ঢাকা ০৫:৩৩ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৮ অগাস্ট ২০২৬

সন্তানের হাতে স্মার্টফোন, মনের মালিক কে?

  • ডেস্ক রিপোর্ট
  • প্রকাশিত : ১১:২১:৪২ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৭ অগাস্ট ২০২৬
  • ৯ বার দেখা হয়েছে

জুবাইয়া বিন্তে কবির: একসময় শিশুর পৃথিবী ছিল উঠোন, মাঠ, পুকুরপাড়, বইয়ের পাতা আর দাদা-দাদির গল্পে ভরা। এখন সেই পৃথিবীর একটি বড় অংশ আটকে আছে চার ইঞ্চি-ছয় ইঞ্চির একটি পর্দায়। মানুষ শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করছে না; ধীরে ধীরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও মানুষের সময়, মনোযোগ ও পছন্দকে পরিচালনা করছে। আর শিশু-কিশোরদের ক্ষেত্রে প্রশ্নটি আরও গভীর তাদের নির্মল মন কি তবে অ্যালগরিদমের পরীক্ষাগারে পরিণত হচ্ছে? ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, টিকটক কিংবা অনুরূপ প্ল্যাটফরমে কোন ভিডিওটি শিশুর সামনে আসবে, কতক্ষণ সে সেটি দেখবে এবং তার পরের কৌতূহল কোথায় যাবে—এর বড় অংশই নির্ধারিত হয় সুপারিশ-অ্যালগরিদমের মাধ্যমে। ফলে শিশুর মন এখন কেবল পরিবারের নয়, প্রযুক্তি-নির্ভর বাণিজ্যিক ব্যবস্থারও গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র।

নিউ মেক্সিকোর আদালতের ঐতিহাসিক বার্তা : এই উদ্বেগ যে কেবল তাত্ত্বিক নয়, তার শক্তিশালী প্রমাণ মিলেছে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ মেক্সিকোতে। আগস্ট ২০২৬-এ একটি আদালত মেটাকে ৫৬ কোটি ৭০ লাখ ডলার অর্থাৎ প্রায় ৯৪২ মিলিয়ন ডলারের মোট আর্থিক দায়ের অংশ হিসেবে অর্থ পরিশোধের নির্দেশ দেয়; এর আগে জুরি ৩৭৫ মিলিয়ন ডলারের দেওয়ানি জরিমানাও নির্ধারণ করেছিল। নতুন অর্থের বড় অংশ শিশু-কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্যসেবা ও প্রতিরোধমূলক কর্মসূচিতে ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে। আদালত শুধু জরিমানা করেননি; অপ্রাপ্তবয়স্কদের বয়স যাচাই, ব্যবহারসীমা, রাত ও স্কুল সময়ে পুশ নোটিফিকেশন সীমিতকরণ, যৌন শোষণ প্রতিরোধ এবং এআই চ্যাটবটের সঙ্গে শিশুদের অনিরাপদ কথোপকথন ঠেকানোর মতো ব্যবস্থাও নির্দেশ দিয়েছেন। মেটা অবশ্য অভিযোগ অস্বীকার করে আপিলের কথা জানিয়েছে।

জরিমানার চেয়েও বড় যে প্রশ্ন : এই রায়ের গুরুত্ব ৫৬৭ মিলিয়ন ডলারের অঙ্কে নয়; এর অন্তর্নিহিত বার্তায়। আদালত কার্যত প্রশ্ন তুলেছেন—একটি প্রযুক্তি কোম্পানি কি এমন নকশা তৈরি করতে পারে, যার ফলে শিশু দীর্ঘ সময় প্ল্যাটফরমে আটকে থাকবে, অথচ সেই নকশার সামাজিক ও মানসিক পরিণতির দায় কোম্পানিকে নিতে হবে না? নিউ মেক্সিকোর রায়ের পর যুক্তরাষ্ট্রে মেটার বিরুদ্ধে বৃহত্তর আইনি লড়াইও নতুন মাত্রা পেয়েছে। ক্যালিফোর্নিয়ায় ২৯টি অঙ্গরাজ্যের মামলায় বর্তমানে বিচারপ্রক্রিয়া চলছে; সেখানে অভিযোগ, মেটা শিশুদের জন্য আসক্তিকর বৈশিষ্ট্য তৈরি করেছে এবং তাদের তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রেও আইন লঙ্ঘন করেছে। ক্ষতিপূরণের সম্ভাব্য অঙ্ক নিয়ে যে আলোচনা চলছে, তা অভূতপূর্ব।

