ঢাকা ০৮:৫৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

খুঁটিতে বাঁধা সেই অনিককে পাঠানো হলো রিহ্যাবে *পরিবারের দায়িত্ব নিয়েছেন মানবিক ইউএনও

  • ডেস্ক রিপোর্ট
  • প্রকাশিত : ০৭:৩০:০৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • ৫ বার দেখা হয়েছে
বরিশাল প্রতিনিধি: চুরির অপবাদ দিয়ে বাজারের মধ্যকার একটি খুঁটিতে রায়হানুল হক অনিক নামের এক যুবককে বেঁধে রেখে রাতভর করা হয় অমানুষিক নির্যাতন। তিনি নির্যাতনকারীদের কাছে এক ফোঁটা পানির জন্য আকুতি-মিনতি জানিয়েও তা পাননি। সকালে লোকমুখে বাবাকে বেঁধে মারধর করার খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুঁটে আসে তার চতুর্থ শ্রেনীতে পড়ুয়া কন্যা তুবা বিনতে অরনি।
শিশু কন্যার সামনে বসেও তার বাবাকে স্থানীয় কতিপয় ব্যক্তি মারধর করে। এসময় হামলাকারীদের পায়ে জড়িয়ে ধরে বাবাকে না মারার জন্য কান্নাকাটি করে শিশু তুবা। একপর্যায়ে মেয়ের কাছে একটু পানি খাওয়ার আবদার করেন বেঁধে রাখা বাবা অনিক। তাৎক্ষনিক বাজারের একটি দোকান থেকে পানিসহ একটি রুটি ও এক কাপ চা এনে নিজ হাতে বেঁধে রাখা বাবাকে পরম যত্নে খাইয়ে দিচ্ছিলেন শিশু তুবা।
কৌতুহল বশত ঘটনাস্থলে উপস্থিত এক যুবক চুরির অপবাদে বেঁধে রাখা বাবার প্রতি তার শিশু কন্যার ভালবাসার এ দৃশ্যটি মোবাইলের ক্যামেরাবন্দি করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে পোস্ট করেন। মুহুর্তের মধ্যে সেই ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পাশাপাশি দেশ-বিদেশের নেটিজেনদের হৃদয়কে নাড়া দিয়েছে। একপর্যায়ে বাবার প্রতি মেয়ের ভালোবাসা আর মমতার কাছে পরাজিত হয় জনতার কঠোরতা। আর জয়ী হয়েছে, একটি ছোট্ট নিষ্পাপ মেয়ের নিঃস্বার্থ ভালোবাসা। ব্যাপক আলোচিত এ ঘটনাটি বরিশালের উজিরপুর উপজেলার বামরাইল বাজারের।
মেয়ের ভালোবাসা পাওয়া বাবা অনিক বদলে যেতে চান :
কয়েকদিন আগেও যাকে ঘিরে ছিল চুরি কিংবা মাদকাসক্তের অপবাদ। আজ তার বাড়িতে সহানুভূতি হাত নিয়ে ভিড় জমাচ্ছেন মানুষ। বরিশালের উজিরপুর উপজেলার বামরাইল এলাকার অনিক সরদারের পরিবারের জীবনে আকস্মিক পরিবর্তনের নেপথ্যে রয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া একটি হৃদয়স্পর্শী ভিডিও। তারই ধারাবাহিকতায় গত ২৭ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় উজিরপুর উপজেলার মানবিক নির্বাহী অফিসার হিসেবে ব্যাপকখ্যাতি অর্জন করা মো. আলী সুজা হাজির হন অনিকের বাড়িতে। তার উপস্থিতি পরিবারটির জন্য নতুন আশার সঞ্চার করেছে।
অনিকের স্ত্রী জান্নাতুল ফেরদাউস জানিয়েছেন, তিনি এইচএসসি পাস। তাদের দুই সন্তান তুবা (৯) ও তুরিন ইসলাম তুনা (৩)। সংসারে আয়ের কোনো নির্দিষ্ট পথ নেই, অভাব-অনটনের মধ্যেই তাদের দিন কাটছে। সন্তানদের মানুষ করতে হলে স্বামীর কর্মসংস্থান কিংবা নিজের জন্য একটি চাকরি প্রয়োজন। তার ভাষায়, স্বামী অনিক তার মেয়ের ভালবাসায় এখন অন্ধকারের পথ ছেড়ে আলোর পথে ফিরে আসতে চান।
