ঢাকা ১০:৪৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ০৪ অক্টোবর ২০২৬

বিইআরসির নির্দেশ অমান্য: কালিয়াকৈরে সিলিন্ডার প্রতি অতিরিক্ত গুনতে হচ্ছে ৫০০ টাকা

  • ডেস্ক রিপোর্ট
  • প্রকাশিত : ০৮:১৭:৩০ অপরাহ্ন, রবিবার, ৪ অক্টোবর ২০২৬
  • ১৪ বার দেখা হয়েছে

কালিয়াকৈর প্রতিনিধি: গাজীপুরের অন্যতম ব্যস্ত শিল্পনগরী কালিয়াকৈর। প্রায় ৬ লাখ পোশাক শ্রমিকের ঘামে সচল এই জনপদে এখন একটাই আলোচনা এলপিজি গ্যাসের লাগামহীন দাম। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) ঘোষিত মূল্যের চেয়ে বহুগুণ বেশি দামে সিলিন্ডার বিক্রি হওয়ায় চরম বিপাকে পড়েছেন স্থানীয় নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত ও শ্রমজীবী মানুষ।

রবিবার কালিয়াকৈর বাজার, চন্দ্রা ত্রিমোড়, হরতকীতলা আমতলা মোড়, পল্লী বিদ্যুৎ, মৌচাক, সফিপুর, কালামপুর ও ফুলবাড়ীয়া এলাকার বিভিন্ন খুচরা দোকানে সরেজমিনে দেখা যায়, সরকারিভাবে ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ১,৭২৮ টাকা নির্ধারণ করা থাকলেও বাজারে তা বিক্রি হচ্ছে ২২০০ থেকে ২৩০০ টাকায়। দোকানভেদে নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা অতিরিক্ত আদায় করা হচ্ছে।

বাজারে আসা সাধারণ ভোক্তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, জ্বালানির পেছনে অতিরিক্ত অর্থ খরচ হওয়ায় নিত্যপ্রয়োজনীয় অন্যান্য কেনাকাটায় কাটছাঁট করতে হচ্ছে।

চন্দ্রা এলাকার পোশাক শ্রমিক সিয়াম হোসেন (২৮) বলেন, “১০ হাজার টাকা বেতনে ঘর ভাড়া, চাল-ডাল আর গ্যাস কেনাই কঠিন হয়ে পড়েছে। যে সিলিন্ডার আগে ১৫০০-১৬০০ টাকায় পেতাম, তা এখন ২২০০-২৩০০ টাকা চায়। আমরা সরকার নির্ধারিত দামে গ্যাস কিনতে চাই।”

মৌচাকের গৃহিণী রহিমা খাতুন (৪২) আক্ষেপ করে বলেন, “স্বামী গার্মেন্টসে চাকরি করেন। গ্যাসের দাম বেড়ে যাওয়ায় সংসার খরচ মেটানো দায়। অনেক সময় প্রতিবেশীদের চুলায় রান্না করে বাচ্চাদের খাওয়াতে হয়।”

সফিপুরের অটো চালক আব্দুল লতিফ (৫০) জানান, দিনে ৬০০ টাকা আয় করে সিলিন্ডার কিনতেই কয়েক দিনের জমানো টাকা শেষ হয়ে যায়।

কালিয়াকৈর বাজারের চা দোকানদার জয়নাল আবেদীন (৬০) জানান, আগে দুটি সিলিন্ডার ৩২০০ টাকায় পেলেও এখন লাগছে ৪৪০০ টাকা। চায়ের দাম বাড়াতে না পেরে ব্যবসা চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

চন্দ্রার মেস বাসিন্দা ও কলেজ ছাত্রী ফাতেমা আক্তার জানান, ৫ জন মিলে গ্যাস কিনতে গিয়ে জনপ্রতি খরচ ৩০০ টাকা থেকে বেড়ে ৫০০ টাকায় দাঁড়িয়েছে, যা শিক্ষার্থীদের জন্য বাড়তি চাপ।

অতিরিক্ত দাম নেওয়ার বিষয়ে খুচরা ব্যবসায়ীরা দুষছেন ডিলার ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে। কালিয়াকৈরের ব্যবসায়ী রাসেল হোসেন এবং পল্লী বিদ্যুৎ এলাকার ‘মায়ের দোয়া এন্টারপ্রাইজ’-এর স্বত্বাধিকারী জানান, কোম্পানি ও ডিলার পর্যায় থেকেই তাদের বেশি দামে সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে। সাথে যুক্ত হচ্ছে পরিবহন খরচ। সরকারি দামে পাইকারি সরবরাহ মিললে তারাও নির্ধারিত দামে বিক্রি করতে পারবেন বলে জানান।

এলপিজি সিলিন্ডারের বাজার অস্থিরতা নিয়ে কালিয়াকৈর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এ এইচ এম ফখরুল হুসাইন বলেন, “বিইআরসি নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে বিক্রির অভিযোগ আমরা পেয়েছি। নির্ধারিত দামে বিক্রি না করা ভোক্তা অধিকার আইনের লঙ্ঘন। দ্রুত বাজার মনিটরিং জোরদার করা হবে এবং প্রতিটি দোকানে মূল্য তালিকা টানানো বাধ্যতামূলক করা হবে। অনিয়ম পেলে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

এদিকে কালিয়াকৈর পৌরসভার সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থী ও সমাজসেবক মোঃ সাইজুদ্দিন বলেন, “কালিয়াকৈর শ্রমিকের শহর। শ্রমিকের বেতনের বড় অংশ গ্যাসে চলে গেলে তারা খাবে কী? সাধারণ মানুষকে সাথে নিয়ে এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানো হবে। সুযোগ পেলে পৌরসভার উদ্যোগে ন্যায্যমূল্যে এলপিজি বিক্রির ডিলার পয়েন্ট ও মনিটরিং সেল গঠন করা হবে।”

জ্বালানি খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, বিইআরসি নির্ধারিত দাম কার্যকর করতে ডিলার পর্যায় থেকে তদারকি জোরদার করা আবশ্যক। অবিলম্বে বাজারে প্রশাসনিক অভিযান পরিচালনা ও দৃশ্যমান মূল্য তালিকা প্রদর্শন নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

জনপ্রিয় সংবাদ

টঙ্গী শিশু নিবাসীদের কম্পিউটার প্রশিক্ষণ কার্যক্রম

বিইআরসির নির্দেশ অমান্য: কালিয়াকৈরে সিলিন্ডার প্রতি অতিরিক্ত গুনতে হচ্ছে ৫০০ টাকা

প্রকাশিত : ০৮:১৭:৩০ অপরাহ্ন, রবিবার, ৪ অক্টোবর ২০২৬

কালিয়াকৈর প্রতিনিধি: গাজীপুরের অন্যতম ব্যস্ত শিল্পনগরী কালিয়াকৈর। প্রায় ৬ লাখ পোশাক শ্রমিকের ঘামে সচল এই জনপদে এখন একটাই আলোচনা এলপিজি গ্যাসের লাগামহীন দাম। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) ঘোষিত মূল্যের চেয়ে বহুগুণ বেশি দামে সিলিন্ডার বিক্রি হওয়ায় চরম বিপাকে পড়েছেন স্থানীয় নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত ও শ্রমজীবী মানুষ।

রবিবার কালিয়াকৈর বাজার, চন্দ্রা ত্রিমোড়, হরতকীতলা আমতলা মোড়, পল্লী বিদ্যুৎ, মৌচাক, সফিপুর, কালামপুর ও ফুলবাড়ীয়া এলাকার বিভিন্ন খুচরা দোকানে সরেজমিনে দেখা যায়, সরকারিভাবে ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ১,৭২৮ টাকা নির্ধারণ করা থাকলেও বাজারে তা বিক্রি হচ্ছে ২২০০ থেকে ২৩০০ টাকায়। দোকানভেদে নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা অতিরিক্ত আদায় করা হচ্ছে।

বাজারে আসা সাধারণ ভোক্তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, জ্বালানির পেছনে অতিরিক্ত অর্থ খরচ হওয়ায় নিত্যপ্রয়োজনীয় অন্যান্য কেনাকাটায় কাটছাঁট করতে হচ্ছে।

চন্দ্রা এলাকার পোশাক শ্রমিক সিয়াম হোসেন (২৮) বলেন, “১০ হাজার টাকা বেতনে ঘর ভাড়া, চাল-ডাল আর গ্যাস কেনাই কঠিন হয়ে পড়েছে। যে সিলিন্ডার আগে ১৫০০-১৬০০ টাকায় পেতাম, তা এখন ২২০০-২৩০০ টাকা চায়। আমরা সরকার নির্ধারিত দামে গ্যাস কিনতে চাই।”

মৌচাকের গৃহিণী রহিমা খাতুন (৪২) আক্ষেপ করে বলেন, “স্বামী গার্মেন্টসে চাকরি করেন। গ্যাসের দাম বেড়ে যাওয়ায় সংসার খরচ মেটানো দায়। অনেক সময় প্রতিবেশীদের চুলায় রান্না করে বাচ্চাদের খাওয়াতে হয়।”

সফিপুরের অটো চালক আব্দুল লতিফ (৫০) জানান, দিনে ৬০০ টাকা আয় করে সিলিন্ডার কিনতেই কয়েক দিনের জমানো টাকা শেষ হয়ে যায়।

কালিয়াকৈর বাজারের চা দোকানদার জয়নাল আবেদীন (৬০) জানান, আগে দুটি সিলিন্ডার ৩২০০ টাকায় পেলেও এখন লাগছে ৪৪০০ টাকা। চায়ের দাম বাড়াতে না পেরে ব্যবসা চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

চন্দ্রার মেস বাসিন্দা ও কলেজ ছাত্রী ফাতেমা আক্তার জানান, ৫ জন মিলে গ্যাস কিনতে গিয়ে জনপ্রতি খরচ ৩০০ টাকা থেকে বেড়ে ৫০০ টাকায় দাঁড়িয়েছে, যা শিক্ষার্থীদের জন্য বাড়তি চাপ।

অতিরিক্ত দাম নেওয়ার বিষয়ে খুচরা ব্যবসায়ীরা দুষছেন ডিলার ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে। কালিয়াকৈরের ব্যবসায়ী রাসেল হোসেন এবং পল্লী বিদ্যুৎ এলাকার ‘মায়ের দোয়া এন্টারপ্রাইজ’-এর স্বত্বাধিকারী জানান, কোম্পানি ও ডিলার পর্যায় থেকেই তাদের বেশি দামে সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে। সাথে যুক্ত হচ্ছে পরিবহন খরচ। সরকারি দামে পাইকারি সরবরাহ মিললে তারাও নির্ধারিত দামে বিক্রি করতে পারবেন বলে জানান।

এলপিজি সিলিন্ডারের বাজার অস্থিরতা নিয়ে কালিয়াকৈর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এ এইচ এম ফখরুল হুসাইন বলেন, “বিইআরসি নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে বিক্রির অভিযোগ আমরা পেয়েছি। নির্ধারিত দামে বিক্রি না করা ভোক্তা অধিকার আইনের লঙ্ঘন। দ্রুত বাজার মনিটরিং জোরদার করা হবে এবং প্রতিটি দোকানে মূল্য তালিকা টানানো বাধ্যতামূলক করা হবে। অনিয়ম পেলে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

এদিকে কালিয়াকৈর পৌরসভার সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থী ও সমাজসেবক মোঃ সাইজুদ্দিন বলেন, “কালিয়াকৈর শ্রমিকের শহর। শ্রমিকের বেতনের বড় অংশ গ্যাসে চলে গেলে তারা খাবে কী? সাধারণ মানুষকে সাথে নিয়ে এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানো হবে। সুযোগ পেলে পৌরসভার উদ্যোগে ন্যায্যমূল্যে এলপিজি বিক্রির ডিলার পয়েন্ট ও মনিটরিং সেল গঠন করা হবে।”

জ্বালানি খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, বিইআরসি নির্ধারিত দাম কার্যকর করতে ডিলার পর্যায় থেকে তদারকি জোরদার করা আবশ্যক। অবিলম্বে বাজারে প্রশাসনিক অভিযান পরিচালনা ও দৃশ্যমান মূল্য তালিকা প্রদর্শন নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।