জুবাইয়া বিন্তে কবির : কখনো কখনো ইতিহাসের দীর্ঘ প্রতীক্ষার শেষে একটি দিন এসে দাঁড়ায় যে দিনটি কেবল ক্যালেন্ডারের পাতায় নয়, মানুষের হৃদয়ের গভীরেও লেখা থাকে। ২০ আগস্ট ২০২৬ তেমনই এক স্মরণীয় দিন। সংসদের ব্যালটের রায়ে ৩৫ বছরের দীর্ঘ বিরতির অবসান ঘটিয়ে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়া যেন তাঁর ছয় দশকের রাজনৈতিক পথচলার এক উজ্জ্বল পরিণতি। ছাত্ররাজনীতির উত্তাল মিছিল থেকে শিক্ষকতার শান্ত প্রাঙ্গণ, পৌরসভার জনসেবা থেকে জাতীয় রাজনীতির বিস্তৃত অঙ্গন অসংখ্য ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়ে আজ তিনি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে। এই ঐতিহাসিক অভিষঙ্গে মিশে আছে একজন মানুষের দীর্ঘ সংগ্রামের গল্প, একটি রাজনৈতিক পরিবারের আবেগ এবং বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার নতুন প্রত্যাশা। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর আমার কাছে শুধু একজন নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতি নন; তিনি আমার প্রিয় রাজনৈতিক নেতাদের একজন, আর আমি নিজেও একটি বিএনপি পরিবারের সন্তান হিসেবে তাঁর এই অর্জনের মুহূর্তে ব্যক্তিগত আনন্দ, আবেগ ও গর্ব অনুভব করছি। তাই প্রিয় এই নেতাকে জানাই হৃদয়ের গভীর থেকে আন্তরিক অভিনন্দন ও উষ্ণ শুভেচ্ছা। একই সঙ্গে এই দূরদর্শী রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের জন্য অভিনন্দন জানাই বিএনপির চেয়ারপারসন ও প্রধানমন্ত্রী, দেশনায়ক তারেক রহমানকে। অভিজ্ঞতা, প্রজ্ঞা ও রাজনৈতিক পরিমিতিবোধকে মূল্যায়ন করে মির্জা ফখরুলকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক দায়িত্বের জন্য বেছে নেওয়া তাঁর নেতৃত্বের একটি তাৎপর্যপূর্ণ স্বাক্ষর হয়ে থাকবে।
আজ যেন সময় নিজেই ফিরে তাকাচ্ছে—ঠাকুরগাঁওয়ের সেই তরুণ ছাত্রনেতার দিকে, যাঁর চোখে একদিন ছিল পরিবর্তনের স্বপ্ন; আর আজ সেই স্বপ্নের পথ বেয়ে তিনি এসে দাঁড়িয়েছেন বঙ্গভবনের দ্বারে। রাজনীতির দীর্ঘ নদী পেরিয়ে ইতিহাসের এই মোহনায় এসে মির্জা ফখরুলের জীবনের গল্প যেন নতুন করে বলে সংগ্রামের পথ যত দীর্ঘই হোক, নিষ্ঠা, প্রজ্ঞা ও মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা একদিন ইতিহাসের দরজায় কড়া নাড়বেই।
৩৫ বছর পর ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি : এই নির্বাচন শুধু একজন নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ঘটনা নয়; বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসেও এটি একটি বিশেষ মুহূর্ত। দীর্ঘ ৩৫ বছর পর রাষ্ট্রপতি পদে আবার প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ভোট অনুষ্ঠিত হলো। ১৯৯১ সালের পর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে এমন প্রতিযোগিতামূলক ভোট আর দেখা যায়নি। ফলে ২০ আগস্টের ভোট যেন বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে একটি দীর্ঘ বিরতির অবসান ঘটাল। জাতীয় সংসদের অধিবেশন কক্ষে সংসদ সদস্যদের ব্যালটের মাধ্যমে রাষ্ট্রপ্রধান নির্বাচিত হওয়ার এই দৃশ্য আমাদের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নতুন যাত্রারও প্রতীক হয়ে থাকবে।
ফল ঘোষণার সেই ঐতিহাসিক মুহূর্ত : বৃহস্পতিবার বিকেল। জাতীয় সংসদের অধিবেশন কক্ষে অপেক্ষারত সংসদ সদস্যরা। ভোটগ্রহণ শেষ, এবার ফল ঘোষণার পালা। প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তা এ এম এম নাসির উদ্দিন ফল ঘোষণা করলেন। ৩৪৯ জন ভোটারের মধ্যে ভোট দিয়েছেন ৩৪৩ জন। কোনো ভোট বাতিল হয়নি। অলি আহমদ ৮৮ ভোট, আর মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ২৫৫ ভোট। ফল ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে যেন এক মুহূর্তে বদলে গেল দৃশ্যপট—একজন দলীয় মহাসচিব পরিণত হলেন রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদধারীতে।

