল। আমি বিএনপির পরিবারের সন্তান। শহীদ রাস্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের জাতীয়তাবাদী স্বপ্ন, আপোষহীন নেত্রী দেশমাতা বেগম খালেদা জিয়ার গণতান্ত্রিক সংগ্রামের রক্তাক্ত ইতিহাস এবং দেশনায়ক তারেক রহমানের অদম্য নেতৃত্ব এসব আমার রক্তে মিশে আছে। তাই যখন দেখি, ক্ষমতার কেন্দ্রে ব্যক্তিপূজার পরিবর্তে রাষ্ট্রের মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে, যখন দেখি ফ্যামিলি কার্ডে পরিবারের সম্মান, কৃষক কার্ডে কৃষকের স্বপ্ন, এবং অর্থনীতিতে পুনরুদ্ধারের নতুন দিগন্ত খুলে যাচ্ছে তখন আমার হৃদয় গর্বে ভরে ওঠে। এই ছয় মাস ব্যর্থতার নয়, বরং এক মহান যাত্রার প্রথম পদক্ষেপ। দেশনায়ক তারেক রহমান যেন এক নতুন সূর্য; তাঁর আলোয় বাংলাদেশের আকাশ আজ নতুন রঙে রঞ্জিত। এই প্রতিবেদনে সেই আলোর গল্পই বলা হবে প্রতিশ্রুতি থেকে রাষ্ট্র পরিচালনার নতুন অভিযাত্রার গল্প।

ক্ষমতার কেন্দ্রে ব্যক্তি নয়, রাষ্ট্র : দেশনায়ক তারেক রহমান সরকারের অন্যতম তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা হচ্ছে—রাষ্ট্র কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। সরকারি প্রতিষ্ঠান, দপ্তর, আদালত ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ব্যক্তিপূজার সংস্কৃতি কমানো, সরকারি ব্যয়ে সংযম এবং প্রশাসনে প্রাতিষ্ঠানিকতার ওপর জোর দেওয়ার উদ্যোগ এই দর্শনেরই প্রতিফলন। প্রধানমন্ত্রী নিজেও সরকারি ব্যয় কমানো, কনভয়ের আকার সীমিত করা এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদের মিতব্যয়ী ব্যবহারের যে দৃষ্টান্ত স্থাপনের চেষ্টা করছেন, তা প্রতীকী হলেও গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ রাষ্ট্রের অর্থ জনগণের অর্থ। একটি গাড়ি, একটি সফর, একটি প্রকল্প বা একটি সরকারি আপ্যায়নের পেছনে যে অর্থ ব্যয় হয়, সেটি কোনো শাসকের ব্যক্তিগত সম্পদ নয়—এটি কৃষক, শ্রমিক, শিক্ষক, ব্যবসায়ী ও প্রবাসীর ঘামে অর্জিত জাতীয় সম্পদ। তাই ক্ষমতার জৌলুস কমিয়ে রাষ্ট্রীয় সম্পদের প্রতি দায়িত্বশীলতা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে।

‘ব্যক্তি নয়, পরিবার’ ফ্যামিলি কার্ডের দর্শন : ছয় মাসে সরকারের সবচেয়ে আলোচিত জনকল্যাণমূলক উদ্যোগগুলোর একটি নিঃসন্দেহে ফ্যামিলি কার্ড। এর মূল দর্শন—‘ব্যক্তি নয়, পরিবারই উন্নয়নের মূল একক’। সরকারি ফ্যামিলি কার্ড প্ল্যাটফর্মেও এই দর্শনকে কর্মসূচিটির ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এটি কেবল একটি কার্ড নয়; সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে এটি বাংলাদেশের সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থাকে খণ্ডিত ভাতা থেকে সমন্বিত পরিবারভিত্তিক ব্যবস্থায় রূপান্তরের একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হতে পারে। নারীকে পরিবারের আর্থিক সহায়তার কেন্দ্রীয় বাহক করা হলে নারীর ক্ষমতায়নও বাড়বে। বিএনপির নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির বাস্তব রূপ হিসেবে তাই ফ্যামিলি কার্ডের রাজনৈতিক ও সামাজিক গুরুত্ব দুটোই রয়েছে।
তবে এর সাফল্য নির্ভর করবে প্রকৃত দরিদ্র পরিবার নির্বাচন, স্বচ্ছ ডেটাবেস, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত সুবিধাভোগী তালিকা এবং দুর্নীতিমুক্ত অর্থ বিতরণের ওপর। ভালো উদ্যোগকে ভালো ব্যবস্থাপনায় রূপ দিতে পারলেই এটি ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের কল্যাণরাষ্ট্রের অন্যতম ভিত্তি হতে পারে।

কৃষকের হাতে কার্ড, কৃষির হাতে নতুন সম্ভাবনা : বাংলাদেশের অর্থনীতির শিকড় এখনো কৃষিতে। অথচ কৃষক বহু বছর ধরে সার, বীজ, সেচ, ঋণ, বাজার ও ন্যায্যমূল্যের নানা সমস্যার মধ্যে টিকে আছেন। এই বাস্তবতায় কৃষক কার্ড একটি সময়োপযোগী উদ্যোগ। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রি-পাইলটে ১০ জেলার ১১টি উপজেলায় ২২ হাজার ৬৫ জন কৃষককে কার্ড দেওয়ার কথা বাজেট নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে। কার্ডের মাধ্যমে নগদ সহায়তার পাশাপাশি ১০ ধরনের সেবা দেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে।
ক্ষুদ্র কৃষকের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ সুদসহ মওকুফের উদ্যোগও সরকারের জনমুখী নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। কৃষক যদি ঋণের বোঝা থেকে কিছুটা মুক্তি পান, উৎপাদনে নতুন করে বিনিয়োগের সুযোগ পান এবং একই পরিচয়ের মাধ্যমে সার-বীজ-ঋণ-বীমা-বাজারতথ্য পেতে পারেন, তাহলে কৃষি অর্থনীতিতে এর বহুগুণ প্রভাব পড়তে পারে।

অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করার প্রথম পরীক্ষা : তারেক রহমান সরকারের প্রথম বাজেট ২০২৬-২৭ অর্থবছরের ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট—শুধু আকারের দিক থেকে বড় নয়; এটি সরকারের অর্থনৈতিক দর্শনেরও একটি ঘোষণাপত্র। বাজেটে প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৫ শতাংশ এবং মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থনীতিকে ‘রিকভারি অ্যান্ড স্ট্যাবিলাইজেশন’, ‘রেস্টোরেশন’ এবং ‘রিকনস্ট্রাকশন ফর অ্যাকসেলারেশন’ এই তিন ধাপের কৌশলে এগিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ সরকারের সামনে শুধু সংকট সামাল দেওয়ার লক্ষ্য নেই; বরং অর্থনীতিকে পুনর্গঠন করে দ্রুততর প্রবৃদ্ধির পথে নেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে।
তবে অর্থনীতির চূড়ান্ত বিচার বাজেটের আকারে নয়, মানুষের জীবনে। বাজারের ব্যাগ, চাকরির সুযোগ, ব্যবসার পরিবেশ, ব্যাংকঋণ ও পরিবারের আয়—এসব জায়গায় স্বস্তি ফিরলেই মানুষ সরকারের অর্থনৈতিক সাফল্যকে সত্যিকার অর্থে স্বীকৃতি দেবে।

মূল্যস্ফীতি স্বস্তির সবচেয়ে বড় দরজা : বর্তমান সরকারের সামনে সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষাগুলোর একটি দ্রব্যমূল্য। মূল্যস্ফীতি কমার অর্থ বাজারে দাম কমে যাওয়া নয়; বরং দাম বৃদ্ধির গতি কমে আসা। ফলে দীর্ঘ সময়ের মূল্যস্ফীতির ক্ষত সাধারণ মানুষের জীবন থেকে মুছে যেতে সময় লাগবে।
সরকারের উচিত খাদ্য সরবরাহ, আমদানি, পরিবহন, মজুত ও বাজার ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি বাড়ানো। কৃষক যেন উৎপাদনের ন্যায্যমূল্য পান এবং ভোক্তাও যেন অস্বাভাবিক দামে পণ্য কিনতে বাধ্য না হন এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করতে হবে। এই জায়গায় তারেক রহমান সরকারের সবচেয়ে বড় সাফল্য হবে যদি আগামী ছয় মাসে মানুষ অনুভব করে বাজারের অস্থিরতা কিছুটা কমেছে, সংসারের হিসাব কিছুটা সহজ হয়েছে।

এক কোটি কর্মসংস্থানের স্বপ্ন : একটি তরুণ দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার মানুষ। কিন্তু সেই তরুণের হাতে কাজ না থাকলে জনসংখ্যা সম্পদ থেকে বোঝায় পরিণত হতে পারে। তাই ২০২৬-৩১ মেয়াদে প্রায় এক কোটি কর্মসংস্থানের লক্ষ্য সরকারের অর্থনৈতিক কর্মসূচির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক।
শিল্পায়ন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ, লজিস্টিকস, রপ্তানিমুখী উৎপাদন, স্টার্টআপ ও গ্রামীণ অর্থনীতিকে কর্মসংস্থানের চালিকাশক্তি করার পরিকল্পনা যথার্থ। তবে লক্ষ্যকে বাস্তবে পরিণত করতে হলে শুধু সরকারি চাকরি নয়—বেসরকারি বিনিয়োগের দরজা খুলতে হবে। একজন তরুণের হাতে চাকরি মানে শুধু একটি আয় নয়; একটি পরিবারের আত্মমর্যাদা, একটি ভবিষ্যতের নিরাপত্তা এবং একটি রাষ্ট্রের উৎপাদনশীল শক্তি।

বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজন আস্থা : ব্যবসা শুরু করতে সময় কমিয়ে ১৪ দিনে নামানোর উদ্যোগ, অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজ করা এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও কৃষকদের অর্থায়নের জন্য পুনঃঅর্থায়ন কর্মসূচি চালু করা বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির ইতিবাচক প্রচেষ্টা। ২০২৬-২৭ বাজেটেও বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানকে অন্যতম অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
কিন্তু বিনিয়োগকারীর আস্থা শুধু কাগজে তৈরি হয় না। নির্ভরযোগ্য গ্যাস-বিদ্যুৎ, পূর্বানুমানযোগ্য করনীতি, সহজ ঋণ, দ্রুত অনুমোদন এবং আইনের সমান প্রয়োগ—এসবের সমন্বয়েই আস্থা তৈরি হয়। দেশনায়ক তারেক রহমান সরকারের সামনে তাই একটি ঐতিহাসিক সুযোগ বাংলাদেশকে এমন একটি দেশে পরিণত করা, যেখানে একজন উদ্যোক্তা রাজনীতির পরিচয় নয়, তার ব্যবসায়িক সক্ষমতা দিয়ে রাষ্ট্রের সহযোগিতা পাবেন।

ব্যাংক খাতের ক্ষত সারানোর কঠিন দায়িত্ব : বাংলাদেশের ব্যাংক খাত বহু বছরের অনিয়ম, দুর্বল তদারকি ও খেলাপি ঋণের বোঝা বহন করছে। নতুন সরকারের জন্য এটি এমন একটি ক্ষেত্র, যেখানে রাজনৈতিক সদিচ্ছার সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা হবে। ব্যাংক পুনর্গঠন প্রয়োজন হলে তা করতে হবে; কিন্তু জনগণের অর্থ দিয়ে পুরোনো দুর্নীতির দায় মেটানো যাবে না। প্রকৃত সম্পদের মূল্যায়ন, দায়ী ব্যক্তিদের জবাবদিহি, খেলাপি ঋণ আদায় এবং পরিচালনা পর্ষদে পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করা জরুরি। দেশনায়ক তারেক রহমান সরকার যদি ব্যাংক খাতকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত, জবাবদিহিমূলক ও উৎপাদনমুখী করতে পারে, তবে সেটিই হবে আগামী দিনের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের অন্যতম বড় অর্জন।

খাদ্য নিরাপত্তায় দৃশ্যমান প্রস্তুতি : খাদ্য মজুতের ক্ষেত্রেও সরকারের প্রথম ছয় মাসে একটি ইতিবাচক প্রস্তুতি দেখা গেছে। সরকারের হিসাব অনুযায়ী, ২৮ জুন পর্যন্ত সরকারি গুদামে ২২ লাখ ১০ হাজার ৯৪৫ মেট্রিক টন খাদ্যশস্য মজুত ছিল। একই সময়ে বোরো সংগ্রহ অভিযানে ধান ও চাল সংগ্রহের তথ্যও দেওয়া হয়েছে। খাদ্য মজুত কেবল দুর্ভিক্ষের আশঙ্কা মোকাবিলার বিষয় নয়; এটি বাজার স্থিতিশীল রাখার একটি অর্থনৈতিক অস্ত্র। আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্য ও জ্বালানির মূল্য অস্থির হলে শক্তিশালী মজুত সরকারকে সাধারণ মানুষের ওপর তাৎক্ষণিক চাপ কমানোর সুযোগ দেয়।