অশ্রুসজল নয়নে অনিক সরদার বলেন, আমি ভালোভাবে জীবনযাপন করতে চাই। কেউ যদি আমাকে আয়-রোজগারের একটি পথ তৈরি করে দেন, নিজেকে বদলে ফেলবো। দুই মুঠো ডাল-ভাত খেয়ে হলেও সন্তানদের ভবিষ্যত গড়ে তোলার জন্য একটি চাকরির আবেদন জানিয়ে তিনি সমাজের বিত্তবানদের প্রতি আহবান করেছেন।
উজিরপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. আলী সুজা বলেন, বাবার প্রতি মেয়ের এই ভালোবাসা দেখেছে সারা বিশ্বের মানুষ। অনিক সরদার যদি সত্যিকার অর্থে আলোর পথে ফিরে আসেন, তাহলে সরকারিভাবে সহায়তা করে পরিবারটির পাশে দাঁড়াবে প্রশাসন।
আমার বাবা ভালো বাবা, মিথ্যে অপবাদ দেওয়া হয়েছে :
আমার বাবা ভালো বাবা, তার বিরুদ্ধে মিথ্যে অপবাদ দেওয়া হয়েছে, কথাগুলো বলতে বলতে হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে বরিশালের উজিরপুরের বামরাইলের আলোচিত শিশুকন্যা তুবা বিনতে অরনি। বাবার সাথে অন্যায় কিছু না হোক, বাবা ভালো হয়ে ফিরে আসুন, এই কামনায় সোমবার দুপুরে বাবাকে তিন মাসের জন্য বিদায় জানিয়েছে ছোট্ট তুবা।
তুবার বাবা অনিক সরদারকে ২৬ সেপ্টেম্বর মধ্যরাত থেকে বেলা সাড়ে এগারোটা পর্যন্ত চুরির অপবাদ দিয়ে বেঁধে রেখে মারধর করার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় কতিপয় ব্যক্তির বিরুদ্ধে। সেই ঘটনায় আহত বাবাকে বেঁধে রাখা অবস্থায় নিজ হাতে চা ও রুটি খাওয়ানোর একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি হয়।
পরে স্থানীয় প্রশাসন নড়ে-চড়ে বসে এবং তুবা ও তার পরিবারের পাশে সহযোগিতার হাত বাড়ায়। বামরাইলের স্থানীয় একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী তুবা বিনতে অরনি। লিখিত মুচলেকা দিয়ে বাবাকে মুক্ত করে বাড়িতে নিয়ে আসার পর দুইদিন ধরে নিজের সন্তানের মতো বাবাকে নিজের কাছে আগলে রেখে সাহস ও শক্তি জুগিয়েছে ছোট্ট তুবা। তবে এবার বাবার জন্য টানা তিন মাস অপেক্ষা করতে হবে সাহসী কন্যা তুবাকে।
সূত্রমতে, ২৮ সেপ্টেম্বর দুপুরে তুবার বাবা উজিরপুর উপজেলার বামরাইল এলাকার আলোচিত অনিক সরদারকে উপজেলা প্রশাসন মাদকাশক্তি নিরাময় কেন্দ্র (রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টার বা পুনর্বাসন কেন্দ্র) পাঠিয়েছেন। তুবার মা জান্নাত বলেন, ওই রাতে খবর পেয়ে আমরা সবাই দৌঁড়ে ঘটনাস্থলে যাই। তুবা তো স্যান্ডেল পরারও সময় নেয়নি, সোজা দৌঁড়ে বাবার কাছে যায়। ওর সামনে ওর বাবারে যখন মারতে ছিলো, তখন তুবা শুধু জোরে জোরে চিৎকার দিয়ে কান্না করে ওর বাবাকে জড়িয়ে ধরে মারতে নিষেধ করছে। কেউ ওর কথা প্রথমে শোনেনি, অনেকে তো ভিডিও করে মজাও নিছে।
চুরির অপবাদে মারধরের শিকার অনিক সরদারের দাবি, পূর্বশত্রুতা ও জমি নিয়ে বিরোধের জেরধরে তাকে মিথ্যে অপবাদ দিয়ে এমন অত্যাচার করা হয়েছে। তিনি বলেন, আমার কাছ থেকে চুরির কোনো মালামাল যেমন উদ্ধার হয়নি, তেমনি কোনো প্রমাণও দেখাতে পারেনি। পরিকল্পনাকারীরা সবসময় চায় আমি যেন আমার পৈত্রিক ভিটায় না থাকতে পারি।
অনিক আরও বলেন, কোনো মেয়ে চায় না তার বাবা আমার মতো ওই রাতের অবস্থায় থাকুক। আমিও তা চাইনি। আমার মেয়ে যখন আমাকে বেঁধে মারতে দেখেছে, তখন আমার তো মরে যেতে মন চাইছে। কারণ ওইরকম মর্মান্তিক দৃশ্য পৃথিবীতে আর আছে কি না, তা কেউ বলতে পারবে না। এখন আমি সবার সহযোগিতায় সুস্থ্য স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে চাই।
উজিরপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. আলী সুজা বলেন, অনিক ও তার স্ত্রীর দাবি অনুযায়ী সে (অনিক) কিছুটা মাদকাসক্ত। তাই প্রথমপর্যায়ে অনিক ও তার পরিবারের সাথে আলোচনা করে অনিক সরদারকে সংশোধনের জন্য মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের সহায়তায় সোমবার দুপুরে গাড়িতে করে রিহ্যাবে পাঠানো হয়েছে। তিনি সেখানে তিনমাস থেকে চিকিৎসা গ্রহণ করবেন।
ইউএনও আরও বলেন, অনিক সুস্থ্য হয়ে ফিরে না আসা পর্যন্ত তার স্ত্রী ও সন্তানদের ভরন পোষনে যা যা প্রয়োজন তা স্থানীয় রাজনৈতিক, সামাজিক ও প্রবাসীদের সহযোগিতা করা হবে। তিনি বলেন, অনিকের বড় মেয়ে তুবা যে স্কুলে লেখাপড়া করছে সেখানে আমি নিজে গিয়ে খোঁজখবর নিয়েছি। তার শিক্ষকদের সাথে লেখাপড়ার বিষয়ে কথা বলেছি। তারা তুবার পড়ালেখার প্রতি বিশেষ নজর রাখবেন বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এছাড়া আমি ব্যক্তিগতভাবে তুবার পড়ালেখা চালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে সার্বিক সহযোগিতা করবো। পাশাপাশি তুবার একটি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা হচ্ছে। যদি কেউ তাকে সহযোগিতা করতে চায়, তাহলে সেখানে তারা সহযোগিতার অর্থ পাঠাতে পারবেন।
অনিককে মাদক নিরাময় কেন্দ্রে পাঠানোর সময় উজিরপুর উপজেলা বিএনপির সিনিয়র সহ-সভাপতি এসএম আলাউদ্দিন নগদ অর্থ দিয়ে পরিবারটিকে সহযোগিতা করেছেন জানিয়ে উজিরপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. আলী সুজা বলেন, অনিকের ঘটনায় মানুষ কোনো কিছুই ভাবেনি। শুধু বাবার প্রতি মেয়ের ভালোবাসার বিষয়টি দেখেছেন। ভূক্তভোগী কর্মহীন শিক্ষিত যুবক রায়হানুল হক অনিক ভালভাবে সুস্থ্য জীবনে ফিরে আসতে পারলে, তাকে কর্মজীবী করে তোলার ঘোষণা দিয়েছেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. আলী সুজা।
উল্লেখ্য, গত ২৫ সেপ্টেম্বর দিবাগত গভীর রাতে বামরাইল বাজারের একটি দোকানে চুরির চেষ্টাকালে জনতার হাতে ধরা পরার অপবাদ দিয়ে কতিপয় ব্যক্তি অনিক সরদারকে অমানুষিক নির্যাতন করে বাজারের একটি খুঁটির সাথে বেঁধে রাখে। খবর পেয়ে শনিবার সকালে ঘটনাস্থলে ছুটে আসে অনিকের মেয়ে তুবা। সারারাত অনাহারে ছিলেন বাবা। এ জন্য বাজারের একটি দোকান থেকে রুটি ও চা এনে নিজের হাতে পরম যত্নে বাবার মুখে তুলে দেয় তুবা। এসময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত এক যুবক ঘটনাটি মোবাইল ফোনে ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিলে মুহুর্তের মধ্যে তা ব্যাপকভাবে ভাইরাল হয়।

ফরিদপুরে শিশু ধর্ষণ মামলায় যুবকের যাবজ্জীবন

খুঁটিতে বাঁধা সেই অনিককে পাঠানো হলো রিহ্যাবে *পরিবারের দায়িত্ব নিয়েছেন মানবিক ইউএনও

প্রকাশিত : ০৭:৩০:০৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
বরিশাল প্রতিনিধি: চুরির অপবাদ দিয়ে বাজারের মধ্যকার একটি খুঁটিতে রায়হানুল হক অনিক নামের এক যুবককে বেঁধে রেখে রাতভর করা হয় অমানুষিক নির্যাতন। তিনি নির্যাতনকারীদের কাছে এক ফোঁটা পানির জন্য আকুতি-মিনতি জানিয়েও তা পাননি। সকালে লোকমুখে বাবাকে বেঁধে মারধর করার খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুঁটে আসে তার চতুর্থ শ্রেনীতে পড়ুয়া কন্যা তুবা বিনতে অরনি।
শিশু কন্যার সামনে বসেও তার বাবাকে স্থানীয় কতিপয় ব্যক্তি মারধর করে। এসময় হামলাকারীদের পায়ে জড়িয়ে ধরে বাবাকে না মারার জন্য কান্নাকাটি করে শিশু তুবা। একপর্যায়ে মেয়ের কাছে একটু পানি খাওয়ার আবদার করেন বেঁধে রাখা বাবা অনিক। তাৎক্ষনিক বাজারের একটি দোকান থেকে পানিসহ একটি রুটি ও এক কাপ চা এনে নিজ হাতে বেঁধে রাখা বাবাকে পরম যত্নে খাইয়ে দিচ্ছিলেন শিশু তুবা।
কৌতুহল বশত ঘটনাস্থলে উপস্থিত এক যুবক চুরির অপবাদে বেঁধে রাখা বাবার প্রতি তার শিশু কন্যার ভালবাসার এ দৃশ্যটি মোবাইলের ক্যামেরাবন্দি করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে পোস্ট করেন। মুহুর্তের মধ্যে সেই ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পাশাপাশি দেশ-বিদেশের নেটিজেনদের হৃদয়কে নাড়া দিয়েছে। একপর্যায়ে বাবার প্রতি মেয়ের ভালোবাসা আর মমতার কাছে পরাজিত হয় জনতার কঠোরতা। আর জয়ী হয়েছে, একটি ছোট্ট নিষ্পাপ মেয়ের নিঃস্বার্থ ভালোবাসা। ব্যাপক আলোচিত এ ঘটনাটি বরিশালের উজিরপুর উপজেলার বামরাইল বাজারের।
মেয়ের ভালোবাসা পাওয়া বাবা অনিক বদলে যেতে চান :
কয়েকদিন আগেও যাকে ঘিরে ছিল চুরি কিংবা মাদকাসক্তের অপবাদ। আজ তার বাড়িতে সহানুভূতি হাত নিয়ে ভিড় জমাচ্ছেন মানুষ। বরিশালের উজিরপুর উপজেলার বামরাইল এলাকার অনিক সরদারের পরিবারের জীবনে আকস্মিক পরিবর্তনের নেপথ্যে রয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া একটি হৃদয়স্পর্শী ভিডিও। তারই ধারাবাহিকতায় গত ২৭ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় উজিরপুর উপজেলার মানবিক নির্বাহী অফিসার হিসেবে ব্যাপকখ্যাতি অর্জন করা মো. আলী সুজা হাজির হন অনিকের বাড়িতে। তার উপস্থিতি পরিবারটির জন্য নতুন আশার সঞ্চার করেছে।
অনিকের স্ত্রী জান্নাতুল ফেরদাউস জানিয়েছেন, তিনি এইচএসসি পাস। তাদের দুই সন্তান তুবা (৯) ও তুরিন ইসলাম তুনা (৩)। সংসারে আয়ের কোনো নির্দিষ্ট পথ নেই, অভাব-অনটনের মধ্যেই তাদের দিন কাটছে। সন্তানদের মানুষ করতে হলে স্বামীর কর্মসংস্থান কিংবা নিজের জন্য একটি চাকরি প্রয়োজন। তার ভাষায়, স্বামী অনিক তার মেয়ের ভালবাসায় এখন অন্ধকারের পথ ছেড়ে আলোর পথে ফিরে আসতে চান।
