জুবাইয়া বিন্তে কবির: মানুষের জীবন বড় বিচিত্র! চারপাশে অসংখ্য মানুষের ভিড়, পরিচিত মুখের আনাগোনা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হাজারো বন্ধু, প্রতিদিন কত কথা, কত আয়োজন—তারপরও কখনো কখনো বুকের গভীরে নেমে আসে এক অদ্ভুত শূন্যতা। মনে হয়, পৃথিবীতে এত মানুষ, অথচ মনের কথাগুলো শোনার মতো একজন মানুষও নেই! কখনো কারও সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছা করে না, আবার কখনো বুকের ভেতর জমে থাকা কথাগুলো বলার জন্য ব্যাকুল হয়ে ওঠে মন। অথচ ঠিক সেই মুহূর্তে খুঁজে পাওয়া যায় না নির্ভরতার কোনো কাঁধ, সহমর্মিতার কোনো হৃদয়। এ এক নীরব মনস্তাত্ত্বিক বাস্তবতা, যার নাম একাকীত্ব। তবে একাকীত্ব মানেই কি অসুখী জীবন? একা থাকা মানেই কি জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া? মোটেও নয়। একা থাকা এবং একাকীত্ব অনুভব করা এক বিষয় নয়। একা থাকা কখনো নিজের ইচ্ছায় বেছে নেওয়া প্রশান্তির সময়, যেখানে মানুষ নিজের সঙ্গে পরিচিত হয়, চিন্তাকে সাজায়, সৃজনশীলতার দুয়ার খুলে দেয়। অন্যদিকে অনিচ্ছাকৃত একাকীত্ব হলো এমন এক মানসিক অনুভূতি, যেখানে মানুষের প্রত্যাশিত আবেগীয় সংযোগের অভাব তাকে ভেতরে ভেতরে কষ্ট দেয়। তাই একাকীত্বকে জয় করার প্রথম শর্ত হলো নিজের অনুভূতিকে বোঝা। মানুষকে এড়িয়ে নয়, বরং নিজের সঙ্গে সুন্দর সম্পর্ক গড়ে তুলে এবং প্রয়োজনমতো মানুষের সঙ্গে সুস্থ সম্পর্ক বজায় রেখেই একাকীত্বকে জীবনের ইতিবাচক শক্তিতে রূপান্তর করা সম্ভব।
একাকীত্বের নীরব মহামারি: আধুনিক পৃথিবীর এক অদৃশ্য সংকট : একাকীত্ব এখন আর ব্যক্তিগত কোনো অনুভূতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি বিশ্বব্যাপী জনস্বাস্থ্য ও সামাজিক সুস্থতার একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) ২০২৫ সালের ৩০ জুন প্রকাশিত From Loneliness to Social Connection: Charting a Path to Healthier Societies শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পৃথিবীর প্রতি ছয়জন মানুষের একজন একাকীত্ব অনুভব করেন। অর্থাৎ বিশ্বের প্রায় ১৫ দশমিক ৮ শতাংশ মানুষ কোনো না কোনোভাবে এই অনুভূতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, ১৩ থেকে ১৭ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে একাকীত্বের হার ২০ দশমিক ৯ শতাংশ এবং ১৮ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের মধ্যে ১৭ দশমিক ৪ শতাংশ। নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে এই হার ২৪ দশমিক ৩ শতাংশ। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, একাকীত্বের সঙ্গে সম্পর্কিত কারণে বিশ্বে বছরে আনুমানিক ৮ লাখ ৭১ হাজার মানুষের মৃত্যুর হিসাব পাওয়া যায়। অর্থাৎ প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ১০০ জনের মৃত্যু। এই পরিসংখ্যান বুঝিয়ে দেয়, একাকীত্বকে নিছক আবেগের সমস্যা ভেবে অবহেলা করার সুযোগ নেই। এটি ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজ—সব ক্ষেত্রেই মনোযোগ দাবি করে।
নিজেকে জানার প্রথম পাঠ: নিজের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে তুলুন : মানুষের জীবনে আনন্দের উৎস শুধু অর্থ, পদোন্নতি, সামাজিক স্বীকৃতি কিংবা অন্যের প্রশংসা নয়। কখনো একটি প্রিয় বই, কখনো এক কাপ চা, কখনো রংতুলিতে আঁকা একটি ছবি, কখনো ছাদের বাগানে নতুন একটি ফুল ফোটার দৃশ্যও জীবনে প্রশান্তি এনে দিতে পারে। যে কাজটি করতে ভালো লাগে, সেটিকে অবহেলা করবেন না। বই পড়তে ভালো লাগলে প্রতিদিন কিছুটা সময় বইয়ের জন্য রাখুন। গান শুনতে ভালো লাগলে প্রিয় সুরের সঙ্গে সময় কাটান। ছবি আঁকা, রান্না, বাগান করা, সেলাই, ফটোগ্রাফি কিংবা লেখালেখি—যে কাজেই আনন্দ পান, সেটিকে নিয়মিত চর্চায় পরিণত করুন। শখকে শুধু অবসর কাটানোর উপকরণ হিসেবে না দেখে আত্মপ্রকাশের মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করুন। নতুন কিছু সৃষ্টি করার আনন্দ মানুষকে নিজের ভেতরের সম্ভাবনার সঙ্গে পরিচিত করে।
