ঢাকা ০৬:০৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬

পূজাসামগ্রীর দাম বৃদ্ধিতে স্থবির পুরান ঢাকার দুর্গাপূজার কেনাবেচা

  • ডেস্ক রিপোর্ট
  • প্রকাশিত : ০৪:০৬:৩৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬
  • ১৭ বার দেখা হয়েছে

শারদীয় দুর্গা উৎসবের অন্যতম প্রাণকেন্দ্র রাজধানীর পুরান ঢাকার শাঁখারীবাজার, তাঁতিবাজার ও লক্ষ্মীবাজার এলাকা। পূজার সময় এলে বদলে যায় এসব এলাকার চেনা চিত্র। মন্দিরগুলোতে শুরু হয় প্রতিমা তৈরির ব্যস্ততা, মণ্ডপ সাজানোর তোড়জোড়, এবং রং-তুলির আঁচড়ে প্রতিমায় ফুটে ওঠে দেবীর রূপ। তবে এই প্রস্তুতির মধ্যেও স্বস্তিতে নেই ব্যবসায়ীরা। জ্বালানি তেল- গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধিতে গত বছরের তুলনায় বেড়েছে প্রতিমার সাজসজ্জা ও পূজার বিভিন্ন উপকরণের দাম। বিপরীতে প্রত্যাশা অনুযায়ী কেনাবেচা বাড়েনি বলে জানিয়েছেন এখানকার দোকানিরা।

শনিবার (১০ অক্টোবর) মহালয়ার মধ্য দিয়ে শুরু হচ্ছে শারদীয় দুর্গোৎসব ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ। উৎসব সামনে রেখে মণ্ডপগুলোতে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি চলছে। কারিগরদের ব্যস্ততা আর দোকানগুলোতে পূজার সামগ্রীর পসরা মিলিয়ে চারদিকে তৈরি হচ্ছে উৎসবের আবহ।

প্রতিমাশিল্পী বিপ্লব দাস দুই দশক ধরে প্রতিমা তৈরির কাজ করছেন। এবার শাঁখারীবাজারের শ্রীশ্রী রাধা মাধব জিউদেব বিগ্রহ মন্দিরসহ তিনটি মণ্ডপের প্রতিমা তৈরির কাজ নিয়েছেন তিনি। প্রতিমা তৈরিতে মাটির কাজের ব্যস্ততার কথা জানিয়ে বিপ্লব দাস বলেন, আমরা এখন মাটির কাজ করছি, প্রায় শেষের দিকে। প্রতিমাগুলো শক্ত হলে রঙের কাজ শুরু করব। এরপর শাড়ি, পরচুলা ও অন্যান্য অলংকার পরানোর কাজ। সব মিলিয়ে চার-পাঁচ দিনের মধ্যে কাজ শেষ হবে।

দুর্গাপূজার প্রতিমা তৈরির ধরন অন্য পূজার প্রতিমার চেয়ে আলাদা বলে মনে করেন এই শিল্পী। তিনি বলেন, দুর্গাপূজার প্রতিমা বানাতে একটা ফুল ফ্যামিলি সেট লাগে। বাহনগুলোও সঙ্গে দিতে হয়। দুর্গাপূজা অনেকটা রাজকীয় পূজা। সেই রাজকীয় আকর্ষণটা তুলে ধরতে হয়। অন্যান্য পূজার প্রতিমার সঙ্গে একটা বাহন দিলেই হয়, কিন্তু দুর্গাপূজায় ফুল সেট লাগে। দুর্গার সঙ্গে অন্য প্রতিমাগুলোও দিতে হয়।

দুর্গার সঙ্গে প্রতিমার সেটে থাকে দেবী সরস্বতী, কার্তিক, গণেশ ও অসুরের প্রতিমা। পাশাপাশি থাকে ময়ূর, হাঁস, পেঁচা, ইঁদুর ও সিংহের মতো বাহন। প্রতিটি প্রতিমা ও বাহনকে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে সাজিয়ে পরিপূর্ণ আবহ তৈরি করতে হয় বলে জানিয়েছেন প্রতিমাশিল্পীরা।

দাম বাড়লেও বিক্রি বাড়েনি বলে জানিয়েছেন শাঁখারীবাজারের সাজঘর দোকানের মালিক দীপক ধর। দীপক ধর বলেন, বেচাকেনা ভালো হচ্ছে না। বিক্রি হচ্ছে, কিন্তু আগের মতো না। সবকিছুর দাম বাড়ছে। ইন্ডিয়াতেও দাম বেড়েছে। বেশিরভাগ মালামাল ইন্ডিয়া থেকে আমদানি করতে হয়। কর বাড়াতে মালের দাম বাড়ছে। তেল-গ্যাসের দাম বৃদ্ধির কারণে সবকিছুর দাম বাড়ছে।

পরিবহন খরচ বৃদ্ধিকেও পণ্যের দাম বাড়ার অন্যতম কারণ হিসেবে মনে করেন দীপক। তিনি জানান, আগে পণ্য পরিবহনে যেখানে দেড়শ টাকা খরচ হতো, এখন সেখানে ৩৫০ টাকা পর্যন্ত দিতে হচ্ছে।

দীপক ধর বলেন, আগে মানুষ দামি দামি মাল খুঁজত, এখন এসে কোনোরকমে সস্তা জিনিস নিয়ে যায়। মালের দাম এত বাড়তি, মানুষ এখন দোকানে এসে ভালো জিনিস খোঁজে না, সস্তা জিনিস কিনে নেয়। তাছাড়া মালের দাম যে হারে বাড়ছে, সেভাবে মানুষের ইনকামও বাড়েনি।

পূজার সাজসজ্জার বাজারের এই হিসাব-নিকাশের প্রভাব পড়েছে প্রতিমা তৈরির খরচেও। আকার ও উচ্চতা ভেদে গত বছর যে প্রতিমা সেট তৈরিতে ৮০ থেকে ৮৫ হাজার টাকা ব্যয় হতো এবছর তা ৯০ হাজার টাকা।

তবে ভিন্ন চিত্র ঢাক- ঢোলের বাজারে। কারিগর সুবল মনিদাশ জানান, এ বছর ঢাকের দাম কিছুটা কমেছে। গত বছর যে ঢাক ১০,০০০ থেকে ১৫,০০০ টাকায় বিক্রি হতো, তা এখন ১০,০০০ থেকে ১২,০০০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে।

সব মিলিয়ে পুরান ঢাকার শাঁখারীবাজার ও তাঁতিবাজারে দুর্গাপূজাকে ঘিরে প্রস্তুতি এগিয়ে চলছে। উৎসবের এই ব্যস্ততার পাশে পূজাসামগ্রীর বাজারে রয়েছে মূল্যবৃদ্ধি ও কেনাবেচার মন্দা। ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশা—শেষ মুহূর্তে ক্রেতাদের আনাগোনা বাড়বে, আর পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী বাজারগুলো ফিরে পাবে পূজার চেনা ব্যস্ততা।

জনপ্রিয় সংবাদ

১৩ বছর পর আবার চালু সিরিয়ার ঐতিহাসিক উমাইয়া মসজিদ

পূজাসামগ্রীর দাম বৃদ্ধিতে স্থবির পুরান ঢাকার দুর্গাপূজার কেনাবেচা

প্রকাশিত : ০৪:০৬:৩৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬

শারদীয় দুর্গা উৎসবের অন্যতম প্রাণকেন্দ্র রাজধানীর পুরান ঢাকার শাঁখারীবাজার, তাঁতিবাজার ও লক্ষ্মীবাজার এলাকা। পূজার সময় এলে বদলে যায় এসব এলাকার চেনা চিত্র। মন্দিরগুলোতে শুরু হয় প্রতিমা তৈরির ব্যস্ততা, মণ্ডপ সাজানোর তোড়জোড়, এবং রং-তুলির আঁচড়ে প্রতিমায় ফুটে ওঠে দেবীর রূপ। তবে এই প্রস্তুতির মধ্যেও স্বস্তিতে নেই ব্যবসায়ীরা। জ্বালানি তেল- গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধিতে গত বছরের তুলনায় বেড়েছে প্রতিমার সাজসজ্জা ও পূজার বিভিন্ন উপকরণের দাম। বিপরীতে প্রত্যাশা অনুযায়ী কেনাবেচা বাড়েনি বলে জানিয়েছেন এখানকার দোকানিরা।

শনিবার (১০ অক্টোবর) মহালয়ার মধ্য দিয়ে শুরু হচ্ছে শারদীয় দুর্গোৎসব ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ। উৎসব সামনে রেখে মণ্ডপগুলোতে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি চলছে। কারিগরদের ব্যস্ততা আর দোকানগুলোতে পূজার সামগ্রীর পসরা মিলিয়ে চারদিকে তৈরি হচ্ছে উৎসবের আবহ।

প্রতিমাশিল্পী বিপ্লব দাস দুই দশক ধরে প্রতিমা তৈরির কাজ করছেন। এবার শাঁখারীবাজারের শ্রীশ্রী রাধা মাধব জিউদেব বিগ্রহ মন্দিরসহ তিনটি মণ্ডপের প্রতিমা তৈরির কাজ নিয়েছেন তিনি। প্রতিমা তৈরিতে মাটির কাজের ব্যস্ততার কথা জানিয়ে বিপ্লব দাস বলেন, আমরা এখন মাটির কাজ করছি, প্রায় শেষের দিকে। প্রতিমাগুলো শক্ত হলে রঙের কাজ শুরু করব। এরপর শাড়ি, পরচুলা ও অন্যান্য অলংকার পরানোর কাজ। সব মিলিয়ে চার-পাঁচ দিনের মধ্যে কাজ শেষ হবে।

দুর্গাপূজার প্রতিমা তৈরির ধরন অন্য পূজার প্রতিমার চেয়ে আলাদা বলে মনে করেন এই শিল্পী। তিনি বলেন, দুর্গাপূজার প্রতিমা বানাতে একটা ফুল ফ্যামিলি সেট লাগে। বাহনগুলোও সঙ্গে দিতে হয়। দুর্গাপূজা অনেকটা রাজকীয় পূজা। সেই রাজকীয় আকর্ষণটা তুলে ধরতে হয়। অন্যান্য পূজার প্রতিমার সঙ্গে একটা বাহন দিলেই হয়, কিন্তু দুর্গাপূজায় ফুল সেট লাগে। দুর্গার সঙ্গে অন্য প্রতিমাগুলোও দিতে হয়।

দুর্গার সঙ্গে প্রতিমার সেটে থাকে দেবী সরস্বতী, কার্তিক, গণেশ ও অসুরের প্রতিমা। পাশাপাশি থাকে ময়ূর, হাঁস, পেঁচা, ইঁদুর ও সিংহের মতো বাহন। প্রতিটি প্রতিমা ও বাহনকে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে সাজিয়ে পরিপূর্ণ আবহ তৈরি করতে হয় বলে জানিয়েছেন প্রতিমাশিল্পীরা।

দাম বাড়লেও বিক্রি বাড়েনি বলে জানিয়েছেন শাঁখারীবাজারের সাজঘর দোকানের মালিক দীপক ধর। দীপক ধর বলেন, বেচাকেনা ভালো হচ্ছে না। বিক্রি হচ্ছে, কিন্তু আগের মতো না। সবকিছুর দাম বাড়ছে। ইন্ডিয়াতেও দাম বেড়েছে। বেশিরভাগ মালামাল ইন্ডিয়া থেকে আমদানি করতে হয়। কর বাড়াতে মালের দাম বাড়ছে। তেল-গ্যাসের দাম বৃদ্ধির কারণে সবকিছুর দাম বাড়ছে।

পরিবহন খরচ বৃদ্ধিকেও পণ্যের দাম বাড়ার অন্যতম কারণ হিসেবে মনে করেন দীপক। তিনি জানান, আগে পণ্য পরিবহনে যেখানে দেড়শ টাকা খরচ হতো, এখন সেখানে ৩৫০ টাকা পর্যন্ত দিতে হচ্ছে।

দীপক ধর বলেন, আগে মানুষ দামি দামি মাল খুঁজত, এখন এসে কোনোরকমে সস্তা জিনিস নিয়ে যায়। মালের দাম এত বাড়তি, মানুষ এখন দোকানে এসে ভালো জিনিস খোঁজে না, সস্তা জিনিস কিনে নেয়। তাছাড়া মালের দাম যে হারে বাড়ছে, সেভাবে মানুষের ইনকামও বাড়েনি।

পূজার সাজসজ্জার বাজারের এই হিসাব-নিকাশের প্রভাব পড়েছে প্রতিমা তৈরির খরচেও। আকার ও উচ্চতা ভেদে গত বছর যে প্রতিমা সেট তৈরিতে ৮০ থেকে ৮৫ হাজার টাকা ব্যয় হতো এবছর তা ৯০ হাজার টাকা।

তবে ভিন্ন চিত্র ঢাক- ঢোলের বাজারে। কারিগর সুবল মনিদাশ জানান, এ বছর ঢাকের দাম কিছুটা কমেছে। গত বছর যে ঢাক ১০,০০০ থেকে ১৫,০০০ টাকায় বিক্রি হতো, তা এখন ১০,০০০ থেকে ১২,০০০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে।

সব মিলিয়ে পুরান ঢাকার শাঁখারীবাজার ও তাঁতিবাজারে দুর্গাপূজাকে ঘিরে প্রস্তুতি এগিয়ে চলছে। উৎসবের এই ব্যস্ততার পাশে পূজাসামগ্রীর বাজারে রয়েছে মূল্যবৃদ্ধি ও কেনাবেচার মন্দা। ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশা—শেষ মুহূর্তে ক্রেতাদের আনাগোনা বাড়বে, আর পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী বাজারগুলো ফিরে পাবে পূজার চেনা ব্যস্ততা।