রাজনীতির সৌন্দর্যের এক অনন্য দৃশ্য : ফল ঘোষণার পর সংসদে যে দৃশ্য তৈরি হয়, সেটিও কম তাৎপর্যপূর্ণ নয়। নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতিকে অভিনন্দন জানাতে এগিয়ে আসেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। করমর্দন, আলিঙ্গন, শুভেচ্ছা—রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার ঊর্ধ্বে উঠে সৌহার্দ্যের যে দৃশ্য সংসদে দেখা গেছে, তা বাংলাদেশের রাজনীতিতে আশার একটি ছবি হয়ে থাকতে পারে। রাজনীতিতে মতের পার্থক্য থাকবে, প্রতিযোগিতা থাকবে, তর্ক থাকবে; কিন্তু সেই পার্থক্য যদি শত্রুতায় পরিণত না হয়, তাহলেই গণতন্ত্র প্রাণ পায়। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ঘিরে সংসদে যে সৌহার্দ্যের ছবি ফুটে উঠেছে, সেটি তাই কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা নয় এটি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রত্যাশাও জাগায়।
ছাত্ররাজনীতির উত্তাল দিন থেকে : মির্জা ফখরুলের রাজনৈতিক জীবনের শুরু হয়েছিল ক্ষমতার অলিন্দে নয়, ছাত্ররাজনীতির উত্তাল মিছিলে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি পড়ার সময় তিনি পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্ত হন। এসএম হল ইউনিটের সাধারণ সম্পাদক এবং পরবর্তী সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের উত্তাল সময় তাঁর রাজনৈতিক চেতনার বিকাশ ঘটে। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে তাঁকে কারাবরণও করতে হয়েছিল।
সেই তরুণ ছাত্রনেতা হয়তো সেদিন কল্পনাও করেননি—জীবনের বহু দশক পর তিনি বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণের দ্বারপ্রান্তে এসে দাঁড়াবেন।
রাজনীতির পাশাপাশি শিক্ষকতার আলো : মির্জা ফখরুলের জীবনের সবচেয়ে সুন্দর দিকগুলোর একটি হলো—তিনি রাজনীতির পাশাপাশি শিক্ষকতার সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে উচ্চশিক্ষা শেষে ১৯৭২ সালে বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারে যোগ দিয়ে ঢাকা কলেজে শিক্ষকতা শুরু করেন। পরবর্তীতে বিভিন্ন সরকারি কলেজে অর্থনীতি পড়িয়েছেন। একজন শিক্ষক মানুষের মধ্যে শুধু তথ্য ঢেলে দেন না; তিনি চিন্তার দরজা খুলে দেন। মির্জা ফখরুলের রাজনৈতিক বক্তব্যে যে যুক্তি, বিশ্লেষণ ও পরিমিতিবোধ দেখা যায়, তার পেছনে একজন অর্থনীতির শিক্ষকের মননশীলতার ছাপও খুঁজে পাওয়া যায়।
প্রশাসনের অভিজ্ঞতাও তাঁর পুঁজি : শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি সরকারি প্রশাসনের বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেছেন। তৎকালীন উপপ্রধানমন্ত্রী এস এ বারীর একান্ত সচিব হিসেবেও কাজ করেছেন। রাষ্ট্রের প্রশাসনিক কাঠামোকে কাছ থেকে দেখা, সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া বোঝা এবং সরকারি ব্যবস্থাপনার বাস্তব অভিজ্ঞতা তাঁর পরবর্তী রাজনৈতিক জীবনকে সমৃদ্ধ করেছে। এই কারণে মির্জা ফখরুলের রাষ্ট্রপতি হওয়ার পেছনে শুধু রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা নয়, শিক্ষকতা ও প্রশাসনিক জীবনের দীর্ঘ প্রস্তুতিও কাজ করেছে।
পৌর চেয়ারম্যান থেকে জননেতা : ১৯৮০-এর দশকে সক্রিয় রাজনীতিতে প্রবেশের পর ১৯৮৮ সালে ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন তিনি। এখানেই তাঁর রাজনৈতিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা—জনগণের কাছে গিয়ে রাজনীতি করা। পৌরসভা মানে মানুষের প্রতিদিনের জীবন—রাস্তা, পানি, পরিচ্ছন্নতা, আলো, নাগরিক সেবা। সেই স্থানীয় বাস্তবতার মধ্য দিয়ে তিনি জনগণের সঙ্গে প্রত্যক্ষ সম্পর্ক গড়ে তোলেন।
আজ যখন তিনি রাষ্ট্রপতি, তখন সেই পৌর চেয়ারম্যানের অভিজ্ঞতাও তাঁর রাজনৈতিক জীবনের এক মূল্যবান অধ্যায়।
সংসদ ও মন্ত্রিসভায় দায়িত্ব : ২০০১ সালের নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে তিনি জাতীয় রাজনীতিতে আরও দৃঢ় অবস্থান তৈরি করেন। বিএনপি সরকারের সময় প্রথমে কৃষি প্রতিমন্ত্রী এবং পরে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। রাষ্ট্র পরিচালনার বাস্তব অভিজ্ঞতা তাঁর রাজনৈতিক জীবনে নতুন মাত্রা যোগ করে।
