দেশের বাজারে তিন মাসেরও বেশি সময় ধরে প্যাকেটজাত সুগন্ধি বা পোলাও চালের দাম আকাশচুম্বী। বর্তমানে ব্র্যান্ডভেদে প্যাকেটজাত পোলাও চাল বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি সর্বোচ্চ ২৩০ টাকায়। তবে বাজারে খোলা পোলাও চালের তিনটি ধরন পাওয়া যাচ্ছে, যার সর্বনিম্নটি বিক্রি হচ্ছে মাত্র ১০০ টাকায়। সে হিসেবে খোলা সুগন্ধি চালের দ্বিগুণ দামেও প্যাকেটজাত পোলাও চাল কেনা সম্ভব হচ্ছে না।
বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, খোলা পোলাও চালের তিনটি ধরনের মধ্যে সর্বনিম্নটি বিক্রি হচ্ছে মাত্র ১০০ টাকা। দ্বিতীয় ধরনের খোলা পোলাও চাল প্রতিকেজি ১৬০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। আর খোলা পোলাও চালের ভালো ধরনটি বিক্রি হচ্ছে ১৯০ টাকা কেজি দরে।
অন্যদিকে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের প্যাকেটজাত পোলাও চাল (চিনিগুঁড়া/কালিজিরা) বিক্রি হচ্ছে ২৩০ টাকায়। এর মধ্যে চাষী, প্রাণ, রূপচান্দা, পুষ্টি, ফ্রেশ ব্র্যান্ডের প্যাকেটজাত চাল দোকানগুলোতে বেশি পাওয়া যাচ্ছে।
বাজার পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, গত ৭-৮ মাসে প্যাকেটজাত পোলাও চালের দাম কেজিপ্রতি ৮০ থেকে ৯০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। এ সময়ে খোলা পোলাও চালের দামও বেড়েছে। তবে খোলা নিম্নমানের পোলাও চাল আগে যেটি ৮০ টাকায় পাওয়া যেত, সেটি এখন ১০০ টাকায় পাওয়া যায়। অর্থাৎ খোলা চালের দাম বেড়েছে মাত্র ২০ টাকা। অথচ, এই সময়ে প্যাকেটজাত পোলাও চালের দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।
রাজধানীর চাল ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কয়েক মাসের ব্যবধানে পোলাও চালের এই অস্বাভাবিক দাম বাড়ার পেছনে মোটাদাগে দুটি বিষয় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। একটি হলো- সাম্প্রতিক সময়ে দুই দফায় বিপুল পরিমাণ সুগন্ধি চালের রপ্তানির অনুমোদন। আরেকটি বলা হচ্ছে কৃত্রিম সংকট।
গত জুন ও জুলাই মাসে দুই দফায় ২৭৮টি প্রতিষ্ঠানকে ৪৫ হাজার ৩২০ টন সুগন্ধি চাল রপ্তানির অনুমোদন দিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। প্রতিষ্ঠানগুলোকে আগামী ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত এই রপ্তানির সময় দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ৫০০ টন রপ্তানির অনুমোদন পেয়েছে সিটি অটো রাইস অ্যান্ড ডাল মিলস। এছাড়া এলিন ফুড প্রোডাক্টসকে ৪০০ টন ও খান অ্যাগ্রো অ্যান্ড ফ্রোজেন ফুড প্রসেসরকে ৩০০ টন সুগন্ধি চাল রপ্তানির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। তালিকায় থাকা অন্যান্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে ১০০ থেকে ২০০ টন পর্যন্ত চাল রপ্তানির সুযোগ দেওয়া হয়েছে। যদিও এই রপ্তানি অনুমোদনের কয়েক মাস আগে থেকেই সুগন্ধি চালের দাম ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে।
বাংলাদেশ চাল রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ ইশাকুল হোসেন জানান, বাংলাদেশে কম করে হলেও বার্ষিক ১০ লাখ টন সুগন্ধি চাল উৎপাদিত হয়। যেখানে অভ্যন্তরীণ চাহিদা মাত্র চার লাখ টন। ফলে উদ্বৃত্ত থাকে প্রায় ছয় লাখ টন। এমন পরিস্থিতিতে উদ্বৃত্ত চালের একাংশ রপ্তানি হলে দেশীয় বাজারের সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হওয়ার কথা নয়। বরং এই বাজার অস্থিরতা দেশের কৃষি রপ্তানি সম্ভাবনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
ব্যবসায়ীদের কেউ কেউ দাবি করছেন যে, আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা বেশি থাকায় স্বাভাবিকভাবেই দেশীয় বাজারে দাম বাড়ছে। এবার প্রতি কেজি চাল রপ্তানির সর্বনিম্ন মূল্য ১ দশমিক ৬০ মার্কিন ডলার নির্ধারণ করা হয়েছে। সে হিসেবে বর্তমান ডলার রেট অনুযায়ী প্রতি কেজি সুগন্ধি চালের সর্বনিম্ন রপ্তানি মূল্য প্রায় ২০০ টাকা।
এদিকে প্যাকেটজাত পোলও চালের দাম বাড়ায় অনেকেই এখন নিম্নমানের খোলা চাল কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। মুগদা বাজার থেকে ১০০ টাকায় এক কেজি খোলা পোলাও চাল কিনেছেন লিয়াকদ আলী। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, খোলা পোলাও চাল যদি ১০০ টাকায় পাওয়া যায়, তাহলে প্যাকেটজাত পোলাও সর্বোচ্চ ১৫০ টাকা হওয়ায় কথা। এটি কোনোভাবেই ২৩০ টাকা হওয়ার কথা নয়। এর পেছনে নিশ্চয়ই বড় শিল্পগোষ্ঠীর সিন্ডিকেট রয়েছে। সরকারের দ্রুত ওই সিন্ডিকেট ভাঙতে উদ্যোগ নেওয়া উচিত।
রপ্তানির কারণে দাম বাড়ার যে গুঞ্জন উঠেছে, এটিকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে দাবি করছেন কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান। তিনি বলেন, ব্যবসায়ীরা এটিকে অজুহাত হিসেবে দেখিয়ে, সুযোগে দাম বাড়িয়ে নিচ্ছেন। তাছাড়া, পরিবহন খরচ বৃদ্ধি ও জ্বালানি সংকটের যে অজুহাত দেওয়া হচ্ছে সেটিও অযৌক্তিক। এটি সম্পূর্ণ একটি ‘কৃত্রিম সংকট’, যা ব্যবসায়ীরা তাদের সুবিধার জন্য তৈরি করছেন।

ডেস্ক রিপোর্ট 






















