পটুয়াখালী প্রতিনিধি: সমুদ্রের ঢেউ আছড়ে পড়ছে তীরে। বিস্তীর্ণ বালুচরে কেউ হাঁটছেন প্রিয়জনের হাত ধরে, কেউ ঢেউয়ের সঙ্গে মেতে উঠেছেন আনন্দে। সৈকতের বেঞ্চিতে বসে সমুদ্র দেখছেন কেউ কেউ। দিগন্তে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের অপরূপ দৃশ্য দেখতে ছুটে আসছেন পর্যটকেরা। এর সঙ্গে এবার যুক্ত হয়েছে শারদীয় দুর্গাপূজার ছুটি এবং শুত্র ও শনিবার (২৩ ও ২৪ অক্টোবর) দুই দিনের পর্যটন কার্নিভাল। সব মিলিয়ে উৎসবের আমেজে নতুন করে সেজেছে পটুয়াখালীর কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকত।
দীর্ঘ নয় বছর পর পর্যটন কার্নিভালকে ঘিরে দেশের অন্যতম জনপ্রিয় এই পর্যটনকেন্দ্রে তৈরি হয়েছে বাড়তি উচ্ছ্বাস। সৈকতজুড়ে বর্ণিল সাজসজ্জা, হোটেল-মোটেলে বুকিং, পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে মানুষের আনাগোনা আর সাংস্কৃতিক আয়োজনের প্রস্তুতি—সব মিলিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। ২২ ও ২৩ অক্টোবর, বৃহস্পতিবার ও শুক্রবারের এই আয়োজন ঘিরে তাঁদের প্রত্যাশা, এবার পর্যটকের ঢল নামবে কুয়াকাটায়।
পর্যটনশিল্পের বিকাশ এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করার লক্ষ্য নিয়ে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন এ কার্নিভালের আয়োজন করেছে। শুক্রবার বিকেলে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাতের কার্নিভাল উদ্বোধন করার কথা রয়েছে। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত থাকছে নানা আয়োজন।
কার্নিভাল ও পূজার ছুটিকে ঘিরে হোটেল-মোটেল, রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ এবং স্থানীয় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোও প্রস্তুতি নিয়েছে। পর্যটকদের বাড়তি চাপ সামাল দিতে প্রস্তুত হচ্ছেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, পরিবহনশ্রমিক ও স্থানীয় বাসিন্দারা। তবে উৎসবের এই আমেজ ধরে রাখতে আবাসন, খাবারের মান, নিরাপত্তা এবং হয়রানিমুক্ত সেবা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব কুয়াকাটার (টোয়াক) সেক্রেটারি জেনারেল আসাদুজ্জামান মিরাজ বলেন, কার্নিভাল ও ছুটিকে কেন্দ্র করে শুক্র ও শনিবার রেকর্ডসংখ্যক পর্যটকের আগমন ঘটবে বলে তাঁরা আশা করছেন। কুয়াকাটায় তিন শতাধিক হোটেলে প্রায় ৫০ হাজার মানুষের থাকার ব্যবস্থা রয়েছে। বাড়তি পর্যটকদের আবাসনের ব্যবস্থা করতে আশপাশের পাঁচটি গ্রামের প্রায় ৬০০ পরিবারও প্রস্তুতি নিচ্ছে।
তিনি বলেন, পূজার ছুটি ও পর্যটন কার্নিভাল উপলক্ষে আসা পর্যটকদের নিরাপত্তা ও সেবা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সবাই প্রস্তুত রয়েছেন।
কুয়াকাটা হোটেল-মোটেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এম এ মোতালেব শরীফ বলেন, প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির হোটেলগুলোর ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ কক্ষ ইতিমধ্যে বুকিং হয়েছে। পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে কিছু হোটেল ভাড়ায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড়ও ঘোষণা করেছে।
