জুবাইয়া বিন্তে কবির: একটি দেশের অগ্রযাত্রার প্রকৃত সৌন্দর্য তখনই পূর্ণতা পায়, যখন সেই অগ্রযাত্রার পথটি নারী-পুরুষ সবার জন্য সমানভাবে নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও স্বস্তির হয়। রাজধানীর তেজগাঁওয়ের বিআরটিসি ট্রাক ডিপোতে ১৮ আগস্ট গোলাপি রঙের পিংক বাসের চাকা যখন ঘুরল, তখন যেন বাংলাদেশের রাজপথে কেবল একটি নতুন গণপরিবহন নয় নারীর নিরাপত্তা, আত্মমর্যাদা, কর্মস্বাধীনতা ও আত্মবিশ্বাসের একটি নতুন স্বপ্নও যাত্রা শুরু করল। নারী চালকের হাতে স্টিয়ারিং, নারী সহকারীর হাতে সেবার দায়িত্ব এবং নারী যাত্রীর জন্য নির্ভার একটি আসন এই দৃশ্য আমাদের নাগরিক জীবনে নিঃসন্দেহে এক প্রতীকী পরিবর্তনের বার্তা বহন করে। এই উদ্যোগের পেছনে প্রধানমন্ত্রী দেশনায়ক তারেক রহমানের নেতৃত্ব ও তাঁর সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নের যে প্রত্যয় রয়েছে, তা বিশেষভাবে প্রশংসার দাবি রাখে। নারীর নিরাপদ যাতায়াতকে কেবল একটি পরিবহন-সুবিধা হিসেবে নয়, রাষ্ট্রের উন্নয়ন, মানবিক মর্যাদা ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির অপরিহার্য অনুষঙ্গ হিসেবে বিবেচনা করাই এই উদ্যোগের সবচেয়ে বড় তাৎপর্য। প্রধানমন্ত্রী দেশনায়ক তারেক রহমানের পাশে সহধর্মিণী ডা. জোবায়দা রহমান এবং তাঁদের কন্যা জাইমা রহমানের মতো নারীদের দৃঢ়তা, শিক্ষা, আত্মমর্যাদা ও স্বনির্ভরতার যে প্রতীকী উপস্থিতি তা বাংলাদেশের অসংখ্য নারীর জন্য অনুপ্রেরণার এক নীরব ভাষা হয়ে উঠতে পারে। তাঁদের পরিবারে নারীর মর্যাদা ও সক্ষমতার যে মূল্যবোধ প্রতিফলিত হয়, বৃহত্তর রাষ্ট্রীয় নীতিতে তার প্রতিফলন ঘটানো নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক। আমি নিজেও একজন নারী। প্রায় পনেরো বছর আগে নিজের গাড়ি চালানো শিখে আজও নিজের স্টিয়ারিং নিজেই ধরি। তাই জানি স্টিয়ারিং শুধু গাড়ির দিক পরিবর্তন করে না, কখনো কখনো মানুষের আত্মবিশ্বাসের দিকও পরিবর্তন করে। নিজের গন্তব্য নিজে নির্ধারণ করার মধ্যে যে স্বাধীনতার অনুভূতি, গণপরিবহনে প্রতিদিন যাতায়াত করা অসংখ্য নারীর সেই অনুভূতি কতটা অনিশ্চয়তা ও অস্বস্তির সঙ্গে মিশে থাকে, তা উপলব্ধি করা কঠিন নয়। সেই জায়গা থেকেই পিংক বাসের যাত্রা আমার কাছে নিছক একটি সরকারি কর্মসূচি নয়; এটি নারীর চোখে নিরাপদ পথের স্বপ্ন, হৃদয়ে সাহসের আলো এবং রাষ্ট্রের প্রতি নতুন আস্থার গল্প। প্রধানমন্ত্রী দেশনায়ক তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিআরটিসি, প্রশিক্ষক, নারী চালক ও সহকারীদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় শুরু হওয়া এই উদ্যোগ তাই অভিনন্দনের দাবিদার। আজকের ১৪টি বাস হয়তো সংখ্যায় ছোট; কিন্তু এর ভেতরে যে প্রত্যাশা, তা বিশাল। এই পিংক বাসের প্রতিটি চাকা যেন বলে নারীর পথ আর অনিরাপদ থাকবে না, নারীর চলার অধিকার আর অনিশ্চয়তার কাছে জিম্মি থাকবে না; রাষ্ট্র নারীর পাশে আছে, থাকবে।
