ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনের ২১তম দিনের কার্যক্রমে ব্যাংক খাতের দুর্নীতি দমন, শেয়ারবাজার কারসাজির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা এবং জাতীয় নিরাপত্তার মতো একাধিক গুরুত্বপূর্ণ জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট ইস্যু নিয়ে মুখর ছিল সংসদ।
অধিবেশনে ব্যাংক লুটেরাদের সম্পত্তি নিলাম করে আমানতকারীদের সঞ্চয় ফিরিয়ে দেওয়ার জোর দাবি জানানো হলে, অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী আশ্বস্ত করেন যে ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকদের সুদসহ টাকা ফেরত দেওয়া হবে এবং কোনো ‘হেয়ার কাট’ রাখা হবে না।
এছাড়া দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় আগামী ১০ বছরে সেনাবাহিনীর আধুনিকায়নে ৮৬ হাজার কোটি টাকার মহাপরিকল্পনা, মিয়ানমারের জান্তাসহ সব পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন জোরদার, চীনে কাঁঠাল রপ্তানি এবং মেয়েদের ডিগ্রি বা অনার্স পর্যন্ত বিনা মূল্যে শিক্ষার সুযোগ দেওয়ার মতো সরকারের একাধিক দূরদর্শী ও যুগান্তকারী পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
বুধবার (৮ জুলাই) বিকেল সাড়ে ৩টায় বাজেট অধিবেশনের ২১তম দিনের কার্যক্রম শুরু হয়। প্রথম অংশে সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ সভাপতিত্ব করার পর, বাদ আসর পরবর্তী সেশনে সভাপতিত্ব করেন ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল।
সংসদে ব্যাংক লুটেরা এবং ব্যাংক খেকো মালিকদের কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করে তাদের সমস্ত সম্পত্তি নিলামে বিক্রি করে গ্রাহকদের টাকা গ্রাহকদের হাতে ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য রেহানা আক্তার রানু। জাতীয় সংসদে কার্যপ্রণালী বিধির ৭১ বিধিতে জরুরি জন-গুরুত্বসম্পন্ন বিষয় সম্পর্কে মনোযোগ আকর্ষণ নোটিশে তিনি এ বিষয়ে অর্থমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
নোটিশে সংসদ সদস্য রেহানা আক্তার রানু বলেন, দেশের কয়েকটি ব্যাংকের অনিয়ম, দুর্নীতি এবং মালিক পক্ষের অর্থ পাচারের কারণে আজ লক্ষ লক্ষ আমানতকারী তাদের টাকা তুলতে পারছে না। এই টাকা বিলাসিতার জন্য নয়। এটা একজন বাবার মেয়ের বিয়ের স্বপ্ন, একজন মায়ের চিকিৎসার শেষ ভরসা, একজন শিক্ষার্থীর ভবিষ্যতের টিউশন ফি, একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর জীবন বাঁচানোর মূলধন, কষ্টে অর্জিত টাকা; কারও পেনশনের সঞ্চয়, কারও সারাজীবনের কষ্টার্জিত আয় বিশ্বাস করে ব্যাংকে রেখেছিল। সমস্ত লুটেরা এবং ব্যাংক খেকো মালিকদের কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করে তাদের সমস্ত সম্পত্তি নিলামে বিক্রি করে গ্রাহকদের টাকা গ্রাহকদের হাতে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য অর্থমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।
নোটিশের জবাবে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, এটি একটি হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটেছে। বাংলাদেশে একটি নির্বাচিত সরকার এ ব্যাপারে নীরব থাকতে পারে না। সরকার দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড আর্থিক খাত আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে একটি সুসংগঠিত বহুমাত্রিক রেজুলেশন কাঠামো প্রতিষ্ঠা করেছে। এই কাঠামোর আইনি ভিত্তি হিসেবে ‘ব্যাংক রেজুলেশন আইন ২০২৬’ প্রণীত হয়েছে। এর আওতায় সমস্যাগ্রস্ত পাঁচটি ব্যাংক তথা এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট ব্যাংক অব বাংলাদেশ-পিএলসি (এক্সিম ব্যাংক), ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক-পিএলসি, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক-পিএলসি, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক-পিএলসি ও ইউনিয়ন ব্যাংককে একীভূত করে সম্মিলিত ‘ইসলামী ব্যাংক-পিএলসি’ গঠন করা হয়েছে। এটি রেজুলেশন কৌশলের অধীনে গৃহীত সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ। এই একীভূতকরণের ফলে পাঁচটি ব্যাংকের সব আমানতকারীর দাবি ও স্বার্থ নতুন ব্যাংকে সংরক্ষিত হয়েছে। এর পাশাপাশি আমানত সুরক্ষা তহবিলের বিধানের আওতায় নির্ধারিত সীমা পর্যন্ত আমানতকারীর ক্ষতিপূরণ পাওয়ার আইনি অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এক্ষেত্রে ‘আমানত সুরক্ষা আইন-২০২৬’ এর মাধ্যমে সুরক্ষিত আমানতের পরিমাণ সর্বোচ্চ ১ লাখ টাকা থেকে ২ লাখ টাকায় উন্নীত করা হয়েছে। রেজুলেশনের আওতায় ব্যাংকগুলোর আমানতকারীরা বাংলাদেশ ব্যাংকের রেজুলেশন স্কিম মোতাবেক আমানতের অর্থ পর্যায়ক্রমে ফেরত পাচ্ছেন।
অর্থমন্ত্রী বলেন, ব্যাংক রেজুলেশন আইন ২০২৬ এর ৫৭ ধারায় রেজুলেশনের আওতাধীন ব্যাংকের পাওনা আদায়ের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংককে দায়ী ব্যক্তি কর্তৃক ব্যাংকের সম্পদ অথবা তহবিল হতে অর্জিত সকল আয়, সম্পত্তি, অধিকার এবং সম্পদের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। এই আইনের প্রয়োগের মাধ্যমে দায়ী ব্যক্তিদের সম্পত্তির নিয়ন্ত্রণ গ্রহণপূর্বক বিক্রয় বা নিলামের মাধ্যমে গ্রাহকের টাকা পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হবে। এছাড়া ফৌজদারি ক্রিমিনাল মামলার পাশাপাশি দেওয়ানি সিভিল পদ্ধতি গ্রহণের মাধ্যমে ব্যাংকিং সেক্টরে অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে সৃষ্ট খেলাপি ঋণের টাকা এবং অবৈধভাবে বিদেশে পাচারকৃত অর্থ ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।
অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যের পর রেহানা আক্তার রানু বলেন, যারা গ্রাহকের টাকা লুট করেছে, ওই সমস্ত ব্যাংক ডাকাত, ব্যাংক লুটেরাদের কোনো ক্ষমা হতে পারে না। তারা পৃথিবীর যেখানেই থাকুক না কেন, ফিরিয়ে এনে তাদেরকে ‘ডিম থেরাপি’ দিয়ে এই টাকা আদায় করতে হবে। মন্ত্রীর কাছে আমার প্রশ্ন, ‘হেয়ার কাট’ নামক ‘মরণ কাট’ প্রত্যাহার করে ৭৫ লাখ গ্রাহককে স্বস্তি দেওয়ার কোনো পরিকল্পনা আপনার মন্ত্রণালয়ের আছে কি না?

ডেস্ক রিপোর্ট 























