ঢাকা ০৬:৪৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ৩১ অগাস্ট ২০২৬

আইফোনের জন্য বিক্রি, রাতেই উদ্ধার দেড় বছরের মুসা এখন তার ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন উদ্যোগ

  • ডেস্ক রিপোর্ট
  • প্রকাশিত : ০৪:০৯:২৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ৩১ অগাস্ট ২০২৬
  • ৭ বার দেখা হয়েছে

পটুয়াখালী প্রতিনিধি: রোববার রাত তখন প্রায় ১০টা। পটুয়াখালীর দশমিনা থানায় একে একে কয়েকজন মানুষ এসে হাজির হলেন। তাঁদের সঙ্গে ছিল দেড় বছরের এক শিশু-মুসা।
কিছুক্ষণ আগেও যে শিশুটির অবস্থান নিয়ে ছিল অনিশ্চয়তা, কোথায় আছে, কার কাছে আছে, তা নিয়ে উদ্বেগে ছিল পরিবার। রাতের মধ্যে সেই শিশুকেই উদ্ধার করে থানায় নিয়ে আসা হয়।
পরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মাহমুদ হাসানের উপস্থিতিতে শিশু মুসাকে তার দাদা মফিজ মুন্সী ও দাদী মাহফুজা বেগমের জিম্মায় দেওয়া হয়। তাঁরা এখন শিশুটির লালন-পালনের দায়িত্ব নিয়েছেন।
তবে মুসাকে উদ্ধারের মধ্য দিয়ে ঘটনার শেষ হয়নি। বরং সামনে এসেছে আরও বড় প্রশ্ন, দেড় বছরের একটি শিশুকে কীভাবে এক লাখ টাকার বিনিময়ে অন্যের কাছে দেওয়া হলো? আর সেই টাকা দিয়ে বাবার নতুন আইফোন কেনার অভিযোগই বা কতটা সত্য?
পটুয়াখালীর দশমিনা উপজেলার বেতাগী-সানকিপুর ইউনিয়নের বড় গোপালদী গ্রামের এই ঘটনা এখন এলাকায় ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, শনিবার সকাল ৮টার দিকে মুসার বাবা মারুফ মুন্সী বাড়িতে আসেন। মায়ের কাছে গিয়ে তিনি বলেন, ছেলেকে নিয়ে একটু বাজারে ঘুরতে যাবেন।
দেড় বছরের নাতিকে গোসল করিয়ে জামাকাপড় পরিয়ে বাবার হাতে তুলে দেন দাদি মাহফুজা বেগম। তখনও কেউ ভাবতে পারেননি, কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই শিশুটিকে ঘিরে এমন একটি ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে।
সকাল গড়িয়ে দুপুর, এরপর সন্ধ্যা। কিন্তু মারুফ ও মুসা কেউই বাড়িতে ফিরছিলেন না। উদ্বিগ্ন হয়ে স্বজনেরা বিভিন্ন জায়গায় খোঁজ করতে শুরু করেন।
একপর্যায়ে মারুফের মামা বাহাদুর মিয়ার মাধ্যমে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। পরিবারের দাবি, তখনই মারুফ জানান, তিনি মুসাকে এক লাখ টাকার বিনিময়ে ইমরান হোসেন নামের এক ব্যক্তির কাছে দিয়ে দিয়েছেন। এরপর থেকেই শিশুটিকে উদ্ধারে তৎপর হয়ে ওঠে পরিবার ও প্রশাসন।

