পটুয়াখালী প্রতিনিধি: সংরক্ষিত বনভূমিতে সারি সারি ঝাউ, কেওড়া, গেওড়া ও ছৈলাগাছ। উপকূলকে রক্ষা করতে গড়ে তোলা সেই বাগানের মধ্যেই এবার তরমুজ চাষের প্রস্তুতি চলছে। ভেকু মেশিন দিয়ে মাটি কেটে নির্মাণ করা হচ্ছে বাঁধ। বন বিভাগের বাধা, দুটি বন মামলা ও থানায় সাধারণ ডায়েরির (জিডি) পরও বন্ধ হয়নি এই তৎপরতা। বন বিভাগের অভিযোগ, মাটি কাটতে গিয়ে উপড়ে ফেলা হয়েছে প্রায় ২০০ থেকে ৩০০টি গাছ।
পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলার ছোটবাইশদিয়া ইউনিয়নের কাউখালী এলাকার চর সাইনবোর্ডে এ ঘটনা ঘটেছে। বন বিভাগের দাবি, সংরক্ষিত বনভূমির অংশ নিয়ে ৩০ একর জমি বন্দোবন্ত দেওয়াকে কেন্দ্র করে বিরোধের সূত্রপাত। জমিটির বন্দোবস্ত বাতিল চেয়ে জেলা প্রশাসনকে একাধিকবার চিঠি দেওয়া হলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এরই মধ্যে নতুন করে গাছ কেটে বনভূমিতে বাঁধ নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে।
বনভূমির সীমানা কোথায়, বন্দোবস্ত দেওয়া জমির অবস্থান কী এবং চাষাবাদের অনুমতিপত্রের বৈধতা কতটুকু,এসব প্রশ্নের নিষ্পত্তি না হওয়ায় পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠেছে।
বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, চর সাইনবোর্ডের ৪১৫ একর এলাকাকে ২০১০ সালের ৪ এপ্রিল সংরক্ষিত বন হিসেবে ঘোষণা করা হয়। পরবর্তী সময়ে সেখানে বিভিন্ন প্রজাতির ম্যানগ্রোভ ও উপকূলীয় গাছ লাগানো হয়। ২০২১-২২ অর্থবছরে ওই এলাকায় ১০ হেক্টর জমিতে ঝাউবাগানসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছের বনায়ন করা হয়।
বন বিভাগের ভাষ্য অনুযায়ী, গত বছর ওই এলাকায় ৩০ একর জমি দুই বছরের জন্য বন্দোবস্ত দেওয়া হয়। এরপর বন্দোবস্তপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা তরমুজ চাষের প্রস্তুতি নিতে গিয়ে বন বিভাগের সৃজিত ঝাউবাগানের গাছ কাটেন বলে অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় বন বিভাগ দুটি মামলা করে। মামলাগুলো সংশ্লিষ্ট আদালতে চলমান রয়েছে বলে জানিয়েছে বন বিভাগ।
এরপরও গত ১৭ অক্টোবর বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে চর সাইনবোর্ডে ভেকু মেশিন দিয়ে মাটি কেটে বাঁধ নির্মাণ শুরু হয় বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। খবর পেয়ে বনকর্মীরা ঘটনাস্থলে গিয়ে বাধা দেন। কিন্তু তাঁদের বাধা উপেক্ষা করেই কাজ চালিয়ে যাওয়া হয় বলে অভিযোগ বন বিভাগের।
রাঙ্গাবালী রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. আমির হোসেন বলেন, “সংরক্ষিত বনভূমিতে অবৈধভাবে ভেকু মেশিন দিয়ে বাঁধ নির্মাণের খবর পেয়ে বনকর্মীরা ঘটনাস্থলে গিয়ে বাধা দেন। কিন্তু তাঁরা বাধা উপেক্ষা করে কাজ চালিয়ে যান। এতে প্রায় ২০০ থেকে ৩০০টি ছৈলা, কেওড়া ও ঝাউগাছ উপড়ে ফেলা হয়েছে। এ ঘটনায় রাঙ্গাবালী থানায় সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছে। অন্যান্য আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়াও চলছে।”
বন বিভাগের কাউখালী ফরেস্ট ক্যাম্পের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. জালাল আহম্মদ খানের করা সাধারণ ডায়েরিতে তিনজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। জিডিতে বলা হয়েছে, তাঁরা ভেকু মেশিন দিয়ে মাটি কেটে বাঁধ নির্মাণ করছিলেন। বনকর্মীরা বাধা দিলে তাঁরা জমি বন্দোবস্তের কাগজপত্র দেখান।
জিডি অনুযায়ী, জমিটি গেজেটভুক্ত বনভূমির অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় কাগজপত্র যাচাইয়ের জন্য সংশ্লিষ্ট কার্যালয়ে উপস্থিত হতে বলা হয়েছিল। কিন্তু তাঁরা তাতে রাজি হননি বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
আগের দুটি বন মামলার জেরে বন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা করা হতে পারে বলেও জিডিতে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। ভবিষ্যতের জন্য বিষয়টি নথিভুক্ত রাখার আবেদন জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট বন কর্মকর্তা।
বন বিভাগের অভিযোগ, এর আগেও বনভূমি রক্ষা করতে গিয়ে কর্মীদের বাধার মুখে পড়তে হয়েছে। জনবলসংকটের কারণে অনেক সময় তাঁদের পিছু হটতে হয়। এতে সংরক্ষিত বনভূমি রক্ষা ও অবৈধ দখল ঠেকানো কঠিন হয়ে পড়ছে।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন জিডিতে উল্লেখ করা প্রধান বিবাদী আরিফ মীর। তিনি বলেন, “আসলে সরকার থেকে আমরা বন্দোবস্ত নিয়ে সেই জমিতে খেত করছি। বনের জমিতে আমরা কোনো কাজ করছি না।”
বন বিভাগের দাবি, জমিটি সংরক্ষিত বনভূমির অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় বন্দোবস্ত বাতিলের জন্য জেলা প্রশাসনকে দুই দফা চিঠি দেওয়া হয়েছে। সর্বশেষ গত ৩ আগস্টও এ বিষয়ে চিঠি পাঠানো হয়।
বিভাগীয় বন কর্মকর্তা ড. মো. জাহিদুর রহমান মিয়ার স্বাক্ষরিত একটি চিঠিতে জেলা প্রশাসককে জানানো হয়েছে, সংশ্লিষ্ট জমি বন বিভাগের ২০ ও ৪ ধারায় ঘোষিত বনভূমির অন্তর্ভুক্ত। সেখানে বন বিভাগের সৃজিত একাধিক বাগান রয়েছে। জমিটি বন্দোবস্ত দেওয়া হলে বন, বন্য প্রাণী, জীববৈচিত্র্য ও আশপাশের ম্যানগ্রোভ প্রতিবেশ মারাত্মক হুমকির মুখে পড়তে পারে।
চিঠিতে বন ও বৃক্ষ সংরক্ষণ আইন, ২০২৬-এর তৃতীয় ভাগের ৬(৫) ধারার উল্লেখ করে বলা হয়েছে, বনভূমির আংশিক অংশ রয়েছে,এমন দাগে কিংবা বনভূমির সংলগ্ন খাসজমি বন্দোবস্ত দেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট বন বিভাগকে অবহিত করতে হবে। এরপর যৌথ জরিপের মাধ্যমে বনভূমি ও খাসজমির সীমানা নির্ধারণ করতে হবে।
বন বিভাগের বক্তব্য, তাদের আপত্তি সত্ত্বেও জমিটির বন্দোবস্তের বিষয়টি নিষ্পত্তি না হওয়ায় নতুন করে দখলচেষ্টার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তবে বন্দোবস্তের নথি, জমির দাগ ও সীমানা যাচাই করে বিষয়টির চূড়ান্ত নিষ্পত্তি প্রয়োজন।
এ ঘটনায় রাঙ্গাবালী উপজেলা ভূমি অফিস থেকে দেওয়া চাষাবাদের অনুমতিপত্রের মেয়াদ ও কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ৩০ একর জমি কাদের সরেজমিন যাচাইয়ের ভিত্তিতে বন্দোবস্ত বা চাষাবাদের অনুমতি দেওয়া হয়েছে, তা স্পষ্ট নয়। অনুমতিপত্রটি সরকারি ডকুমেন্ট হিসেবে কোন আদালতে উপস্থাপনযোগ্য নহে বলে উল্লেখ রয়েছে। এই অনুমতিপত্রে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নাম ও ইস্যুর তারিখ না থাকার বিষয়টিও যাচাইয়ের দাবি রাখে।
অনুমতির মেয়াদ এক মৌসুম, এক বছর, নাকি বাংলা ১৪৩৪ সনের ৩০ চৈত্র পর্যন্ত, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। চাষাবাদের অনুমতি থাকলে সেখানে গাছ কাটা বা মাটি কেটে বাঁধ নির্মাণের সুযোগ ছিল কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
রাঙ্গাবালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাজমুল হাসান বলেন, “আমি এখানে আসার পর এ ধরনের কোনো অনুমতি দেওয়া হয়নি। অভিযোগ এসেছে, তাই বনের জমি এবং খাসজমি চিহ্নিত করতে হবে। তবে যদি বনের গাছ কেটে থাকে, তাহলে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
পটুয়াখালীর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) আবদুল কাইয়ুম বলেন, “বন বিভাগের চিঠি পেয়েছি। যাচাই-বাছাই করে বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।” চাষাবাদের অনুমতি দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো অনিয়ম হয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হবে বলে জানান তিনি।
উপকূলীয় অঞ্চলে বনভূমি ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের ক্ষতি কমানো, জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং মাটির স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সেই বনভূমির মধ্যে শত শত গাছ উপড়ে ফেলার অভিযোগের পরও যদি সীমানা ও বন্দোবস্তের বৈধতা দ্রুত নির্ধারণ করা না যায়, তাহলে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।

ডেস্ক রিপোর্ট 






















