ঢাকা ০৬:০৮ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

এক পাশে ভাঙন, অন্য পাশে বিচ্ছিন্নতা: তেঁতুলিয়ার তীরে পাঁচ কিলোমিটারজুড়ে মানুষের একটাই দাবি

  • ডেস্ক রিপোর্ট
  • প্রকাশিত : ০৪:৫৫:০৮ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • ৫ বার দেখা হয়েছে

পটুয়াখালী প্রতিনিধি: তেঁতুলিয়া নদীর দিকে তাকিয়ে থাকলে বোঝা যায়, নদী শুধু পানি বয়ে নিয়ে যায় না—কখনো কখনো একটি জনপদের ভবিষ্যৎও বদলে দেয়।
নদীর তীর ঘেঁষে বসতি। কোথাও ঘরবাড়ি, কোথাও ফসলের জমি, কোথাও মানুষের বছরের পর বছর ধরে গড়ে তোলা স্বপ্ন। কিন্তু নদীর স্রোত আর ভাঙনের কাছে এসবের অনেকটাই অনিশ্চিত।
এই অনিশ্চয়তার মধ্যেই শুক্রবার সকালে তেঁতুলিয়া নদীর তীরে জড়ো হয়েছিলেন হাজারো মানুষ। কারও হাতে ছিল প্ল্যাকার্ড, কারও কণ্ঠে স্লোগান। নদীর পাড় ধরে মানুষের সেই সারি একসময় প্রায় পাঁচ কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হয়।
তাঁদের দাবি দুটি—তেঁতুলিয়া নদীর ভাঙন ঠেকাতে টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ এবং ভোলা থেকে পটুয়াখালীর ধুলিয়া পর্যন্ত সেতু নির্মাণ।
আয়োজকদের ভাষায়, এই দুটি দাবি আসলে একই বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত—নদীর কারণে যে মানুষগুলো ঝুঁকিতে আছে, তাঁদের নিরাপদ জীবন ও সহজ যোগাযোগ নিশ্চিত করা।
পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার মঠবাড়িয়া, ধুলিয়া, নাজিরপুর ও কাছিপাড়াসহ তেঁতুলিয়া নদীসংলগ্ন এলাকাগুলোতে নদীভাঙন নতুন কোনো ঘটনা নয়।
বর্ষা কিংবা নদীতে স্রোত বাড়লে ভাঙনের আতঙ্কও বাড়ে। নদীর তীরের মানুষের কাছে তাই নদী একদিকে জীবিকা ও যোগাযোগের অংশ, অন্যদিকে ঘরবাড়ি ও জমি হারানোর আশঙ্কার নাম।
মানববন্ধনে অংশ নেওয়া মানুষের বক্তব্যে বারবার উঠে আসে সেই উদ্বেগের কথা।
তাঁদের অভিযোগ, ভাঙন ঠেকাতে বিভিন্ন সময়ে বিচ্ছিন্নভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হলেও নদীর গতিপ্রকৃতি বিবেচনায় নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি কোনো প্রতিরোধব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি।
ফলে এক জায়গায় প্রতিরোধ তৈরি হলে অন্য জায়গায় ভাঙন দেখা দেওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়।
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, চন্দ্রদ্বীপ ইউনিয়নসহ তেঁতুলিয়া নদীঘেঁষা জনপদগুলো রক্ষায় এখনই পরিকল্পিত উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে ভাঙনের ক্ষতি আরও বাড়তে পারে।
তাঁরা চান, নদীর তীর রক্ষায় এমন বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা হোক, যা শুধু একটি বর্ষা মৌসুম নয়, দীর্ঘ সময় ধরে মানুষের বসতি ও কৃষিজমি রক্ষা করতে পারে।