সবুজ বাংলাদেশ নির্মাণের অঙ্গীকার : চারা রোপণ ও খাল খননের কর্মসূচিকে নিছক পরিবেশগত উদ্যোগ হিসেবে দেখলে ভুল হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা বাংলাদেশের জন্য এটি খাদ্যনিরাপত্তা, জলাবদ্ধতা, ভূগর্ভস্থ পানি, জীববৈচিত্র্য ও গ্রামীণ অর্থনীতির সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত। সরকার ২০২৬ সালে প্রায় ৫ কোটি ১৫ লাখ চারা রোপণের লক্ষ্য নিয়েছে এবং প্রথম ছয় মাসে ২ কোটির বেশি চারা রোপণের কথা জানিয়েছে। আগামী পাঁচ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন ও পুনঃখননের পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে। এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—চারা লাগানোর পর তা বেঁচে থাকছে কি না এবং খননের পর খালগুলো সত্যিই প্রবাহমান থাকছে কি না। সংখ্যার চেয়ে স্থায়িত্বই হবে সাফল্যের প্রকৃত মাপকাঠি।

আইনশৃঙ্খলায় রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব : রাষ্ট্রের প্রথম দায়িত্ব নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। তাই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নত করার উদ্যোগ সরকারের রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দ্রুত বিচার, অপরাধী গ্রেপ্তার এবং জঙ্গল সলিমপুরে যৌথ বাহিনীর অভিযানের মতো ঘটনাকে সরকার রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠার উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেছে। তবে রাষ্ট্রের শক্তি শুধু অভিযানে নয় আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগে। চাঁদাবাজ, মাদক ব্যবসায়ী, সন্ত্রাসী কিংবা অপরাধী যে দলেরই হোক, তার বিরুদ্ধে একই আইন প্রয়োগ করতে পারলেই জনগণের আস্থা স্থায়ী হবে। অপরাধীর রাজনৈতিক পরিচয় নয়, অপরাধই যেন তার পরিচয় হয় এটাই হতে হবে রাষ্ট্রের নীতি।

পুলিশে মেধা ও পেশাদারিত্ব : আইনশৃঙ্খলা উন্নয়নের সঙ্গে পুলিশ সংস্কার অবিচ্ছেদ্য। যোগ্য কর্মকর্তা যোগ্য জায়গায় থাকবেন, পদায়ন হবে দক্ষতা ও পেশাদারিত্বের ভিত্তিতে এই সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করতে পারলে পুলিশের প্রতি জনগণের আস্থা বাড়বে। কোনো সরকারি পদ যেন ব্যক্তিগত বিনিয়োগে পরিণত না হয় এটিও নিশ্চিত করা জরুরি। কারণ রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব যদি অর্থনৈতিক সুবিধা অর্জনের মাধ্যম হয়ে যায়, তবে শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হন সাধারণ নাগরিক। দেশনায়ক তারেক রহমান সরকারের সামনে তাই সুযোগ রয়েছে—বাংলাদেশের পুলিশকে রাজনৈতিক আনুগত্যের কাঠামো থেকে পেশাদার নাগরিক সেবার প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার।

পররাষ্ট্রনীতিতে ভারসাম্যের নতুন অধ্যায় : ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়’ বাংলাদেশের জন্য এই নীতি কেবল কূটনৈতিক বাক্য নয়; এটি ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার প্রয়োজন। ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, জাপান, মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের জন্য অপরিহার্য। তারেক রহমানের চীন সফর এই ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য। সরকারি তথ্য অনুযায়ী সফরে মোট ১৭টি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। কূটনীতির সৌন্দর্য সফরের ছবিতে নয়; বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, জ্বালানি, অবকাঠামো, শ্রমবাজার ও জাতীয় নিরাপত্তায় তার বাস্তব সুফলে। সেই বিচারে চীন সফরকে একটি সম্ভাবনাময় সূচনা বলা যায়।

ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক বন্ধুত্ব, কিন্তু জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে :
ভারত বাংলাদেশের প্রতিবেশী, গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য অংশীদার এবং আঞ্চলিক বাস্তবতার অপরিহার্য অংশ। তাই ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে আবেগ নয়, জাতীয় স্বার্থই হওয়া উচিত মূল ভিত্তি। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে আলোচনা চলছে; আগস্টের ২০-২৫ তারিখকে সম্ভাব্য সময় হিসেবে সংবাদ প্রকাশিত হলেও চূড়ান্ত তারিখ নিশ্চিত হয়নি। বাংলাদেশের পানি, সীমান্ত, বাণিজ্য, নিরাপত্তা, বিদ্যুৎ, যোগাযোগ ও শ্রমবাজার—প্রতিটি ক্ষেত্রে পারস্পরিক মর্যাদা ও ন্যায্যতার ভিত্তিতে সম্পর্ক এগিয়ে নিতে হবে। জিয়াউর রহমানের বহুমাত্রিক কূটনীতির উত্তরাধিকার থেকে শিক্ষা নিয়ে তারেক রহমান যদি জাতীয় স্বার্থকেন্দ্রিক ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি প্রতিষ্ঠা করতে পারেন, সেটি বাংলাদেশের জন্য বড় অর্জন হবে।

শিক্ষায় বিনিয়োগ মানে ভবিষ্যতে বিনিয়োগ : শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি, ডিজিটাল ক্লাসরুম, ‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’, ফ্রি ওয়াই-ফাই, শিক্ষার্থীদের সহায়তা এবং দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষার উদ্যোগ ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু শিক্ষা সংস্কার শুধু প্রযুক্তি বিতরণে শেষ হতে পারে না। শিক্ষক প্রশিক্ষণ, শিক্ষার মান, ঝরে পড়া রোধ, কারিগরি শিক্ষা, গবেষণা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন সবকিছুকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ আজকের একটি ট্যাবলেটের চেয়ে আগামী দিনের একজন দক্ষ শিক্ষক, বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী, চিকিৎসক কিংবা উদ্যোক্তা দেশের জন্য অনেক বড় সম্পদ।

স্বাস্থ্যসেবায় আস্থা ফেরানোর প্রয়াস : স্বাস্থ্য খাতে এক লাখ হেলথ কেয়ারার নিয়োগের প্রক্রিয়া, পাঁচ হাজার চিকিৎসক নিয়োগের উদ্যোগ এবং ইলেকট্রনিক হেলথ কার্ড চালুর প্রস্তুতি সরকারের স্বাস্থ্যভাবনার ইতিবাচক দিক নির্দেশ করে। বাংলাদেশে স্বাস্থ্যসেবার সবচেয়ে বড় সংকট শুধু চিকিৎসকের সংখ্যা নয়—সেবা পাওয়ার অসমতা। রাজধানীর বাইরে মানসম্মত চিকিৎসা, উপজেলা পর্যায়ে বিশেষজ্ঞ সেবা, জরুরি চিকিৎসা, ওষুধের প্রাপ্যতা এবং রোগীর তথ্যের ডিজিটাল সংরক্ষণ এসব নিশ্চিত করা জরুরি। একজন দরিদ্র মানুষ যেন চিকিৎসার জন্য নিজের শেষ সম্বল বিক্রি করতে বাধ্য না হন একটি মানবিক রাষ্ট্রের স্বাস্থ্যনীতির সাফল্যের প্রকৃত মাপকাঠি এটিই।

