জুবাইয়া বিন্তে কবির: বাংলাদেশে শীত একটি পরিচিত ঋতু। বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ে কুয়াশা নামে, হিমেল বাতাস বয়ে যায়, তাপমাত্রা ধীরে ধীরে নেমে আসে—মানুষের জীবনযাত্রা কিছুটা শ্লথ হয়, এটিই স্বাভাবিক বাস্তবতা। শীত আমাদের ঋতুচক্রেরই অংশ। কিন্তু যখন এই শীত তার স্বাভাবিক সীমা অতিক্রম করে তীব্র শৈত্যপ্রবাহে রূপ নেয়, তখন তা আর নিছক ঋতু পরিবর্তনের ঘটনা থাকে না; তখন শীত হয়ে ওঠে এক নীরব দুর্যোগ। আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাসে তাপমাত্রা যদি ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নেমে আসার আশঙ্কা প্রকাশ পায়, তার অর্থ কেবল ঠান্ডা বাড়া নয়—তার অর্থ মানুষের জীবন, জীবিকা, স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও সামাজিক স্থিতিশীলতার ওপর গভীর ও বহুমাত্রিক চাপ সৃষ্টি হওয়া। শৈত্যপ্রবাহ বন্যা বা ঘূর্ণিঝড়ের মতো হঠাৎ আঘাত হানে না। এতে নেই ধ্বংসস্তূপ, নেই আকস্মিক দৃশ্যমান বিপর্যয়। অথচ এর প্রভাব ধীরে ধীরে, নীরবে, কিন্তু গভীরভাবে সমাজের প্রতিটি স্তরকে চেপে ধরে।

শীতের তীব্রতা ও ভৌগোলিক বাস্তবতা : বাংলাদেশের ভৌগোলিক বৈচিত্র্যের কারণে শীতের প্রকোপ সর্বত্র সমান নয়। উত্তরাঞ্চল, চরাঞ্চল, হাওড় ও নদীবেষ্টিত এলাকাগুলোতে শীতের তীব্রতা তুলনামূলকভাবে বেশি। ভোররাত থেকে সকাল পর্যন্ত ঘন কুয়াশা নেমে আসে, সূর্যের দেখা মেলে দেরিতে, ঠান্ডা বাতাস দীর্ঘ সময় স্থায়ী হয়। দিন ও রাতের তাপমাত্রার পার্থক্য কমে গিয়ে শীত আরও তীক্ষ্ণভাবে অনুভূত হয়। এই বাস্তবতা সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে ফেলে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে। কৃষক মাঠে যেতে পারেন না, দিনমজুরদের কাজ বন্ধ হয়ে যায়, নৌপথে চলাচল ব্যাহত হয়। বাজারে যাতায়াত কমে যায়, পণ্য পরিবহনে দেরি হয়। শহরাঞ্চলেও কুয়াশার কারণে যানবাহনের গতি কমে, সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে এবং কর্মচাঞ্চল্যে ভাটা পড়ে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কমে যায়; বিশেষ করে প্রাথমিক স্তরের শিশুদের জন্য শীত নিয়মিত শিক্ষাজীবনের বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
জীবিকা ও অর্থনীতিতে শৈত্যপ্রবাহের ধীর অভিঘাত :
তীব্র শৈত্যপ্রবাহ অর্থনীতিতে তাৎক্ষণিক বড় ধাক্কা না দিলেও এর প্রভাব ধীরে ধীরে বিস্তৃত হয়। কৃষি খাতে অতিরিক্ত ঠান্ডা বোরো ধানের বীজতলা নষ্ট করতে পারে, শাকসবজির বৃদ্ধি ব্যাহত হয়, আলু ও অন্যান্য শীতকালীন ফসলে রোগ দেখা দেয়। কৃষকদের উৎপাদন খরচ বাড়ে, লাভের হিসাব এলোমেলো হয়ে যায়। পশুপালন খাতেও শীতের নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। গবাদিপশু ঠান্ডাজনিত রোগে আক্রান্ত হলে দুধ ও মাংস উৎপাদন কমে যায়। অনেক দরিদ্র পরিবার, যাদের আয়ের বড় উৎস গবাদিপশু, তারা আর্থিক সংকটে পড়ে। পরিবহন ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটলে বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ ব্যাহত হয়, দাম বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। এর চাপ গিয়ে পড়ে সাধারণ মানুষের ওপর। এভাবে শীত ধীরে ধীরে অর্থনীতির নিচু স্তরে অস্থিরতা তৈরি করে।