পুলিশের অনুসন্ধানে জানা যায়, শিশুটিকে দশমিনা থেকে পাশের গলাচিপা উপজেলার চরবিশ্বাস ইউনিয়নের একটি এলাকায় রাখা হয়েছে।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, মারুফকে জিজ্ঞাসাবাদ করে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ইমরান হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। পরে ইমরান জানান, শিশুটিকে তাঁর শ্বশুর মাহাবুব গাজীর বাড়িতে রাখা হয়েছে।
রোববার রাত ১০টার দিকে মাহাবুব গাজী শিশুটিকে নিয়ে দশমিনা থানায় উপস্থিত হন।
সেখানেই প্রশাসনের উপস্থিতিতে মুসাকে তার দাদা-দাদীর কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়।
দশমিনা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আতিকুল ইসলাম বলেন, পুলিশের বিশেষ কৌশলে শিশুটিকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। পরে ইউএনওর উপস্থিতিতে তাকে দাদা-দাদীর জিম্মায় দেওয়া হয়েছে।
শিশুটিকে উদ্ধারের পর এখন তদন্তের অন্যতম বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে এক লাখ টাকা লেনদেনের অভিযোগ। পরিবারের দাবি, মারুফ এক লাখ টাকার বিনিময়ে শিশুটিকে ইমরান হোসেনের কাছে লিখিতভাবে দিয়ে দেন। ইমরানও শিশুটিকে এক লাখ টাকার বিনিময়ে নেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন বলে জানিয়েছে পরিবার।
তবে কেন তিনি শিশুটিকে নিয়েছিলেন, এ নিয়েও তাঁর বক্তব্য রয়েছে।
ইমরানের ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁর শ্বশুরের পাঁচ মেয়ে থাকলেও কোনো ছেলে সন্তান নেই। এ কারণে পরিবারের সঙ্গে আলোচনা করে মুসাকে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।
পুলিশ এখন এই লেনদেন, লিখিত কাগজপত্র এবং শিশুটিকে কার কাছে, কী উদ্দেশ্যে দেওয়া হয়েছিল, এসব বিষয় খতিয়ে দেখছে।
ঘটনার সঙ্গে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে একটি নতুন আইফোন।
পরিবারের অভিযোগ, মুসাকে দেওয়ার বিনিময়ে পাওয়া টাকা নিয়ে মারুফ ঢাকায় চলে যান। সেখানে পুরোনো মোবাইল ফোন পরিবর্তন করে নতুন আইফোন কেনেন।
পরিবারের দাবি, পুরোনো আইফোনের সঙ্গে অতিরিক্ত টাকা যোগ করে নতুন ফোনটি কেনা হয়েছে। তবে এই অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা তাৎক্ষণিকভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। পুলিশের তদন্তেই বিষয়টি স্পষ্ট হবে। ঘটনার প্রকৃত কারণ এবং টাকা কীভাবে খরচ হয়েছে, সেটিও তদন্তের অংশ বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা।
পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মুসার বাবা-মায়ের সংসারে বেশ কিছুদিন ধরেই অশান্তি চলছিল। প্রায় এক মাস আগে পারিবারিক কলহের জেরে মুসার মা বৃষ্টি বাবার বাড়ি সাভারে চলে যান।
মাহফুজা বেগমের ভাষ্য, প্রায় চার বছর আগে মারুফ সাভারের বৃষ্টিকে বিয়ে করে বাড়িতে আনেন। তাঁদের সংসারে প্রায় তিন বছর পর মুসার জন্ম হয়।