জ্বালানি সংকট যেখানে আরও কঠিন হতে হবে সরকারকে : সরকারের প্রথম ছয় মাসের সবচেয়ে বড় দুর্বলতার জায়গাগুলোর একটি জ্বালানি ও গ্যাস সরবরাহ। শিল্পকারখানা, সার কারখানা, সিএনজি স্টেশন ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের ঘাটতির প্রভাব পড়েছে। এই সংকট অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তবে সংকট মানেই ব্যর্থতা নয়; সংকট থেকে বেরিয়ে আসার সক্ষমতাই সরকারের প্রকৃত পরীক্ষা। দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, এলএনজি উৎসের বৈচিত্র্য, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বিদ্যুৎ সঞ্চালন অবকাঠামো ও শক্তিদক্ষতার ওপর একযোগে কাজ করতে হবে। বাংলাদেশের শিল্প খাতকে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন নির্ভরযোগ্যতা। সামান্য বেশি দামের বিদ্যুৎ-গ্যাস একজন উদ্যোক্তা হয়তো মেনে নিতে পারেন; কিন্তু অনিশ্চিত সরবরাহের কারণে কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়া কোনো বিনিয়োগকারীই মেনে নেবেন না।

প্রথম ছয় মাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা প্রতিশ্রুতি নয়, ফলাফল : সরকারের আত্মমূল্যায়নে বহু সাফল্যের কথা উঠে এসেছে। রিজভীর ভাষায় অধিকাংশ নির্বাচনী কর্মসূচি বাস্তবায়িত হয়েছে। কিন্তু একটি গণতান্ত্রিক সরকারের মূল্যায়নে শুধু সরকারি পরিসংখ্যান যথেষ্ট নয়। বিরোধী মত, গণমাধ্যম, নাগরিক সমাজ, অর্থনীতিবিদ এবং সর্বোপরি সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
ফ্যামিলি কার্ডের সংখ্যা যতই হোক, প্রকৃত দরিদ্রের হাতে পৌঁছেছে কি না সেটিই প্রশ্ন। কর্মসংস্থানের লক্ষ্য যত বড়ই হোক, তরুণের হাতে বাস্তব কাজ এসেছে কি না সেটিই প্রশ্ন। বাজেট যত বড়ই হোক, মূল্যস্ফীতি কমেছে কি না সেটিই প্রশ্ন। এই বাস্তববাদী মানসিকতাই তারেক রহমান সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় শক্তি হতে পারে। কারণ গণতন্ত্রে জনগণকে শুধু বলা যায় না যে সরকার সফল; জনগণের জীবনেই সেই সাফল্যের প্রমাণ দিতে হয়।

পরিশেষে, ছয় মাসের এই পথচলা শেষ হয়নি; বরং এটি কেবল শুরু। দেশনায়ক তারেক রহমানের নেতৃত্বে যে ভিত্তি আজ স্থাপিত হয়েছে ফ্যামিলি কার্ডের মানবিক দর্শন, কৃষকের হাতে সম্মানের কার্ড, অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের সাহসী বাজেট, কর্মসংস্থানের স্বপ্ন, পরিবেশের সবুজ অঙ্গীকার, আইনশৃঙ্খলার পুনরুদ্ধার এবং ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি এসব মিলে গড়ে উঠছে এক নতুন বাংলাদেশের নকশা।

আমি বিএনপির পরিবারের সন্তান হিসেবে জানি, আমাদের দলের সংগ্রাম কখনো ক্ষমতার জন্য ছিল না; এটি ছিল জনগণের মর্যাদার জন্য, রাষ্ট্রের স্বাধীনতার জন্য। জিয়াউর রহমান যে জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্রচিন্তার বীজ বপন করেছিলেন, বেগম খালেদা জিয়া যে গণতন্ত্রের জন্য প্রাণপণ লড়েছিলেন, তারেক রহমান আজ সেই উত্তরাধিকারকেই বাস্তবে রূপ দিচ্ছেন। তাঁর সরকার শুধু শাসন করছে না তারা রাষ্ট্রকে জনগণের কাছে ফিরিয়ে দিচ্ছে। আগামী ছয় মাস আরও কঠিন হবে। দ্রব্যমূল্যের চাপ, কর্মসংস্থানের অভাব, জ্বালানির সংকট সব মোকাবিলা করতে হবে দৃঢ় হাতে। কিন্তু যে নেতা ইতিমধ্যেই ব্যক্তি থেকে রাষ্ট্রে, প্রতিশ্রুতি থেকে কর্মে পথ দেখিয়েছেন, তিনি নিশ্চয়ই এসব বাধা অতিক্রম করবেন। কারণ ইতিহাস সাক্ষী যখন জনগণের হৃদয়ে আশা জাগে, তখন কোনো অন্ধকার স্থায়ী হয় না। দেশনায়ক তারেক রহমানের নেতৃত্বে এই সরকার যেন শুধু একটি নির্বাচিত সরকার না হয়ে ওঠে; বরং বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পুনর্জন্মের এক মহাকাব্যিক অধ্যায় হয়ে ওঠে। যেদিন সাধারণ মানুষ বলবেন “সরকার আছে, তাই আমরা নিরাপদ, আমরা আশাবাদী” সেদিনই এই ছয় মাসের ভিত্তি সার্থক হবে। আজ সেই দিনের প্রত্যাশায় আমরা দাঁড়িয়ে আছি গর্বিত, আবেগময় এবং অটল বিশ্বাসে।

লেখক : জুবাইয়া বিন্তে কবির
অর্থনীতিবিদ, গবেষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট

জনপ্রিয় সংবাদ

ছয় মাসে স্বপ্নের পথে বাংলাদেশ: দেশনায়ক তারেক রহমানের সরকারের নতুন অভিযাত্রা

প্রকাশিত : ১০:৪৮:৫৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৬ অগাস্ট ২০২৬