মন্ত্রী হিসেবে তিনি বুঝেছেন রাষ্ট্র পরিচালনা শুধু বক্তৃতার বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে অর্থনীতি, প্রশাসন, অবকাঠামো, কৃষি, মানুষের প্রত্যাশা এবং সীমিত সম্পদের মধ্যে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কঠিন বাস্তবতা।

কঠিন সময়ে বিএনপির কাণ্ডারি : ২০০৬-এর পর বিএনপির জন্য যে দীর্ঘ রাজনৈতিক সংকটের সময় শুরু হয়, মির্জা ফখরুল সেই সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মুখ হয়ে ওঠেন। ২০০৯ সালে সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব, ২০১১ সালে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব এবং ২০১৬ সালে পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব—এই ধারাবাহিকতায় তিনি দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে উঠে আসেন।
খালেদা জিয়ার কারাবাস এবং তারেক রহমানের দেশের বাইরে অবস্থানের সময়ে দলকে সংগঠিত রাখা, নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখা এবং রাজনৈতিক বক্তব্যকে সামনে তুলে ধরার কঠিন দায়িত্ব তিনি পালন করেন। তাঁর দীর্ঘ মহাসচিবের সময়কাল তাই বিএনপির ইতিহাসেও একটি স্বতন্ত্র অধ্যায়।
তারেক রহমানের দূরদর্শী নেতৃত্ব : আজকের এই রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আলোচনায় প্রধানমন্ত্রী ও দেশনায়ক তারেক রহমানের নেতৃত্বের বিষয়টি অনিবার্যভাবেই সামনে আসে। দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত, প্রবীণ ও অভিজ্ঞ একজন রাজনৈতিক নেতাকে রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন দেওয়ার সিদ্ধান্তে আমি তারেক রহমানের রাজনৈতিক দূরদর্শিতার প্রতিফলন দেখি।
ক্ষমতার রাজনীতিতে অনেক সময় তরুণত্বকে প্রাধান্য দেওয়া হয়; কিন্তু রাষ্ট্রের সাংবিধানিক পদে অভিজ্ঞতা, পরিমিতি, রাজনৈতিক স্মৃতি ও প্রজ্ঞারও বিশেষ মূল্য আছে। মির্জা ফখরুলকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে বেছে নেওয়া সেই অভিজ্ঞতার প্রতি আস্থার একটি দৃষ্টান্ত।
দলীয় নেতা থেকে সবার রাষ্ট্রপতি : রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মির্জা ফখরুলের সামনে সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি ঘটেছে তিনি আর কেবল বিএনপির নেতা নন; তিনি এখন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি। দলীয় রাজনীতির সক্রিয় মঞ্চ থেকে রাষ্ট্রের সাংবিধানিক শীর্ষ পদে তাঁর উত্তরণ তাঁকে একটি নতুন দায়িত্বের সামনে দাঁড় করিয়েছে। বিএনপির প্রতি তাঁর দীর্ঘ আনুগত্য যেমন রাজনৈতিক ইতিহাসের অংশ, তেমনি রাষ্ট্রপতি হিসেবে তাঁকে দল-মত নির্বিশেষে সব নাগরিকের আস্থা অর্জন করতে হবে। এটাই হবে তাঁর নতুন পরিচয়ের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য।
২৫৫ ভোটের রাজনৈতিক বার্তা : ২৫৫ ভোট নিছক একটি সংখ্যা নয়। এটি সংসদে তাঁর প্রতি ব্যাপক সমর্থনের প্রতিফলন। অন্যদিকে অলি আহমদের ৮৮ ভোটও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিরোধী মতের উপস্থিতি নিশ্চিত করেছে। ৩৪৩টি বৈধ ভোটের মধ্যে ২৫৫ ভোট পেয়ে বিজয়ী হওয়া মির্জা ফখরুলকে শক্তিশালী ম্যান্ডেট দিয়েছে। এই নির্বাচনের আরও গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ৩৫ বছর পর রাষ্ট্রপতি পদে সত্যিকার প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখা গেল। গণতন্ত্রের জন্য প্রতিযোগিতা কখনো দুর্বলতা নয়; বরং তা রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রাণশক্তি।