বাংলাদেশের বাস্তবতাও ভয়াবহ : আমাদেরও ভুলে গেলে চলবে না—ডিজিটাল বাংলাদেশ এখন বাস্তবতার অংশ। DataReportal-এর হিসাবে, ২০২৫ সালের শুরুতে বাংলাদেশে প্রায় ৬ কোটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারী-পরিচয় ছিল। আর ইউনিসেফ বাংলাদেশের প্রায় ২৯ হাজার তরুণের ওপর পরিচালিত U-Report জরিপে দুই-তৃতীয়াংশ বলেছে, অতিরিক্ত ভুয়া খবর ও ভুল তথ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের মানসিক চাপের সবচেয়ে বড় কারণ। প্রায় এক-অষ্টমাংশ বুলিং ও নেতিবাচক মন্তব্যকে সবচেয়ে খারাপ অভিজ্ঞতা হিসেবে চিহ্নিত করেছে। অর্থাৎ শিশুর হাতে স্মার্টফোন তুলে দেওয়া মানেই শুধু তাকে প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচয় করানো নয়; তাকে একটি বিশাল, অনিয়ন্ত্রিত তথ্য ও প্রভাবের জগতের দরজাও খুলে দেওয়া।

শিশুর মনের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা : শিশু তো ছোট আকারের প্রাপ্তবয়স্ক নয়। তার মস্তিষ্ক, আবেগ, বিচারবোধ ও আত্মনিয়ন্ত্রণ এখনো বিকাশমান। ইউনিসেফও বলছে, শিশুদের মস্তিষ্ক ও মনোসামাজিক বিকাশ চলমান থাকায় অনলাইনের ঝুঁকিতে তারা তুলনামূলকভাবে বেশি সংবেদনশীল। তাই একজন প্রাপ্তবয়স্ক যে ভিডিওকে নিছক বিনোদন হিসেবে দেখবেন, একটি শিশু সেটিকেই বাস্তবতার আদর্শ বলে ধরে নিতে পারে। অ্যালগরিদম যদি বুঝতে পারে যে উত্তেজক, ভয়াবহ, যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ, রাগ-উসকে দেওয়া বা আবেগঘন কনটেন্ট শিশুকে বেশি সময় আটকে রাখছে, তবে আরও একই ধরনের কনটেন্ট সামনে আসতে পারে। এভাবেই কৌতূহল একসময় অভ্যাসে, অভ্যাস আসক্তিতে এবং আসক্তি মানসিক বন্দিত্বে রূপ নিতে পারে।

শুধু শিশুই নয় বিপদে মা-বাবাও : আমরা প্রায়ই সন্তানকে বলি ‘ফোন রেখো’, ‘ফেসবুক বন্ধ করো’, ‘পড়তে বসো’। কিন্তু সেই কথাই যদি বাবা-মা সারাক্ষণ ফোন হাতে রেখে বলেন, শিশুর কাছে তা কতটা বিশ্বাসযোগ্য? আত্মীয়স্বজন বসে আছেন, অথচ মা ফেসবুকে; সন্তান কথা বলতে চাইছে, অথচ বাবা রিল দেখছেন; পরিবার বেড়াতে গেছে, কিন্তু প্রত্যেকে নিজের স্ক্রিনে—এই দৃশ্য এখন অস্বাভাবিক নয়। সন্তান তখন শিখছে একটি নীরব পাঠ: বাস্তব মানুষ অপেক্ষা করতে পারে, কিন্তু স্ক্রিনের নোটিফিকেশন অপেক্ষা করে না। ফলে ডিজিটাল আসক্তি প্রতিরোধের প্রথম বিদ্যালয় হতে হবে পরিবার, আর প্রথম শিক্ষক হতে হবে মা-বাবার নিজেদের আচরণ।

পাঁচ মিনিট’ যে এক ঘণ্টা হয়ে যায় : সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আকর্ষণের পেছনে শুধু ব্যবহারকারীর দুর্বলতা নেই; প্ল্যাটফরমের নকশাও গুরুত্বপূর্ণ। নোটিফিকেশন, লাইক, মন্তব্য, স্বয়ংক্রিয় ভিডিও, ব্যক্তিকেন্দ্রিক সুপারিশ এবং অসীম স্ক্রল—সব মিলিয়ে ব্যবহারকারীকে আরও কিছুক্ষণ থাকার জন্য প্রলুব্ধ করে। পাঁচ মিনিটের জন্য ফোন হাতে নিয়ে কখন ৪০ মিনিট পেরিয়ে যায়, অনেকেই বুঝতে পারেন না। শিশুদের ক্ষেত্রে এই সময়ের মূল্য আরও বেশি। সেই হারানো ৪০ মিনিট হয়তো একটি বই পড়ার সময়, মাঠে দৌড়ানোর সময়, মায়ের সঙ্গে গল্প করার সময় কিংবা নিজের কল্পনাশক্তিকে বিকশিত করার সময় ছিল। শিশুর শৈশব একবার চলে গেলে অ্যালগরিদম তা ফেরত দিতে পারবে না।