জুবাইয়া বিন্তে কবির: বাংলাদেশের রাজনৈতিক আকাশে যখন দীর্ঘ অন্ধকারের ছায়া ঘনীভূত হয়েছিল, তখন জনগণের হৃদয়ে জেগে উঠেছিল এক নতুন প্রভাতের আকাঙ্ক্ষা। সেই আকাঙ্ক্ষারই মূর্ত প্রতীক হয়ে এসেছেন জননন্দিত প্রধানমন্ত্রী, দেশনায়ক তারেক রহমান। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপির ঐতিহাসিক বিজয় এবং ১৭ ফেব্রুয়ারি তাঁর নেতৃত্বে সরকার গঠনের পর আজ ১৭ আগস্ট—মাত্র ছয় মাস। কিন্তু এই ছয় মাস শুধু ক্যালেন্ডারের পাতা নয়; এটি এক নতুন রাষ্ট্রচিন্তার জন্মলগ্ন, এক নতুন সংস্কৃতির সূচনা এবং এক নতুন সম্ভাবনার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের কাল। আমি বিএনপির পরিবারের সন্তান। শহীদ রাস্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের জাতীয়তাবাদী স্বপ্ন, আপোষহীন নেত্রী দেশমাতা বেগম খালেদা জিয়ার গণতান্ত্রিক সংগ্রামের রক্তাক্ত ইতিহাস এবং দেশনায়ক তারেক রহমানের অদম্য নেতৃত্ব এসব আমার রক্তে মিশে আছে। তাই যখন দেখি, ক্ষমতার কেন্দ্রে ব্যক্তিপূজার পরিবর্তে রাষ্ট্রের মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে, যখন দেখি ফ্যামিলি কার্ডে পরিবারের সম্মান, কৃষক কার্ডে কৃষকের স্বপ্ন, এবং অর্থনীতিতে পুনরুদ্ধারের নতুন দিগন্ত খুলে যাচ্ছে তখন আমার হৃদয় গর্বে ভরে ওঠে। এই ছয় মাস ব্যর্থতার নয়, বরং এক মহান যাত্রার প্রথম পদক্ষেপ। দেশনায়ক তারেক রহমান যেন এক নতুন সূর্য; তাঁর আলোয় বাংলাদেশের আকাশ আজ নতুন রঙে রঞ্জিত। এই প্রতিবেদনে সেই আলোর গল্পই বলা হবে প্রতিশ্রুতি থেকে রাষ্ট্র পরিচালনার নতুন অভিযাত্রার গল্প।

ক্ষমতার কেন্দ্রে ব্যক্তি নয়, রাষ্ট্র : দেশনায়ক তারেক রহমান সরকারের অন্যতম তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা হচ্ছে—রাষ্ট্র কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। সরকারি প্রতিষ্ঠান, দপ্তর, আদালত ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ব্যক্তিপূজার সংস্কৃতি কমানো, সরকারি ব্যয়ে সংযম এবং প্রশাসনে প্রাতিষ্ঠানিকতার ওপর জোর দেওয়ার উদ্যোগ এই দর্শনেরই প্রতিফলন। প্রধানমন্ত্রী নিজেও সরকারি ব্যয় কমানো, কনভয়ের আকার সীমিত করা এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদের মিতব্যয়ী ব্যবহারের যে দৃষ্টান্ত স্থাপনের চেষ্টা করছেন, তা প্রতীকী হলেও গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ রাষ্ট্রের অর্থ জনগণের অর্থ। একটি গাড়ি, একটি সফর, একটি প্রকল্প বা একটি সরকারি আপ্যায়নের পেছনে যে অর্থ ব্যয় হয়, সেটি কোনো শাসকের ব্যক্তিগত সম্পদ নয়—এটি কৃষক, শ্রমিক, শিক্ষক, ব্যবসায়ী ও প্রবাসীর ঘামে অর্জিত জাতীয় সম্পদ। তাই ক্ষমতার জৌলুস কমিয়ে রাষ্ট্রীয় সম্পদের প্রতি দায়িত্বশীলতা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে।

‘ব্যক্তি নয়, পরিবার’ ফ্যামিলি কার্ডের দর্শন : ছয় মাসে সরকারের সবচেয়ে আলোচিত জনকল্যাণমূলক উদ্যোগগুলোর একটি নিঃসন্দেহে ফ্যামিলি কার্ড। এর মূল দর্শন—‘ব্যক্তি নয়, পরিবারই উন্নয়নের মূল একক’। সরকারি ফ্যামিলি কার্ড প্ল্যাটফর্মেও এই দর্শনকে কর্মসূচিটির ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এটি কেবল একটি কার্ড নয়; সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে এটি বাংলাদেশের সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থাকে খণ্ডিত ভাতা থেকে সমন্বিত পরিবারভিত্তিক ব্যবস্থায় রূপান্তরের একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হতে পারে। নারীকে পরিবারের আর্থিক সহায়তার কেন্দ্রীয় বাহক করা হলে নারীর ক্ষমতায়নও বাড়বে। বিএনপির নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির বাস্তব রূপ হিসেবে তাই ফ্যামিলি কার্ডের রাজনৈতিক ও সামাজিক গুরুত্ব দুটোই রয়েছে।
তবে এর সাফল্য নির্ভর করবে প্রকৃত দরিদ্র পরিবার নির্বাচন, স্বচ্ছ ডেটাবেস, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত সুবিধাভোগী তালিকা এবং দুর্নীতিমুক্ত অর্থ বিতরণের ওপর। ভালো উদ্যোগকে ভালো ব্যবস্থাপনায় রূপ দিতে পারলেই এটি ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের কল্যাণরাষ্ট্রের অন্যতম ভিত্তি হতে পারে।

কৃষকের হাতে কার্ড, কৃষির হাতে নতুন সম্ভাবনা : বাংলাদেশের অর্থনীতির শিকড় এখনো কৃষিতে। অথচ কৃষক বহু বছর ধরে সার, বীজ, সেচ, ঋণ, বাজার ও ন্যায্যমূল্যের নানা সমস্যার মধ্যে টিকে আছেন। এই বাস্তবতায় কৃষক কার্ড একটি সময়োপযোগী উদ্যোগ। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রি-পাইলটে ১০ জেলার ১১টি উপজেলায় ২২ হাজার ৬৫ জন কৃষককে কার্ড দেওয়ার কথা বাজেট নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে। কার্ডের মাধ্যমে নগদ সহায়তার পাশাপাশি ১০ ধরনের সেবা দেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে।
ক্ষুদ্র কৃষকের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ সুদসহ মওকুফের উদ্যোগও সরকারের জনমুখী নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। কৃষক যদি ঋণের বোঝা থেকে কিছুটা মুক্তি পান, উৎপাদনে নতুন করে বিনিয়োগের সুযোগ পান এবং একই পরিচয়ের মাধ্যমে সার-বীজ-ঋণ-বীমা-বাজারতথ্য পেতে পারেন, তাহলে কৃষি অর্থনীতিতে এর বহুগুণ প্রভাব পড়তে পারে।

অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করার প্রথম পরীক্ষা : তারেক রহমান সরকারের প্রথম বাজেট ২০২৬-২৭ অর্থবছরের ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট—শুধু আকারের দিক থেকে বড় নয়; এটি সরকারের অর্থনৈতিক দর্শনেরও একটি ঘোষণাপত্র। বাজেটে প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৫ শতাংশ এবং মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থনীতিকে ‘রিকভারি অ্যান্ড স্ট্যাবিলাইজেশন’, ‘রেস্টোরেশন’ এবং ‘রিকনস্ট্রাকশন ফর অ্যাকসেলারেশন’ এই তিন ধাপের কৌশলে এগিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ সরকারের সামনে শুধু সংকট সামাল দেওয়ার লক্ষ্য নেই; বরং অর্থনীতিকে পুনর্গঠন করে দ্রুততর প্রবৃদ্ধির পথে নেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে।
তবে অর্থনীতির চূড়ান্ত বিচার বাজেটের আকারে নয়, মানুষের জীবনে। বাজারের ব্যাগ, চাকরির সুযোগ, ব্যবসার পরিবেশ, ব্যাংকঋণ ও পরিবারের আয়—এসব জায়গায় স্বস্তি ফিরলেই মানুষ সরকারের অর্থনৈতিক সাফল্যকে সত্যিকার অর্থে স্বীকৃতি দেবে।

মূল্যস্ফীতি স্বস্তির সবচেয়ে বড় দরজা : বর্তমান সরকারের সামনে সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষাগুলোর একটি দ্রব্যমূল্য। মূল্যস্ফীতি কমার অর্থ বাজারে দাম কমে যাওয়া নয়; বরং দাম বৃদ্ধির গতি কমে আসা। ফলে দীর্ঘ সময়ের মূল্যস্ফীতির ক্ষত সাধারণ মানুষের জীবন থেকে মুছে যেতে সময় লাগবে।
সরকারের উচিত খাদ্য সরবরাহ, আমদানি, পরিবহন, মজুত ও বাজার ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি বাড়ানো। কৃষক যেন উৎপাদনের ন্যায্যমূল্য পান এবং ভোক্তাও যেন অস্বাভাবিক দামে পণ্য কিনতে বাধ্য না হন এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করতে হবে। এই জায়গায় তারেক রহমান সরকারের সবচেয়ে বড় সাফল্য হবে যদি আগামী ছয় মাসে মানুষ অনুভব করে বাজারের অস্থিরতা কিছুটা কমেছে, সংসারের হিসাব কিছুটা সহজ হয়েছে।

এক কোটি কর্মসংস্থানের স্বপ্ন : একটি তরুণ দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার মানুষ। কিন্তু সেই তরুণের হাতে কাজ না থাকলে জনসংখ্যা সম্পদ থেকে বোঝায় পরিণত হতে পারে। তাই ২০২৬-৩১ মেয়াদে প্রায় এক কোটি কর্মসংস্থানের লক্ষ্য সরকারের অর্থনৈতিক কর্মসূচির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক।
শিল্পায়ন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ, লজিস্টিকস, রপ্তানিমুখী উৎপাদন, স্টার্টআপ ও গ্রামীণ অর্থনীতিকে কর্মসংস্থানের চালিকাশক্তি করার পরিকল্পনা যথার্থ। তবে লক্ষ্যকে বাস্তবে পরিণত করতে হলে শুধু সরকারি চাকরি নয়—বেসরকারি বিনিয়োগের দরজা খুলতে হবে। একজন তরুণের হাতে চাকরি মানে শুধু একটি আয় নয়; একটি পরিবারের আত্মমর্যাদা, একটি ভবিষ্যতের নিরাপত্তা এবং একটি রাষ্ট্রের উৎপাদনশীল শক্তি।

বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজন আস্থা : ব্যবসা শুরু করতে সময় কমিয়ে ১৪ দিনে নামানোর উদ্যোগ, অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজ করা এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও কৃষকদের অর্থায়নের জন্য পুনঃঅর্থায়ন কর্মসূচি চালু করা বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির ইতিবাচক প্রচেষ্টা। ২০২৬-২৭ বাজেটেও বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানকে অন্যতম অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
কিন্তু বিনিয়োগকারীর আস্থা শুধু কাগজে তৈরি হয় না। নির্ভরযোগ্য গ্যাস-বিদ্যুৎ, পূর্বানুমানযোগ্য করনীতি, সহজ ঋণ, দ্রুত অনুমোদন এবং আইনের সমান প্রয়োগ—এসবের সমন্বয়েই আস্থা তৈরি হয়। দেশনায়ক তারেক রহমান সরকারের সামনে তাই একটি ঐতিহাসিক সুযোগ বাংলাদেশকে এমন একটি দেশে পরিণত করা, যেখানে একজন উদ্যোক্তা রাজনীতির পরিচয় নয়, তার ব্যবসায়িক সক্ষমতা দিয়ে রাষ্ট্রের সহযোগিতা পাবেন।

ব্যাংক খাতের ক্ষত সারানোর কঠিন দায়িত্ব : বাংলাদেশের ব্যাংক খাত বহু বছরের অনিয়ম, দুর্বল তদারকি ও খেলাপি ঋণের বোঝা বহন করছে। নতুন সরকারের জন্য এটি এমন একটি ক্ষেত্র, যেখানে রাজনৈতিক সদিচ্ছার সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা হবে। ব্যাংক পুনর্গঠন প্রয়োজন হলে তা করতে হবে; কিন্তু জনগণের অর্থ দিয়ে পুরোনো দুর্নীতির দায় মেটানো যাবে না। প্রকৃত সম্পদের মূল্যায়ন, দায়ী ব্যক্তিদের জবাবদিহি, খেলাপি ঋণ আদায় এবং পরিচালনা পর্ষদে পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করা জরুরি। দেশনায়ক তারেক রহমান সরকার যদি ব্যাংক খাতকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত, জবাবদিহিমূলক ও উৎপাদনমুখী করতে পারে, তবে সেটিই হবে আগামী দিনের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের অন্যতম বড় অর্জন।

খাদ্য নিরাপত্তায় দৃশ্যমান প্রস্তুতি : খাদ্য মজুতের ক্ষেত্রেও সরকারের প্রথম ছয় মাসে একটি ইতিবাচক প্রস্তুতি দেখা গেছে। সরকারের হিসাব অনুযায়ী, ২৮ জুন পর্যন্ত সরকারি গুদামে ২২ লাখ ১০ হাজার ৯৪৫ মেট্রিক টন খাদ্যশস্য মজুত ছিল। একই সময়ে বোরো সংগ্রহ অভিযানে ধান ও চাল সংগ্রহের তথ্যও দেওয়া হয়েছে। খাদ্য মজুত কেবল দুর্ভিক্ষের আশঙ্কা মোকাবিলার বিষয় নয়; এটি বাজার স্থিতিশীল রাখার একটি অর্থনৈতিক অস্ত্র। আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্য ও জ্বালানির মূল্য অস্থির হলে শক্তিশালী মজুত সরকারকে সাধারণ মানুষের ওপর তাৎক্ষণিক চাপ কমানোর সুযোগ দেয়।