স্বাস্থ্যঝুঁকি: শৈত্যপ্রবাহের সবচেয়ে ভয়ংকর দিক :
শৈত্যপ্রবাহের সবচেয়ে ভয়াবহ প্রভাব পড়ে মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর। ঠান্ডাজনিত রোগ—সর্দি, কাশি, জ্বর, নিউমোনিয়া, হাঁপানি—শীতকালে মারাত্মক আকার ধারণ করে। শিশু, বয়স্ক ও দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। অনেক ক্ষেত্রে হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে রোগীর চাপ বেড়ে যায়, যা বিদ্যমান স্বাস্থ্যব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাকে আরও স্পষ্ট করে তোলে।
শীতজনিত মৃত্যু অনেক সময় নীরবে ঘটে। এগুলো খুব কম ক্ষেত্রেই আলোচনায় আসে, অথচ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এগুলো প্রতিরোধযোগ্য। পর্যাপ্ত গরম কাপড়, উষ্ণ আশ্রয়, সচেতনতা ও সময়মতো চিকিৎসা পেলে বহু জীবন রক্ষা করা সম্ভব। প্রশ্ন হলো—এই নীরব মৃত্যুগুলো রোধে আমাদের সম্মিলিত উদ্যোগ কতটা কার্যকর?
শীত ও সামাজিক বৈষম্য : শীত সামাজিক বৈষম্যকে আরও নগ্নভাবে সামনে আনে। যাঁরা পাকা ঘরে থাকেন, উষ্ণ পোশাক ও পর্যাপ্ত খাদ্যের সুবিধা ভোগ করেন, তাঁদের কাছে শীত সহনীয়। কিন্তু যাঁরা ফুটপাথে ঘুমান, বস্তিতে থাকেন কিংবা দিন আনে দিন খায়, তাঁদের কাছে শীত মানে টিকে থাকার সংগ্রাম। একই শহরে, একই শীতে এই বৈপরীত্য আমাদের সমাজব্যবস্থার গভীর অসাম্যকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়।
জলবায়ু পরিবর্তন ও শীতের নতুন বাস্তবতা : সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আবহাওয়ার চরমতা বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট। গ্রীষ্মে তীব্র তাপপ্রবাহ, বর্ষায় অতিবৃষ্টি এবং শীতে অস্বাভাবিক ঠান্ডা—এই ধারাবাহিকতা জলবায়ু পরিবর্তনের সুস্পষ্ট ইঙ্গিত। শীত এখন আর শুধু ঠান্ডা নয়; এটি অনিশ্চয়তার প্রতীক। এই বাস্তবতায় শীত মোকাবিলায় স্বল্পমেয়াদি উদ্যোগের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি অভিযোজন নীতি অপরিহার্য।
ঘন কুয়াশা ও কৃষির নীরব বিপর্যয় : বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার উপ-উষ্ণমণ্ডলীয় অঞ্চলে শীত ও কুয়াশা সাধারণত কৃষির জন্য সহায়ক। কিন্তু যখন শীত তার স্বাভাবিক সীমা ছাড়িয়ে দীর্ঘস্থায়ী কুয়াশা ও তীব্র শৈত্যপ্রবাহে রূপ নেয়, তখন তা কৃষির জন্য নীরব দুর্যোগে পরিণত হয়।

ঘন কুয়াশা সূর্যালোককে আড়াল করে রাখে, তাপমাত্রা স্বাভাবিকের নিচে নেমে যায়। ফসলের ফটোসিন্থেসিস ব্যাহত হয়, গাছের অভ্যন্তরীণ শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়ার গতি কমে যায়। ফলস্বরূপ পাতার বৃদ্ধি শ্লথ হয়, মূলের বিস্তার সীমিত হয় এবং গাছ দুর্বল হয়ে পড়ে। বীজ অঙ্কুরোদগম ধীর হয়, ফুল ফোটা ও ফল গঠনে বিলম্ব ঘটে। একটি ফসলের বিলম্ব পরবর্তী ফসলের সময়সূচিকেও এলোমেলো করে দেয়।
রোগবালাই ও উৎপাদন খরচের চাপ : ঘন কুয়াশা ও ঠান্ডা আবহাওয়া ছত্রাক ও ব্যাকটেরিয়ার বংশবিস্তারের জন্য উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টি করে। আলুতে লেট ব্লাইট, পেঁয়াজে পার্পল ব্লচ, বীজতলায় ছত্রাকজনিত রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। কৃষককে অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহার করতে হয়, উৎপাদন খরচ বাড়ে এবং পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
উপকূলীয় লবণ চাষ: কুয়াশার আরেকটি শিকার
উপকূলীয় অঞ্চলে লবণ চাষ পুরোপুরি সূর্যালোক ও বাষ্পীভবনের ওপর নির্ভরশীল। ঘন কুয়াশা সূর্যের তাপ বাধাগ্রস্ত করে, বাতাসে আর্দ্রতা বাড়ায়, ফলে লবণের স্ফটিকায়ন থেমে যায়। অনেক ক্ষেত্রে জমে থাকা লবণ আবার গলে যায়—চাষিরা একে বলেন “লবণ মারা যাওয়া”। এতে উৎপাদন কমে, গুণগত মান নষ্ট হয়, বাজারদর পড়ে যায়। প্রান্তিক লবণ চাষির আয় ও জীবিকা চরম অনিশ্চয়তায় পড়ে।
পরিসংখ্যান ও সতর্ক সংকেত : গত এক দশকের উপাত্ত বলছে, শীত মৌসুমে ঘন কুয়াশা ও শৈত্যপ্রবাহের স্থায়িত্ব বেড়েছে। প্রতি মৌসুমে গড়ে ৮–১২ দিন শৈত্যপ্রবাহ নথিভুক্ত হচ্ছে, যা ১৯৯০-এর দশকের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। উত্তরাঞ্চলে তাপমাত্রা ৬–৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নেমে আসছে, যা ফসলের সহনশীল সীমার কাছাকাছি। এই প্রবণতা কৃষির জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি সতর্ক সংকেত।
রাষ্ট্র, সমাজ ও ভবিষ্যতের করণীয় : শৈত্যপ্রবাহ মোকাবিলা কোনো মৌসুমি আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি রাষ্ট্রের প্রস্তুতি, সমাজের সংবেদনশীলতা এবং আমাদের সামষ্টিক ভবিষ্যৎচিন্তার এক গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। শীত যখন তার স্বাভাবিক সীমা অতিক্রম করে নীরব দুর্যোগে রূপ নেয়, তখন কেবল প্রকৃতির দোষ দিয়ে দায় সারা যায় না—এটি হয়ে ওঠে শাসনব্যবস্থা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার স্পষ্ট সূচক।

এই বাস্তবতায় রাষ্ট্রের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে আগেভাগেই চিহ্নিত করা, গৃহহীন ও প্রান্তিক মানুষের জন্য পর্যাপ্ত গরম কাপড় নিশ্চিত করা, অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা এবং স্বাস্থ্যসেবাকে শীতকালীন চাপ মোকাবিলায় সক্ষম করে তোলা—এসব কাজ হতে হবে পরিকল্পিত, সমন্বিত ও সময়োপযোগী। শীত শুরু হওয়ার পর প্রতিক্রিয়াশীল উদ্যোগ নয়; বরং শীত আসার আগেই কার্যকর প্রস্তুতি গ্রহণই পারে মানুষের ভোগান্তি ও প্রাণহানি কমিয়ে আনতে। মাঠ প্রশাসন, স্থানীয় সরকার ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের মধ্যে সমন্বয় না থাকলে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ কাগজেই সীমাবদ্ধ থেকে যায়—এ বাস্তবতা বারবার প্রমাণিত হয়েছে।
তবে শীত মোকাবিলা শুধু রাষ্ট্রের একক দায়িত্ব নয়। সমাজের বিত্তবান, সক্ষম ও সচেতন মানুষের ভূমিকাও এখানে অনিবার্য। যে সমাজে একই শহরে কেউ উষ্ণ ঘরে কম্বলের ভেতর নিশ্চিন্তে রাত কাটায়, আর কেউ ফুটপাতে কাঁপতে কাঁপতে ভোরের অপেক্ষায় থাকে—সে সমাজে মানবিকতার প্রশ্ন অনিবার্যভাবে উঠে আসে। একটি কম্বল, একটি সোয়েটার কিংবা একবেলা উষ্ণ খাবার—এগুলো দয়া বা অনুগ্রহ নয়; এগুলো মানবিক দায়িত্ব, নাগরিক দায়িত্ব। শীতের রাতে কারও পাশে দাঁড়ানো মানে কেবল একজন মানুষকে উষ্ণতা দেওয়া নয়; বরং সমাজের নৈতিক ভিত্তিকে শক্ত করা।

দীর্ঘমেয়াদে আমাদের ভাবনাকে আরও গভীরে নিয়ে যেতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তবতায় শীত ও কুয়াশা এখন আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি একটি পুনরাবৃত্ত ও ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি। তাই প্রয়োজন জলবায়ু সংবেদনশীল ও স্মার্ট কৃষি কৌশল, শীতসহনশীল ফসলের গবেষণা, উন্নত আবহাওয়া পূর্বাভাস ব্যবস্থা এবং কৃষক ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য কার্যকর অভিযোজন নীতি। একই সঙ্গে নীতিনির্ধারণে গবেষণাভিত্তিক সিদ্ধান্ত এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার প্রতিফলন অপরিহার্য। শীত ও কুয়াশাকে অবহেলা করার আর কোনো সুযোগ নেই। কারণ এই নীরব দুর্যোগ ধীরে ধীরে আমাদের জীবন, জীবিকা, কৃষি ব্যবস্থা ও অর্থনীতির ভিত্তিকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করাচ্ছে। আজ যে প্রস্তুতি আমরা নেব, যে মানবিকতা আমরা দেখাব এবং যে দূরদর্শী সিদ্ধান্ত আমরা গ্রহণ করব—সেগুলোর ওপরই নির্ভর করবে আগামীর বাংলাদেশ কতটা নিরাপদ, সহনশীল ও মানবিক হয়ে উঠতে পারে।

ডেস্ক রিপোর্ট 























