ঢাকা ০৯:৫৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬

আকিজ টেক্সটাইল এখন গ্রামবাসীর দুঃখ!

  • ডেস্ক রিপোর্ট
  • প্রকাশিত : ০৮:১৪:১৯ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬
  • ৪ বার দেখা হয়েছে
ঢাকা – আরিচা মহাসড়কের মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার জাগীর ইউনিয়নের গোলড়া চরখন্ড এলাকায় স্থাপিত আকিজ টেক্সটাইল মিলস এখন গ্রামবাসীর দুঃখে পরিণত হয়েছে। কারখানার বিষাক্ত বর্জ্য দিনের পর দিন, মাসের পর মাস এমনকি বছরের পর বছর   ধলেশ্বরী নদী এবং পার্শ্ববর্তী ফসলি জমিতে নির্গত হচ্ছে।এনিয়ে ভুক্তভোগী গ্রামবাসীরা মানব বন্ধনসহ নানা প্রতিবাদ করলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ রহস্যজনক কারণে কার্যকরী কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি।
জানা গেছে, ১৯৯৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি আকিজ টেক্সটাইল মিলস লিমিটেড কোম্পানিসত্তা পায়। এরপর মানিকগঞ্জের জাগির চরখন্ড গোলড়া এলাকায় ১৬ একর কৃষি জমির উপর কারখানা তৈরি করে  উৎপাদন কার্যক্রম শুরু করে। প্রতিষ্ঠানগ্ন থেকে এলাকাবাসীর বাধা উপেক্ষা করে সম্পূর্ণ নিয়মবহির্ভূতভাবে এই কারখানার কেমিক্যাল মিশ্রিত বিষাক্ত বর্জ্য নদীও পার্শ্ববর্তী কৃষি জমিতে ফেলে আসছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, আকিজ টেক্সটাইল মিল থেকে মাটির নীচ দিয়ে ড্রেনের মাধ্যমে লাল কালচে পানি ধলেশ্বরী নদীর দিকে প্রবাহিত হচ্ছে। নদীর একটু আগে ড্রেন থেকে  এই পানি বড় আকারে গভীর করা দুটি পুকুরের মতো জায়গায় খেলা হচ্ছে । সেখান থেকে নীচ দিয়ে সরাসরি একই কালারের পানি সরাসরি নদীর পানির সাথে মিশে যাচ্ছে। নদীর নিচে নেমে দেখা যায় পানি নির্গত হওয়ার স্থানে কিছুটা গভীরতা দেখা গেলেও বেশিরভাগ স্থানে ময়লা এবং মাটি মিশে চরের মতো স্তুপ সৃষ্টি হয়েছে।
নদীতে গোসল করতে আসা জসিম উদ্দিন বলেন, আকিজ ফ্যাক্টরি থেকে নদীতে নিয়মিত বিষাক্ত বর্জ্য খেলা হচ্ছে। এই কারণে ভাটির পানি গোসল কিংবা গৃহস্থলীর কাজে ব্যবহার করা যায়না। উজানের পানি তুলনামূলক কিছুটা ভালো। তবে বৃষ্টি অথবা ধার (স্রোত) কমে গেলে ওই পানি এদিকে আসে। তখন এই পাশের পানিও ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পরে।
ক্ষোভ প্রকাশ করে স্থানীয় আক্কাস আলী বলেন, আমরা এলাকাবাসী কয়েকবার মানববন্ধন করেছি। অনেক সাংবাদিক এসেছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমে নিউজ হয়েছে। মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে জরিমানা করা হয়েছে। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি।
এক গৃহিণী জানান, ঘর গৃহস্থলীর কাজের জন্য এবং গোসল করার একমাত্র ভরসা ধলেশ্বরী নদী। এই নদীতে গোসল করে আমাদের শারীরিক সমস্যা হচ্ছে। বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ। উপায় না পেয়ে আমরা বাধ্য হয়ে বিষাক্ত পানি দিয়ে গোসল সহ নানা কাজ করছি।