অলি আহমদের অভিনন্দন গণতন্ত্রের সৌন্দর্য : পরাজয়ের পর অলি আহমদ নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুলকে অভিনন্দন জানিয়েছেন এবং গণতন্ত্র, স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, নাগরিক অধিকার ও জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে অভিন্ন অঙ্গীকারের কথা বলেছেন। এই সৌজন্যবোধ আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্য নিঃসন্দেহে ইতিবাচক বার্তা। রাজনীতির সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য এখানেই—প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকবে, কিন্তু প্রতিপক্ষকে শত্রু মনে করতে হবে না। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সেই রাজনৈতিক সৌজন্যের একটি সুন্দর দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে।
বঙ্গভবনের নতুন অধ্যায় : শুক্রবার বঙ্গভবনে শপথ গ্রহণের পর মির্জা ফখরুলের জীবনে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হবে নতুন অধ্যায়। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বঙ্গভবনের দরবার হলে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় তাঁর শপথ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। যে মানুষটি একদিন ঠাকুরগাঁও পৌরসভার নাগরিক সেবার দায়িত্ব নিয়েছিলেন, সেই মানুষই এখন রাষ্ট্রের সাংবিধানিক প্রধানের দায়িত্ব নেবেন। ইতিহাসের কী বিস্ময়কর বাঁক! জীবনের দীর্ঘ পথ কখনো কখনো এমন জায়গায় নিয়ে যায়, যেখানে অতীতের প্রতিটি পদক্ষেপ নতুন অর্থ পেতে শুরু করে।
নতুন রাষ্ট্রপতির কাছে প্রত্যাশা : মির্জা ফখরুলের কাছে আমার ব্যক্তিগত প্রত্যাশা অনেক। তিনি যেন সংবিধান, আইনের শাসন, নাগরিক অধিকার এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মর্যাদাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেন। তিনি যেন রাষ্ট্রপতি ভবনকে কোনো দলের নয়, সমগ্র বাংলাদেশের মানুষের প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। রাজনীতির দীর্ঘ অভিজ্ঞতা তাঁকে শিখিয়েছে মতের পার্থক্য কীভাবে মোকাবিলা করতে হয়। সেই অভিজ্ঞতা যদি রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক দায়িত্বের সঙ্গে যুক্ত হয়, তবে তাঁর মেয়াদ বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি মানুষের আস্থা পুনর্গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বিএনপি পরিবারের সন্তান হিসেবে আমার অনুভূতি :
বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে পারিবারিকভাবে বেড়ে ওঠা একজন মানুষ হিসেবে আজকের দিনটি আমার জন্য নিঃসন্দেহে আবেগের। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আদর্শ, বেগম খালেদা জিয়ার দীর্ঘ সংগ্রাম এবং দেশনায়ক তারেক রহমানের নেতৃত্বের ধারাবাহিকতায় মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের রাষ্ট্রপতি হওয়া আমার কাছে একটি রাজনৈতিক অধ্যায়ের পরিণতি। তবে ব্যক্তিগত রাজনৈতিক অনুভূতির ঊর্ধ্বে একটি বড় প্রত্যাশাও আছে বাংলাদেশ যেন এমন একটি রাষ্ট্রে পরিণত হয়, যেখানে রাজনৈতিক পরিচয় নাগরিক মর্যাদার পথে বাধা হবে না।
পৌর চেয়ারম্যান থেকে রাষ্ট্রপতি এক অনন্য জীবনকাহিনি : মির্জা ফখরুলের জীবনের দিকে ফিরে তাকালে একটি বিষয় বিস্মিত করে তিনি কখনো এক লাফে ক্ষমতার শীর্ষে ওঠেননি। প্রতিটি ধাপ পেরিয়েছেন ধীরে ধীরে। ছাত্রনেতা, শিক্ষক, সরকারি কর্মকর্তা, পৌর চেয়ারম্যান, জেলা বিএনপির নেতা, সংসদ সদস্য, প্রতিমন্ত্রী, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব, ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব, মহাসচিব অবশেষে রাষ্ট্রপতি। এই ধারাবাহিকতাই তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি। তাঁর রাষ্ট্রপতি হওয়া তাই আকস্মিক কোনো ঘটনা নয়; বরং প্রায় ছয় দশকের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও সংগ্রামের এক দীর্ঘ সমাপ্তি এবং একই সঙ্গে নতুন শুরুর নাম।
অভিনন্দনের বর্ণিল বার্তা: মির্জা ফখরুলকে ঘিরে শিক্ষকসমাজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও বিশ্বনেতাদের শুভেচ্ছা :
নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা জানিয়েছেন দেশের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যবৃন্দ, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ এবং বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান ও সরকারপ্রধানরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সংগঠন ইউট্যাবের মহাসচিব ও সাদা দলের আহ্বায়ক, বিএনপির কেন্দ্রীয় গণশিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের সিনিয়র প্রফেসর আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন শিক্ষাবিদ ও গবেষক ড. মোর্শেদ হাসান খান নতুন রাষ্ট্রপতিকে আন্তরিক অভিনন্দন জানিয়ে তাঁর সুস্বাস্থ্য, দীর্ঘায়ু ও সফল রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব কামনা করেছেন। একইভাবে ঢাবি,পবিপ্রবি, ববি, ইবি, রাবি, জবি, শাবিপ্রবি, পিবিপ্রবি, ইসলামি আরবি ও নওগা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও শিক্ষাবিদরা মির্জা ফখরুলের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়াকে স্বাগত জানিয়ে তাঁর নেতৃত্বে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান আরও শক্তিশালী ও মর্যাদাপূর্ণ হবে বলে প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন। দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারাও দলীয় বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে নতুন রাষ্ট্রপতিকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান ও সরকারপ্রধানদের অভিনন্দনবার্তায় প্রতিফলিত হয়েছে বাংলাদেশের সঙ্গে পারস্পরিক সহযোগিতা, বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ও ভবিষ্যৎ অংশীদারিত্ব আরও গভীর করার প্রত্যাশা। ফলে মির্জা ফখরুলের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার মুহূর্তটি শুধু একটি দল বা রাজনৈতিক পরিসরের আনন্দের বিষয় হয়ে থাকেনি; দেশ-বিদেশের নানা মহলের শুভেচ্ছায় তা পরিণত হয়েছে একটি বৃহত্তর রাষ্ট্রীয় ও কূটনৈতিক তাৎপর্যের ঘটনায়।

পরিশেষে, আজ মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর আর শুধু ঠাকুরগাঁওয়ের সন্তান নন, শুধু বিএনপির মহাসচিব নন, শুধু আমার মতো বিএনপি পরিবারের মানুষের প্রিয় নেতা নন—তিনি এখন বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত একজন জাতীয় নেতা। ২০ আগস্টের ২৫৫ ভোটের রায় তাঁকে নিয়ে গেল রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক আসনে। তাঁর এই অর্জনে আমি ব্যক্তিগতভাবে আনন্দিত, আবেগাপ্লুত এবং গর্বিত। প্রিয় রাজনৈতিক নেতা মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে জানাই আন্তরিক অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা। একই সঙ্গে আমাদের গর্ব এবং আমাদের অহংকার জননন্দিত প্রধানমন্ত্রী দেশনায়ক তারেক রহমানকে জানাই অভিনন্দন অভিজ্ঞতা, প্রজ্ঞা ও রাজনৈতিক পরিমিতিবোধকে মূল্যায়নের এই সিদ্ধান্তের জন্য। ইতিহাসের পাতা আজ যেন মৃদু স্বরে একটি গল্প বলছে একদিন যে পথ শুরু হয়েছিল ছাত্ররাজনীতির মিছিলে, যে পথ ঠাকুরগাঁও পৌরসভার সীমানা পেরিয়ে জাতীয় রাজনীতির বিস্তীর্ণ প্রান্তরে ছড়িয়ে পড়েছিল, সেই পথই আজ এসে পৌঁছেছে বঙ্গভবনের দরজায়। এটি শুধু মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের ব্যক্তিগত বিজয় নয়; এটি তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের প্রতি সময়ের এক গভীর স্বীকৃতি। আর বাংলাদেশের মানুষ এখন অপেক্ষা করছে এই নতুন রাষ্ট্রপতি তাঁর অভিজ্ঞতা, প্রজ্ঞা ও সৌজন্যের আলোয় রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদকে কতটা নতুন মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করতে পারেন।
লেখক : জুবাইয়া বিন্তে কবির
অর্থনীতিবিদ, গবেষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট

ডেস্ক রিপোর্ট 






