যে যাত্রার শুরু নিরাপত্তার আকাঙ্ক্ষা থেকে : গণপরিবহনে নারীর অভিজ্ঞতা আমাদের নগরজীবনের এক বেদনাময় বাস্তবতা। বাসে ওঠার জন্য দীর্ঘ অপেক্ষা, অতিরিক্ত ভিড়, আসন না পাওয়া, অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শ, কটূক্তি, চালক-সহকারীর দুর্ব্যবহার কিংবা সন্ধ্যার পর নিরাপত্তাহীনতা এসব কারণে বহু নারী প্রতিদিন যাতায়াতের স্বাধীনতা সীমিত করেন। ফলে নিরাপদ পরিবহন কেবল আরাম বা সুবিধার প্রশ্ন নয়; এটি নারীর শিক্ষা, কর্মসংস্থান, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করার প্রশ্ন। গবেষণাতেও দেখা গেছে, গণপরিবহনে নিরাপত্তাহীনতা নারীর চলাচল ও কর্মজীবনে অংশগ্রহণকে প্রভাবিত করে।
বিশ্বের পথে নারী-নিরাপদ পরিবহনের ইতিহাস : নারীদের জন্য আলাদা গণপরিবহনের ধারণা বাংলাদেশে বিচ্ছিন্ন কোনো চিন্তা নয়; পৃথিবীর বহু নগর দীর্ঘদিন ধরে এর বিভিন্ন মডেল পরীক্ষা করেছে। মেক্সিকো সিটিতে ২০০৮ সালে নারীদের জন্য পৃথক বাস চালু হয়। পাকিস্তান, দুবাই, জাপান, ইরান, ভারত, ব্রাজিল, ইন্দোনেশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে নারীদের জন্য পৃথক বাস, ট্রেনের কোচ কিংবা নির্দিষ্ট পরিবহনসেবা চালু হয়েছে। বিশ্বব্যাংকও উল্লেখ করেছে, নারীদের নিরাপদ চলাচলের জন্য বিভিন্ন দেশে নারী-নির্দিষ্ট গণপরিবহনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
মেক্সিকো সিটির অভিজ্ঞতা : বিশ্বে নারী-নির্দিষ্ট বাসব্যবস্থার আলোচিত উদাহরণ মেক্সিকো সিটি। সেখানে ব্যস্ত ও অতিরিক্ত ভিড়ের গণপরিবহনে নারীদের যৌন হয়রানি ও অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শ থেকে সুরক্ষার জন্য নারী-নির্দিষ্ট বাস চালু করা হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, গণপরিবহনে সহিংসতার বাস্তবতা ও সেই ভয় নারীদের নারী-নির্দিষ্ট পরিবহন ব্যবহারে আগ্রহী করেছে। ফলে এ ধরনের সেবা শুধু পরিবহন নয়—নারীর নগর-অধিকার রক্ষার সামাজিক আন্দোলনেরও অংশ হয়ে উঠেছে।
পাকিস্তান, দুবাই ও ইরানের ভিন্ন অভিজ্ঞতা : পাকিস্তানে নারীদের জন্য পৃথক বাসসেবা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল শারীরিক হয়রানি কমানোর লক্ষ্যে; ২০১২ সালে কয়েকটি নারী-নির্দিষ্ট বাস চালুর পরীক্ষাও হয়েছিল। দুবাইয়েও নারী-নির্দিষ্ট বাসের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ইরানে আবার গণপরিবহনে নারী-পুরুষ পৃথকীকরণের দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে এবং তেহরানে নারী চালক ও নারী যাত্রীদের জন্য পৃথক বাস-মিনিবাস চালুর উদ্যোগের কথাও পাওয়া যায়। এসব অভিজ্ঞতা আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়—শুধু বাস নামালেই সেবা সফল হয় না; নিয়মিততা, পর্যাপ্ত সংখ্যা, সময়সূচি, ব্যবস্থাপনা ও যাত্রী আস্থা সমান গুরুত্বপূর্ণ।
