ঢাকা ০১:০৩ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২২ জুন ২০২৬

২৫ বছরের রক্তক্ষয়ী বিরোধের অবসান: কেশবপুরে ফিরেছে শান্তি, উৎসবে মেতেছে গ্রামবাসী

  • ডেস্ক রিপোর্ট
  • প্রকাশিত : ০৯:৫০:৪৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ২১ জুন ২০২৬
  • ৮ বার দেখা হয়েছে
একটি বিলকে কেন্দ্র করে দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে চলা রক্তক্ষয়ী সংঘাত, মামলা-মোকদ্দমা, আধিপত্য বিস্তার এবং সামাজিক বৈরিতার অবশেষে অবসান ঘটেছে। চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা উপজেলার হারদী ইউনিয়নের কেশবপুর গ্রামে দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে চলমান এই বিরোধ মীমাংসায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে চুয়াডাঙ্গা জেলা পুলিশ। ফলে দীর্ঘদিনের আতঙ্ক ও অস্থিরতা কাটিয়ে এখন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছেন গ্রামবাসীরা।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, কেশবপুর গ্রামের একটি বিলের মালিকানা ও লিজ সংক্রান্ত বিরোধকে কেন্দ্র করে ‘সালাম গ্রুপ’ এবং ‘মনসুর আলী চেঙ্গিস খান গ্রুপ’-এর মধ্যে প্রায় ২৫ বছর ধরে তীব্র দ্বন্দ্ব চলে আসছিল। সময়ের পরিক্রমায় এই বিরোধ শুধু ব্যক্তি বা গোষ্ঠীগত পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং তা পুরো গ্রামের সামাজিক সম্প্রীতি ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে ব্যাহত করেছে।
দীর্ঘ এই সময়ে উভয় পক্ষের বিরুদ্ধে অন্তত ২০ থেকে ২২টি মামলা আদালত ও থানায় চলমান রয়েছে। একাধিকবার সংঘটিত হয়েছে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ। আহত হয়েছেন অনেক মানুষ। এমনকি রাতের ঘুম হারাম হয়ে গিয়েছিল গ্রামের সাধারণ মানুষের। প্রতিনিয়ত বিরাজ করত অজানা আতঙ্ক।
বিশেষ করে গত বছরের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। নতুন করে সংঘাতের আশঙ্কায় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন এলাকাবাসী। এমন পরিস্থিতিতে দীর্ঘস্থায়ী এই বিরোধ নিরসনে উদ্যোগ নেয় চুয়াডাঙ্গা জেলা পুলিশ।