অশ্রুসজল নয়নে অনিক সরদার বলেন, আমি ভালোভাবে জীবনযাপন করতে চাই। কেউ যদি আমাকে আয়-রোজগারের একটি পথ তৈরি করে দেন, নিজেকে বদলে ফেলবো। দুই মুঠো ডাল-ভাত খেয়ে হলেও সন্তানদের ভবিষ্যত গড়ে তোলার জন্য একটি চাকরির আবেদন জানিয়ে তিনি সমাজের বিত্তবানদের প্রতি আহবান করেছেন।
উজিরপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. আলী সুজা বলেন, বাবার প্রতি মেয়ের এই ভালোবাসা দেখেছে সারা বিশ্বের মানুষ। অনিক সরদার যদি সত্যিকার অর্থে আলোর পথে ফিরে আসেন, তাহলে সরকারিভাবে সহায়তা করে পরিবারটির পাশে দাঁড়াবে প্রশাসন।
আমার বাবা ভালো বাবা, মিথ্যে অপবাদ দেওয়া হয়েছে :
আমার বাবা ভালো বাবা, তার বিরুদ্ধে মিথ্যে অপবাদ দেওয়া হয়েছে, কথাগুলো বলতে বলতে হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে বরিশালের উজিরপুরের বামরাইলের আলোচিত শিশুকন্যা তুবা বিনতে অরনি। বাবার সাথে অন্যায় কিছু না হোক, বাবা ভালো হয়ে ফিরে আসুন, এই কামনায় সোমবার দুপুরে বাবাকে তিন মাসের জন্য বিদায় জানিয়েছে ছোট্ট তুবা।
তুবার বাবা অনিক সরদারকে ২৬ সেপ্টেম্বর মধ্যরাত থেকে বেলা সাড়ে এগারোটা পর্যন্ত চুরির অপবাদ দিয়ে বেঁধে রেখে মারধর করার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় কতিপয় ব্যক্তির বিরুদ্ধে। সেই ঘটনায় আহত বাবাকে বেঁধে রাখা অবস্থায় নিজ হাতে চা ও রুটি খাওয়ানোর একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি হয়।
পরে স্থানীয় প্রশাসন নড়ে-চড়ে বসে এবং তুবা ও তার পরিবারের পাশে সহযোগিতার হাত বাড়ায়। বামরাইলের স্থানীয় একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী তুবা বিনতে অরনি। লিখিত মুচলেকা দিয়ে বাবাকে মুক্ত করে বাড়িতে নিয়ে আসার পর দুইদিন ধরে নিজের সন্তানের মতো বাবাকে নিজের কাছে আগলে রেখে সাহস ও শক্তি জুগিয়েছে ছোট্ট তুবা। তবে এবার বাবার জন্য টানা তিন মাস অপেক্ষা করতে হবে সাহসী কন্যা তুবাকে।
সূত্রমতে, ২৮ সেপ্টেম্বর দুপুরে তুবার বাবা উজিরপুর উপজেলার বামরাইল এলাকার আলোচিত অনিক সরদারকে উপজেলা প্রশাসন মাদকাশক্তি নিরাময় কেন্দ্র (রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টার বা পুনর্বাসন কেন্দ্র) পাঠিয়েছেন। তুবার মা জান্নাত বলেন, ওই রাতে খবর পেয়ে আমরা সবাই দৌঁড়ে ঘটনাস্থলে যাই। তুবা তো স্যান্ডেল পরারও সময় নেয়নি, সোজা দৌঁড়ে বাবার কাছে যায়। ওর সামনে ওর বাবারে যখন মারতে ছিলো, তখন তুবা শুধু জোরে জোরে চিৎকার দিয়ে কান্না করে ওর বাবাকে জড়িয়ে ধরে মারতে নিষেধ করছে। কেউ ওর কথা প্রথমে শোনেনি, অনেকে তো ভিডিও করে মজাও নিছে।
চুরির অপবাদে মারধরের শিকার অনিক সরদারের দাবি, পূর্বশত্রুতা ও জমি নিয়ে বিরোধের জেরধরে তাকে মিথ্যে অপবাদ দিয়ে এমন অত্যাচার করা হয়েছে। তিনি বলেন, আমার কাছ থেকে চুরির কোনো মালামাল যেমন উদ্ধার হয়নি, তেমনি কোনো প্রমাণও দেখাতে পারেনি। পরিকল্পনাকারীরা সবসময় চায় আমি যেন আমার পৈত্রিক ভিটায় না থাকতে পারি।
