ঢাকা ০৫:৩৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬

কুয়াকাটায় শতবর্ষী বটবৃক্ষ সংরক্ষিত ঘোষণা, রক্ষায় উদ্যোগ ধর্মীয় ঐতিহ্যের স্মৃতি বুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে গাছটি, আশ্রয় দিচ্ছে পাখি ও ছোট প্রাণীদের

  • ডেস্ক রিপোর্ট
  • প্রকাশিত : ০৪:২২:৫৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬
  • ২ বার দেখা হয়েছে

পটুয়াখালী প্রতিনিধি: একটি বটগাছ, যার শিকড়ে জড়িয়ে আছে ইতিহাস, ধর্মীয় বিশ্বাস ও একটি সম্প্রদায়ের সাংস্কৃতিক স্মৃতি। একসময় এর জায়গায় ছিল রাখাইন সম্প্রদায়ের একটি ধর্মীয় স্থাপনা। সময়ের পরিক্রমায় সেই স্থাপনা বিলীন হলেও সেখানে জন্ম নেওয়া বটগাছটি দাঁড়িয়ে আছে কালের সাক্ষী হয়ে। এর ছায়ায় আশ্রয় নেয় পাখি, ছোট প্রাণী ও নানা প্রজাতির কীটপতঙ্গ। কুয়াকাটার এই শতবর্ষী বটবৃক্ষকে এবার সংরক্ষিত ঘোষণা করা হয়েছে।
পটুয়াখালীর কুয়াকাটা মহিলা রাখাইন মার্কেটসংলগ্ন বটবৃক্ষটির সুরক্ষায় গত ১২ অক্টোবর একটি বিলবোর্ড স্থাপন করা হয়। উপকূলীয় বন বিভাগ ও কুয়াকাটা পৌরসভার উদ্যোগে নেওয়া এ পদক্ষেপে সহযোগিতা করেছে পরিবেশবাদী ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন অ্যানিমেল লাভার্স অব পটুয়াখালী।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, গাছটি কেবল পরিবেশের অংশ নয়, রাখাইন সম্প্রদায়ের ধর্মীয় অনুভূতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গেও নিবিড়ভাবে জড়িত। তাই এর সুরক্ষা নিশ্চিত করা মানে একই সঙ্গে স্থানীয় ইতিহাস, সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার উদ্যোগ নেওয়া।

কুয়াকাটা কেন্দ্রীয় শ্রীমঙ্গল বৌদ্ধবিহারের অধ্যক্ষ ভদন্ত ইন্দ্রবংশ থেরো বলেন, ১৭৮৪ সালে রাখাইন সম্প্রদায়ের লোকজন এ এলাকায় আসেন। পরে এখানে শ্রীমঙ্গল বৌদ্ধবিহার প্রতিষ্ঠা করা হয়। পাশাপাশি বান্দরবানের স্বর্ণজাদির আদলে একটি জাদিও নির্মাণ করা হয়েছিল।
তিনি বলেন, ১৯৩৫ সালের বন্যায় জাদিটি ভেঙে যায়। পরে সেই স্থানের ওপরই বটগাছটি জন্ম নেয়। ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সঙ্গে সম্পর্ক থাকায় গাছটি আর কাটা হয়নি। দীর্ঘদিন ধরে এটি সংরক্ষণ করা হয়েছে ধর্মীয় বিশ্বাস ও সংস্কারের অংশ হিসেবে। এখন আনুষ্ঠানিকভাবে সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়ায় সংশ্লিষ্ট সবাইকে ধন্যবাদ জানান তিনি।
কুয়াকাটা পৌরসভার প্রশাসক ও কলাপাড়া উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ইয়াসীন সাদেক বলেন, পৌরসভা, বন বিভাগ ও অ্যানিমেল লাভার্স অব পটুয়াখালী সম্মিলিতভাবে বটবৃক্ষটিকে সংরক্ষিত ঘোষণা করেছে। পরিবেশ ও প্রতিবেশ রক্ষার পাশাপাশি রাখাইন সম্প্রদায়ের ধর্মীয় অনুভূতির সঙ্গে গাছটির সম্পর্ক বিবেচনায় নিয়েই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি স্থানীয় সবাইকে গাছটি সংরক্ষণে সচেষ্ট থাকার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা ধর্মীয় অনুভূতি ও ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকার ওপর গুরুত্ব দেন।
অ্যানিমেল লাভার্স অব পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলা সমন্বয়কারী বায়জিদ মুন্সী বলেন, “একটি শতবর্ষী গাছ হারিয়ে গেলে শুধু একটি বৃক্ষই হারায় না, তার সঙ্গে হারিয়ে যায় বহু বছরের ইতিহাস, জীববৈচিত্র্যের আশ্রয় এবং মানুষের স্মৃতির একটি অংশ। আমরা চাই, গাছটি নিরাপদ থাকুক, এর ছায়ায় পাখি ও অন্যান্য প্রাণী আশ্রয় পাক। একই সঙ্গে নতুন প্রজন্ম জানুক, প্রকৃতি ও ঐতিহ্য রক্ষা করা আমাদের সবার দায়িত্ব।”

বিলবোর্ড স্থাপনের মাধ্যমে গাছটির সুরক্ষায় একটি দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া হলেও এর দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণ নিশ্চিত করাই এখন গুরুত্বপূর্ণ। এজন্য প্রয়োজন নিয়মিত পরিচর্যা, গাছের গোড়া ও আশপাশের পরিবেশ সুরক্ষা এবং নির্বিচারে ক্ষতিসাধন রোধে কার্যকর ব্যবস্থা।
কুয়াকাটার এই বটবৃক্ষের গল্প তাই শুধু একটি পুরোনো গাছকে ঘিরে নয়। এর সঙ্গে মিশে আছে রাখাইন সম্প্রদায়ের ইতিহাস, ধর্মীয় বিশ্বাস এবং প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের দীর্ঘ সহাবস্থানের স্মৃতি। সেই স্মৃতি ও জীববৈচিত্র্যকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য টিকিয়ে রাখতে সংরক্ষণের উদ্যোগ কতটা কার্যকর হয়, এখন সেটিই দেখার বিষয়।

জনপ্রিয় সংবাদ

কুয়াকাটায় শতবর্ষী বটবৃক্ষ সংরক্ষিত ঘোষণা, রক্ষায় উদ্যোগ ধর্মীয় ঐতিহ্যের স্মৃতি বুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে গাছটি, আশ্রয় দিচ্ছে পাখি ও ছোট প্রাণীদের

কুয়াকাটায় শতবর্ষী বটবৃক্ষ সংরক্ষিত ঘোষণা, রক্ষায় উদ্যোগ ধর্মীয় ঐতিহ্যের স্মৃতি বুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে গাছটি, আশ্রয় দিচ্ছে পাখি ও ছোট প্রাণীদের

প্রকাশিত : ০৪:২২:৫৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬

পটুয়াখালী প্রতিনিধি: একটি বটগাছ, যার শিকড়ে জড়িয়ে আছে ইতিহাস, ধর্মীয় বিশ্বাস ও একটি সম্প্রদায়ের সাংস্কৃতিক স্মৃতি। একসময় এর জায়গায় ছিল রাখাইন সম্প্রদায়ের একটি ধর্মীয় স্থাপনা। সময়ের পরিক্রমায় সেই স্থাপনা বিলীন হলেও সেখানে জন্ম নেওয়া বটগাছটি দাঁড়িয়ে আছে কালের সাক্ষী হয়ে। এর ছায়ায় আশ্রয় নেয় পাখি, ছোট প্রাণী ও নানা প্রজাতির কীটপতঙ্গ। কুয়াকাটার এই শতবর্ষী বটবৃক্ষকে এবার সংরক্ষিত ঘোষণা করা হয়েছে।
পটুয়াখালীর কুয়াকাটা মহিলা রাখাইন মার্কেটসংলগ্ন বটবৃক্ষটির সুরক্ষায় গত ১২ অক্টোবর একটি বিলবোর্ড স্থাপন করা হয়। উপকূলীয় বন বিভাগ ও কুয়াকাটা পৌরসভার উদ্যোগে নেওয়া এ পদক্ষেপে সহযোগিতা করেছে পরিবেশবাদী ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন অ্যানিমেল লাভার্স অব পটুয়াখালী।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, গাছটি কেবল পরিবেশের অংশ নয়, রাখাইন সম্প্রদায়ের ধর্মীয় অনুভূতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গেও নিবিড়ভাবে জড়িত। তাই এর সুরক্ষা নিশ্চিত করা মানে একই সঙ্গে স্থানীয় ইতিহাস, সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার উদ্যোগ নেওয়া।

কুয়াকাটা কেন্দ্রীয় শ্রীমঙ্গল বৌদ্ধবিহারের অধ্যক্ষ ভদন্ত ইন্দ্রবংশ থেরো বলেন, ১৭৮৪ সালে রাখাইন সম্প্রদায়ের লোকজন এ এলাকায় আসেন। পরে এখানে শ্রীমঙ্গল বৌদ্ধবিহার প্রতিষ্ঠা করা হয়। পাশাপাশি বান্দরবানের স্বর্ণজাদির আদলে একটি জাদিও নির্মাণ করা হয়েছিল।
তিনি বলেন, ১৯৩৫ সালের বন্যায় জাদিটি ভেঙে যায়। পরে সেই স্থানের ওপরই বটগাছটি জন্ম নেয়। ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সঙ্গে সম্পর্ক থাকায় গাছটি আর কাটা হয়নি। দীর্ঘদিন ধরে এটি সংরক্ষণ করা হয়েছে ধর্মীয় বিশ্বাস ও সংস্কারের অংশ হিসেবে। এখন আনুষ্ঠানিকভাবে সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়ায় সংশ্লিষ্ট সবাইকে ধন্যবাদ জানান তিনি।
কুয়াকাটা পৌরসভার প্রশাসক ও কলাপাড়া উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ইয়াসীন সাদেক বলেন, পৌরসভা, বন বিভাগ ও অ্যানিমেল লাভার্স অব পটুয়াখালী সম্মিলিতভাবে বটবৃক্ষটিকে সংরক্ষিত ঘোষণা করেছে। পরিবেশ ও প্রতিবেশ রক্ষার পাশাপাশি রাখাইন সম্প্রদায়ের ধর্মীয় অনুভূতির সঙ্গে গাছটির সম্পর্ক বিবেচনায় নিয়েই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি স্থানীয় সবাইকে গাছটি সংরক্ষণে সচেষ্ট থাকার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা ধর্মীয় অনুভূতি ও ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকার ওপর গুরুত্ব দেন।
অ্যানিমেল লাভার্স অব পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলা সমন্বয়কারী বায়জিদ মুন্সী বলেন, “একটি শতবর্ষী গাছ হারিয়ে গেলে শুধু একটি বৃক্ষই হারায় না, তার সঙ্গে হারিয়ে যায় বহু বছরের ইতিহাস, জীববৈচিত্র্যের আশ্রয় এবং মানুষের স্মৃতির একটি অংশ। আমরা চাই, গাছটি নিরাপদ থাকুক, এর ছায়ায় পাখি ও অন্যান্য প্রাণী আশ্রয় পাক। একই সঙ্গে নতুন প্রজন্ম জানুক, প্রকৃতি ও ঐতিহ্য রক্ষা করা আমাদের সবার দায়িত্ব।”

বিলবোর্ড স্থাপনের মাধ্যমে গাছটির সুরক্ষায় একটি দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া হলেও এর দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণ নিশ্চিত করাই এখন গুরুত্বপূর্ণ। এজন্য প্রয়োজন নিয়মিত পরিচর্যা, গাছের গোড়া ও আশপাশের পরিবেশ সুরক্ষা এবং নির্বিচারে ক্ষতিসাধন রোধে কার্যকর ব্যবস্থা।
কুয়াকাটার এই বটবৃক্ষের গল্প তাই শুধু একটি পুরোনো গাছকে ঘিরে নয়। এর সঙ্গে মিশে আছে রাখাইন সম্প্রদায়ের ইতিহাস, ধর্মীয় বিশ্বাস এবং প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের দীর্ঘ সহাবস্থানের স্মৃতি। সেই স্মৃতি ও জীববৈচিত্র্যকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য টিকিয়ে রাখতে সংরক্ষণের উদ্যোগ কতটা কার্যকর হয়, এখন সেটিই দেখার বিষয়।