ঢাকা ০১:৪৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ১১ অক্টোবর ২০২৬

ব্যথার সঙ্গে চার বছরের দীর্ঘ লড়াই শেষে, গার্গীর মুখোমুখি এখন এক নতুন চ্যালেঞ্জ

  • ডেস্ক রিপোর্ট
  • প্রকাশিত : ১০:০৪:০৫ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১১ অক্টোবর ২০২৬
  • ১২ বার দেখা হয়েছে

মেয়েকে পড়াশোনা করিয়ে নিজের পায়ে দাঁড় করাবেন—এটাই ছিল বাবা-মায়ের স্বপ্ন। বাবা চেয়েছিলেন, মেয়ে ইঞ্জিনিয়ার হোক। ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনায় মেধাবী গার্গী চ্যাটার্জীও এগিয়ে যাচ্ছিলেন সেই স্বপ্নের পথে। স্কুলে তার রোল সাধারণত প্রথম পাঁচজনের মধ্যে থাকত। প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী (পিএসসি), জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট (জেএসসি) ও মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি)—তিন পরীক্ষাতেই পেয়েছিলেন জিপিএ-৫।

২০১৬ সালে পিরোজপুর সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করে উচ্চমাধ্যমিকে পড়তে ঢাকায় যান গার্গী। প্রথমে মাইলস্টোন কলেজে ভর্তি হলেও পরে রাজউক উত্তরা মডেল কলেজে পড়াশোনা শুরু করেন। সবকিছু ঠিকঠাকই চলছিল। কিন্তু পরের বছরই বদলে যায় তার জীবন।

২০১৭ সালের ১৬ মার্চ হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান গার্গীর বাবা দীপক কুমার চ্যাটার্জী। তিনি স্ট্যাম্প ভেন্ডার ও শিক্ষানবিশ আইনজীবী হিসেবে কাজ করতেন। বাবার মৃত্যুর পর পরিবারে আর্থিক সংকট দেখা দেয়। গার্গীর পড়াশোনা ও সংসারের খরচ চালাতে তার মা পূর্ণিমা চ্যাটার্জী স্বরূপকাঠীর গ্রামের জমি কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হন। সেই অর্থও ধীরে ধীরে শেষ হয়ে যায়।

অর্থকষ্টের কারণে ঢাকায় থেকে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি গার্গীর। ফিরে আসতে হয় পিরোজপুরে। পরে পিরোজপুর মহিলা কলেজের মাধ্যমে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নেন তিনি। বাবার মৃত্যু, কলেজ পরিবর্তন ও মানসিকভাবে ভেঙে পড়ার প্রভাব পড়ে ফলাফলেও। ২০১৮ সালে এইচএসসিতে তার ফল হয় জিপিএ-৪.১৭। ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার স্বপ্ন সেখানেই থেমে যায়।

তবে বাবার আরেকটি স্বপ্ন ছিল—মেয়েকে নিজের পায়ে দাঁড় করানো। সেই স্বপ্ন পূরণের পথেই এগিয়ে যান গার্গী। ভর্তি হন ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটির আইন বিভাগে। পড়াশোনার পাশাপাশি নিজের খরচ চালাতে টিউশনি করেছেন, কোচিংয়ে পড়িয়েছেন, করেছেন খণ্ডকালীন চাকরি। ২০২০-২১ সালের দিকে নিজ উদ্যোগে হোমমেড জুয়েলারির ব্যবসাও শুরু করেন। নিজের পায়ে দাঁড়ানোর লড়াই তখন এগোচ্ছিল।

কিন্তু এবার তার জীবনে বাধা হয়ে দাঁড়ায় জটিল এক রোগ। আইন বিষয়ে পড়াশোনার শেষ বর্ষে থাকতেই গার্গীর অ্যাঙ্কাইলোজিং স্পন্ডিলাইটিস ধরা পড়ে। ধীরে ধীরে শরীরজুড়ে ব্যথা, হাত-পা নাড়াতে সমস্যা, ঘাড় সোজা রাখতে না পারা ও হাঁটাচলায় অসুবিধা বাড়তে থাকে। অসুস্থতা বেড়ে যাওয়ায় একপর্যায়ে ব্যবসাটিও বন্ধ করে দিতে হয় তাকে। তারপরও পড়াশোনা থামাননি গার্গী। অসুস্থতার সঙ্গে লড়াই করেই এলএলবি শেষ করেন। এতে তার সিজিপিএ ছিল ৩.৮৬। এলএলএমে অর্জন করেন ৩.৮৮।

এরপর বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসে (বিইউপি) মাস্টার্স ইন পিস, কনফ্লিক্ট অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস স্টাডিজে ভর্তি হন। তত দিনে তার শারীরিক অবস্থা আরও খারাপের দিকে যায়। হুইলচেয়ারে করে বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে হতো তাকে। বন্ধু নিজাম, শ্রীবতি ও রনক বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করেছেন।

বর্তমানে গার্গী অ্যাঙ্কিলোজিং স্পন্ডিলাইটিসের জটিল পর্যায়ে রয়েছেন। বাংলাদেশ মেডিকেল ইউনিভার্সিটির রিউমাটোলজিস্ট অধ্যাপক ডা. আবু শাহীনের তত্ত্বাবধানে তার চিকিৎসা চলছে। পরিবারের ভাষ্য, গার্গীর স্যাক্রোইলিয়াক (এসআই) জয়েন্ট, হিপ জয়েন্ট ও লাম্বার স্পাইনের বিভিন্ন অংশ জোড়া লেগে গেছে। অল্প হাঁটতেও তার লাঠির প্রয়োজন হয়। অনেক সময় হুইলচেয়ার ব্যবহার করতে হয়।

দীর্ঘদিন চিকিৎসার অংশ হিসেবে অ্যাডালিমুম্যাব ও ইটানারসেপ্টের মতো ইনজেকশন নিয়েছেন গার্গী।
পরিবারের ভাষ্য, শুরুতে এসব চিকিৎসায় কিছুটা উপকার পেলেও পরে কার্যকারিতা কমে যায়। দীর্ঘদিন চিকিৎসা নেওয়ার ফলে বিভিন্ন শারীরিক জটিলতাও দেখা দিয়েছে। এখন চিকিৎসকের পরামর্শে হিপ জয়েন্ট প্রতিস্থাপনের প্রস্তুতি চলছে। এরপর প্রদাহ নিয়ন্ত্রণে গোলিমুম্যাব ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। নতুন চিকিৎসা শুরুর আগে প্রয়োজনীয় টিকা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করানোর কথাও জানিয়েছেন পরিবারের সদস্যরা।

জনপ্রিয় সংবাদ

বলিউড তারকা ইমরান খান আটক

ব্যথার সঙ্গে চার বছরের দীর্ঘ লড়াই শেষে, গার্গীর মুখোমুখি এখন এক নতুন চ্যালেঞ্জ

প্রকাশিত : ১০:০৪:০৫ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১১ অক্টোবর ২০২৬

মেয়েকে পড়াশোনা করিয়ে নিজের পায়ে দাঁড় করাবেন—এটাই ছিল বাবা-মায়ের স্বপ্ন। বাবা চেয়েছিলেন, মেয়ে ইঞ্জিনিয়ার হোক। ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনায় মেধাবী গার্গী চ্যাটার্জীও এগিয়ে যাচ্ছিলেন সেই স্বপ্নের পথে। স্কুলে তার রোল সাধারণত প্রথম পাঁচজনের মধ্যে থাকত। প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী (পিএসসি), জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট (জেএসসি) ও মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি)—তিন পরীক্ষাতেই পেয়েছিলেন জিপিএ-৫।

২০১৬ সালে পিরোজপুর সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করে উচ্চমাধ্যমিকে পড়তে ঢাকায় যান গার্গী। প্রথমে মাইলস্টোন কলেজে ভর্তি হলেও পরে রাজউক উত্তরা মডেল কলেজে পড়াশোনা শুরু করেন। সবকিছু ঠিকঠাকই চলছিল। কিন্তু পরের বছরই বদলে যায় তার জীবন।

২০১৭ সালের ১৬ মার্চ হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান গার্গীর বাবা দীপক কুমার চ্যাটার্জী। তিনি স্ট্যাম্প ভেন্ডার ও শিক্ষানবিশ আইনজীবী হিসেবে কাজ করতেন। বাবার মৃত্যুর পর পরিবারে আর্থিক সংকট দেখা দেয়। গার্গীর পড়াশোনা ও সংসারের খরচ চালাতে তার মা পূর্ণিমা চ্যাটার্জী স্বরূপকাঠীর গ্রামের জমি কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হন। সেই অর্থও ধীরে ধীরে শেষ হয়ে যায়।

অর্থকষ্টের কারণে ঢাকায় থেকে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি গার্গীর। ফিরে আসতে হয় পিরোজপুরে। পরে পিরোজপুর মহিলা কলেজের মাধ্যমে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নেন তিনি। বাবার মৃত্যু, কলেজ পরিবর্তন ও মানসিকভাবে ভেঙে পড়ার প্রভাব পড়ে ফলাফলেও। ২০১৮ সালে এইচএসসিতে তার ফল হয় জিপিএ-৪.১৭। ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার স্বপ্ন সেখানেই থেমে যায়।

তবে বাবার আরেকটি স্বপ্ন ছিল—মেয়েকে নিজের পায়ে দাঁড় করানো। সেই স্বপ্ন পূরণের পথেই এগিয়ে যান গার্গী। ভর্তি হন ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটির আইন বিভাগে। পড়াশোনার পাশাপাশি নিজের খরচ চালাতে টিউশনি করেছেন, কোচিংয়ে পড়িয়েছেন, করেছেন খণ্ডকালীন চাকরি। ২০২০-২১ সালের দিকে নিজ উদ্যোগে হোমমেড জুয়েলারির ব্যবসাও শুরু করেন। নিজের পায়ে দাঁড়ানোর লড়াই তখন এগোচ্ছিল।

কিন্তু এবার তার জীবনে বাধা হয়ে দাঁড়ায় জটিল এক রোগ। আইন বিষয়ে পড়াশোনার শেষ বর্ষে থাকতেই গার্গীর অ্যাঙ্কাইলোজিং স্পন্ডিলাইটিস ধরা পড়ে। ধীরে ধীরে শরীরজুড়ে ব্যথা, হাত-পা নাড়াতে সমস্যা, ঘাড় সোজা রাখতে না পারা ও হাঁটাচলায় অসুবিধা বাড়তে থাকে। অসুস্থতা বেড়ে যাওয়ায় একপর্যায়ে ব্যবসাটিও বন্ধ করে দিতে হয় তাকে। তারপরও পড়াশোনা থামাননি গার্গী। অসুস্থতার সঙ্গে লড়াই করেই এলএলবি শেষ করেন। এতে তার সিজিপিএ ছিল ৩.৮৬। এলএলএমে অর্জন করেন ৩.৮৮।

এরপর বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসে (বিইউপি) মাস্টার্স ইন পিস, কনফ্লিক্ট অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস স্টাডিজে ভর্তি হন। তত দিনে তার শারীরিক অবস্থা আরও খারাপের দিকে যায়। হুইলচেয়ারে করে বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে হতো তাকে। বন্ধু নিজাম, শ্রীবতি ও রনক বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করেছেন।

বর্তমানে গার্গী অ্যাঙ্কিলোজিং স্পন্ডিলাইটিসের জটিল পর্যায়ে রয়েছেন। বাংলাদেশ মেডিকেল ইউনিভার্সিটির রিউমাটোলজিস্ট অধ্যাপক ডা. আবু শাহীনের তত্ত্বাবধানে তার চিকিৎসা চলছে। পরিবারের ভাষ্য, গার্গীর স্যাক্রোইলিয়াক (এসআই) জয়েন্ট, হিপ জয়েন্ট ও লাম্বার স্পাইনের বিভিন্ন অংশ জোড়া লেগে গেছে। অল্প হাঁটতেও তার লাঠির প্রয়োজন হয়। অনেক সময় হুইলচেয়ার ব্যবহার করতে হয়।

দীর্ঘদিন চিকিৎসার অংশ হিসেবে অ্যাডালিমুম্যাব ও ইটানারসেপ্টের মতো ইনজেকশন নিয়েছেন গার্গী।
পরিবারের ভাষ্য, শুরুতে এসব চিকিৎসায় কিছুটা উপকার পেলেও পরে কার্যকারিতা কমে যায়। দীর্ঘদিন চিকিৎসা নেওয়ার ফলে বিভিন্ন শারীরিক জটিলতাও দেখা দিয়েছে। এখন চিকিৎসকের পরামর্শে হিপ জয়েন্ট প্রতিস্থাপনের প্রস্তুতি চলছে। এরপর প্রদাহ নিয়ন্ত্রণে গোলিমুম্যাব ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। নতুন চিকিৎসা শুরুর আগে প্রয়োজনীয় টিকা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করানোর কথাও জানিয়েছেন পরিবারের সদস্যরা।