পুলিশ সুপার মোহাম্মদ রুহুল কবীর খানের দিকনির্দেশনায় এবং অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) মোস্তাফিজুর রহমানের সরাসরি নেতৃত্বে শুরু হয় সমঝোতার প্রক্রিয়া। বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা ও যোগাযোগের পর গত শনিবার (২০ জুন) রাতে আলমডাঙ্গা থানায় উভয় পক্ষকে নিয়ে দীর্ঘ বৈঠকের আয়োজন করা হয়।
বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন আলমডাঙ্গা উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আমিনুল ইসলাম রোকন ও সাবেক সভাপতি শহিদুল কাউনাইন টিলুসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা। দীর্ঘ আলোচনা ও মতবিনিময়ের একপর্যায়ে উভয় পক্ষ শান্তিপূর্ণ সমাধানের বিষয়ে একমত হন।
আলমডাঙ্গা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) বাণী ইসরাঈল জানান, জেলা পুলিশের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত আলোচনায় অত্যন্ত ইতিবাচক ফল এসেছে। এখন থেকে উভয় পক্ষ নিজেরাই আলোচনার মাধ্যমে বাকি সমস্যাগুলোর সমাধান করবেন এবং স্থায়ী শান্তি বজায় রাখতে জেলা পুলিশ সর্বাত্মক সহযোগিতা করবে।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “২৫ বছর ধরে চলা এই সংঘাতের অবসানে আলোচনা অত্যন্ত ফলপ্রসূ হয়েছে। অনেক আগেই হয়তো এমন উদ্যোগ নেওয়া উচিত ছিল। তবে দেরিতে হলেও আমরা একটি স্থায়ী সমাধানের পথে এগোতে পেরেছি।”
সমঝোতার খবর ছড়িয়ে পড়তেই কেশবপুর গ্রামে শুরু হয় আনন্দ-উচ্ছ্বাস। থানার সামনে উপস্থিত শতাধিক গ্রামবাসী জেলা পুলিশ, পুলিশ সুপার এবং অতিরিক্ত পুলিশ সুপারকে ধন্যবাদ জানিয়ে স্লোগান দেন। পরে গ্রামেও মিষ্টি বিতরণ করা হয়।
গ্রামবাসীরা জানান, আগামী মঙ্গলবার চূড়ান্ত আপোষনামা স্বাক্ষরিত হওয়ার কথা রয়েছে। উভয় পক্ষের নেতারা গ্রামবাসীর সামনে ঘোষণা দিয়েছেন যে ভবিষ্যতে কোনো বিরোধ সৃষ্টি হলে তা আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা হবে এবং সাধারণ মানুষকে আর কোনো সংঘাতে জড়ানো হবে না।
দীর্ঘ ২৫ বছর পর কেশবপুরে ফিরে আসা এই শান্তি শুধু একটি বিরোধের সমাপ্তিই নয়; এটি একটি গ্রামের সামাজিক সম্প্রীতি পুনঃপ্রতিষ্ঠার ইতিহাস। যে গ্রাম একসময় সংঘাত, আতঙ্ক ও রক্তক্ষয়ের জন্য পরিচিত ছিল, আজ সেখানে বইছে সম্প্রীতির সুবাতাস। আর সেই শান্তির আনন্দে উৎসবে মেতেছে পুরো কেশবপুর।