পর্যটকেরা কুয়াকাটায় আসেন মূলত সমুদ্রের টানে। তবে এই সৈকতের আকর্ষণ শুধু ঢেউ আর বালুচরে সীমাবদ্ধ নয়। একই সৈকত থেকে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখার অভিজ্ঞতার পাশাপাশি রাখাইন সম্প্রদায়ের ঐতিহ্য, স্থানীয় সংস্কৃতি ও খাবার ভ্রমণে যোগ করে ভিন্ন মাত্রা।
রাখাইন পল্লি, মিশ্রিপাড়া, গঙ্গামতি, লেম্বুর বন, তিন নদীর মোহনা, শুঁটকিপল্লি, ঝাউবাগান ও লাল কাঁকড়ার চর—কুয়াকাটার এসব দর্শনীয় স্থানেও পর্যটকদের আনাগোনা বাড়ছে। পর্যটকেরা আসায় রাখাইন মার্কেট, শুঁটকির বাজার, ঝিনুক ও আচার বিক্রির দোকান এবং স্থানীয় খাবারের দোকানগুলোতে বাড়তি বিক্রির আশা তৈরি হয়েছে।
পর্যটন মৌসুমে বড় হোটেল কিংবা রিসোর্টের পাশাপাশি আয় বাড়ে ছোট দোকানি, খাবার বিক্রেতা, পরিবহনশ্রমিক ও স্থানীয় গাইডদেরও। ফলে কার্নিভাল ঘিরে শুধু পর্যটন ব্যবসায়ীরাই নন, স্থানীয় ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারাও আশাবাদী।
কুয়াকাটা প্রেসক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক হোসাইন আমীর বলেন, শারদীয় দুর্গাপূজার দীর্ঘ ছুটির সঙ্গে পর্যটন কার্নিভাল যুক্ত হওয়ায় এবার পর্যটকের সংখ্যা বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। দীর্ঘ নয় বছর পর এ ধরনের আয়োজন কুয়াকাটার পর্যটনশিল্পের জন্য আনন্দের বিষয়।
তবে তাঁর মতে, শুধু আয়োজন করলেই হবে না, পর্যটকদের ভালো অভিজ্ঞতাও নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্য ব্যবসায়ীদের হয়রানিমুক্ত সেবা দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
পর্যটকদের বাড়তি চাপ সামাল দিতে জেলা ও উপজেলা প্রশাসন, ট্যুরিস্ট পুলিশ এবং থানা পুলিশ সমন্বিতভাবে প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানিয়েছেন কুয়াকাটা ট্যুরিস্ট পুলিশের পরিদর্শক নাজমুল হাসান।
তিনি বলেন, সৈকতসহ পর্যটকদের সমাগমস্থলগুলোতে সার্বক্ষণিক নজরদারি থাকবে। কোনো পর্যটক যাতে হয়রানি বা অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির শিকার না হন, সে বিষয়ে পুলিশ সতর্ক থাকবে। যেকোনো সমস্যায় পর্যটকদের ট্যুরিস্ট পুলিশের সহায়তা নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও বিচ-ম্যানেজমেন্ট কমিটির সদস্যসচিব মো. আরিফুজ্জামান বলেন, বিচ কার্নিভাল উপলক্ষে স্থানীয় ও দেশবরেণ্য কণ্ঠশিল্পী এবং চলচ্চিত্রশিল্পীদের অংশগ্রহণে দুই দিনব্যাপী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। এ আয়োজন ঘিরে বিপুলসংখ্যক পর্যটকের সমাগমের প্রত্যাশা রয়েছে। পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।
ইতিমধ্যে কুয়াকাটার জিরো পয়েন্টসহ বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রে মানুষের উপস্থিতি নজর কেড়েছে । কেউ সমুদ্রে নেমে আনন্দ করছেন, কেউ ঢেউয়ের ছন্দ উপভোগ করছেন সৈকতে বসে। আবার কেউ প্রিয়জনের সঙ্গে হেঁটে বেড়াচ্ছেন বালুচর ধরে। উৎসবের এই আবহে পর্যটকদের পদচারণে আরও মুখর হয়ে ওঠার অপেক্ষায় সৈকতনগরী।

ডেস্ক রিপোর্ট 






