জাপান-ভারতসহ বিশ্বের শিক্ষা : জাপানে নারীদের জন্য বিশেষ ট্রেন-কার এবং ভারতে ‘লেডিস স্পেশাল’ ধরনের গণপরিবহন ব্যবস্থার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে। দিল্লি, মুম্বাই, কলকাতা ও চেন্নাইয়ের মতো ভারতীয় নগরে নারী-নির্দিষ্ট ট্রেনসেবা নারীর কর্মজীবী ও শিক্ষার্থী চলাচলের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। তবে বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণ সতর্ক করেছে—নারী-নির্দিষ্ট পরিবহন তাৎক্ষণিক নিরাপত্তা দিতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে মূল গণপরিবহন ব্যবস্থাকে নারী-নিরাপদ করাও জরুরি। অর্থাৎ ‘নারীদের আলাদা বাস’ হবে সমাধানের একটি অংশ, পুরো সমাধান নয়।
বাংলাদেশেও এই স্বপ্নের ইতিহাস পুরোনো : বাংলাদেশে নারী-নির্দিষ্ট বাসের ইতিহাস আজকের পিংক বাসে এসে শুরু হয়নি। গবেষণা অনুযায়ী, বিআরটিসি ১৯৮০-এর দশকের শুরুতেই ঢাকার কয়েকটি রুটে ‘উইমেন বাস’ চালুর উদ্যোগ নিয়েছিল। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই তা বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন পর্যায়ে উদ্যোগ নেওয়া হলেও ধারাবাহিকতা রক্ষা করা সম্ভব হয়নি। ১৯৯৭ সালে শিক্ষার্থী ও কর্মজীবী নারীদের জন্য উদ্যোগ এবং ১৯৯৮ সালে বিশেষভাবে নারীযাত্রীদের জন্য পরীক্ষামূলক সেবা চালুর ইতিহাসও রয়েছে।
২০০১ থেকে ২০০৯ বারবার ফিরে আসার গল্প : ২০০১ সালে নারী-নির্দিষ্ট বাসসেবা পুনরায় গুরুত্ব পায়। ২০০৮ সালেও পাঁচটি বাস দিয়ে একটি রুটে সেবা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০০৯ সালে আবার তা পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু পর্যাপ্ত বাস না থাকা, অনিয়মিত চলাচল, দীর্ঘ অপেক্ষা, ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং যাত্রীসংখ্যা নিয়ে নানা সমস্যায় আগের উদ্যোগগুলো স্থায়ী হতে পারেনি। গবেষণায়ও ঢাকা শহরের নারী বাসসেবার অনিয়মিততা ও সীমিত পরিসরের বিষয়টি উঠে এসেছে।
অতীতের ব্যর্থতা এবার হোক ভবিষ্যতের শিক্ষা : একটি উদ্যোগের উদ্বোধন করা সহজ; তাকে টেকসই করা কঠিন। অতীতের অভিজ্ঞতা তাই নতুন পিংক বাসের জন্য সতর্কবার্তা। নারী যাত্রীদের দীর্ঘ অপেক্ষায় রেখে যদি বাস না আসে, নির্ধারিত রুটে যদি নিয়মিত না চলে, বাসের সংখ্যা যদি প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল থাকে তবে মানুষের আস্থা নষ্ট হবে। তাই উদ্বোধনী ছবি ও আনুষ্ঠানিকতার চেয়ে বেশি জরুরি প্রতিদিনের নির্ভরযোগ্য সেবা। নারী যাত্রীকে এমন নিশ্চয়তা দিতে হবে ‘আমি জানি, এই সময়ে এই স্টপেজে বাসটি আসবেই।’
নারীর হাতে স্টিয়ারিং আমার নিজেরও এক পরিচিত গল্প :
আমি নিজেও একজন নারী। প্রায় ১৫ বছর আগে থেকেই নিজের গাড়ি নিজেই চালাই। স্টিয়ারিং হাতে নেওয়ার প্রথম দিন থেকে আজ পর্যন্ত আমি অনুভব করেছি গাড়ি চালানো শুধু একটি দক্ষতা নয়, এটি আত্মনির্ভরতার এক অসাধারণ অনুভূতি। নিজের গন্তব্য নিজে নির্ধারণ করা, নিজের সময়ের ওপর নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা এবং পথের সিদ্ধান্ত নিজে নেওয়ার মধ্যে এক ধরনের স্বাধীনতার স্বাদ আছে। তাই যখন দেখি রাবেয়া খাতুন, জান্নাতুল ফেরদৌসীর মতো নারীরা আজ বিশাল বাসের স্টিয়ারিং হাতে নিয়েছেন, তখন ব্যক্তিগত অনুভূতিও জাতীয় আশাবাদের সঙ্গে মিশে যায়। নারীর হাতে স্টিয়ারিং মানে শুধু একটি বাসের নিয়ন্ত্রণ নয় নিজের জীবনের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার প্রতীক।
