গাজীপুর প্রতিনিধি: একসময় কালিয়াকৈরের গ্রামগুলোর সকাল-বিকেলের নীরবতা ভেঙে ভেসে আসত সাইকেলের টুংটাং ঘণ্টির শব্দ। কাঁধে চামড়ার ব্যাগ ঝুলিয়ে পথে পথে ছুটে বেড়াতেন ডাকপিয়ন। গ্রামের মানুষ জানালার ফাঁক দিয়ে তাকিয়ে থাকতেন- হয়তো আজ আমার ছেলের চিঠি এসেছে।
কিন্তু প্রযুক্তির যুগে সেই দৃশ্য এখন শুধুই স্মৃতি। মুঠোফোন আর ইন্টারনেটের কারণে হারিয়ে গেছে ডাকপিয়নের ব্যস্ততা, ফুরিয়ে গেছে হাতে লেখা চিঠির অপেক্ষা।
সরেজমিনে কালিয়াকৈর পৌরসভার কেন্দ্রীয় পোস্ট অফিস ও চাপাইর ইউনিয়নের গোবিন্দপুর সাব-পোস্ট অফিসে গিয়ে দেখা যায়, আগের সেই ভিড় নেই। লাল রঙের চিঠির বাক্সটিতে মরিচা ধরেছে। কর্মচারীরা বসে আছেন নীরবে।
পোস্ট অফিসের দেয়ালে টাঙানো “ডাক ঘর POST OFFICE” সাইনবোর্ডটিও জরাজীর্ণ। একটি পোস্ট অফিসের সামনে জরাজীর্ণ লাল চিঠির বাক্স। এখন আর তেমন চিঠি পড়ে না এখানে। পোস্ট অফিসের পোস্টমাস্টার বলেন, ২০-২৫ বছর আগেও প্রতিদিন ১৫০-২০০ ব্যক্তিগত চিঠি আসত। প্রবাসীদের চিঠি, চাকরির নিয়োগপত্র, মানি অর্ডার -মানুষ সকাল থেকে লাইনে দাঁড়াত। ডাকপিয়ন সাইকেল নিয়ে বের হলে গ্রামের মানুষ দৌড়ে আসত। এখন মাসে ৫-৬টা ব্যক্তিগত চিঠিও আসে না। সব কাজ এখন অনলাইনে।
কালিয়াকৈর এলাকার ডাককর্মী বলেন, আগে সকালে ব্যাগ ভর্তি চিঠি নিয়ে বের হতাম। এখন ব্যাগে চিঠির বদলে পার্সেল, ব্যাংকের কাগজ আর সরকারি নোটিশ বেশি থাকে। সাইকেলের ঘণ্টির শব্দ শুনে মানুষ আর ছুটে আসে না। কারণ সব খবর মোবাইলেই পেয়ে যায়।
কালিয়াকৈরের প্রবীণ বাসিন্দা ৭২ বছর বয়সী আব্দুল মজিদ বলেন, ছেলে সৌদি থাকত। মাসে একটা চিঠি আসত। সেই চিঠির জন্য ১৫ দিন আগে থেকে অপেক্ষা করতাম। ডাকপিয়ন চিঠি দিলে সবাই মিলে বসে পড়তাম। চোখের পানি আর হাসি একসাথে আসত। এখন ভিডিও কলে কথা হয়, কিন্তু কাগজের উপর হাতের লেখার স্পর্শটা নাই।
গৃহিণী ফাতেমা বেগম বলেন, আমার মেয়ের বিয়ের কার্ডও একসময় চিঠিতে আসত। সেই কার্ড আমি এখনো আলমারিতে যত্ন করে রেখেছি। আজকের পোলাপান চিঠি কী জিনিসই চেনে না। স্থানীয় শিক্ষক মো.জামাল বলেন, আজকের প্রজন্ম হোয়াটসঅ্যাপ, মেসেঞ্জারেই বড় হচ্ছে। তাদের কাছে চিঠি লেখা মানে ইতিহাস। কিন্তু আমরা যারা চিঠির যুগ দেখেছি, তারা জানি একটি খামের মধ্যে কত আবেগ, কত অপেক্ষা লুকিয়ে থাকত।
পোস্ট অফিস সূত্রে জানা যায়, এখন ডাক বিভাগের আয়ের বড় অংশ আসে পার্সেল, ব্যাংকিং ও সরকারি কাজ থেকে। ব্যক্তিগত চিঠি প্রায় শূন্যের কোঠায়।
চিঠির ব্যবহার কমেছে, ডাকপিয়নের ব্যস্ত দিনও হারিয়ে গেছে। তবু কালিয়াকৈরের প্রবীণদের স্মৃতিতে আজও বেঁচে আছে একটি ছোট্ট খামের গল্প। যে খামের মধ্যে থাকত প্রিয় মানুষের হাতের লেখা, অপেক্ষার আবেগ আর ভালোবাসা।

ডেস্ক রিপোর্ট 






