ফেসবুকের ফাঁদে মিথ্যা, প্রতারণা ও অপচিকিৎসা :
বিপদ শুধু আসক্তিতে সীমাবদ্ধ নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া খবর, গুজব, প্রতারণামূলক বিনিয়োগ, ভুয়া অনলাইন শপ, পরিচিত সেজে টাকা চাওয়া কিংবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় তৈরি নকল ভিডিও এখন বড় বাস্তবতা। এমনকি স্বাস্থ্য নিয়ে ‘সাত দিনে রোগ সারবে’ ধরনের বিভ্রান্তিকর দাবিও ছড়ায়। শিশু-কিশোররা তো বটেই, অভিভাবকরাও অনেক সময় যাচাই না করে এসব বিশ্বাস করেন। ২০২৬ সালে বাংলাদেশের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের কণ্ঠ ও ছবি ব্যবহার করে তৈরি ডিপফেক ভিডিও দিয়ে ‘ফ্যামিলি কার্ড’-এর নামে প্রতারণার ঘটনাও সামনে এসেছে।

বাংলাদেশের শিশুদের অনলাইন ঝুঁকির কঠিন পরিসংখ্যান :
২০২৫ সালের একটি বাংলাদেশি গবেষণায় অনলাইন যৌন শোষণ ও শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগজনক চিত্র উঠে আসে। প্রতিবেদিত ফল অনুযায়ী, ২৩ শতাংশ শিশু অনলাইনে গুরুতর ঝুঁকির মুখে; ফেসবুক ব্যবহারকারী শিশুদের মধ্যে ঝুঁকির মাত্রা বিশেষভাবে উদ্বেগজনক বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। ২০২৫ সালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যোগাযোগের মাধ্যমে ১১ বছর বয়সী একটি শিশুর নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাও ইউনিসেফ বাংলাদেশ উল্লেখ করেছে। এসব ঘটনা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখায়—‘আমার সন্তান তো শুধু ফেসবুক দেখে’—এই নিশ্চিন্ত বাক্যটি আর নিরাপত্তার নিশ্চয়তা নয়।

রাষ্ট্রকে এখনই দূরদর্শী হতে হবে : এখানেই প্রধানমন্ত্রী দেশনায়ক তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রতি একটি গুরুত্বপূর্ণ আবেদন রয়েছে। সরকার ইতিমধ্যে সাইবার বুলিং মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনে একটি বিশেষ সেল গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে; ২৪ ঘণ্টার হটলাইন, অনলাইন রিপোর্টিং পোর্টাল ও প্রশিক্ষিত প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থার পরিকল্পনাও সামনে এসেছে। একই সঙ্গে সাইবার অপরাধ, অনলাইন গুজব ও অপতথ্য মোকাবিলায় বিশেষায়িত সাইবার পুলিশ ইউনিট গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই উদ্যোগগুলোকে আরও শক্তিশালী করে শিশু-কেন্দ্রিক ‘জাতীয় অনলাইন নিরাপত্তা কাঠামো’ গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।

আইন চাই, কিন্তু স্বাধীনতাও চাই : শিশু সুরক্ষার নামে এমন কোনো ব্যবস্থা করা যাবে না, যা নাগরিকের বৈধ মতপ্রকাশের অধিকারকে অযথা সংকুচিত করে। আমাদের প্রয়োজন এমন আইন, যেখানে একদিকে শিশুদের যৌন শোষণ, সাইবার বুলিং, প্রতারণা, ডিপফেক ও ব্যক্তিগত তথ্যের অপব্যবহারের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা থাকবে; অন্যদিকে সাংবাদিকতা, মতপ্রকাশ, সমালোচনা ও গণতান্ত্রিক অধিকার থাকবে সুরক্ষিত। অ্যালগরিদমের স্বচ্ছতা, শিশুদের তথ্য ব্যবহারের নীতি, বয়স যাচাই এবং প্ল্যাটফরমের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে স্বাধীন নিয়ন্ত্রক ও নিরীক্ষা ব্যবস্থা প্রয়োজন। কারণ ডিজিটাল নিরাপত্তা মানে শুধু নজরদারি নয়; নিরাপত্তার সঙ্গে স্বাধীনতার ভারসাম্যও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

স্কুলে ডিজিটাল সাক্ষরতা বাধ্যতামূলক হোক : শিশুকে শুধু ‘ফোন ব্যবহার করো না’ বললে সমস্যার সমাধান হবে না। তাকে শেখাতে হবে—কোন তথ্য সত্য, কোনটি মিথ্যা; কোন ব্যক্তির সঙ্গে অনলাইনে কথা বলা নিরাপদ; কীভাবে ব্যক্তিগত ছবি ও তথ্য রক্ষা করতে হয়; সাইবার বুলিং হলে কী করতে হয়; সন্দেহজনক লিংকে কেন ক্লিক করা যাবে না; এবং এআই-নির্মিত ছবি বা ভিডিও কীভাবে শনাক্ত করতে হয়। ইউনিসেফও শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তায় ডিজিটাল সাক্ষরতা, নিরাপদ যোগাযোগ ও অভিভাবকীয় সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় তাই ডিজিটাল নাগরিকত্ব ও অনলাইন নৈতিকতা কোনো বিলাসী বিষয় নয়—এটি ভবিষ্যৎ নাগরিক তৈরির মৌলিক শিক্ষা।

