শেরপুর প্রতিনিধি : আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে শেরপুর–২ (নকলা–নালিতাবাড়ী) আসনে ক্রমেই জমে উঠছে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর দ্বিমুখী লড়াই। এ আসনে চারজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থাকলেও স্থানীয় ভোটারদের একটি বড় অংশের ধারণা, ভোটের মূল প্রতিযোগিতা আবর্তিত হবে বিএনপি মনোনীত ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী প্রকৌশলী মো. ফাহিম চৌধুরী ও জামায়াতে ইসলামী মনোনীত দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী গোলাম কিবরিয়ার মধ্যেই।
এ ছাড়া ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ মনোনীত হাতপাখা প্রতীকের প্রার্থী মাওলানা আব্দুল্লাহ আল কায়েস এবং এবি পার্টি মনোনীত ঈগল প্রতীকের প্রার্থী আব্দুল্লাহ বাদশাও মাঠে রয়েছেন। তবে স্থানীয়দের মতে, এবারের নির্বাচনে ফল নির্ধারণে বড় নিয়ামক হিসেবে সামনে এসেছে নালিতাবাড়ী উপজেলার প্রায় ৬৪ হাজার বাড়তি ভোটের সমীকরণ ও আঞ্চলিকতার হিসাব—যা শেষ মুহূর্তে ভোটের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে।জেলা নির্বাচন কর্মকর্তার কার্যালয়ের তথ্যমতে, শেরপুর–২ আসনে রয়েছে ২১টি ইউনিয়ন ও ২টি পৌরসভা। মোট ভোটকেন্দ্র ১৫৪টি। ভোটার সংখ্যা ৪ লাখ ৪০ হাজার ৩৪ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ১৫ হাজার ৭৮৬ জন এবং নারী ভোটার ২ লাখ ২৪ হাজার ২৪৮ জন। এতে নকলা উপজেলায় ১ লাখ ৮৮ হাজার ১১৯ জন ও নালিতাবাড়ীতে ২ লাখ ৫১ হাজার ৯১৫ জন ভোটার রয়েছেন৷ অর্থাৎ নালিতাবাড়ীতে নকলার তুলনায় ৬৩ হাজার ৭৯৬ ভোট বেশি। স্থানীয়দের মতে, এই বাড়তি ভোটই এবার ফল নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জামায়াত প্রার্থী গোলাম কিবরিয়া বেশ আগে থেকেই মাঠে সক্রিয় ছিলেন। প্রায় এক বছর ধরে ধারাবাহিক কর্মসূচির মাধ্যমে তিনি প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। অন্যদিকে বিএনপির প্রার্থী ফাহিম চৌধুরী দ্বৈত নাগরিকত্ব সংক্রান্ত জটিলতায় কিছু সময় প্রচারণায় পিছিয়ে পড়লেও ভোট ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে তিনি ও তাঁর দলীয় নেতা-কর্মীরা দুই উপজেলাতেই সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সভা-সমাবেশ ও বাড়ি বাড়ি গণসংযোগ চালাচ্ছেন।
এদিকে ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী আব্দুল্লাহ আল কায়েস সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে এবি পার্টির প্রার্থী আব্দুল্লাহ বাদশা সীমিতসংখ্যক নেতা-কর্মী নিয়ে প্রচারণা চালালেও মাঠপর্যায়ে বড় ধরনের সাংগঠনিক উপস্থিতি এখনো চোখে পড়েনি বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
এই আসনের ৪ প্রার্থীর মধ্যে ৩ জনের বাড়ি নালিতাবাড়ী উপজেলায়। কেবল বিএনপির প্রার্থী ফাহিম চৌধুরীর বাড়ি নকলা উপজেলায়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, নিজ নিজ উপজেলার প্রার্থীর প্রতি ভোটারদের মধ্যে এক ধরনের নীরব পক্ষপাত কাজ করছে।

নালিতাবাড়ীর বাসিন্দা আল হেলাল বলেন, ‘দীর্ঘ প্রায় ৩৫ বছরে কোনো বড় দল আমাদের উপজেলার কাউকে প্রার্থী করেনি। এবার তাই এই উপজেলার মানুষের জন্য বড় সুযোগ।’
অন্যদিকে নকলা উপজেলার ভোটারদের একটি অংশ বলছেন, দলীয় সমর্থনের পাশাপাশি নকলার ‘এমপি ধরে রাখা’ও তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
শেরপুর–২ আসনের রাজনৈতিক ইতিহাসে দীর্ঘদিন আধিপত্য ছিল আওয়ামী লীগের। ১৯৯১ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত আটটি জাতীয় নির্বাচনে ছয়বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন আওয়ামী লীগের প্রয়াত নেত্রী মতিয়া চৌধুরী। এ ছাড়া দুইবার নির্বাচিত হন বিএনপির সাবেক কেন্দ্রীয় নেতা ও সাবেক হুইপ জাহেদ আলী চৌধুরী। তাঁরা দুজনই নকলা উপজেলার বাসিন্দা ছিলেন। ২০১০ সালে জাহেদ আলী চৌধুরীর মৃত্যুর পর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার হিসেবে সামনে আসেন তাঁর ছেলে ফাহিম চৌধুরী। ২০১৮ সালের নির্বাচনে ফাহিম চৌধুরী অংশ নিলেও দলীয় বিভক্তি ও অনিশ্চয়তার কারণে বিএনপি প্রত্যাশিত ফল পায়নি। তবে এবার দলীয় বিভক্তি ভুলে ধানের শীষকে বিজয়ী করতে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার কথা বলছেন বিএনপির স্থানীয় নেতারা।
বিএনপি প্রার্থী প্রকৌশলী ফাহিম চৌধুরী বলেন, ‘এই আসনের মানুষ পরিবর্তন চায়। আমি নির্বাচিত হলে এলাকার সার্বিক উন্নয়ন নিশ্চিত করব।’
অন্যদিকে জামায়াত প্রার্থী গোলাম কিবরিয়া বলেন, নির্বাচিত হলে দুর্নীতি ও চাঁদাবাজিমুক্ত সমাজ গড়ে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করবেন। তাঁর দাবি, ভোটাররা এতদিন আওয়ামী লীগ ও বিএনপিকে দেখেছেন, এবার নতুন কাউকে দেখতে চান।
তরুণ ভোটার আহম্মেদ জুনায়েদ (২৭) বলেন, ‘এবার তরুণ ভোটাররা ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করবেন। অতীতের কর্মকাণ্ড, প্রচারের কৌশল, ব্যক্তিত্ব ও তারুণ্য—এসব বিবেচনায় যিনি বেশি সাড়া জাগাতে পারবেন, তিনিই বিজয়ের পথে এগিয়ে থাকবেন।’
রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে এ আসনে প্রস্তুত রয়েছে ১৫৩টি স্থায়ী ও ১টি অস্থায়ী কেন্দ্র। ভোটকক্ষ রয়েছে মোট ৮২০টি।

ডেস্ক রিপোর্ট 






