শরীরচর্চায় ফিরুক মনের প্রাণ: সুস্থ শরীর, প্রশান্ত মন: শরীর ও মনের মধ্যে গভীর সম্পর্ক রয়েছে। দীর্ঘ সময় ঘরে বসে থাকা, অনিয়মিত জীবনযাপন এবং শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা অনেক সময় মন খারাপ ও অবসন্নতার অনুভূতিকে বাড়িয়ে দিতে পারে। তাই একাকীত্বের সময়টুকুতে শরীরচর্চাকে জীবনের নিয়মিত অংশ করে তুলুন। সকালে কিংবা বিকেলে ২০ থেকে ৩০ মিনিট হাঁটুন, হালকা ব্যায়াম করুন, সাইকেল চালান অথবা যোগব্যায়ামের অনুশীলন করুন। শারীরিক পরিশ্রমের সময় মস্তিষ্কে এন্ডোরফিনসহ বিভিন্ন স্নায়ুরাসায়নিক প্রক্রিয়া সক্রিয় হয়, যা মেজাজ ও সুস্থতার অনুভূতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। ব্যায়ামের জন্য সব সময় জিমে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। বাড়ির ছাদ, বারান্দা, খোলা মাঠ কিংবা আশপাশের রাস্তা—যেকোনো নিরাপদ জায়গাই হতে পারে আপনার শরীর ও মনের যত্ন নেওয়ার উপযুক্ত স্থান।
নতুন কিছু শেখার আনন্দ: বয়স নয়, আগ্রহই হোক পরিচয়জীবনে বড় কিছু অর্জনের স্বপ্ন থাকা ভালো, কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণের জন্য ছোট ছোট পদক্ষেপ নেওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। নিজের পেশা, পড়াশোনা কিংবা ব্যক্তিগত শখের ক্ষেত্রে প্রতিদিনের জন্য একটি বাস্তবসম্মত লক্ষ্য নির্ধারণ করুন। আজ ১০ পৃষ্ঠা বই পড়বেন, আগামী সাত দিনে একটি নতুন রেসিপি শিখবেন, এক মাসে একটি বই শেষ করবেন কিংবা প্রতিদিন ৩০ মিনিট নতুন কোনো দক্ষতা অর্জনে ব্যয় করবেন। লক্ষ্য পূরণ হলে নিজেকে ছোট্ট কোনো উপহার দিন। মনোবিজ্ঞানে একে বলা হয় Goal Setting এবং Sense of Achievement—অর্থাৎ লক্ষ্য নির্ধারণ ও তা অর্জনের মধ্য দিয়ে আত্মতৃপ্তি লাভ। ছোট ছোট সাফল্য মানুষের আত্মবিশ্বাস বাড়ায় এবং জীবনের প্রতি আগ্রহ ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করে। জীবনের প্রতিটি দিনকে অর্থবহ করে তুলতে বড় কোনো ঘটনার অপেক্ষা করার প্রয়োজন নেই।
অন্যের পাশে দাঁড়ান: মানুষের ভালোবাসায় খুঁজে নিন নিজের আনন্দ: নিজের কষ্ট ভুলে থাকার একটি সুন্দর উপায় হলো অন্যের কষ্ট উপলব্ধি করা এবং সাধ্য অনুযায়ী পাশে দাঁড়ানো। অসহায় মানুষকে সাহায্য করুন, বৃদ্ধ মা-বাবার সঙ্গে সময় কাটান, এতিম শিশুর মুখে হাসি ফোটান, অসুস্থ প্রতিবেশীর খোঁজ নিন কিংবা পথের অসহায় প্রাণীটির জন্য একটু খাবারের ব্যবস্থা করুন। স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজে যুক্ত হতে পারেন। অন্যের উপকার করার মধ্য দিয়ে মানুষের মধ্যে আত্মতৃপ্তি, উদ্দেশ্যবোধ ও সামাজিক সংযোগ তৈরি হতে পারে। মনোবিজ্ঞানে এ ধরনের আচরণকে Prosocial Behaviour বলা হয়। তবে অন্যকে সাহায্য করতে গিয়ে নিজের সামর্থ্য ও মানসিক সীমাবদ্ধতার কথাও মনে রাখতে হবে। নিজের যত্ন নেওয়া এবং অন্যের যত্ন নেওয়া পরস্পরের বিরোধী নয়; বরং দুটিই একটি সুন্দর জীবনের পরিপূরক। কখনো কখনো অন্যের মুখে হাসি ফোটানোর মধ্যেই নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় আনন্দটি খুঁজে পাওয়া যায়।