স্ত্রী চলে যাওয়ার পর কিছুদিন বাড়িতে ছিলেন মারুফ। পরে আবার ঢাকায় চলে যান। ঘটনার দুই দিন আগে তিনি বাড়িতে ফেরেন।
পরদিন সকালে ছেলেকে নিয়ে বের হওয়ার পরই ঘটে এই ঘটনা।
ফলে পারিবারিক বিরোধ, মারুফের আর্থিক অবস্থা এবং শিশুটিকে অন্যের কাছে দেওয়ার সিদ্ধান্ত, সবকিছুই তদন্তে গুরুত্ব পাচ্ছে।
শিশুটিকে উদ্ধার করে দাদা-দাদীর কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হলেও এখানেই দায়িত্ব শেষ করতে চাইছে না উপজেলা প্রশাসন।
ইউএনও মো. মাহমুদ হাসান জানিয়েছেন, মুসার ভবিষ্যতের কথা বিবেচনা করে তার নামে একটি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
শিশুটির কল্যাণে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় সব ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও জানিয়েছেন তিনি।
এ উদ্যোগের গুরুত্ব এখানেই, একটি শিশুকে শুধু উদ্ধার করলেই তার নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না। তার বেড়ে ওঠা, শিক্ষা, চিকিৎসা এবং ভবিষ্যতের জন্যও প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি সহায়তা।
মুসা এখন তার দাদা-দাদীর কাছে। কিন্তু তার জীবনের এই অস্বাভাবিক শুরু হয়তো পরিবারের জন্য দীর্ঘদিনের একটি দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে থাকবে।
শিশুটিকে উদ্ধারের পর এখন ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
মুসাকে কার কাছে দেওয়া হয়েছিল, কীভাবে টাকা লেনদেন হয়েছে, কোনো লিখিত চুক্তি করা হয়েছিল কি না এবং শিশুটিকে অন্যের কাছে দেওয়ার পেছনে আর কোনো ব্যক্তি জড়িত ছিলেন কি না, এসব বিষয় তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
ওসি মো. আতিকুল ইসলাম বলেন, মারুফ ও ইমরানকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে এবং ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্তের পর প্রকৃত ঘটনা আরও পরিষ্কার হবে।
এদিকে নাতিকে ফিরে পাওয়ার পর কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে মুসার দাদা-দাদীর পরিবারে।
দাদি মাহফুজা বেগমের কথায় সেই স্বস্তির সঙ্গে মিশে আছে আতঙ্কও।
তিনি চান, তাঁর নাতি যেন নিরাপদে বড় হয়। কারণ দেড় বছরের মুসা এখনও জানে না, কয়েক ঘণ্টার জন্য বাবার সঙ্গে বেরিয়ে যাওয়ার পর তাকে ঘিরে কতটা ভয়াবহ এক গল্প তৈরি হয়েছিল।
সে জানে না, এক লাখ টাকার বিনিময়ে তাকে অন্যের কাছে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল। জানে না, তাকে উদ্ধারে রাতে ছুটতে হয়েছিল পুলিশ ও প্রশাসনকে। আর এখন তার ভবিষ্যৎ সুরক্ষায় তার নামে ব্যাংক হিসাব খোলার উদ্যোগ নিয়েছে উপজেলা প্রশাসন।
মুসার জন্য হয়তো এই উদ্ধারই একটি নতুন শুরুর জায়গা, যেখানে তার পরিচয় কোনো লেনদেনের বস্তু হিসেবে নয়, বরং একটি শিশুর নিরাপদ ভবিষ্যৎ হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত হবে।

জনপ্রিয় সংবাদ

প্রধান শিক্ষকদের ওপর বাড়ছে নজরদারি, পিডিএস হালনাগাদের নির্দেশ মাউশির

আইফোনের জন্য বিক্রি, রাতেই উদ্ধার দেড় বছরের মুসা এখন তার ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন উদ্যোগ

প্রকাশিত : ০৪:০৯:২৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ৩১ অগাস্ট ২০২৬

পটুয়াখালী প্রতিনিধি: রোববার রাত তখন প্রায় ১০টা। পটুয়াখালীর দশমিনা থানায় একে একে কয়েকজন মানুষ এসে হাজির হলেন। তাঁদের সঙ্গে ছিল দেড় বছরের এক শিশু-মুসা।
কিছুক্ষণ আগেও যে শিশুটির অবস্থান নিয়ে ছিল অনিশ্চয়তা, কোথায় আছে, কার কাছে আছে, তা নিয়ে উদ্বেগে ছিল পরিবার। রাতের মধ্যে সেই শিশুকেই উদ্ধার করে থানায় নিয়ে আসা হয়।
পরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মাহমুদ হাসানের উপস্থিতিতে শিশু মুসাকে তার দাদা মফিজ মুন্সী ও দাদী মাহফুজা বেগমের জিম্মায় দেওয়া হয়। তাঁরা এখন শিশুটির লালন-পালনের দায়িত্ব নিয়েছেন।
তবে মুসাকে উদ্ধারের মধ্য দিয়ে ঘটনার শেষ হয়নি। বরং সামনে এসেছে আরও বড় প্রশ্ন, দেড় বছরের একটি শিশুকে কীভাবে এক লাখ টাকার বিনিময়ে অন্যের কাছে দেওয়া হলো? আর সেই টাকা দিয়ে বাবার নতুন আইফোন কেনার অভিযোগই বা কতটা সত্য?
পটুয়াখালীর দশমিনা উপজেলার বেতাগী-সানকিপুর ইউনিয়নের বড় গোপালদী গ্রামের এই ঘটনা এখন এলাকায় ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, শনিবার সকাল ৮টার দিকে মুসার বাবা মারুফ মুন্সী বাড়িতে আসেন। মায়ের কাছে গিয়ে তিনি বলেন, ছেলেকে নিয়ে একটু বাজারে ঘুরতে যাবেন।
দেড় বছরের নাতিকে গোসল করিয়ে জামাকাপড় পরিয়ে বাবার হাতে তুলে দেন দাদি মাহফুজা বেগম। তখনও কেউ ভাবতে পারেননি, কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই শিশুটিকে ঘিরে এমন একটি ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে।
সকাল গড়িয়ে দুপুর, এরপর সন্ধ্যা। কিন্তু মারুফ ও মুসা কেউই বাড়িতে ফিরছিলেন না। উদ্বিগ্ন হয়ে স্বজনেরা বিভিন্ন জায়গায় খোঁজ করতে শুরু করেন।
একপর্যায়ে মারুফের মামা বাহাদুর মিয়ার মাধ্যমে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। পরিবারের দাবি, তখনই মারুফ জানান, তিনি মুসাকে এক লাখ টাকার বিনিময়ে ইমরান হোসেন নামের এক ব্যক্তির কাছে দিয়ে দিয়েছেন। এরপর থেকেই শিশুটিকে উদ্ধারে তৎপর হয়ে ওঠে পরিবার ও প্রশাসন।