পরিবারই হোক প্রথম ‘ডিজিটাল স্কুল’ : খাবার টেবিলে ফোন নয়। ঘুমের অন্তত এক ঘণ্টা আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বন্ধ। পড়াশোনার সময় নোটিফিকেশন বন্ধ। সপ্তাহে নির্দিষ্ট সময় ‘স্ক্রিন-মুক্ত পরিবার’। সন্তান কী দেখছে, তার সঙ্গে তা নিয়ে বন্ধুত্বপূর্ণ আলোচনা—কিন্তু গুপ্তচরবৃত্তি নয়। সবচেয়ে বড় কথা, মা-বাবাকে নিজেরাও উদাহরণ হতে হবে। শিশুর হাতে বই দিয়ে নিজে যদি ফোনে ডুবে থাকি, তবে বই তার কাছে কখনোই আকর্ষণীয় হবে না। সন্তানকে মাঠে পাঠানোর আগে বাবা যদি তার সঙ্গে হাঁটেন, মা যদি গল্প করেন, পরিবার যদি একসঙ্গে খেলতে বসে—তাহলেই স্ক্রিনের বিকল্প বাস্তব আনন্দ তৈরি হবে।

প্রধানমন্ত্রীর ‘মানবিক বাংলাদেশ’ স্বপ্নের সঙ্গে ডিজিটাল নিরাপত্তা : প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শিশুদের মানবিক মূল্যবোধে গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন এবং শিক্ষা, খেলাধুলা ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডকে জাতি গঠনের গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ হিসেবে তুলে ধরেছেন। তাঁর সরকারও অতিরিক্ত মোবাইল ব্যবহার ও শিশু-কিশোরদের সুস্থ বিকাশের সঙ্গে খেলাধুলা ও সহশিক্ষামূলক কার্যক্রমকে যুক্ত করার কথা বলেছে। এই দর্শনকে আরও বিস্তৃত করে প্রতিটি বিদ্যালয়ে খেলাধুলা, পাঠাগার, সাংস্কৃতিক চর্চা, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা এবং ডিজিটাল নিরাপত্তা শিক্ষাকে সমন্বিত করা যেতে পারে। কারণ একটি জাতির ভবিষ্যৎ শুধু প্রযুক্তিবান্ধব শিশু দিয়ে তৈরি হয় না; প্রয়োজন প্রযুক্তি-সচেতন, বিবেকবান, মানবিক ও দায়িত্বশীল নাগরিক।

পরিশেষে, শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি ফেসবুক থাকবে কি থাকবে না এটি নয়। প্রশ্ন হলো, প্রযুক্তি কি মানুষকে ব্যবহার করবে, নাকি মানুষ প্রযুক্তিকে ব্যবহার করবে? শিশুর মন কোনো কোম্পানির বিজ্ঞাপন-রাজস্ব বাড়ানোর উপকরণ হতে পারে না। তার কৌতূহল কোনো অ্যালগরিদমিক পরীক্ষার বিষয় নয়; তার শৈশব কোনো ‘এনগেজমেন্ট মেট্রিক’ নয়। নিউ মেক্সিকোর রায় তাই কেবল মেটার বিরুদ্ধে একটি মামলা নয় এটি গোটা পৃথিবীর জন্য সতর্ক ঘণ্টা। বাংলাদেশও এই সতর্কবার্তা শুনুক। প্রধানমন্ত্রী দেশনায়ক তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার যদি শিশুদের ডিজিটাল নিরাপত্তাকে জাতীয় উন্নয়ন ও মানবসম্পদ বিনির্মাণের অংশ হিসেবে অগ্রাধিকার দেয়, তবে প্রযুক্তির অন্ধকারকে নিয়ন্ত্রণ করে তার আলোকে কাজে লাগানো সম্ভব। আমাদের সন্তানদের হাতে স্মার্টফোন থাকুক, কিন্তু তাদের মন যেন কোনো অ্যালগরিদমের মালিকানায় না যায়। তারা যেন স্ক্রিনের নাগরিক নয় একটি স্বাধীন, মানবিক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের নির্মাতা হয়ে বেড়ে ওঠে। সেটিই হোক আমাদের প্রযুক্তিযুগের সবচেয়ে বড় অঙ্গীকার।

লেখক : জুবাইয়া বিন্তে কবির
অর্থনীতিবিদ, গবেষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট

জনপ্রিয় সংবাদ

সন্তানের হাতে স্মার্টফোন, মনের মালিক কে?