সম্পর্কের যত্ন নিন: সব মানুষ নয়, একজন আপনজনই যথেষ্ট : জীবনে অনেক পরিচিত মানুষ থাকলেও সবাই আপন হয় না। আবার অনেক সময় একজন মানুষের আন্তরিক উপস্থিতিই জীবনের বড় আশ্রয় হয়ে ওঠে। তাই সম্পর্কের সংখ্যা বাড়ানোর চেয়ে সম্পর্কের গভীরতা বাড়ানোর চেষ্টা করুন। পুরোনো বন্ধুকে ফোন করুন, ভাইবোনের সঙ্গে কথা বলুন, পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে একসঙ্গে খাবার খান, প্রিয়জনের সঙ্গে নিজের অনুভূতি ভাগ করে নিন। কারও সঙ্গে মতের অমিল হলে অহংকারের দেয়াল তুলে না রেখে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করুন। সব সময় অন্যের কাছ থেকে প্রত্যাশা না করে নিজেও সম্পর্কের প্রতি দায়িত্বশীল হোন। তবে মনে রাখবেন, কোনো সম্পর্ক যদি নিয়মিত অপমান, অবহেলা, মানসিক নির্যাতন কিংবা বিষাক্ত আচরণের কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে সুস্থ সীমারেখা তৈরি করাও জরুরি। একাকীত্ব কাটানোর অর্থ যেকোনো সম্পর্ক আঁকড়ে ধরে থাকা নয়; বরং সম্মান, বিশ্বাস ও ভালোবাসার ভিত্তিতে সুস্থ সম্পর্ক গড়ে তোলা।
বিজ্ঞান কী বলছে: দীর্ঘস্থায়ী একাকীত্ব শরীর ও মনের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ: একাকীত্বকে ইতিবাচকভাবে ব্যবহারের কথা বললেও দীর্ঘস্থায়ী অনিচ্ছাকৃত একাকীত্বের স্বাস্থ্যঝুঁকি অস্বীকার করার সুযোগ নেই। যুক্তরাষ্ট্রের National Academy of Sciences-এ প্রকাশিত ২০১৫ সালের একটি গুরুত্বপূর্ণ মেটা-বিশ্লেষণে ৭০টির বেশি গবেষণা এবং ৩ লাখের বেশি মানুষের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, একাকীত্ব ও একা বসবাসের সঙ্গে যথাক্রমে ২৯, ২৬ ও ৩২ শতাংশ বেশি মৃত্যুঝুঁকির সম্পর্ক রয়েছে। গবেষণাটি Perspectives on Psychological Science সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়। যুক্তরাষ্ট্রের সার্জন জেনারেলের ২০২৩ সালের পরামর্শপত্রেও দুর্বল সামাজিক সম্পর্কের সঙ্গে হৃদ্রোগের ঝুঁকি ২৯ শতাংশ, স্ট্রোকের ঝুঁকি ৩২ শতাংশ এবং বয়স্কদের মধ্যে ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি প্রায় ৫০ শতাংশ বেশি হওয়ার সম্পর্ক তুলে ধরা হয়েছে। তবে এগুলো গবেষণায় পাওয়া সম্পর্ক বা ঝুঁকির পরিসংখ্যান; প্রত্যেক একাকী মানুষের ক্ষেত্রে এসব রোগ হবে, এমন নয়। গবেষণাগুলো আমাদের সতর্ক করে যে মানুষের সঙ্গে সুস্থ সামাজিক সংযোগ কেবল মানসিক প্রশান্তির জন্য নয়, শারীরিক সুস্থতার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
পরিশেষে, একাকীত্ব জয় করার সবচেয়ে বড় সাহস নিজের যত্ন নেওয়া : মনে রাখতে হবে, একাকীত্বকে নিজের শক্তিতে পরিণত করার অর্থ কষ্টকে চেপে রাখা কিংবা সবার কাছ থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া নয়। কিছু সময় নিজের সঙ্গে কাটানো যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজনের মুহূর্তে অন্যের সাহায্য চাওয়াও সমান গুরুত্বপূর্ণ। যদি দীর্ঘদিন ধরে মন খারাপ থাকে, কোনো কাজে আগ্রহ না পান, ঘুম ও খাওয়ার অভ্যাসে পরিবর্তন আসে, মানুষের সঙ্গে মিশতে ভয় লাগে কিংবা দৈনন্দিন কাজ ব্যাহত হয়, তাহলে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন। বিষণ্নতা বা উদ্বেগের মতো সমস্যার লক্ষণ থাকলে পেশাদার সহায়তা গ্রহণ করা জরুরি। কাউন্সেলিং, মনোচিকিৎসা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা মানুষের জীবনকে আবার স্বাভাবিক ছন্দে ফিরিয়ে আনতে পারে। সাহায্য চাওয়া দুর্বলতা নয়; বরং নিজের প্রতি দায়িত্বশীলতার পরিচয়। নিজের কষ্টকে ছোট করে দেখবেন না, আবার নিজেকে অসহায়ও ভাববেন না।
লেখক : জুবাইয়া বিন্তে কবির
অর্থনীতিবিদ, গবেষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট

ডেস্ক রিপোর্ট 






