রাবেয়া-জান্নাতুলদের সাহসকে অভিবাদন : একজন নারী বাসচালক হতে চাইলে আজও অনেককে পরিবারের আপত্তি শুনতে হয়। রাবেয়া খাতুনের অভিজ্ঞতাই তার উদাহরণ। পরিবার আপত্তি করেছিল, কিন্তু তিনি থামেননি। কারণ তিনি বিশ্বাস করেন, কাজের কোনো লিঙ্গ নেই। এই বিশ্বাসটিই আমাদের সামাজিক মনস্তত্ত্বের সবচেয়ে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন। নারী চিকিৎসক হতে পারেন, প্রকৌশলী হতে পারেন, পাইলট হতে পারেন, সেনাবাহিনীতে দায়িত্ব পালন করতে পারেন; তাহলে দক্ষতা, প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্স অর্জনের পর নারী কেন বাস চালাতে পারবেন না?
পিংক বাস শুধু নিরাপত্তা নয়, কর্মসংস্থানেরও দরজা : এই উদ্যোগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি হলো—নারী শুধু যাত্রী নন, পরিবহন ব্যবস্থার কর্মীও। চালক, কন্ডাক্টর ও সহকারী হিসেবে নারীদের অংশগ্রহণ পরিবহন খাতে নতুন কর্মসংস্থানের পথ খুলবে। এতে মেয়েরা প্রশিক্ষণ নেবে, পেশাগত দক্ষতা অর্জন করবে এবং পরিবার ও সমাজের সামনে নতুন উদাহরণ তৈরি করবে। একটি বাসে একজন নারী চালকের আসন ভবিষ্যতে শত শত নারীর পেশাগত আকাঙ্ক্ষাকে সাহসী করে তুলতে পারে।
নিরাপদ যাত্রা মানেই অর্থনীতির গতি : নারীর নিরাপদ যাতায়াতকে কখনো ‘নারীকল্যাণের অতিরিক্ত সুবিধা’ হিসেবে দেখা উচিত নয়। এটি জাতীয় অর্থনীতির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। একজন ছাত্রী যদি নিরাপত্তাহীনতার কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে না পারেন, একজন চাকরিজীবী যদি অফিসের সময়ের সঙ্গে গণপরিবহনের অনিশ্চয়তা সামলাতে না পারেন, একজন উদ্যোক্তা যদি সন্ধ্যার পর নিরাপদে ফিরতে না পারেন তাহলে দেশের অর্থনীতিই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। নিরাপদ চলাচল তাই নারী শ্রমশক্তির অংশগ্রহণ বাড়ানোর অন্যতম অবকাঠামো।
১৩ রুটে ১৪ বাস শুরুটা ছোট, স্বপ্নটা বড় : প্রাথমিকভাবে ঢাকায় ১০টি, চট্টগ্রামে দুটি এবং বগুড়ায় দুটি বাস চালু হয়েছে। ঢাকা ও আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মস্থল, বাণিজ্যিক এলাকা ও পরিবহনকেন্দ্রকে যুক্ত করার চেষ্টা করা হয়েছে। বিআরটিসি জানিয়েছে, পর্যায়ক্রমে বাসের সংখ্যা ও রুট বাড়ানো হবে; আগামী তিন মাসে ৫০টি বাস চালুর লক্ষ্যও নির্ধারণ করা হয়েছে। তিন শহরে মোট ১৩৪টি নির্ধারিত স্থানে যাত্রীসেবা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রযুক্তির ছোঁয়ায় আস্থা আরও বাড়ুক : পিংক বাসে ই-টিকিট, ভেহিকেল ট্র্যাকিং সিস্টেম এবং কিছু বাসে সিসিটিভি যুক্ত করা হয়েছে। এ উদ্যোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ নিরাপত্তা শুধু বাসের ভেতরে নয় বাস কখন আসছে, কোথায় আছে, কোথায় থামছে এবং কোনো অভিযোগ হলে দায়ী ব্যক্তি কে এসবেরও স্বচ্ছতা প্রয়োজন। ভবিষ্যতে প্রতিটি বাসে সিসিটিভি, জিপিএস, জরুরি যোগাযোগব্যবস্থা, অভিযোগ গ্রহণের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম এবং চালক-কন্ডাক্টরের নিয়মিত প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা গেলে সেবাটির বিশ্বাসযোগ্যতা বহুগুণ বাড়বে।
পিংক বাসের সঙ্গে বদলাতে হবে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিও :
কোনো নারী বাস চালাচ্ছেন এ নিয়ে বিদ্রূপ, কটূক্তি কিংবা নেতিবাচক মন্তব্য করার প্রবণতা এখনই থামাতে হবে। নারী চালককে ‘ব্যতিক্রম’ হিসেবে নয়, দক্ষ পেশাজীবী হিসেবে দেখতে হবে। একজন পুরুষ চালক যেমন প্রশিক্ষণ, লাইসেন্স ও দক্ষতার ভিত্তিতে স্টিয়ারিংয়ে বসেন, একজন নারীও ঠিক একই যোগ্যতায় সেখানে বসেন। তাই পিংক বাসের আসল সাফল্য তখনই হবে, যখন গোলাপি রঙের বাসটি মানুষের চোখে আর ‘অদ্ভুত দৃশ্য’ থাকবে না স্বাভাবিক গণপরিবহনের অংশ হয়ে উঠবে।
প্রধানমন্ত্রীর দূরদর্শী নির্দেশনায় অঙ্গীকারের বাস্তবায়ন :
এই উদ্যোগের পেছনে প্রধানমন্ত্রী দেশনায়ক তারেক রহমানের সরাসরি নির্দেশনা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। চলতি বছরের মার্চে তিনি রাজধানীতে নারীদের জন্য পৃথক বাসসেবা চালুর নির্দেশ দেন, যাতে নারীরা নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যে গণপরিবহন ব্যবহার করতে পারেন। সরকারের নির্বাচনী পরিকল্পনাতেও নারী-পরিচালিত বাসের মাধ্যমে নারীর নিরাপত্তা বৃদ্ধির বিষয়টি ছিল। সেই রাজনৈতিক অঙ্গীকার আজ দৃশ্যমান রাষ্ট্রীয় সেবায় রূপ পেয়েছে।
সরকারকে ধন্যবাদ, সংশ্লিষ্টদেরও অভিনন্দন : একটি নীতিগত সিদ্ধান্তকে বাস্তব সেবায় রূপ দেওয়া সহজ নয়। সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়, বিআরটিসি, প্রশিক্ষক, নারী চালক-কন্ডাক্টর এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সমন্বিত উদ্যোগের ফলেই আজকের এই যাত্রা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনার দ্রুত বাস্তবায়ন এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সক্রিয়তার জন্য সরকার প্রশংসার দাবিদার। সরকারের ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনার সঙ্গে নারী-নিরাপদ পরিবহনকে যুক্ত করা হয়েছে বলেও সরকারি ও সংবাদসূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
শুধু পিংক বাস নয়, চাই নারীবান্ধব পুরো পরিবহনব্যবস্থা :তবে আমাদের প্রত্যাশা আরও বড়। পিংক বাস থাকবে, কিন্তু একই সঙ্গে সাধারণ বাসও নারীবান্ধব হতে হবে। প্রতিটি বাসে নির্ধারিত নারী আসন, প্রশিক্ষিত কর্মী, সিসিটিভি, অভিযোগের দ্রুত প্রতিকার, আলোকিত বাসস্টপ, নিরাপদ ফুটপাত, পর্যাপ্ত স্টপেজ এবং নির্ভরযোগ্য সময়সূচি নিশ্চিত করতে হবে। বাসের সংখ্যা এত বাড়াতে হবে যাতে নারীরা কেবল ‘বিশেষ বাসের’ অপেক্ষায় না থাকেন। কারণ বাংলাদেশের প্রতিটি নারীকে নিরাপদ গণপরিবহনের অধিকার দিতে হবে শুধু পিংক বাসের যাত্রীকে নয়।
পরিশেষে, প্রধানমন্ত্রী দেশনায়ক তারেক রহমানের নেতৃত্বে এই উদ্যোগের যে সূচনা হয়েছে, তা যেন আরও বিস্তৃত হয় ঢাকা, চট্টগ্রাম ও বগুড়ার সীমা পেরিয়ে দেশের প্রতিটি বিভাগ, প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ শহর এবং একদিন প্রত্যন্ত জনপদেও পৌঁছে যায়। বাসের সংখ্যা বাড়ুক, রুট বাড়ুক, প্রযুক্তিনির্ভর নিরাপত্তা বাড়ুক; একই সঙ্গে সাধারণ গণপরিবহন ব্যবস্থাকেও নারী ও শিশুবান্ধব করে তোলা হোক। ডা. জোবায়দা রহমানের মতো নারীর আত্মমর্যাদা ও মানবিকতার প্রতীকী অনুপ্রেরণা এবং জাইমা রহমানের প্রজন্মের আধুনিক, আত্মবিশ্বাসী নারীদের স্বপ্ন যেন এই রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের ভবিষ্যৎ নির্মাণে প্রতিফলিত হয়—এ প্রত্যাশাও অমূলক নয়। তবে সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি ঘটতে হবে আমাদের মানসিকতায়। নারী বাস চালালে বিস্মিত হওয়ার কিছু নেই, নারী স্টিয়ারিং ধরলে কটূক্তিরও কোনো অবকাশ নেই। যে নারী আকাশে উড়তে পারেন, সমুদ্র পাড়ি দিতে পারেন, অস্ত্র হাতে দেশ রক্ষা করতে পারেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে জ্ঞান সৃষ্টি করতে পারেন, হাসপাতালের শয্যার পাশে জীবন বাঁচাতে পারেন তিনি কেন একটি বাসের স্টিয়ারিং ধরতে পারবেন না? নারীকে সুযোগ দিলে তিনি শুধু পথ চলেন না; তিনি পথ তৈরি করেন। আজ পিংক বাসের জানালায় হয়তো কোনো কিশোরী স্বপ্ন দেখছে একদিন আমিও চালকের আসনে বসব। কোনো মা হয়তো মেয়েকে বলছেন ‘ভয় পেয়ো না, এখন তোমার জন্যও নিরাপদ বাস আছে।’ কোনো নারী চালক হয়তো স্টিয়ারিংয়ে হাত রেখে নিঃশব্দে বলছেন ‘আমি পারি।’ এই ‘আমি পারি’ উচ্চারণটিই হোক বাংলাদেশের নারীর নতুন শক্তির ভাষা। প্রধানমন্ত্রী দেশনায়ক তারেক রহমান ও তাঁর নেতৃত্বাধীন সরকারকে তাই এই সাহসী ও জনবান্ধব উদ্যোগের জন্য আন্তরিক অভিনন্দন। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিআরটিসি, নারী চালক-সহকারী এবং মাঠপর্যায়ের প্রতিটি কর্মীকে জানাই শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা। আজ যে গোলাপি বাসের চাকা ঘুরেছে, সেটি যেন থেমে না যায় বরং তার চাকা ঘুরুক আরও দূরে, আরও বহুদূর। সেই চাকার শব্দে মিশে থাকুক বাংলাদেশের নারীর হাসি, আত্মবিশ্বাস ও স্বাধীনতার গান। কারণ একটি পিংক বাস কেবল একটি বাস নয় এটি একটি প্রতিশ্রুতি। নারীর নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি, মর্যাদার প্রতিশ্রুতি, সমঅধিকারের প্রতিশ্রুতি এবং একটি আরও মানবিক বাংলাদেশের প্রতিশ্রুতি। নারীর হাতে স্টিয়ারিং উঠেছে এবার বাংলাদেশের পথও হোক তাঁর জন্য আরও নিরাপদ, প্রশস্ত ও আলোকিত।
লেখক : জুবাইয়া বিন্তে কবির
অর্থনীতিবিদ, গবেষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট

ডেস্ক রিপোর্ট 






