সবুজ বাংলাদেশ নির্মাণের অঙ্গীকার : চারা রোপণ ও খাল খননের কর্মসূচিকে নিছক পরিবেশগত উদ্যোগ হিসেবে দেখলে ভুল হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা বাংলাদেশের জন্য এটি খাদ্যনিরাপত্তা, জলাবদ্ধতা, ভূগর্ভস্থ পানি, জীববৈচিত্র্য ও গ্রামীণ অর্থনীতির সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত। সরকার ২০২৬ সালে প্রায় ৫ কোটি ১৫ লাখ চারা রোপণের লক্ষ্য নিয়েছে এবং প্রথম ছয় মাসে ২ কোটির বেশি চারা রোপণের কথা জানিয়েছে। আগামী পাঁচ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন ও পুনঃখননের পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে। এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—চারা লাগানোর পর তা বেঁচে থাকছে কি না এবং খননের পর খালগুলো সত্যিই প্রবাহমান থাকছে কি না। সংখ্যার চেয়ে স্থায়িত্বই হবে সাফল্যের প্রকৃত মাপকাঠি।

আইনশৃঙ্খলায় রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব : রাষ্ট্রের প্রথম দায়িত্ব নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। তাই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নত করার উদ্যোগ সরকারের রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দ্রুত বিচার, অপরাধী গ্রেপ্তার এবং জঙ্গল সলিমপুরে যৌথ বাহিনীর অভিযানের মতো ঘটনাকে সরকার রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠার উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেছে। তবে রাষ্ট্রের শক্তি শুধু অভিযানে নয় আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগে। চাঁদাবাজ, মাদক ব্যবসায়ী, সন্ত্রাসী কিংবা অপরাধী যে দলেরই হোক, তার বিরুদ্ধে একই আইন প্রয়োগ করতে পারলেই জনগণের আস্থা স্থায়ী হবে। অপরাধীর রাজনৈতিক পরিচয় নয়, অপরাধই যেন তার পরিচয় হয় এটাই হতে হবে রাষ্ট্রের নীতি।

পুলিশে মেধা ও পেশাদারিত্ব : আইনশৃঙ্খলা উন্নয়নের সঙ্গে পুলিশ সংস্কার অবিচ্ছেদ্য। যোগ্য কর্মকর্তা যোগ্য জায়গায় থাকবেন, পদায়ন হবে দক্ষতা ও পেশাদারিত্বের ভিত্তিতে এই সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করতে পারলে পুলিশের প্রতি জনগণের আস্থা বাড়বে। কোনো সরকারি পদ যেন ব্যক্তিগত বিনিয়োগে পরিণত না হয় এটিও নিশ্চিত করা জরুরি। কারণ রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব যদি অর্থনৈতিক সুবিধা অর্জনের মাধ্যম হয়ে যায়, তবে শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হন সাধারণ নাগরিক। দেশনায়ক তারেক রহমান সরকারের সামনে তাই সুযোগ রয়েছে—বাংলাদেশের পুলিশকে রাজনৈতিক আনুগত্যের কাঠামো থেকে পেশাদার নাগরিক সেবার প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার।

পররাষ্ট্রনীতিতে ভারসাম্যের নতুন অধ্যায় : ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়’ বাংলাদেশের জন্য এই নীতি কেবল কূটনৈতিক বাক্য নয়; এটি ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার প্রয়োজন। ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, জাপান, মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের জন্য অপরিহার্য। তারেক রহমানের চীন সফর এই ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য। সরকারি তথ্য অনুযায়ী সফরে মোট ১৭টি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। কূটনীতির সৌন্দর্য সফরের ছবিতে নয়; বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, জ্বালানি, অবকাঠামো, শ্রমবাজার ও জাতীয় নিরাপত্তায় তার বাস্তব সুফলে। সেই বিচারে চীন সফরকে একটি সম্ভাবনাময় সূচনা বলা যায়।

ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক বন্ধুত্ব, কিন্তু জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে :
ভারত বাংলাদেশের প্রতিবেশী, গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য অংশীদার এবং আঞ্চলিক বাস্তবতার অপরিহার্য অংশ। তাই ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে আবেগ নয়, জাতীয় স্বার্থই হওয়া উচিত মূল ভিত্তি। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে আলোচনা চলছে; আগস্টের ২০-২৫ তারিখকে সম্ভাব্য সময় হিসেবে সংবাদ প্রকাশিত হলেও চূড়ান্ত তারিখ নিশ্চিত হয়নি। বাংলাদেশের পানি, সীমান্ত, বাণিজ্য, নিরাপত্তা, বিদ্যুৎ, যোগাযোগ ও শ্রমবাজার—প্রতিটি ক্ষেত্রে পারস্পরিক মর্যাদা ও ন্যায্যতার ভিত্তিতে সম্পর্ক এগিয়ে নিতে হবে। জিয়াউর রহমানের বহুমাত্রিক কূটনীতির উত্তরাধিকার থেকে শিক্ষা নিয়ে তারেক রহমান যদি জাতীয় স্বার্থকেন্দ্রিক ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি প্রতিষ্ঠা করতে পারেন, সেটি বাংলাদেশের জন্য বড় অর্জন হবে।

শিক্ষায় বিনিয়োগ মানে ভবিষ্যতে বিনিয়োগ : শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি, ডিজিটাল ক্লাসরুম, ‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’, ফ্রি ওয়াই-ফাই, শিক্ষার্থীদের সহায়তা এবং দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষার উদ্যোগ ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু শিক্ষা সংস্কার শুধু প্রযুক্তি বিতরণে শেষ হতে পারে না। শিক্ষক প্রশিক্ষণ, শিক্ষার মান, ঝরে পড়া রোধ, কারিগরি শিক্ষা, গবেষণা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন সবকিছুকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ আজকের একটি ট্যাবলেটের চেয়ে আগামী দিনের একজন দক্ষ শিক্ষক, বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী, চিকিৎসক কিংবা উদ্যোক্তা দেশের জন্য অনেক বড় সম্পদ।