প্রকাশিত : ১১:২১:৪২ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৭ অগাস্ট ২০২৬

জুবাইয়া বিন্তে কবির: একসময় শিশুর পৃথিবী ছিল উঠোন, মাঠ, পুকুরপাড়, বইয়ের পাতা আর দাদা-দাদির গল্পে ভরা। এখন সেই পৃথিবীর একটি বড় অংশ আটকে আছে চার ইঞ্চি-ছয় ইঞ্চির একটি পর্দায়। মানুষ শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করছে না; ধীরে ধীরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও মানুষের সময়, মনোযোগ ও পছন্দকে পরিচালনা করছে। আর শিশু-কিশোরদের ক্ষেত্রে প্রশ্নটি আরও গভীর তাদের নির্মল মন কি তবে অ্যালগরিদমের পরীক্ষাগারে পরিণত হচ্ছে? ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, টিকটক কিংবা অনুরূপ প্ল্যাটফরমে কোন ভিডিওটি শিশুর সামনে আসবে, কতক্ষণ সে সেটি দেখবে এবং তার পরের কৌতূহল কোথায় যাবে—এর বড় অংশই নির্ধারিত হয় সুপারিশ-অ্যালগরিদমের মাধ্যমে। ফলে শিশুর মন এখন কেবল পরিবারের নয়, প্রযুক্তি-নির্ভর বাণিজ্যিক ব্যবস্থারও গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র।

নিউ মেক্সিকোর আদালতের ঐতিহাসিক বার্তা : এই উদ্বেগ যে কেবল তাত্ত্বিক নয়, তার শক্তিশালী প্রমাণ মিলেছে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ মেক্সিকোতে। আগস্ট ২০২৬-এ একটি আদালত মেটাকে ৫৬ কোটি ৭০ লাখ ডলার অর্থাৎ প্রায় ৯৪২ মিলিয়ন ডলারের মোট আর্থিক দায়ের অংশ হিসেবে অর্থ পরিশোধের নির্দেশ দেয়; এর আগে জুরি ৩৭৫ মিলিয়ন ডলারের দেওয়ানি জরিমানাও নির্ধারণ করেছিল। নতুন অর্থের বড় অংশ শিশু-কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্যসেবা ও প্রতিরোধমূলক কর্মসূচিতে ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে। আদালত শুধু জরিমানা করেননি; অপ্রাপ্তবয়স্কদের বয়স যাচাই, ব্যবহারসীমা, রাত ও স্কুল সময়ে পুশ নোটিফিকেশন সীমিতকরণ, যৌন শোষণ প্রতিরোধ এবং এআই চ্যাটবটের সঙ্গে শিশুদের অনিরাপদ কথোপকথন ঠেকানোর মতো ব্যবস্থাও নির্দেশ দিয়েছেন। মেটা অবশ্য অভিযোগ অস্বীকার করে আপিলের কথা জানিয়েছে।

জরিমানার চেয়েও বড় যে প্রশ্ন : এই রায়ের গুরুত্ব ৫৬৭ মিলিয়ন ডলারের অঙ্কে নয়; এর অন্তর্নিহিত বার্তায়। আদালত কার্যত প্রশ্ন তুলেছেন—একটি প্রযুক্তি কোম্পানি কি এমন নকশা তৈরি করতে পারে, যার ফলে শিশু দীর্ঘ সময় প্ল্যাটফরমে আটকে থাকবে, অথচ সেই নকশার সামাজিক ও মানসিক পরিণতির দায় কোম্পানিকে নিতে হবে না? নিউ মেক্সিকোর রায়ের পর যুক্তরাষ্ট্রে মেটার বিরুদ্ধে বৃহত্তর আইনি লড়াইও নতুন মাত্রা পেয়েছে। ক্যালিফোর্নিয়ায় ২৯টি অঙ্গরাজ্যের মামলায় বর্তমানে বিচারপ্রক্রিয়া চলছে; সেখানে অভিযোগ, মেটা শিশুদের জন্য আসক্তিকর বৈশিষ্ট্য তৈরি করেছে এবং তাদের তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রেও আইন লঙ্ঘন করেছে। ক্ষতিপূরণের সম্ভাব্য অঙ্ক নিয়ে যে আলোচনা চলছে, তা অভূতপূর্ব।