সাবেক এমপি সেলিমা আহমাদ মারা গেছেন

২৫ বছরের রক্তক্ষয়ী বিরোধের অবসান: কেশবপুরে ফিরেছে শান্তি, উৎসবে মেতেছে গ্রামবাসী

প্রকাশিত : ০৯:৫০:৪৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ২১ জুন ২০২৬
একটি বিলকে কেন্দ্র করে দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে চলা রক্তক্ষয়ী সংঘাত, মামলা-মোকদ্দমা, আধিপত্য বিস্তার এবং সামাজিক বৈরিতার অবশেষে অবসান ঘটেছে। চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা উপজেলার হারদী ইউনিয়নের কেশবপুর গ্রামে দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে চলমান এই বিরোধ মীমাংসায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে চুয়াডাঙ্গা জেলা পুলিশ। ফলে দীর্ঘদিনের আতঙ্ক ও অস্থিরতা কাটিয়ে এখন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছেন গ্রামবাসীরা।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, কেশবপুর গ্রামের একটি বিলের মালিকানা ও লিজ সংক্রান্ত বিরোধকে কেন্দ্র করে ‘সালাম গ্রুপ’ এবং ‘মনসুর আলী চেঙ্গিস খান গ্রুপ’-এর মধ্যে প্রায় ২৫ বছর ধরে তীব্র দ্বন্দ্ব চলে আসছিল। সময়ের পরিক্রমায় এই বিরোধ শুধু ব্যক্তি বা গোষ্ঠীগত পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং তা পুরো গ্রামের সামাজিক সম্প্রীতি ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে ব্যাহত করেছে।
দীর্ঘ এই সময়ে উভয় পক্ষের বিরুদ্ধে অন্তত ২০ থেকে ২২টি মামলা আদালত ও থানায় চলমান রয়েছে। একাধিকবার সংঘটিত হয়েছে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ। আহত হয়েছেন অনেক মানুষ। এমনকি রাতের ঘুম হারাম হয়ে গিয়েছিল গ্রামের সাধারণ মানুষের। প্রতিনিয়ত বিরাজ করত অজানা আতঙ্ক।
বিশেষ করে গত বছরের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। নতুন করে সংঘাতের আশঙ্কায় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন এলাকাবাসী। এমন পরিস্থিতিতে দীর্ঘস্থায়ী এই বিরোধ নিরসনে উদ্যোগ নেয় চুয়াডাঙ্গা জেলা পুলিশ।
পুলিশ সুপার মোহাম্মদ রুহুল কবীর খানের দিকনির্দেশনায় এবং অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) মোস্তাফিজুর রহমানের সরাসরি নেতৃত্বে শুরু হয় সমঝোতার প্রক্রিয়া। বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা ও যোগাযোগের পর গত শনিবার (২০ জুন) রাতে আলমডাঙ্গা থানায় উভয় পক্ষকে নিয়ে দীর্ঘ বৈঠকের আয়োজন করা হয়।
বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন আলমডাঙ্গা উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আমিনুল ইসলাম রোকন ও সাবেক সভাপতি শহিদুল কাউনাইন টিলুসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা। দীর্ঘ আলোচনা ও মতবিনিময়ের একপর্যায়ে উভয় পক্ষ শান্তিপূর্ণ সমাধানের বিষয়ে একমত হন।
আলমডাঙ্গা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) বাণী ইসরাঈল জানান, জেলা পুলিশের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত আলোচনায় অত্যন্ত ইতিবাচক ফল এসেছে। এখন থেকে উভয় পক্ষ নিজেরাই আলোচনার মাধ্যমে বাকি সমস্যাগুলোর সমাধান করবেন এবং স্থায়ী শান্তি বজায় রাখতে জেলা পুলিশ সর্বাত্মক সহযোগিতা করবে।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “২৫ বছর ধরে চলা এই সংঘাতের অবসানে আলোচনা অত্যন্ত ফলপ্রসূ হয়েছে। অনেক আগেই হয়তো এমন উদ্যোগ নেওয়া উচিত ছিল। তবে দেরিতে হলেও আমরা একটি স্থায়ী সমাধানের পথে এগোতে পেরেছি।”
সমঝোতার খবর ছড়িয়ে পড়তেই কেশবপুর গ্রামে শুরু হয় আনন্দ-উচ্ছ্বাস। থানার সামনে উপস্থিত শতাধিক গ্রামবাসী জেলা পুলিশ, পুলিশ সুপার এবং অতিরিক্ত পুলিশ সুপারকে ধন্যবাদ জানিয়ে স্লোগান দেন। পরে গ্রামেও মিষ্টি বিতরণ করা হয়।
গ্রামবাসীরা জানান, আগামী মঙ্গলবার চূড়ান্ত আপোষনামা স্বাক্ষরিত হওয়ার কথা রয়েছে। উভয় পক্ষের নেতারা গ্রামবাসীর সামনে ঘোষণা দিয়েছেন যে ভবিষ্যতে কোনো বিরোধ সৃষ্টি হলে তা আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা হবে এবং সাধারণ মানুষকে আর কোনো সংঘাতে জড়ানো হবে না।
দীর্ঘ ২৫ বছর পর কেশবপুরে ফিরে আসা এই শান্তি শুধু একটি বিরোধের সমাপ্তিই নয়; এটি একটি গ্রামের সামাজিক সম্প্রীতি পুনঃপ্রতিষ্ঠার ইতিহাস। যে গ্রাম একসময় সংঘাত, আতঙ্ক ও রক্তক্ষয়ের জন্য পরিচিত ছিল, আজ সেখানে বইছে সম্প্রীতির সুবাতাস। আর সেই শান্তির আনন্দে উৎসবে মেতেছে পুরো কেশবপুর।