মানববন্ধনের আরেকটি বড় দাবি ভোলা ও পটুয়াখালীর মধ্যে সরাসরি সড়ক যোগাযোগ তৈরি করা।
‘ভোলা (ভেলুমিয়া)-পটুয়াখালী (ধুলিয়া) সেতু’ বাস্তবায়ন কমিটির দাবি, ভোলার ভেলুমিয়া থেকে পটুয়াখালীর ধুলিয়া পয়েন্ট পর্যন্ত তেঁতুলিয়া নদীর দূরত্ব প্রায় সাড়ে তিন কিলোমিটার।
এই জায়গায় একটি সেতু নির্মাণ করা গেলে ভোলা সরাসরি দেশের মূল সড়ক নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে বলে মনে করছেন তাঁরা।
বর্তমানে নদী পারাপারের ওপর নির্ভরশীল মানুষের জন্য সেতুটি শুধু যোগাযোগের একটি অবকাঠামো হবে না, বরং দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনীতি ও মানুষের চলাচলে বড় পরিবর্তন আনতে পারে—এমনটাই দাবি আন্দোলনকারীদের।
সেতু বাস্তবায়ন কমিটির আহ্বায়ক মো. মোফাজ্জেল হোসেন মফু সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ভেলুমিয়া-ধুলিয়া সেতু নির্মাণ হলে ভোলা থেকে ধুলিয়া হয়ে বরিশালের বাকেরগঞ্জ দিয়ে প্রায় ৪৫ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে বরিশাল শহরে পৌঁছানো সম্ভব হবে।
তাঁর মতে, এতে ভোলার সঙ্গে পটুয়াখালী ও বরিশালের যোগাযোগ সহজ হবে এবং দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও নতুন গতি আসতে পারে।
সেতুর দাবির পেছনে স্থানীয় মানুষের আরেকটি যুক্তি হলো, দক্ষিণাঞ্চলে গত কয়েক বছরে গড়ে ওঠা গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও পর্যটনকেন্দ্রগুলোর সঙ্গে ভোলার সরাসরি সড়ক যোগাযোগ তৈরি করা।
আয়োজকদের দাবি, ভেলুমিয়া-ধুলিয়া সেতু নির্মিত হলে ভোলার সঙ্গে কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকত, পায়রা বন্দর, পায়রা তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রসহ দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকার যোগাযোগ সহজ হবে।
একই সঙ্গে মংলা বন্দর ও দক্ষিণাঞ্চলের কয়েকটি জেলার সঙ্গেও যোগাযোগের নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে তাঁরা মনে করেন।
তবে এসব সম্ভাবনা বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে সেতুর পাশাপাশি সংযোগ সড়ক, পরিবহন অবকাঠামো এবং সামগ্রিক আঞ্চলিক যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নের ওপর।
তারপরও স্থানীয় মানুষের কাছে সেতুটি এখন একটি দীর্ঘদিনের প্রত্যাশার প্রতীক।
শুক্রবারের কর্মসূচিতে সবচেয়ে বেশি নজর কেড়েছে মানববন্ধনের বিস্তৃতি।
মঠবাড়িয়া-ধুলিয়া লঞ্চঘাট থেকে বাকেরগঞ্জের দুর্গাপাশা এলাকা পর্যন্ত প্রায় পাঁচ কিলোমিটার নদীতীরজুড়ে মানুষ দাঁড়িয়ে কর্মসূচি পালন করেন।
আয়োজকদের ভাষ্য, এত বড় পরিসরে মানুষের অংশগ্রহণের মূল কারণ হলো—দাবিগুলো শুধু একটি ইউনিয়ন বা একটি উপজেলার মানুষের নয়।
তেঁতুলিয়া নদীর দুই তীরের মানুষ, ভোলা ও পটুয়াখালীর বাসিন্দা এবং দক্ষিণাঞ্চলের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে বিষয়টি জড়িত।
মানববন্ধন শেষে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে সেতু বাস্তবায়ন কমিটির আহ্বায়ক মো. মোফাজ্জেল হোসেন মফু তারেক রহমানের দৃষ্টি আকর্ষণ করে সেতু নির্মাণের দাবি জানান।
তিনি বলেন, এই সেতু বাস্তবায়িত হলে দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের মানুষের যোগাযোগব্যবস্থা সহজ হওয়ার পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিতেও এর প্রভাব পড়তে পারে।
কর্মসূচিতে স্থানীয় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক ও পেশাজীবী সংগঠনের প্রতিনিধিরাও অংশ নেন।
মানববন্ধনের সংক্ষিপ্ত সমাবেশে ভার্চুয়ালি বক্তব্য দেন স্থানীয় সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম মাসুদ।
এ ছাড়া উপস্থিত ছিলেন বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য সহিদুল আলম তালুকদার, উপজেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক তসলিম তালুকদার, উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর আমির মাও. রফিকুল ইসলাম, বাউফল উপজেলা জনকল্যাণ সমিতির সভাপতি আ. রব খান, সাবেক জেলা পরিষদ সদস্য মো. বাবুল মিয়া, উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সদস্যসচিব মো. নাইম সিকদার তারেক, ধুলিয়া ইউপি চেয়ারম্যান মো. জহিরুল ইসলামসহ অনেকে।
বিভিন্ন রাজনৈতিক মত ও পরিচয়ের মানুষের একই কর্মসূচিতে অংশ নেওয়াকে আয়োজকেরা দাবি দুটির ব্যাপক জনসমর্থনের প্রমাণ হিসেবে দেখছেন।
তবে সেতু নির্মাণের মতো বড় অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়নে সম্ভাব্যতা যাচাই, অর্থায়ন, পরিবেশগত প্রভাব এবং কারিগরি বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

শুক্রবারের মানববন্ধন শেষ হয়েছে। মানুষ বাড়ি ফিরেছেন। নদীও তার স্বাভাবিক গতিতে বয়ে চলেছে।
কিন্তু তেঁতুলিয়ার তীরে থেকে গেছে সেই পুরোনো প্রশ্ন—এই নদী থেকে মানুষ কবে স্থায়ীভাবে নিরাপদ হবে?
আর ভোলার মানুষ কবে সরাসরি সড়কপথে পটুয়াখালী ও দেশের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত হতে পারবেন?
মানববন্ধনে অংশ নেওয়া মানুষের কাছে সেতু মানে শুধু নদীর ওপর কংক্রিটের কাঠামো নয়। তাঁদের কাছে এটি ভোলা ও দক্ষিণাঞ্চলের মধ্যে একটি নতুন সংযোগের সম্ভাবনা।
আর বেড়িবাঁধ মানে শুধু নদীর তীর রক্ষা নয়—এটি ঘরবাড়ি, জমি, জীবিকা ও একটি জনপদের ভবিষ্যৎ রক্ষার প্রশ্ন।
তাই তেঁতুলিয়ার তীরে পাঁচ কিলোমিটারজুড়ে দাঁড়িয়ে হাজারো মানুষের যে দাবি উচ্চারিত হয়েছে, তার কেন্দ্রে আসলে একটি প্রত্যাশাই—নদী যেন আর তাঁদের ভাঙনের গল্প না লেখে, বরং যোগাযোগ ও সম্ভাবনার নতুন পথ খুলে দেয়।

জনপ্রিয় সংবাদ

‘আমরা ফটোসেশনের রাজনীতি করি না, ৬ মাসেই সব কাজ শেষ হয় না’—পানিসম্পদ মন্ত্রী এ্যানি

এক পাশে ভাঙন, অন্য পাশে বিচ্ছিন্নতা: তেঁতুলিয়ার তীরে পাঁচ কিলোমিটারজুড়ে মানুষের একটাই দাবি

প্রকাশিত : ০৪:৫৫:০৮ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

পটুয়াখালী প্রতিনিধি: তেঁতুলিয়া নদীর দিকে তাকিয়ে থাকলে বোঝা যায়, নদী শুধু পানি বয়ে নিয়ে যায় না—কখনো কখনো একটি জনপদের ভবিষ্যৎও বদলে দেয়।
নদীর তীর ঘেঁষে বসতি। কোথাও ঘরবাড়ি, কোথাও ফসলের জমি, কোথাও মানুষের বছরের পর বছর ধরে গড়ে তোলা স্বপ্ন। কিন্তু নদীর স্রোত আর ভাঙনের কাছে এসবের অনেকটাই অনিশ্চিত।
এই অনিশ্চয়তার মধ্যেই শুক্রবার সকালে তেঁতুলিয়া নদীর তীরে জড়ো হয়েছিলেন হাজারো মানুষ। কারও হাতে ছিল প্ল্যাকার্ড, কারও কণ্ঠে স্লোগান। নদীর পাড় ধরে মানুষের সেই সারি একসময় প্রায় পাঁচ কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হয়।
তাঁদের দাবি দুটি—তেঁতুলিয়া নদীর ভাঙন ঠেকাতে টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ এবং ভোলা থেকে পটুয়াখালীর ধুলিয়া পর্যন্ত সেতু নির্মাণ।
আয়োজকদের ভাষায়, এই দুটি দাবি আসলে একই বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত—নদীর কারণে যে মানুষগুলো ঝুঁকিতে আছে, তাঁদের নিরাপদ জীবন ও সহজ যোগাযোগ নিশ্চিত করা।
পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার মঠবাড়িয়া, ধুলিয়া, নাজিরপুর ও কাছিপাড়াসহ তেঁতুলিয়া নদীসংলগ্ন এলাকাগুলোতে নদীভাঙন নতুন কোনো ঘটনা নয়।
বর্ষা কিংবা নদীতে স্রোত বাড়লে ভাঙনের আতঙ্কও বাড়ে। নদীর তীরের মানুষের কাছে তাই নদী একদিকে জীবিকা ও যোগাযোগের অংশ, অন্যদিকে ঘরবাড়ি ও জমি হারানোর আশঙ্কার নাম।
মানববন্ধনে অংশ নেওয়া মানুষের বক্তব্যে বারবার উঠে আসে সেই উদ্বেগের কথা।
তাঁদের অভিযোগ, ভাঙন ঠেকাতে বিভিন্ন সময়ে বিচ্ছিন্নভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হলেও নদীর গতিপ্রকৃতি বিবেচনায় নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি কোনো প্রতিরোধব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি।
ফলে এক জায়গায় প্রতিরোধ তৈরি হলে অন্য জায়গায় ভাঙন দেখা দেওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়।
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, চন্দ্রদ্বীপ ইউনিয়নসহ তেঁতুলিয়া নদীঘেঁষা জনপদগুলো রক্ষায় এখনই পরিকল্পিত উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে ভাঙনের ক্ষতি আরও বাড়তে পারে।
তাঁরা চান, নদীর তীর রক্ষায় এমন বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা হোক, যা শুধু একটি বর্ষা মৌসুম নয়, দীর্ঘ সময় ধরে মানুষের বসতি ও কৃষিজমি রক্ষা করতে পারে।

মানববন্ধনের আরেকটি বড় দাবি ভোলা ও পটুয়াখালীর মধ্যে সরাসরি সড়ক যোগাযোগ তৈরি করা।
‘ভোলা (ভেলুমিয়া)-পটুয়াখালী (ধুলিয়া) সেতু’ বাস্তবায়ন কমিটির দাবি, ভোলার ভেলুমিয়া থেকে পটুয়াখালীর ধুলিয়া পয়েন্ট পর্যন্ত তেঁতুলিয়া নদীর দূরত্ব প্রায় সাড়ে তিন কিলোমিটার।
এই জায়গায় একটি সেতু নির্মাণ করা গেলে ভোলা সরাসরি দেশের মূল সড়ক নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে বলে মনে করছেন তাঁরা।
বর্তমানে নদী পারাপারের ওপর নির্ভরশীল মানুষের জন্য সেতুটি শুধু যোগাযোগের একটি অবকাঠামো হবে না, বরং দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনীতি ও মানুষের চলাচলে বড় পরিবর্তন আনতে পারে—এমনটাই দাবি আন্দোলনকারীদের।
সেতু বাস্তবায়ন কমিটির আহ্বায়ক মো. মোফাজ্জেল হোসেন মফু সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ভেলুমিয়া-ধুলিয়া সেতু নির্মাণ হলে ভোলা থেকে ধুলিয়া হয়ে বরিশালের বাকেরগঞ্জ দিয়ে প্রায় ৪৫ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে বরিশাল শহরে পৌঁছানো সম্ভব হবে।
তাঁর মতে, এতে ভোলার সঙ্গে পটুয়াখালী ও বরিশালের যোগাযোগ সহজ হবে এবং দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও নতুন গতি আসতে পারে।
সেতুর দাবির পেছনে স্থানীয় মানুষের আরেকটি যুক্তি হলো, দক্ষিণাঞ্চলে গত কয়েক বছরে গড়ে ওঠা গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও পর্যটনকেন্দ্রগুলোর সঙ্গে ভোলার সরাসরি সড়ক যোগাযোগ তৈরি করা।
আয়োজকদের দাবি, ভেলুমিয়া-ধুলিয়া সেতু নির্মিত হলে ভোলার সঙ্গে কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকত, পায়রা বন্দর, পায়রা তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রসহ দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকার যোগাযোগ সহজ হবে।
একই সঙ্গে মংলা বন্দর ও দক্ষিণাঞ্চলের কয়েকটি জেলার সঙ্গেও যোগাযোগের নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে তাঁরা মনে করেন।
তবে এসব সম্ভাবনা বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে সেতুর পাশাপাশি সংযোগ সড়ক, পরিবহন অবকাঠামো এবং সামগ্রিক আঞ্চলিক যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নের ওপর।
তারপরও স্থানীয় মানুষের কাছে সেতুটি এখন একটি দীর্ঘদিনের প্রত্যাশার প্রতীক।
শুক্রবারের কর্মসূচিতে সবচেয়ে বেশি নজর কেড়েছে মানববন্ধনের বিস্তৃতি।
মঠবাড়িয়া-ধুলিয়া লঞ্চঘাট থেকে বাকেরগঞ্জের দুর্গাপাশা এলাকা পর্যন্ত প্রায় পাঁচ কিলোমিটার নদীতীরজুড়ে মানুষ দাঁড়িয়ে কর্মসূচি পালন করেন।
আয়োজকদের ভাষ্য, এত বড় পরিসরে মানুষের অংশগ্রহণের মূল কারণ হলো—দাবিগুলো শুধু একটি ইউনিয়ন বা একটি উপজেলার মানুষের নয়।
তেঁতুলিয়া নদীর দুই তীরের মানুষ, ভোলা ও পটুয়াখালীর বাসিন্দা এবং দক্ষিণাঞ্চলের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে বিষয়টি জড়িত।
মানববন্ধন শেষে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে সেতু বাস্তবায়ন কমিটির আহ্বায়ক মো. মোফাজ্জেল হোসেন মফু তারেক রহমানের দৃষ্টি আকর্ষণ করে সেতু নির্মাণের দাবি জানান।
তিনি বলেন, এই সেতু বাস্তবায়িত হলে দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের মানুষের যোগাযোগব্যবস্থা সহজ হওয়ার পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিতেও এর প্রভাব পড়তে পারে।
কর্মসূচিতে স্থানীয় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক ও পেশাজীবী সংগঠনের প্রতিনিধিরাও অংশ নেন।
মানববন্ধনের সংক্ষিপ্ত সমাবেশে ভার্চুয়ালি বক্তব্য দেন স্থানীয় সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম মাসুদ।
এ ছাড়া উপস্থিত ছিলেন বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য সহিদুল আলম তালুকদার, উপজেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক তসলিম তালুকদার, উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর আমির মাও. রফিকুল ইসলাম, বাউফল উপজেলা জনকল্যাণ সমিতির সভাপতি আ. রব খান, সাবেক জেলা পরিষদ সদস্য মো. বাবুল মিয়া, উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সদস্যসচিব মো. নাইম সিকদার তারেক, ধুলিয়া ইউপি চেয়ারম্যান মো. জহিরুল ইসলামসহ অনেকে।
বিভিন্ন রাজনৈতিক মত ও পরিচয়ের মানুষের একই কর্মসূচিতে অংশ নেওয়াকে আয়োজকেরা দাবি দুটির ব্যাপক জনসমর্থনের প্রমাণ হিসেবে দেখছেন।
তবে সেতু নির্মাণের মতো বড় অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়নে সম্ভাব্যতা যাচাই, অর্থায়ন, পরিবেশগত প্রভাব এবং কারিগরি বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

শুক্রবারের মানববন্ধন শেষ হয়েছে। মানুষ বাড়ি ফিরেছেন। নদীও তার স্বাভাবিক গতিতে বয়ে চলেছে।
কিন্তু তেঁতুলিয়ার তীরে থেকে গেছে সেই পুরোনো প্রশ্ন—এই নদী থেকে মানুষ কবে স্থায়ীভাবে নিরাপদ হবে?
আর ভোলার মানুষ কবে সরাসরি সড়কপথে পটুয়াখালী ও দেশের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত হতে পারবেন?
মানববন্ধনে অংশ নেওয়া মানুষের কাছে সেতু মানে শুধু নদীর ওপর কংক্রিটের কাঠামো নয়। তাঁদের কাছে এটি ভোলা ও দক্ষিণাঞ্চলের মধ্যে একটি নতুন সংযোগের সম্ভাবনা।
আর বেড়িবাঁধ মানে শুধু নদীর তীর রক্ষা নয়—এটি ঘরবাড়ি, জমি, জীবিকা ও একটি জনপদের ভবিষ্যৎ রক্ষার প্রশ্ন।
তাই তেঁতুলিয়ার তীরে পাঁচ কিলোমিটারজুড়ে দাঁড়িয়ে হাজারো মানুষের যে দাবি উচ্চারিত হয়েছে, তার কেন্দ্রে আসলে একটি প্রত্যাশাই—নদী যেন আর তাঁদের ভাঙনের গল্প না লেখে, বরং যোগাযোগ ও সম্ভাবনার নতুন পথ খুলে দেয়।