৭০ বছর বয়সী এক কৃষক বলেন, বর্তমান সরকার কৃষি উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্যে খাল খনন কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। অথচ আকিজ টেক্সটাইল মিলের   ব্রয়লারের ছাই ফেলে নদী ভরাট করছে। সামান্য বাতাসে ছাই উড়ে পরিবেশ বিনষ্ট করছে। কারখানার ময়লা পরে নদীর পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়ে ঐতিহ্যবাহী ধলেশ্বরী নদীর এই অংশটি মৃতপায় খালে পরিণত হয়েছে। এক কথা আকিজ টেক্সটাইল মিল এখন গোলড়া চরখন্ডবাসীর দুঃখে পরিণত হয়েছে।
গোলড়া চরখন্ড গ্রামের আক্কেল আলী মাতবরের স্ত্রী জানান, আকিজ টেক্সটাইলের পানি যেখান দিয়ে যায়, পুড়তে পুড়তে যায়। ফ্যাক্টরির বিষাক্ত পানিতে ভুট্টা ক্ষেত নষ্ট হয়ে গেছে।
জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল মানিকগঞ্জ জেলা শাখার আহবায়ক কমিটির সদস্য গোলড়া চরখন্ড গ্রামের ভুক্তভোগী রাজিব হাসান জানান,ফ্যাসিস্ট সরকারের দুঃশাসনামলে আমার বিরুদ্ধে তিনটি মিথ্যা মামলা দেওয়া হয়েছিল। কারণ আমি আকিজ টেক্সটাইলের বর্জ্য নদীতে ফেলার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছি।
তিনি বলেন, ফ্যাক্টরি চালু করার পর থেকেই ধলেশ্বরী নদী ও পার্শ্ববর্তী কৃষি জমিতে বিষাক্ত বর্জ্য ফেলা হচ্ছে। এক সময় মাছের অভয়ারণ্য হিসেবে পরিচিত ধলেশ্বরী নদী এখন মাছ শূন্য হয়ে পড়েছে। বিলীন হয়ে যাচ্ছে দেশি প্রজাতির বিভিন্ন  মাছ। এছাড়া বিষাক্ত এই পানিতে গোসল করে চর্মরোগে আক্রান্ত হচ্ছে এলাকাবাসী। দীর্ঘদিন যাবত এই সীমাহীন অনিয়ম অব্যবস্থাপনা চলতে থাকলেও ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকার ও তার পরবর্তী অন্তর্বর্তীকালীন সরকার  কার্যকরী কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি।
তিনি বলেন, কয়েকদিন আগে আকিজ টেক্সটাইল মিলের ভেতর থেকে আসা কেমিক্যাল মিশ্রিত বিষাক্ত পানিতে আমার ও আমার প্রতিবেশীদের কয়েক বিঘা জমির ভুট্টা সহ অন্যান্য ফসল পুড়ে গেছে। বিষয়টি বারবার কারখানা কর্তৃপক্ষ এমনকি প্রশাসনকে জানানোর পরও কোন কাজ হয়নি। এছাড়া আকিজ টেক্সটাইল মিল কর্তৃপক্ষ আমাদের গ্রামের অনেক মানুষের জমি ক্ষমতার জোরে জবর দখল করে রেখেছে।
এবিষয়ে আকিজ টেক্সটাইল মিলস লিমিটেডের ডিজিএম মো: জাকিরের মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন এই মুহূর্তে মিটিংয়ে আছি। এক সময় অফিসে আসলে কথা হবে।
পরিবেশ অধিদপ্তর মানিকগঞ্জ জেলা কার্যালয়ের  উপ-পরিচালক আব্দুল্লাহ আল মামুন দিনকালকে জানান, আকিজ টেক্সটাইল মিলের বর্জ্য ধলেশ্বরী নদীতে নির্গত হওয়ার বিষয়টি অবগত আছি। মূলত তাদের সমস্যা কালার প্যারামিটে। কালার প্যারামিটার স্ট্যান্ডার্ডের বাইরে থাকার কারণে ওই কারখানাকে ৫ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। অতি দ্রুত প্যারামিটার স্ট্যান্ডার্ড ঠিক করতে বলা হয়েছে।
জনপ্রিয় সংবাদ

৫৮ দিনের নিষেধাজ্ঞায় থমকে উপকূল মাছ নেই, আয়ের পথ বন্ধ,পটুয়াখালীর জেলেপল্লীতে বাড়ছে ঋণ, দুশ্চিন্তা আর পেশা বদলের ভাবনা

আকিজ টেক্সটাইল এখন গ্রামবাসীর দুঃখ!

প্রকাশিত : ০৮:১৪:১৯ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬
ঢাকা – আরিচা মহাসড়কের মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার জাগীর ইউনিয়নের গোলড়া চরখন্ড এলাকায় স্থাপিত আকিজ টেক্সটাইল মিলস এখন গ্রামবাসীর দুঃখে পরিণত হয়েছে। কারখানার বিষাক্ত বর্জ্য দিনের পর দিন, মাসের পর মাস এমনকি বছরের পর বছর   ধলেশ্বরী নদী এবং পার্শ্ববর্তী ফসলি জমিতে নির্গত হচ্ছে।এনিয়ে ভুক্তভোগী গ্রামবাসীরা মানব বন্ধনসহ নানা প্রতিবাদ করলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ রহস্যজনক কারণে কার্যকরী কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি।
জানা গেছে, ১৯৯৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি আকিজ টেক্সটাইল মিলস লিমিটেড কোম্পানিসত্তা পায়। এরপর মানিকগঞ্জের জাগির চরখন্ড গোলড়া এলাকায় ১৬ একর কৃষি জমির উপর কারখানা তৈরি করে  উৎপাদন কার্যক্রম শুরু করে। প্রতিষ্ঠানগ্ন থেকে এলাকাবাসীর বাধা উপেক্ষা করে সম্পূর্ণ নিয়মবহির্ভূতভাবে এই কারখানার কেমিক্যাল মিশ্রিত বিষাক্ত বর্জ্য নদীও পার্শ্ববর্তী কৃষি জমিতে ফেলে আসছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, আকিজ টেক্সটাইল মিল থেকে মাটির নীচ দিয়ে ড্রেনের মাধ্যমে লাল কালচে পানি ধলেশ্বরী নদীর দিকে প্রবাহিত হচ্ছে। নদীর একটু আগে ড্রেন থেকে  এই পানি বড় আকারে গভীর করা দুটি পুকুরের মতো জায়গায় খেলা হচ্ছে । সেখান থেকে নীচ দিয়ে সরাসরি একই কালারের পানি সরাসরি নদীর পানির সাথে মিশে যাচ্ছে। নদীর নিচে নেমে দেখা যায় পানি নির্গত হওয়ার স্থানে কিছুটা গভীরতা দেখা গেলেও বেশিরভাগ স্থানে ময়লা এবং মাটি মিশে চরের মতো স্তুপ সৃষ্টি হয়েছে।
নদীতে গোসল করতে আসা জসিম উদ্দিন বলেন, আকিজ ফ্যাক্টরি থেকে নদীতে নিয়মিত বিষাক্ত বর্জ্য খেলা হচ্ছে। এই কারণে ভাটির পানি গোসল কিংবা গৃহস্থলীর কাজে ব্যবহার করা যায়না। উজানের পানি তুলনামূলক কিছুটা ভালো। তবে বৃষ্টি অথবা ধার (স্রোত) কমে গেলে ওই পানি এদিকে আসে। তখন এই পাশের পানিও ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পরে।
ক্ষোভ প্রকাশ করে স্থানীয় আক্কাস আলী বলেন, আমরা এলাকাবাসী কয়েকবার মানববন্ধন করেছি। অনেক সাংবাদিক এসেছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমে নিউজ হয়েছে। মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে জরিমানা করা হয়েছে। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি।
এক গৃহিণী জানান, ঘর গৃহস্থলীর কাজের জন্য এবং গোসল করার একমাত্র ভরসা ধলেশ্বরী নদী। এই নদীতে গোসল করে আমাদের শারীরিক সমস্যা হচ্ছে। বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ। উপায় না পেয়ে আমরা বাধ্য হয়ে বিষাক্ত পানি দিয়ে গোসল সহ নানা কাজ করছি।
৭০ বছর বয়সী এক কৃষক বলেন, বর্তমান সরকার কৃষি উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্যে খাল খনন কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। অথচ আকিজ টেক্সটাইল মিলের   ব্রয়লারের ছাই ফেলে নদী ভরাট করছে। সামান্য বাতাসে ছাই উড়ে পরিবেশ বিনষ্ট করছে। কারখানার ময়লা পরে নদীর পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়ে ঐতিহ্যবাহী ধলেশ্বরী নদীর এই অংশটি মৃতপায় খালে পরিণত হয়েছে। এক কথা আকিজ টেক্সটাইল মিল এখন গোলড়া চরখন্ডবাসীর দুঃখে পরিণত হয়েছে।
গোলড়া চরখন্ড গ্রামের আক্কেল আলী মাতবরের স্ত্রী জানান, আকিজ টেক্সটাইলের পানি যেখান দিয়ে যায়, পুড়তে পুড়তে যায়। ফ্যাক্টরির বিষাক্ত পানিতে ভুট্টা ক্ষেত নষ্ট হয়ে গেছে।
জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল মানিকগঞ্জ জেলা শাখার আহবায়ক কমিটির সদস্য গোলড়া চরখন্ড গ্রামের ভুক্তভোগী রাজিব হাসান জানান,ফ্যাসিস্ট সরকারের দুঃশাসনামলে আমার বিরুদ্ধে তিনটি মিথ্যা মামলা দেওয়া হয়েছিল। কারণ আমি আকিজ টেক্সটাইলের বর্জ্য নদীতে ফেলার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছি।
তিনি বলেন, ফ্যাক্টরি চালু করার পর থেকেই ধলেশ্বরী নদী ও পার্শ্ববর্তী কৃষি জমিতে বিষাক্ত বর্জ্য ফেলা হচ্ছে। এক সময় মাছের অভয়ারণ্য হিসেবে পরিচিত ধলেশ্বরী নদী এখন মাছ শূন্য হয়ে পড়েছে। বিলীন হয়ে যাচ্ছে দেশি প্রজাতির বিভিন্ন  মাছ। এছাড়া বিষাক্ত এই পানিতে গোসল করে চর্মরোগে আক্রান্ত হচ্ছে এলাকাবাসী। দীর্ঘদিন যাবত এই সীমাহীন অনিয়ম অব্যবস্থাপনা চলতে থাকলেও ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকার ও তার পরবর্তী অন্তর্বর্তীকালীন সরকার  কার্যকরী কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি।
তিনি বলেন, কয়েকদিন আগে আকিজ টেক্সটাইল মিলের ভেতর থেকে আসা কেমিক্যাল মিশ্রিত বিষাক্ত পানিতে আমার ও আমার প্রতিবেশীদের কয়েক বিঘা জমির ভুট্টা সহ অন্যান্য ফসল পুড়ে গেছে। বিষয়টি বারবার কারখানা কর্তৃপক্ষ এমনকি প্রশাসনকে জানানোর পরও কোন কাজ হয়নি। এছাড়া আকিজ টেক্সটাইল মিল কর্তৃপক্ষ আমাদের গ্রামের অনেক মানুষের জমি ক্ষমতার জোরে জবর দখল করে রেখেছে।
এবিষয়ে আকিজ টেক্সটাইল মিলস লিমিটেডের ডিজিএম মো: জাকিরের মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন এই মুহূর্তে মিটিংয়ে আছি। এক সময় অফিসে আসলে কথা হবে।
পরিবেশ অধিদপ্তর মানিকগঞ্জ জেলা কার্যালয়ের  উপ-পরিচালক আব্দুল্লাহ আল মামুন দিনকালকে জানান, আকিজ টেক্সটাইল মিলের বর্জ্য ধলেশ্বরী নদীতে নির্গত হওয়ার বিষয়টি অবগত আছি। মূলত তাদের সমস্যা কালার প্যারামিটে। কালার প্যারামিটার স্ট্যান্ডার্ডের বাইরে থাকার কারণে ওই কারখানাকে ৫ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। অতি দ্রুত প্যারামিটার স্ট্যান্ডার্ড ঠিক করতে বলা হয়েছে।