পুলিশের অনুসন্ধানে জানা যায়, শিশুটিকে দশমিনা থেকে পাশের গলাচিপা উপজেলার চরবিশ্বাস ইউনিয়নের একটি এলাকায় রাখা হয়েছে।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, মারুফকে জিজ্ঞাসাবাদ করে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ইমরান হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। পরে ইমরান জানান, শিশুটিকে তাঁর শ্বশুর মাহাবুব গাজীর বাড়িতে রাখা হয়েছে।
রোববার রাত ১০টার দিকে মাহাবুব গাজী শিশুটিকে নিয়ে দশমিনা থানায় উপস্থিত হন।
সেখানেই প্রশাসনের উপস্থিতিতে মুসাকে তার দাদা-দাদীর কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়।
দশমিনা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আতিকুল ইসলাম বলেন, পুলিশের বিশেষ কৌশলে শিশুটিকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। পরে ইউএনওর উপস্থিতিতে তাকে দাদা-দাদীর জিম্মায় দেওয়া হয়েছে।
শিশুটিকে উদ্ধারের পর এখন তদন্তের অন্যতম বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে এক লাখ টাকা লেনদেনের অভিযোগ। পরিবারের দাবি, মারুফ এক লাখ টাকার বিনিময়ে শিশুটিকে ইমরান হোসেনের কাছে লিখিতভাবে দিয়ে দেন। ইমরানও শিশুটিকে এক লাখ টাকার বিনিময়ে নেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন বলে জানিয়েছে পরিবার।
তবে কেন তিনি শিশুটিকে নিয়েছিলেন, এ নিয়েও তাঁর বক্তব্য রয়েছে।
ইমরানের ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁর শ্বশুরের পাঁচ মেয়ে থাকলেও কোনো ছেলে সন্তান নেই। এ কারণে পরিবারের সঙ্গে আলোচনা করে মুসাকে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।
পুলিশ এখন এই লেনদেন, লিখিত কাগজপত্র এবং শিশুটিকে কার কাছে, কী উদ্দেশ্যে দেওয়া হয়েছিল, এসব বিষয় খতিয়ে দেখছে।
ঘটনার সঙ্গে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে একটি নতুন আইফোন।
পরিবারের অভিযোগ, মুসাকে দেওয়ার বিনিময়ে পাওয়া টাকা নিয়ে মারুফ ঢাকায় চলে যান। সেখানে পুরোনো মোবাইল ফোন পরিবর্তন করে নতুন আইফোন কেনেন।
পরিবারের দাবি, পুরোনো আইফোনের সঙ্গে অতিরিক্ত টাকা যোগ করে নতুন ফোনটি কেনা হয়েছে। তবে এই অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা তাৎক্ষণিকভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। পুলিশের তদন্তেই বিষয়টি স্পষ্ট হবে। ঘটনার প্রকৃত কারণ এবং টাকা কীভাবে খরচ হয়েছে, সেটিও তদন্তের অংশ বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা।
পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মুসার বাবা-মায়ের সংসারে বেশ কিছুদিন ধরেই অশান্তি চলছিল। প্রায় এক মাস আগে পারিবারিক কলহের জেরে মুসার মা বৃষ্টি বাবার বাড়ি সাভারে চলে যান।
মাহফুজা বেগমের ভাষ্য, প্রায় চার বছর আগে মারুফ সাভারের বৃষ্টিকে বিয়ে করে বাড়িতে আনেন। তাঁদের সংসারে প্রায় তিন বছর পর মুসার জন্ম হয়।
স্ত্রী চলে যাওয়ার পর কিছুদিন বাড়িতে ছিলেন মারুফ। পরে আবার ঢাকায় চলে যান। ঘটনার দুই দিন আগে তিনি বাড়িতে ফেরেন।
পরদিন সকালে ছেলেকে নিয়ে বের হওয়ার পরই ঘটে এই ঘটনা।
ফলে পারিবারিক বিরোধ, মারুফের আর্থিক অবস্থা এবং শিশুটিকে অন্যের কাছে দেওয়ার সিদ্ধান্ত, সবকিছুই তদন্তে গুরুত্ব পাচ্ছে।
শিশুটিকে উদ্ধার করে দাদা-দাদীর কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হলেও এখানেই দায়িত্ব শেষ করতে চাইছে না উপজেলা প্রশাসন।
ইউএনও মো. মাহমুদ হাসান জানিয়েছেন, মুসার ভবিষ্যতের কথা বিবেচনা করে তার নামে একটি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
শিশুটির কল্যাণে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় সব ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও জানিয়েছেন তিনি।
এ উদ্যোগের গুরুত্ব এখানেই, একটি শিশুকে শুধু উদ্ধার করলেই তার নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না। তার বেড়ে ওঠা, শিক্ষা, চিকিৎসা এবং ভবিষ্যতের জন্যও প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি সহায়তা।
মুসা এখন তার দাদা-দাদীর কাছে। কিন্তু তার জীবনের এই অস্বাভাবিক শুরু হয়তো পরিবারের জন্য দীর্ঘদিনের একটি দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে থাকবে।
শিশুটিকে উদ্ধারের পর এখন ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
মুসাকে কার কাছে দেওয়া হয়েছিল, কীভাবে টাকা লেনদেন হয়েছে, কোনো লিখিত চুক্তি করা হয়েছিল কি না এবং শিশুটিকে অন্যের কাছে দেওয়ার পেছনে আর কোনো ব্যক্তি জড়িত ছিলেন কি না, এসব বিষয় তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
ওসি মো. আতিকুল ইসলাম বলেন, মারুফ ও ইমরানকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে এবং ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্তের পর প্রকৃত ঘটনা আরও পরিষ্কার হবে।
এদিকে নাতিকে ফিরে পাওয়ার পর কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে মুসার দাদা-দাদীর পরিবারে।
দাদি মাহফুজা বেগমের কথায় সেই স্বস্তির সঙ্গে মিশে আছে আতঙ্কও।
তিনি চান, তাঁর নাতি যেন নিরাপদে বড় হয়। কারণ দেড় বছরের মুসা এখনও জানে না, কয়েক ঘণ্টার জন্য বাবার সঙ্গে বেরিয়ে যাওয়ার পর তাকে ঘিরে কতটা ভয়াবহ এক গল্প তৈরি হয়েছিল।
সে জানে না, এক লাখ টাকার বিনিময়ে তাকে অন্যের কাছে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল। জানে না, তাকে উদ্ধারে রাতে ছুটতে হয়েছিল পুলিশ ও প্রশাসনকে। আর এখন তার ভবিষ্যৎ সুরক্ষায় তার নামে ব্যাংক হিসাব খোলার উদ্যোগ নিয়েছে উপজেলা প্রশাসন।
মুসার জন্য হয়তো এই উদ্ধারই একটি নতুন শুরুর জায়গা, যেখানে তার পরিচয় কোনো লেনদেনের বস্তু হিসেবে নয়, বরং একটি শিশুর নিরাপদ ভবিষ্যৎ হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত হবে।