বাংলাদেশের বাস্তবতাও ভয়াবহ : আমাদেরও ভুলে গেলে চলবে না—ডিজিটাল বাংলাদেশ এখন বাস্তবতার অংশ। DataReportal-এর হিসাবে, ২০২৫ সালের শুরুতে বাংলাদেশে প্রায় ৬ কোটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারী-পরিচয় ছিল। আর ইউনিসেফ বাংলাদেশের প্রায় ২৯ হাজার তরুণের ওপর পরিচালিত U-Report জরিপে দুই-তৃতীয়াংশ বলেছে, অতিরিক্ত ভুয়া খবর ও ভুল তথ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের মানসিক চাপের সবচেয়ে বড় কারণ। প্রায় এক-অষ্টমাংশ বুলিং ও নেতিবাচক মন্তব্যকে সবচেয়ে খারাপ অভিজ্ঞতা হিসেবে চিহ্নিত করেছে। অর্থাৎ শিশুর হাতে স্মার্টফোন তুলে দেওয়া মানেই শুধু তাকে প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচয় করানো নয়; তাকে একটি বিশাল, অনিয়ন্ত্রিত তথ্য ও প্রভাবের জগতের দরজাও খুলে দেওয়া।

শিশুর মনের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা : শিশু তো ছোট আকারের প্রাপ্তবয়স্ক নয়। তার মস্তিষ্ক, আবেগ, বিচারবোধ ও আত্মনিয়ন্ত্রণ এখনো বিকাশমান। ইউনিসেফও বলছে, শিশুদের মস্তিষ্ক ও মনোসামাজিক বিকাশ চলমান থাকায় অনলাইনের ঝুঁকিতে তারা তুলনামূলকভাবে বেশি সংবেদনশীল। তাই একজন প্রাপ্তবয়স্ক যে ভিডিওকে নিছক বিনোদন হিসেবে দেখবেন, একটি শিশু সেটিকেই বাস্তবতার আদর্শ বলে ধরে নিতে পারে। অ্যালগরিদম যদি বুঝতে পারে যে উত্তেজক, ভয়াবহ, যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ, রাগ-উসকে দেওয়া বা আবেগঘন কনটেন্ট শিশুকে বেশি সময় আটকে রাখছে, তবে আরও একই ধরনের কনটেন্ট সামনে আসতে পারে। এভাবেই কৌতূহল একসময় অভ্যাসে, অভ্যাস আসক্তিতে এবং আসক্তি মানসিক বন্দিত্বে রূপ নিতে পারে।

শুধু শিশুই নয় বিপদে মা-বাবাও : আমরা প্রায়ই সন্তানকে বলি ‘ফোন রেখো’, ‘ফেসবুক বন্ধ করো’, ‘পড়তে বসো’। কিন্তু সেই কথাই যদি বাবা-মা সারাক্ষণ ফোন হাতে রেখে বলেন, শিশুর কাছে তা কতটা বিশ্বাসযোগ্য? আত্মীয়স্বজন বসে আছেন, অথচ মা ফেসবুকে; সন্তান কথা বলতে চাইছে, অথচ বাবা রিল দেখছেন; পরিবার বেড়াতে গেছে, কিন্তু প্রত্যেকে নিজের স্ক্রিনে—এই দৃশ্য এখন অস্বাভাবিক নয়। সন্তান তখন শিখছে একটি নীরব পাঠ: বাস্তব মানুষ অপেক্ষা করতে পারে, কিন্তু স্ক্রিনের নোটিফিকেশন অপেক্ষা করে না। ফলে ডিজিটাল আসক্তি প্রতিরোধের প্রথম বিদ্যালয় হতে হবে পরিবার, আর প্রথম শিক্ষক হতে হবে মা-বাবার নিজেদের আচরণ।

পাঁচ মিনিট’ যে এক ঘণ্টা হয়ে যায় : সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আকর্ষণের পেছনে শুধু ব্যবহারকারীর দুর্বলতা নেই; প্ল্যাটফরমের নকশাও গুরুত্বপূর্ণ। নোটিফিকেশন, লাইক, মন্তব্য, স্বয়ংক্রিয় ভিডিও, ব্যক্তিকেন্দ্রিক সুপারিশ এবং অসীম স্ক্রল—সব মিলিয়ে ব্যবহারকারীকে আরও কিছুক্ষণ থাকার জন্য প্রলুব্ধ করে। পাঁচ মিনিটের জন্য ফোন হাতে নিয়ে কখন ৪০ মিনিট পেরিয়ে যায়, অনেকেই বুঝতে পারেন না। শিশুদের ক্ষেত্রে এই সময়ের মূল্য আরও বেশি। সেই হারানো ৪০ মিনিট হয়তো একটি বই পড়ার সময়, মাঠে দৌড়ানোর সময়, মায়ের সঙ্গে গল্প করার সময় কিংবা নিজের কল্পনাশক্তিকে বিকশিত করার সময় ছিল। শিশুর শৈশব একবার চলে গেলে অ্যালগরিদম তা ফেরত দিতে পারবে না।