অনিক আরও বলেন, কোনো মেয়ে চায় না তার বাবা আমার মতো ওই রাতের অবস্থায় থাকুক। আমিও তা চাইনি। আমার মেয়ে যখন আমাকে বেঁধে মারতে দেখেছে, তখন আমার তো মরে যেতে মন চাইছে। কারণ ওইরকম মর্মান্তিক দৃশ্য পৃথিবীতে আর আছে কি না, তা কেউ বলতে পারবে না। এখন আমি সবার সহযোগিতায় সুস্থ্য স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে চাই।
উজিরপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. আলী সুজা বলেন, অনিক ও তার স্ত্রীর দাবি অনুযায়ী সে (অনিক) কিছুটা মাদকাসক্ত। তাই প্রথমপর্যায়ে অনিক ও তার পরিবারের সাথে আলোচনা করে অনিক সরদারকে সংশোধনের জন্য মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের সহায়তায় সোমবার দুপুরে গাড়িতে করে রিহ্যাবে পাঠানো হয়েছে। তিনি সেখানে তিনমাস থেকে চিকিৎসা গ্রহণ করবেন।
ইউএনও আরও বলেন, অনিক সুস্থ্য হয়ে ফিরে না আসা পর্যন্ত তার স্ত্রী ও সন্তানদের ভরন পোষনে যা যা প্রয়োজন তা স্থানীয় রাজনৈতিক, সামাজিক ও প্রবাসীদের সহযোগিতা করা হবে। তিনি বলেন, অনিকের বড় মেয়ে তুবা যে স্কুলে লেখাপড়া করছে সেখানে আমি নিজে গিয়ে খোঁজখবর নিয়েছি। তার শিক্ষকদের সাথে লেখাপড়ার বিষয়ে কথা বলেছি। তারা তুবার পড়ালেখার প্রতি বিশেষ নজর রাখবেন বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এছাড়া আমি ব্যক্তিগতভাবে তুবার পড়ালেখা চালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে সার্বিক সহযোগিতা করবো। পাশাপাশি তুবার একটি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা হচ্ছে। যদি কেউ তাকে সহযোগিতা করতে চায়, তাহলে সেখানে তারা সহযোগিতার অর্থ পাঠাতে পারবেন।
অনিককে মাদক নিরাময় কেন্দ্রে পাঠানোর সময় উজিরপুর উপজেলা বিএনপির সিনিয়র সহ-সভাপতি এসএম আলাউদ্দিন নগদ অর্থ দিয়ে পরিবারটিকে সহযোগিতা করেছেন জানিয়ে উজিরপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. আলী সুজা বলেন, অনিকের ঘটনায় মানুষ কোনো কিছুই ভাবেনি। শুধু বাবার প্রতি মেয়ের ভালোবাসার বিষয়টি দেখেছেন। ভূক্তভোগী কর্মহীন শিক্ষিত যুবক রায়হানুল হক অনিক ভালভাবে সুস্থ্য জীবনে ফিরে আসতে পারলে, তাকে কর্মজীবী করে তোলার ঘোষণা দিয়েছেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. আলী সুজা।
উল্লেখ্য, গত ২৫ সেপ্টেম্বর দিবাগত গভীর রাতে বামরাইল বাজারের একটি দোকানে চুরির চেষ্টাকালে জনতার হাতে ধরা পরার অপবাদ দিয়ে কতিপয় ব্যক্তি অনিক সরদারকে অমানুষিক নির্যাতন করে বাজারের একটি খুঁটির সাথে বেঁধে রাখে। খবর পেয়ে শনিবার সকালে ঘটনাস্থলে ছুটে আসে অনিকের মেয়ে তুবা। সারারাত অনাহারে ছিলেন বাবা। এ জন্য বাজারের একটি দোকান থেকে রুটি ও চা এনে নিজের হাতে পরম যত্নে বাবার মুখে তুলে দেয় তুবা। এসময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত এক যুবক ঘটনাটি মোবাইল ফোনে ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিলে মুহুর্তের মধ্যে তা ব্যাপকভাবে ভাইরাল হয়।