স্বাস্থ্যসেবায় আস্থা ফেরানোর প্রয়াস : স্বাস্থ্য খাতে এক লাখ হেলথ কেয়ারার নিয়োগের প্রক্রিয়া, পাঁচ হাজার চিকিৎসক নিয়োগের উদ্যোগ এবং ইলেকট্রনিক হেলথ কার্ড চালুর প্রস্তুতি সরকারের স্বাস্থ্যভাবনার ইতিবাচক দিক নির্দেশ করে। বাংলাদেশে স্বাস্থ্যসেবার সবচেয়ে বড় সংকট শুধু চিকিৎসকের সংখ্যা নয়—সেবা পাওয়ার অসমতা। রাজধানীর বাইরে মানসম্মত চিকিৎসা, উপজেলা পর্যায়ে বিশেষজ্ঞ সেবা, জরুরি চিকিৎসা, ওষুধের প্রাপ্যতা এবং রোগীর তথ্যের ডিজিটাল সংরক্ষণ এসব নিশ্চিত করা জরুরি। একজন দরিদ্র মানুষ যেন চিকিৎসার জন্য নিজের শেষ সম্বল বিক্রি করতে বাধ্য না হন একটি মানবিক রাষ্ট্রের স্বাস্থ্যনীতির সাফল্যের প্রকৃত মাপকাঠি এটিই।

জ্বালানি সংকট যেখানে আরও কঠিন হতে হবে সরকারকে : সরকারের প্রথম ছয় মাসের সবচেয়ে বড় দুর্বলতার জায়গাগুলোর একটি জ্বালানি ও গ্যাস সরবরাহ। শিল্পকারখানা, সার কারখানা, সিএনজি স্টেশন ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের ঘাটতির প্রভাব পড়েছে। এই সংকট অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তবে সংকট মানেই ব্যর্থতা নয়; সংকট থেকে বেরিয়ে আসার সক্ষমতাই সরকারের প্রকৃত পরীক্ষা। দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, এলএনজি উৎসের বৈচিত্র্য, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বিদ্যুৎ সঞ্চালন অবকাঠামো ও শক্তিদক্ষতার ওপর একযোগে কাজ করতে হবে। বাংলাদেশের শিল্প খাতকে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন নির্ভরযোগ্যতা। সামান্য বেশি দামের বিদ্যুৎ-গ্যাস একজন উদ্যোক্তা হয়তো মেনে নিতে পারেন; কিন্তু অনিশ্চিত সরবরাহের কারণে কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়া কোনো বিনিয়োগকারীই মেনে নেবেন না।

প্রথম ছয় মাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা প্রতিশ্রুতি নয়, ফলাফল : সরকারের আত্মমূল্যায়নে বহু সাফল্যের কথা উঠে এসেছে। রিজভীর ভাষায় অধিকাংশ নির্বাচনী কর্মসূচি বাস্তবায়িত হয়েছে। কিন্তু একটি গণতান্ত্রিক সরকারের মূল্যায়নে শুধু সরকারি পরিসংখ্যান যথেষ্ট নয়। বিরোধী মত, গণমাধ্যম, নাগরিক সমাজ, অর্থনীতিবিদ এবং সর্বোপরি সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
ফ্যামিলি কার্ডের সংখ্যা যতই হোক, প্রকৃত দরিদ্রের হাতে পৌঁছেছে কি না সেটিই প্রশ্ন। কর্মসংস্থানের লক্ষ্য যত বড়ই হোক, তরুণের হাতে বাস্তব কাজ এসেছে কি না সেটিই প্রশ্ন। বাজেট যত বড়ই হোক, মূল্যস্ফীতি কমেছে কি না সেটিই প্রশ্ন। এই বাস্তববাদী মানসিকতাই তারেক রহমান সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় শক্তি হতে পারে। কারণ গণতন্ত্রে জনগণকে শুধু বলা যায় না যে সরকার সফল; জনগণের জীবনেই সেই সাফল্যের প্রমাণ দিতে হয়।

পরিশেষে, ছয় মাসের এই পথচলা শেষ হয়নি; বরং এটি কেবল শুরু। দেশনায়ক তারেক রহমানের নেতৃত্বে যে ভিত্তি আজ স্থাপিত হয়েছে ফ্যামিলি কার্ডের মানবিক দর্শন, কৃষকের হাতে সম্মানের কার্ড, অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের সাহসী বাজেট, কর্মসংস্থানের স্বপ্ন, পরিবেশের সবুজ অঙ্গীকার, আইনশৃঙ্খলার পুনরুদ্ধার এবং ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি এসব মিলে গড়ে উঠছে এক নতুন বাংলাদেশের নকশা।

আমি বিএনপির পরিবারের সন্তান হিসেবে জানি, আমাদের দলের সংগ্রাম কখনো ক্ষমতার জন্য ছিল না; এটি ছিল জনগণের মর্যাদার জন্য, রাষ্ট্রের স্বাধীনতার জন্য। জিয়াউর রহমান যে জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্রচিন্তার বীজ বপন করেছিলেন, বেগম খালেদা জিয়া যে গণতন্ত্রের জন্য প্রাণপণ লড়েছিলেন, তারেক রহমান আজ সেই উত্তরাধিকারকেই বাস্তবে রূপ দিচ্ছেন। তাঁর সরকার শুধু শাসন করছে না তারা রাষ্ট্রকে জনগণের কাছে ফিরিয়ে দিচ্ছে। আগামী ছয় মাস আরও কঠিন হবে। দ্রব্যমূল্যের চাপ, কর্মসংস্থানের অভাব, জ্বালানির সংকট সব মোকাবিলা করতে হবে দৃঢ় হাতে। কিন্তু যে নেতা ইতিমধ্যেই ব্যক্তি থেকে রাষ্ট্রে, প্রতিশ্রুতি থেকে কর্মে পথ দেখিয়েছেন, তিনি নিশ্চয়ই এসব বাধা অতিক্রম করবেন। কারণ ইতিহাস সাক্ষী যখন জনগণের হৃদয়ে আশা জাগে, তখন কোনো অন্ধকার স্থায়ী হয় না। দেশনায়ক তারেক রহমানের নেতৃত্বে এই সরকার যেন শুধু একটি নির্বাচিত সরকার না হয়ে ওঠে; বরং বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পুনর্জন্মের এক মহাকাব্যিক অধ্যায় হয়ে ওঠে। যেদিন সাধারণ মানুষ বলবেন “সরকার আছে, তাই আমরা নিরাপদ, আমরা আশাবাদী” সেদিনই এই ছয় মাসের ভিত্তি সার্থক হবে। আজ সেই দিনের প্রত্যাশায় আমরা দাঁড়িয়ে আছি গর্বিত, আবেগময় এবং অটল বিশ্বাসে।

লেখক : জুবাইয়া বিন্তে কবির
অর্থনীতিবিদ, গবেষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট