ঢাকা ০২:১৫ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ০৯ অক্টোবর ২০২৬

তিন বছর পর গাজা – একটি জাতিকে নিশ্চিহ্ন করার নীলনকশা

  • ডেস্ক রিপোর্ট
  • প্রকাশিত : ১১:২০:৫৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর ২০২৬
  • ৭ বার দেখা হয়েছে

জুবাইয়া বিন্তে কবির: হামাসের নেতৃত্বে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামলার পর দখলদার ইসরায়েল গাজায় যে বর্বর যুদ্ধ শুরু করে, তার তিন বছর পর আজ গাজা আর চেনা যায় না। এটি এখন পৃথিবীর বুকে এক জীবন্ত ধ্বংসস্তূপ, এক উন্মুক্ত কারাগার, যেখানে প্রতিটি ইটের নিচে চাপা পড়ে আছে একটি পরিবারের স্বপ্ন। এই লেখাটি গাজাবাসীর পক্ষ থেকে, মানবতার পক্ষ থেকে দখলদার ইসরায়েলের রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে একটি দলিল।

রক্তের হিসাব: ৭৪ হাজারের বেশি শহীদ : গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে ২০২৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত শহীদের সংখ্যা ৭৪,২৪৩ জন ছাড়িয়েছে, আহত ১ লাখ ৭৫ হাজারের বেশি। প্রতি ১০ জন গাজাবাসীর মধ্যে ১ জন হয় শহীদ, না হয় পঙ্গু। এটি কোনো যুদ্ধ নয়, এটি সুপরিকল্পিত গণহত্যা।

যুদ্ধবিরতির প্রহসন: যুদ্ধবিরতির পরও ১৪শ’ হত্যা :
২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর যে কথিত যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করা হয়েছিল, তা ছিল বিশ্বকে ধোঁকা দেওয়ার এক নাটক। আল জাজিরার অনুসন্ধান বলছে গত ৩৬১ দিনে ৩২৫ দিনই ইসরায়েল হামলা চালিয়েছে। জাতিসংঘ OCHA-এর ২ অক্টোবর ২০২৬-এর রিপোর্টে যুদ্ধবিরতির পর নিহত ১,৪৩১ জন এবং আহত ৫,০২৬ জন। গাজার মিডিয়া অফিস বলছে ৫,১৪৭ বার যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে ১,৪২১ জনকে হত্যা করা হয়েছে। যুদ্ধবিরতি কাগজে, বোমা বাস্তবে।

২০ লাখ মানুষের জীবন বিপর্যস্ত: আল জাজিরার সতর্কতা :
আল জাজিরা বলছে এই যুদ্ধে প্রায় ২০ লাখ মানুষের জীবন বিপর্যস্ত। বারবার উচ্ছেদের নোটিশে পরিবার ছিন্নভিন্ন। একজন মানুষ গড়ে ৬ বার বাস্তুচ্যুত হয়েছে। আজ গাজায় কোনো পরিবার নেই যারা তাদের ঘর হারায়নি।

আশ্রয়হীন ৯৪ শতাংশ: তাঁবুর নিচে একটি জাতি :
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী সেপ্টেম্বরে গাজার ৯৪% মানুষ জরুরি আশ্রয় ও গৃহস্থালি সহায়তার প্রয়োজন ছিল। ৬৫% পরিবার তাঁবু বা ত্রিপলে থাকে, যেখানে শীত-গ্রীষ্ম-বৃষ্টি থেকে কোনো সুরক্ষা নেই। বিছানা নেই, রান্নার হাঁড়ি নেই, স্যানিটেশন নেই। এটি মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় আশ্রয় সংকট।

পানির জন্য হাহাকার: ৯১ শতাংশ পরিবার পানি-নিরাপত্তাহীন : জুনে যা ৮৪% ছিল, আগস্টে তা ৯১%। পয়ঃনিষ্কাশন ও বোমায় ভূগর্ভস্থ পানি লবণাক্ত ও দূষিত। শিশুরা নর্দমার পানি পান করছে। পানি সংগ্রহ এখন প্রতিদিনের যুদ্ধ, মা-বোনদের ৫-৬ ঘণ্টা লাইনে দাঁড়াতে হয় এক কলসি পানির জন্য।

অন্ধকার গাজা: বিদ্যুৎবিহীন জনপদ : গাজায় কোনো কার্যকর বিদ্যুৎ গ্রিড নেই। ইসরায়েল ইচ্ছাকৃতভাবে বিদ্যুৎ কেন্দ্র ধ্বংস করেছে। হাসপাতাল, পানির পাম্প, সব চলে জেনারেটরে। জ্বালানি না থাকায় আইসিইউতে শিশুরা মারা যাচ্ছে, ইনকিউবেটরে নবজাতক নিভে যাচ্ছে।

ইয়েলো লাইন: গাজাকে টুকরো করার ষড়যন্ত্র :
যুদ্ধ গাজার মানচিত্র বদলে দিয়েছে। ইয়েলো লাইন নামে এক সামরিক দাগ টেনে গাজার ৭০% এলাকা দখল করে রেখেছে ইসরায়েলি বাহিনী। ইউরো-মেড মনিটর বলছে ২০ লাখের বেশি মানুষ গাজার ৩০% এর কম এলাকায় গাদাগাদি করে বন্দি। এটি গাজাকে ছোট করতে করতে নিশ্চিহ্ন করার পরিকল্পনা।

রাফাহর কান্না: সীমান্তে বন্দি ১০ লাখ মানুষ : মিশর সীমান্তের রাফাহ ছিল শেষ আশ্রয়, যেখানে ১০ লাখের বেশি মানুষ আশ্রয় নিয়েছিল। ২০২৪ সালের মে মাসে সেখানে হামলা চালিয়ে ৮ লাখ মানুষকে আবার উচ্ছেদ করা হয়। এখন মাওয়াসি ছাড়া পুরো রাফাহ দখলদারদের নিয়ন্ত্রণে। মানুষ নিজের বাড়িতে ফিরতে পারে না।

অর্থনীতিকে হত্যা: ৯২ শতাংশ প্রতিষ্ঠান ধ্বংস :
জাতিসংঘের UNCTAD রিপোর্ট বলছে অক্টোবর ২০২৩ থেকে গাজার ৯২% অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস। দোকান নেই, কারখানা নেই, বাজার নেই। এটি অর্থনীতি ধ্বংস নয়, একটি জাতির জীবিকা হত্যা।

বিশ্বের ভয়াবহতম সংকট: ২১২ ডলারের জিডিপি :
UNCTAD-এর ভাষায় এটি বিশ্বের সবচেয়ে ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকট। ২০২৫ সালে মাথাপিছু জিডিপি মাত্র ২১২ ডলার, যা ২০২২ সালের ১৭%, দৈনিক ০.৫৮ ডলার। বেকারত্ব ৭৮%, কর্মক্ষম মানুষের ৯০% এর বেশি বেকার। একটি পুরো জনগোষ্ঠীকে ভিক্ষুক বানানো হয়েছে।

৯৯% নির্মাণ খাত শেষ: কৃষি-শিল্প মাটিতে : নির্মাণ খাত ৯৯% ধ্বংস, কৃষি ও শিল্প প্রতিটি ৯৪% ধ্বংস। জমিতে বোমা, কারখানায় বোমা। গাজা এখন খাদ্য উৎপাদন করতে পারে না, ইসরায়েলি সীমান্তের দয়ায় বাঁচতে হয়। এটি পরিকল্পিত দুর্ভিক্ষ তৈরির কৌশল।

২০০% মূল্যবৃদ্ধি: নগদহীন, ক্ষুধার্ত গাজা : পণ্যের দাম অক্টোবর ২০২৩ এর তুলনায় ২০০% বেশি। নগদ টাকা নেই, মানুষ ই-ওয়ালেটে ৩০% কমিশন দিয়ে টাকা তুলছে। ত্রাণের ট্রাক আটকে রেখে ইসরায়েল ক্ষুধাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে।

শিক্ষা হত্যা: ৯৮% স্কুল ধ্বংস : ইউনিসেফ বলছে ৯৮% স্কুল ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস। ৭ লাখ শিশু তিন বছর স্কুলে যায়নি। ২ লাখ শিশু কোনো শিক্ষাই পাচ্ছে না। ক্লাসরুম এখন গণকবর, স্কুল এখন আশ্রয়কেন্দ্র। একটি প্রজন্মকে মূর্খ করে রাখার নীলনকশা।

স্বাস্থ্য ব্যবস্থার গণহত্যা: ৩৬টি হাসপাতালই আক্রান্ত :
WHO বলছে ৩৬টি হাসপাতালই ক্ষতিগ্রস্ত, মাত্র ১৯টি আংশিক সচল, কোনোটিই পূর্ণ সক্ষম নয়। ওষুধ নেই, জ্বালানি নেই। ক্যানসার রোগী, ডায়ালাইসিস রোগী বিনা চিকিৎসায় মরছে। মাত্র ১২,৪০০ রোগীকে বাইরে নেওয়া গেছে। হাসপাতালে বোমা মারা যুদ্ধাপরাধ।

হামাস দুর্বল, কিন্তু প্রতিরোধ শেষ হয়নি : তিন বছরে ইসরায়েল দাবি করছে হামাসের ৩০-৪০ হাজারের সুসংগঠিত বাহিনী, ৫ ব্রিগেড, ২৪ ব্যাটালিয়ন ভেঙে গেছে। তাদের শীর্ষ নেতা ইসমাইল হানিয়া, ইয়াহিয়া সিনওয়ার, মোহাম্মদ দেইফ, মোহাম্মদ সিনওয়ার, ইজ আল-দিন আল-হাদ্দাদকে হত্যা করা হয়েছে। কিন্তু ৩-৫ জনের ছোট দলগুলো এখনো ধ্বংসস্তূপ থেকে প্রতিরোধ চালাচ্ছে। এটি প্রমাণ করে বোমা দিয়ে আদর্শ মারা যায় না।

শাসন ছেড়েছে হামাস, দখল ছাড়েনি ইসরায়েল : ৬ জুলাই ২০২৬ হামাস ১৯ বছরের বেসামরিক প্রশাসন বিলুপ্ত ঘোষণা করে। তারা N C A G-এর কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের কথা বলে। কিন্তু ইসরায়েল এই শূন্যতায় গণতন্ত্র আনেনি, এনেছে ওয়ারলর্ড, গোত্রীয় মিলিশিয়া আর চরম নিরাপত্তাহীনতা। পুলিশের ওপর ১২টি হামলায় ৫৩ জন নিহত, ত্রাণ লুট হচ্ছে।

গাজাবাসীর ক্ষোভ: বিক্ষোভ দমন করছে কে? ২০২৫ শেষ ও ২০২৬ জুড়ে মধ্য গাজা ও খান ইউনিসে মানুষ রাস্তায় নেমেছে – যুদ্ধ বন্ধ করো, খাবার ঢুকতে দাও স্লোগানে। এই ক্ষোভ শুধু ইসরায়েলের বিরুদ্ধে নয়, দীর্ঘ অবরোধ ও ধ্বংসের বিরুদ্ধে। কিন্তু এই বিক্ষোভকে হামাস দমন করছে বলা হচ্ছে, আসলে দমন করছে ক্ষুধা ও বোমা।

৭ অক্টোবরের সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্ক ও সত্য : আপনি উল্লেখ করেছেন ইয়াহিয়া সিনওয়ার ২০২২ সালে আল-আকসা নিয়ে সতর্ক করেছিলেন। ইসরায়েলি সাংবাদিক শ্লোমি এলদারের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, হামলার আগে বন্দি বিনিময় ও দীর্ঘ শান্তির একটি চুক্তি প্রায় প্রস্তুত ছিল, নেতানিয়াহু তা পিছিয়ে দেন। শিন বেতের কর্মকর্তা বলেছিলেন সিনওয়ার রাডার থেকে অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিলেন। অর্থাৎ ৭ অক্টোবর হঠাৎ হয়নি, এটি দীর্ঘ অবরোধের বিস্ফোরণ।

জনমত: হামাসের প্রতি সমর্থন কমলেও ফিলিস্তিনের প্রতি বাড়ছে : জরিপে হামাসের প্রতি সমর্থন ৩৫% থেকে ২৪% এ নেমেছে, পশ্চিম তীরে ৩২% থেকে ১৮%, গাজায় ৪১% থেকে ৩৩%। কিন্তু এর মানে ফিলিস্তিনের প্রতি সমর্থন কমেনি। জেরুজালেম মিডিয়ার জরিপে আস্থা ১২% থেকে ৬.৭% হলেও ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের দাবি বিশ্বজুড়ে আরও জোরালো হয়েছে। মানুষ হামাসের কৌশল নিয়ে প্রশ্ন তুলছে, কিন্তু দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে অবস্থান একই আছে।

বোর্ড অব পিস: নতুন ফাঁদ? জাতিসংঘ প্রস্তাব ২৮০৩ ও ট্রাম্পের বোর্ড অব পিস পরিকল্পনায় টেকনোক্র্যাট কমিটি, আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক ও আরব শান্তিরক্ষীর কথা বলা হচ্ছে, যেখানে হামাসের আসন নেই। এটি কি মুক্তি, নাকি গাজাকে আন্তর্জাতিক তত্ত্বাবধানে আরেকটি উপনিবেশ বানানোর চেষ্টা? ফিলিস্তিনিরা নিজেরা শাসন করবে, বাইরের কেউ নয়।

৭১.৫ বিলিয়ন ডলারের ধ্বংস: কে দেবে? বিশ্বব্যাংক, ইইউ, জাতিসংঘ বলছে পুনর্গঠনে ৭১.৫ বিলিয়ন ডলার লাগবে, যার মধ্যে ৩৫.২ বিলিয়ন শুধু ভৌত ক্ষতি। অন্য হিসাবে ৮০ বিলিয়ন ছাড়াবে। ইসরায়েল, আমেরিকা, আমিরাত, সৌদি আরব বলছে হামাস থাকলে টাকা দেবে না। অর্থাৎ টাকার শর্তে রাজনীতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা।

হাইব্রিড মডেলের ভয়: হিজবুল্লাহ হবে গাজা?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন হামাস এখন হিজবুল্লাহ বা তালেবানের মতো হাইব্রিড হবে – প্রশাসন ছাড়বে, কিন্তু ভূগর্ভে অস্ত্র ও নেটওয়ার্ক রাখবে। যদি বৈধ ফিলিস্তিনি নেতৃত্ব না আসে, গাজা ওয়ারলর্ড-তন্ত্রে পরিণত হবে। দখলদাররা এটাই চায় – বিভক্ত, দুর্বল, শাসনহীন গাজা।

মিসরের আলোচনা: নিরস্ত্রীকরণ বনাম রাষ্ট্র : মিসর, কাতার, তুরস্ক, যুক্তরাষ্ট্র মধ্যস্থতায় পরোক্ষ আলোচনা চলছে। ইসরায়েল চায় সব সুড়ঙ্গ ধ্বংস ও সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণ, খলিল আল-হাইয়ার নেতৃত্বাধীন হামাস চায় দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধবিরতি ও সার্বভৌম ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের নিশ্চয়তা। অস্ত্রের আগে রাষ্ট্র, নিরাপত্তার আগে মুক্তি – এটাই ফিলিস্তিনি দাবি।

কবে মুক্তি? মুক্তির তিন শর্ত : প্রথম, অবিলম্বে প্রকৃত যুদ্ধবিরতি ও গণহত্যা বন্ধ, প্রতিদিনের ৫-১০ জন হত্যা বন্ধ করতে হবে। দ্বিতীয়, অবরোধ তুলে মানবিক করিডোর, পানি, বিদ্যুৎ, স্কুল, হাসপাতাল ফেরাতে হবে। তৃতীয়, ফিলিস্তিনিদের নিজেদের নেতৃত্বে, টেকনোক্র্যাট নয়, নির্বাচিত ও বৈধ প্রশাসন এবং ১৯৬৭ সীমানায় সার্বভৌম ফিলিস্তিন রাষ্ট্র। এই তিন ছাড়া মুক্তি নেই।

পরিশেষে, ১৯৮৭ সালে জন্ম নেওয়া হামাস আজ সবচেয়ে দুর্বল, কিন্তু গাজা দুর্বল নয়। ২ লাখ ৭৯ হাজার মানুষ তাঁবুতে থেকেও ফিরে যাওয়ার স্বপ্ন দেখে। গাজার শিশু ধ্বংসস্তূপে বসে আলিফ-বা পড়ে। এই জাতিকে বোমা দিয়ে মুছা যায় না। কবে মুক্তি মিলবে? যেদিন বিশ্ব বিবেক জাগবে, যেদিন দখলদার ইসরায়েলের বিচার হবে, যেদিন ফিলিস্তিনি শিশু আর পানি সংগ্রহের জন্য ৬ ঘণ্টা লাইনে দাঁড়াবে না, সেদিন। গাজাবাসীর দুঃখ আজ আমাদের দুঃখ, তাদের মুক্তি আমাদের মুক্তি।

লেখক: জুবাইয়া বিন্তে কবির

জনপ্রিয় সংবাদ

৫ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবির অভিযোগে মামলা

তিন বছর পর গাজা – একটি জাতিকে নিশ্চিহ্ন করার নীলনকশা

প্রকাশিত : ১১:২০:৫৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর ২০২৬

জুবাইয়া বিন্তে কবির: হামাসের নেতৃত্বে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামলার পর দখলদার ইসরায়েল গাজায় যে বর্বর যুদ্ধ শুরু করে, তার তিন বছর পর আজ গাজা আর চেনা যায় না। এটি এখন পৃথিবীর বুকে এক জীবন্ত ধ্বংসস্তূপ, এক উন্মুক্ত কারাগার, যেখানে প্রতিটি ইটের নিচে চাপা পড়ে আছে একটি পরিবারের স্বপ্ন। এই লেখাটি গাজাবাসীর পক্ষ থেকে, মানবতার পক্ষ থেকে দখলদার ইসরায়েলের রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে একটি দলিল।

রক্তের হিসাব: ৭৪ হাজারের বেশি শহীদ : গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে ২০২৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত শহীদের সংখ্যা ৭৪,২৪৩ জন ছাড়িয়েছে, আহত ১ লাখ ৭৫ হাজারের বেশি। প্রতি ১০ জন গাজাবাসীর মধ্যে ১ জন হয় শহীদ, না হয় পঙ্গু। এটি কোনো যুদ্ধ নয়, এটি সুপরিকল্পিত গণহত্যা।

যুদ্ধবিরতির প্রহসন: যুদ্ধবিরতির পরও ১৪শ’ হত্যা :
২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর যে কথিত যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করা হয়েছিল, তা ছিল বিশ্বকে ধোঁকা দেওয়ার এক নাটক। আল জাজিরার অনুসন্ধান বলছে গত ৩৬১ দিনে ৩২৫ দিনই ইসরায়েল হামলা চালিয়েছে। জাতিসংঘ OCHA-এর ২ অক্টোবর ২০২৬-এর রিপোর্টে যুদ্ধবিরতির পর নিহত ১,৪৩১ জন এবং আহত ৫,০২৬ জন। গাজার মিডিয়া অফিস বলছে ৫,১৪৭ বার যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে ১,৪২১ জনকে হত্যা করা হয়েছে। যুদ্ধবিরতি কাগজে, বোমা বাস্তবে।

২০ লাখ মানুষের জীবন বিপর্যস্ত: আল জাজিরার সতর্কতা :
আল জাজিরা বলছে এই যুদ্ধে প্রায় ২০ লাখ মানুষের জীবন বিপর্যস্ত। বারবার উচ্ছেদের নোটিশে পরিবার ছিন্নভিন্ন। একজন মানুষ গড়ে ৬ বার বাস্তুচ্যুত হয়েছে। আজ গাজায় কোনো পরিবার নেই যারা তাদের ঘর হারায়নি।

আশ্রয়হীন ৯৪ শতাংশ: তাঁবুর নিচে একটি জাতি :
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী সেপ্টেম্বরে গাজার ৯৪% মানুষ জরুরি আশ্রয় ও গৃহস্থালি সহায়তার প্রয়োজন ছিল। ৬৫% পরিবার তাঁবু বা ত্রিপলে থাকে, যেখানে শীত-গ্রীষ্ম-বৃষ্টি থেকে কোনো সুরক্ষা নেই। বিছানা নেই, রান্নার হাঁড়ি নেই, স্যানিটেশন নেই। এটি মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় আশ্রয় সংকট।

পানির জন্য হাহাকার: ৯১ শতাংশ পরিবার পানি-নিরাপত্তাহীন : জুনে যা ৮৪% ছিল, আগস্টে তা ৯১%। পয়ঃনিষ্কাশন ও বোমায় ভূগর্ভস্থ পানি লবণাক্ত ও দূষিত। শিশুরা নর্দমার পানি পান করছে। পানি সংগ্রহ এখন প্রতিদিনের যুদ্ধ, মা-বোনদের ৫-৬ ঘণ্টা লাইনে দাঁড়াতে হয় এক কলসি পানির জন্য।

অন্ধকার গাজা: বিদ্যুৎবিহীন জনপদ : গাজায় কোনো কার্যকর বিদ্যুৎ গ্রিড নেই। ইসরায়েল ইচ্ছাকৃতভাবে বিদ্যুৎ কেন্দ্র ধ্বংস করেছে। হাসপাতাল, পানির পাম্প, সব চলে জেনারেটরে। জ্বালানি না থাকায় আইসিইউতে শিশুরা মারা যাচ্ছে, ইনকিউবেটরে নবজাতক নিভে যাচ্ছে।

ইয়েলো লাইন: গাজাকে টুকরো করার ষড়যন্ত্র :
যুদ্ধ গাজার মানচিত্র বদলে দিয়েছে। ইয়েলো লাইন নামে এক সামরিক দাগ টেনে গাজার ৭০% এলাকা দখল করে রেখেছে ইসরায়েলি বাহিনী। ইউরো-মেড মনিটর বলছে ২০ লাখের বেশি মানুষ গাজার ৩০% এর কম এলাকায় গাদাগাদি করে বন্দি। এটি গাজাকে ছোট করতে করতে নিশ্চিহ্ন করার পরিকল্পনা।

রাফাহর কান্না: সীমান্তে বন্দি ১০ লাখ মানুষ : মিশর সীমান্তের রাফাহ ছিল শেষ আশ্রয়, যেখানে ১০ লাখের বেশি মানুষ আশ্রয় নিয়েছিল। ২০২৪ সালের মে মাসে সেখানে হামলা চালিয়ে ৮ লাখ মানুষকে আবার উচ্ছেদ করা হয়। এখন মাওয়াসি ছাড়া পুরো রাফাহ দখলদারদের নিয়ন্ত্রণে। মানুষ নিজের বাড়িতে ফিরতে পারে না।

অর্থনীতিকে হত্যা: ৯২ শতাংশ প্রতিষ্ঠান ধ্বংস :
জাতিসংঘের UNCTAD রিপোর্ট বলছে অক্টোবর ২০২৩ থেকে গাজার ৯২% অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস। দোকান নেই, কারখানা নেই, বাজার নেই। এটি অর্থনীতি ধ্বংস নয়, একটি জাতির জীবিকা হত্যা।

বিশ্বের ভয়াবহতম সংকট: ২১২ ডলারের জিডিপি :
UNCTAD-এর ভাষায় এটি বিশ্বের সবচেয়ে ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকট। ২০২৫ সালে মাথাপিছু জিডিপি মাত্র ২১২ ডলার, যা ২০২২ সালের ১৭%, দৈনিক ০.৫৮ ডলার। বেকারত্ব ৭৮%, কর্মক্ষম মানুষের ৯০% এর বেশি বেকার। একটি পুরো জনগোষ্ঠীকে ভিক্ষুক বানানো হয়েছে।

৯৯% নির্মাণ খাত শেষ: কৃষি-শিল্প মাটিতে : নির্মাণ খাত ৯৯% ধ্বংস, কৃষি ও শিল্প প্রতিটি ৯৪% ধ্বংস। জমিতে বোমা, কারখানায় বোমা। গাজা এখন খাদ্য উৎপাদন করতে পারে না, ইসরায়েলি সীমান্তের দয়ায় বাঁচতে হয়। এটি পরিকল্পিত দুর্ভিক্ষ তৈরির কৌশল।

২০০% মূল্যবৃদ্ধি: নগদহীন, ক্ষুধার্ত গাজা : পণ্যের দাম অক্টোবর ২০২৩ এর তুলনায় ২০০% বেশি। নগদ টাকা নেই, মানুষ ই-ওয়ালেটে ৩০% কমিশন দিয়ে টাকা তুলছে। ত্রাণের ট্রাক আটকে রেখে ইসরায়েল ক্ষুধাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে।

শিক্ষা হত্যা: ৯৮% স্কুল ধ্বংস : ইউনিসেফ বলছে ৯৮% স্কুল ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস। ৭ লাখ শিশু তিন বছর স্কুলে যায়নি। ২ লাখ শিশু কোনো শিক্ষাই পাচ্ছে না। ক্লাসরুম এখন গণকবর, স্কুল এখন আশ্রয়কেন্দ্র। একটি প্রজন্মকে মূর্খ করে রাখার নীলনকশা।

স্বাস্থ্য ব্যবস্থার গণহত্যা: ৩৬টি হাসপাতালই আক্রান্ত :
WHO বলছে ৩৬টি হাসপাতালই ক্ষতিগ্রস্ত, মাত্র ১৯টি আংশিক সচল, কোনোটিই পূর্ণ সক্ষম নয়। ওষুধ নেই, জ্বালানি নেই। ক্যানসার রোগী, ডায়ালাইসিস রোগী বিনা চিকিৎসায় মরছে। মাত্র ১২,৪০০ রোগীকে বাইরে নেওয়া গেছে। হাসপাতালে বোমা মারা যুদ্ধাপরাধ।

হামাস দুর্বল, কিন্তু প্রতিরোধ শেষ হয়নি : তিন বছরে ইসরায়েল দাবি করছে হামাসের ৩০-৪০ হাজারের সুসংগঠিত বাহিনী, ৫ ব্রিগেড, ২৪ ব্যাটালিয়ন ভেঙে গেছে। তাদের শীর্ষ নেতা ইসমাইল হানিয়া, ইয়াহিয়া সিনওয়ার, মোহাম্মদ দেইফ, মোহাম্মদ সিনওয়ার, ইজ আল-দিন আল-হাদ্দাদকে হত্যা করা হয়েছে। কিন্তু ৩-৫ জনের ছোট দলগুলো এখনো ধ্বংসস্তূপ থেকে প্রতিরোধ চালাচ্ছে। এটি প্রমাণ করে বোমা দিয়ে আদর্শ মারা যায় না।

শাসন ছেড়েছে হামাস, দখল ছাড়েনি ইসরায়েল : ৬ জুলাই ২০২৬ হামাস ১৯ বছরের বেসামরিক প্রশাসন বিলুপ্ত ঘোষণা করে। তারা N C A G-এর কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের কথা বলে। কিন্তু ইসরায়েল এই শূন্যতায় গণতন্ত্র আনেনি, এনেছে ওয়ারলর্ড, গোত্রীয় মিলিশিয়া আর চরম নিরাপত্তাহীনতা। পুলিশের ওপর ১২টি হামলায় ৫৩ জন নিহত, ত্রাণ লুট হচ্ছে।

গাজাবাসীর ক্ষোভ: বিক্ষোভ দমন করছে কে? ২০২৫ শেষ ও ২০২৬ জুড়ে মধ্য গাজা ও খান ইউনিসে মানুষ রাস্তায় নেমেছে – যুদ্ধ বন্ধ করো, খাবার ঢুকতে দাও স্লোগানে। এই ক্ষোভ শুধু ইসরায়েলের বিরুদ্ধে নয়, দীর্ঘ অবরোধ ও ধ্বংসের বিরুদ্ধে। কিন্তু এই বিক্ষোভকে হামাস দমন করছে বলা হচ্ছে, আসলে দমন করছে ক্ষুধা ও বোমা।

৭ অক্টোবরের সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্ক ও সত্য : আপনি উল্লেখ করেছেন ইয়াহিয়া সিনওয়ার ২০২২ সালে আল-আকসা নিয়ে সতর্ক করেছিলেন। ইসরায়েলি সাংবাদিক শ্লোমি এলদারের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, হামলার আগে বন্দি বিনিময় ও দীর্ঘ শান্তির একটি চুক্তি প্রায় প্রস্তুত ছিল, নেতানিয়াহু তা পিছিয়ে দেন। শিন বেতের কর্মকর্তা বলেছিলেন সিনওয়ার রাডার থেকে অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিলেন। অর্থাৎ ৭ অক্টোবর হঠাৎ হয়নি, এটি দীর্ঘ অবরোধের বিস্ফোরণ।

জনমত: হামাসের প্রতি সমর্থন কমলেও ফিলিস্তিনের প্রতি বাড়ছে : জরিপে হামাসের প্রতি সমর্থন ৩৫% থেকে ২৪% এ নেমেছে, পশ্চিম তীরে ৩২% থেকে ১৮%, গাজায় ৪১% থেকে ৩৩%। কিন্তু এর মানে ফিলিস্তিনের প্রতি সমর্থন কমেনি। জেরুজালেম মিডিয়ার জরিপে আস্থা ১২% থেকে ৬.৭% হলেও ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের দাবি বিশ্বজুড়ে আরও জোরালো হয়েছে। মানুষ হামাসের কৌশল নিয়ে প্রশ্ন তুলছে, কিন্তু দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে অবস্থান একই আছে।

বোর্ড অব পিস: নতুন ফাঁদ? জাতিসংঘ প্রস্তাব ২৮০৩ ও ট্রাম্পের বোর্ড অব পিস পরিকল্পনায় টেকনোক্র্যাট কমিটি, আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক ও আরব শান্তিরক্ষীর কথা বলা হচ্ছে, যেখানে হামাসের আসন নেই। এটি কি মুক্তি, নাকি গাজাকে আন্তর্জাতিক তত্ত্বাবধানে আরেকটি উপনিবেশ বানানোর চেষ্টা? ফিলিস্তিনিরা নিজেরা শাসন করবে, বাইরের কেউ নয়।

৭১.৫ বিলিয়ন ডলারের ধ্বংস: কে দেবে? বিশ্বব্যাংক, ইইউ, জাতিসংঘ বলছে পুনর্গঠনে ৭১.৫ বিলিয়ন ডলার লাগবে, যার মধ্যে ৩৫.২ বিলিয়ন শুধু ভৌত ক্ষতি। অন্য হিসাবে ৮০ বিলিয়ন ছাড়াবে। ইসরায়েল, আমেরিকা, আমিরাত, সৌদি আরব বলছে হামাস থাকলে টাকা দেবে না। অর্থাৎ টাকার শর্তে রাজনীতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা।

হাইব্রিড মডেলের ভয়: হিজবুল্লাহ হবে গাজা?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন হামাস এখন হিজবুল্লাহ বা তালেবানের মতো হাইব্রিড হবে – প্রশাসন ছাড়বে, কিন্তু ভূগর্ভে অস্ত্র ও নেটওয়ার্ক রাখবে। যদি বৈধ ফিলিস্তিনি নেতৃত্ব না আসে, গাজা ওয়ারলর্ড-তন্ত্রে পরিণত হবে। দখলদাররা এটাই চায় – বিভক্ত, দুর্বল, শাসনহীন গাজা।

মিসরের আলোচনা: নিরস্ত্রীকরণ বনাম রাষ্ট্র : মিসর, কাতার, তুরস্ক, যুক্তরাষ্ট্র মধ্যস্থতায় পরোক্ষ আলোচনা চলছে। ইসরায়েল চায় সব সুড়ঙ্গ ধ্বংস ও সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণ, খলিল আল-হাইয়ার নেতৃত্বাধীন হামাস চায় দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধবিরতি ও সার্বভৌম ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের নিশ্চয়তা। অস্ত্রের আগে রাষ্ট্র, নিরাপত্তার আগে মুক্তি – এটাই ফিলিস্তিনি দাবি।

কবে মুক্তি? মুক্তির তিন শর্ত : প্রথম, অবিলম্বে প্রকৃত যুদ্ধবিরতি ও গণহত্যা বন্ধ, প্রতিদিনের ৫-১০ জন হত্যা বন্ধ করতে হবে। দ্বিতীয়, অবরোধ তুলে মানবিক করিডোর, পানি, বিদ্যুৎ, স্কুল, হাসপাতাল ফেরাতে হবে। তৃতীয়, ফিলিস্তিনিদের নিজেদের নেতৃত্বে, টেকনোক্র্যাট নয়, নির্বাচিত ও বৈধ প্রশাসন এবং ১৯৬৭ সীমানায় সার্বভৌম ফিলিস্তিন রাষ্ট্র। এই তিন ছাড়া মুক্তি নেই।

পরিশেষে, ১৯৮৭ সালে জন্ম নেওয়া হামাস আজ সবচেয়ে দুর্বল, কিন্তু গাজা দুর্বল নয়। ২ লাখ ৭৯ হাজার মানুষ তাঁবুতে থেকেও ফিরে যাওয়ার স্বপ্ন দেখে। গাজার শিশু ধ্বংসস্তূপে বসে আলিফ-বা পড়ে। এই জাতিকে বোমা দিয়ে মুছা যায় না। কবে মুক্তি মিলবে? যেদিন বিশ্ব বিবেক জাগবে, যেদিন দখলদার ইসরায়েলের বিচার হবে, যেদিন ফিলিস্তিনি শিশু আর পানি সংগ্রহের জন্য ৬ ঘণ্টা লাইনে দাঁড়াবে না, সেদিন। গাজাবাসীর দুঃখ আজ আমাদের দুঃখ, তাদের মুক্তি আমাদের মুক্তি।

লেখক: জুবাইয়া বিন্তে কবির