ফেসবুকের ফাঁদে মিথ্যা, প্রতারণা ও অপচিকিৎসা :
বিপদ শুধু আসক্তিতে সীমাবদ্ধ নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া খবর, গুজব, প্রতারণামূলক বিনিয়োগ, ভুয়া অনলাইন শপ, পরিচিত সেজে টাকা চাওয়া কিংবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় তৈরি নকল ভিডিও এখন বড় বাস্তবতা। এমনকি স্বাস্থ্য নিয়ে ‘সাত দিনে রোগ সারবে’ ধরনের বিভ্রান্তিকর দাবিও ছড়ায়। শিশু-কিশোররা তো বটেই, অভিভাবকরাও অনেক সময় যাচাই না করে এসব বিশ্বাস করেন। ২০২৬ সালে বাংলাদেশের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের কণ্ঠ ও ছবি ব্যবহার করে তৈরি ডিপফেক ভিডিও দিয়ে ‘ফ্যামিলি কার্ড’-এর নামে প্রতারণার ঘটনাও সামনে এসেছে।

বাংলাদেশের শিশুদের অনলাইন ঝুঁকির কঠিন পরিসংখ্যান :
২০২৫ সালের একটি বাংলাদেশি গবেষণায় অনলাইন যৌন শোষণ ও শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগজনক চিত্র উঠে আসে। প্রতিবেদিত ফল অনুযায়ী, ২৩ শতাংশ শিশু অনলাইনে গুরুতর ঝুঁকির মুখে; ফেসবুক ব্যবহারকারী শিশুদের মধ্যে ঝুঁকির মাত্রা বিশেষভাবে উদ্বেগজনক বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। ২০২৫ সালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যোগাযোগের মাধ্যমে ১১ বছর বয়সী একটি শিশুর নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাও ইউনিসেফ বাংলাদেশ উল্লেখ করেছে। এসব ঘটনা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখায়—‘আমার সন্তান তো শুধু ফেসবুক দেখে’—এই নিশ্চিন্ত বাক্যটি আর নিরাপত্তার নিশ্চয়তা নয়।

রাষ্ট্রকে এখনই দূরদর্শী হতে হবে : এখানেই প্রধানমন্ত্রী দেশনায়ক তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রতি একটি গুরুত্বপূর্ণ আবেদন রয়েছে। সরকার ইতিমধ্যে সাইবার বুলিং মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনে একটি বিশেষ সেল গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে; ২৪ ঘণ্টার হটলাইন, অনলাইন রিপোর্টিং পোর্টাল ও প্রশিক্ষিত প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থার পরিকল্পনাও সামনে এসেছে। একই সঙ্গে সাইবার অপরাধ, অনলাইন গুজব ও অপতথ্য মোকাবিলায় বিশেষায়িত সাইবার পুলিশ ইউনিট গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই উদ্যোগগুলোকে আরও শক্তিশালী করে শিশু-কেন্দ্রিক ‘জাতীয় অনলাইন নিরাপত্তা কাঠামো’ গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।

আইন চাই, কিন্তু স্বাধীনতাও চাই : শিশু সুরক্ষার নামে এমন কোনো ব্যবস্থা করা যাবে না, যা নাগরিকের বৈধ মতপ্রকাশের অধিকারকে অযথা সংকুচিত করে। আমাদের প্রয়োজন এমন আইন, যেখানে একদিকে শিশুদের যৌন শোষণ, সাইবার বুলিং, প্রতারণা, ডিপফেক ও ব্যক্তিগত তথ্যের অপব্যবহারের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা থাকবে; অন্যদিকে সাংবাদিকতা, মতপ্রকাশ, সমালোচনা ও গণতান্ত্রিক অধিকার থাকবে সুরক্ষিত। অ্যালগরিদমের স্বচ্ছতা, শিশুদের তথ্য ব্যবহারের নীতি, বয়স যাচাই এবং প্ল্যাটফরমের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে স্বাধীন নিয়ন্ত্রক ও নিরীক্ষা ব্যবস্থা প্রয়োজন। কারণ ডিজিটাল নিরাপত্তা মানে শুধু নজরদারি নয়; নিরাপত্তার সঙ্গে স্বাধীনতার ভারসাম্যও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

স্কুলে ডিজিটাল সাক্ষরতা বাধ্যতামূলক হোক : শিশুকে শুধু ‘ফোন ব্যবহার করো না’ বললে সমস্যার সমাধান হবে না। তাকে শেখাতে হবে—কোন তথ্য সত্য, কোনটি মিথ্যা; কোন ব্যক্তির সঙ্গে অনলাইনে কথা বলা নিরাপদ; কীভাবে ব্যক্তিগত ছবি ও তথ্য রক্ষা করতে হয়; সাইবার বুলিং হলে কী করতে হয়; সন্দেহজনক লিংকে কেন ক্লিক করা যাবে না; এবং এআই-নির্মিত ছবি বা ভিডিও কীভাবে শনাক্ত করতে হয়। ইউনিসেফও শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তায় ডিজিটাল সাক্ষরতা, নিরাপদ যোগাযোগ ও অভিভাবকীয় সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় তাই ডিজিটাল নাগরিকত্ব ও অনলাইন নৈতিকতা কোনো বিলাসী বিষয় নয়—এটি ভবিষ্যৎ নাগরিক তৈরির মৌলিক শিক্ষা।

পরিবারই হোক প্রথম ‘ডিজিটাল স্কুল’ : খাবার টেবিলে ফোন নয়। ঘুমের অন্তত এক ঘণ্টা আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বন্ধ। পড়াশোনার সময় নোটিফিকেশন বন্ধ। সপ্তাহে নির্দিষ্ট সময় ‘স্ক্রিন-মুক্ত পরিবার’। সন্তান কী দেখছে, তার সঙ্গে তা নিয়ে বন্ধুত্বপূর্ণ আলোচনা—কিন্তু গুপ্তচরবৃত্তি নয়। সবচেয়ে বড় কথা, মা-বাবাকে নিজেরাও উদাহরণ হতে হবে। শিশুর হাতে বই দিয়ে নিজে যদি ফোনে ডুবে থাকি, তবে বই তার কাছে কখনোই আকর্ষণীয় হবে না। সন্তানকে মাঠে পাঠানোর আগে বাবা যদি তার সঙ্গে হাঁটেন, মা যদি গল্প করেন, পরিবার যদি একসঙ্গে খেলতে বসে—তাহলেই স্ক্রিনের বিকল্প বাস্তব আনন্দ তৈরি হবে।

প্রধানমন্ত্রীর ‘মানবিক বাংলাদেশ’ স্বপ্নের সঙ্গে ডিজিটাল নিরাপত্তা : প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শিশুদের মানবিক মূল্যবোধে গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন এবং শিক্ষা, খেলাধুলা ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডকে জাতি গঠনের গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ হিসেবে তুলে ধরেছেন। তাঁর সরকারও অতিরিক্ত মোবাইল ব্যবহার ও শিশু-কিশোরদের সুস্থ বিকাশের সঙ্গে খেলাধুলা ও সহশিক্ষামূলক কার্যক্রমকে যুক্ত করার কথা বলেছে। এই দর্শনকে আরও বিস্তৃত করে প্রতিটি বিদ্যালয়ে খেলাধুলা, পাঠাগার, সাংস্কৃতিক চর্চা, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা এবং ডিজিটাল নিরাপত্তা শিক্ষাকে সমন্বিত করা যেতে পারে। কারণ একটি জাতির ভবিষ্যৎ শুধু প্রযুক্তিবান্ধব শিশু দিয়ে তৈরি হয় না; প্রয়োজন প্রযুক্তি-সচেতন, বিবেকবান, মানবিক ও দায়িত্বশীল নাগরিক।

পরিশেষে, শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি ফেসবুক থাকবে কি থাকবে না এটি নয়। প্রশ্ন হলো, প্রযুক্তি কি মানুষকে ব্যবহার করবে, নাকি মানুষ প্রযুক্তিকে ব্যবহার করবে? শিশুর মন কোনো কোম্পানির বিজ্ঞাপন-রাজস্ব বাড়ানোর উপকরণ হতে পারে না। তার কৌতূহল কোনো অ্যালগরিদমিক পরীক্ষার বিষয় নয়; তার শৈশব কোনো ‘এনগেজমেন্ট মেট্রিক’ নয়। নিউ মেক্সিকোর রায় তাই কেবল মেটার বিরুদ্ধে একটি মামলা নয় এটি গোটা পৃথিবীর জন্য সতর্ক ঘণ্টা। বাংলাদেশও এই সতর্কবার্তা শুনুক। প্রধানমন্ত্রী দেশনায়ক তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার যদি শিশুদের ডিজিটাল নিরাপত্তাকে জাতীয় উন্নয়ন ও মানবসম্পদ বিনির্মাণের অংশ হিসেবে অগ্রাধিকার দেয়, তবে প্রযুক্তির অন্ধকারকে নিয়ন্ত্রণ করে তার আলোকে কাজে লাগানো সম্ভব। আমাদের সন্তানদের হাতে স্মার্টফোন থাকুক, কিন্তু তাদের মন যেন কোনো অ্যালগরিদমের মালিকানায় না যায়। তারা যেন স্ক্রিনের নাগরিক নয় একটি স্বাধীন, মানবিক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের নির্মাতা হয়ে বেড়ে ওঠে। সেটিই হোক আমাদের প্রযুক্তিযুগের সবচেয়ে বড় অঙ্গীকার।

লেখক : জুবাইয়া বিন্তে কবির
অর্থনীতিবিদ, গবেষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট