ঢাকা ১১:২১ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬

৫৮ দিনের নিষেধাজ্ঞায় থমকে উপকূল মাছ নেই, আয়ের পথ বন্ধ,পটুয়াখালীর জেলেপল্লীতে বাড়ছে ঋণ, দুশ্চিন্তা আর পেশা বদলের ভাবনা

  • ডেস্ক রিপোর্ট
  • প্রকাশিত : ০৯:৫১:৪২ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬
  • ৭ বার দেখা হয়েছে

পটুয়াখালী প্রতিনিধি: পটুয়াখালীর উপকূলে এখন আর ভোরের আলোয় ট্রলারের গর্জন শোনা যায় না। জেলার উপকূলীয় মহিপুর-আলীপুর মৎস্য বন্দর কিংবা কুয়াকাটার সৈকত চ্যানেলে সারি সারি ট্রলার দাঁড়িয়ে,নিঃশব্দ, কর্মহীন। জেলেদের হাতে এখন জাল নয়, দুশ্চিন্তার ভার।
দীর্ঘদিনের জ্বালানি সংকট কাটিয়ে ওঠার আগেই নতুন করে বিপাকে পড়েছেন উপকূলীয় জেলেরা। ৫৮ দিনের বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হওয়ায় পটুয়াখালীর উপকূলজুড়ে নেমে এসেছে অনিশ্চয়তা।
বঙ্গোপসাগরের জলসীমায় ইলিশসহ সামুদ্রিক মাছের নিরাপদ প্রজনন নিশ্চিত করতে সরকার প্রতি বছরের মতো এবারও ১৪ এপ্রিল মধ্যরাত থেকে ১১ জুন পর্যন্ত সব ধরনের মাছ ধরা নিষিদ্ধ করেছে। পরিবেশ ও মৎস্য সম্পদ রক্ষায় এই সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও, এর প্রভাব পড়েছে হাজারো জেলে পরিবারের জীবনে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, মহিপুর, আলীপুর ও কুয়াকাটার মাছঘাটে জেলেরা ইতোমধ্যে ট্রলার তুলে রেখেছেন তীরে। কেউ জাল সেলাই করছেন, কেউ ট্রলার মেরামত করছেন। কিন্তু কাজের এই ব্যস্ততা কেবল সময় কাটানোর জন্য,আয়ের কোনো পথ নেই।


৫২ বছর বয়সী জেলে রফিক মাঝি জীবনের সব সময় কাটিয়েছেন সাগরে। ছয় সদস্যের পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি তিনি। এখন তার চোখে শুধু অনিশ্চয়তা।
‘ছোটবেলা থেকে মাছ ধরি। অন্য কাজ জানি না। আয় বন্ধ, খরচ তো থেমে নেই,’বলছিলেন তিনি।
চার সন্তানের পড়াশোনা, সংসারের খরচ, সব মিলিয়ে দিশেহারা অবস্থা তার। ইতোমধ্যে প্রায় দুই লাখ টাকা ঋণ নিয়েছেন মহাজনের কাছ থেকে, পাশাপাশি এনজিওর কিস্তিও চালিয়ে যেতে হচ্ছে।
‘নিষেধাজ্ঞার সময় সরকারি সহায়তা শুরুতেই দরকার। আর ঋণের কিস্তি বন্ধ না হলে টিকে থাকা কঠিন,’যোগ করেন তিনি।
৪০ বছর বয়সী জেলে ফারুক মাঝির কণ্ঠেও একই হতাশা। সরকারি সহায়তা হিসেবে চাল পেলেও তা পর্যাপ্ত নয় বলে অভিযোগ তার।
‘৮০ কেজি চাল দেয়ার কথা, কিন্তু বাস্তবে কম পাই। আর চাল দিয়ে তো সব হয় না,তেল, ডাল, ওষুধ,সব লাগে,’বললেন তিনি।
তার মতে, অন্তত নগদ ৫ হাজার টাকা সহায়তা না পেলে এই সময়টা পার করা কঠিন।
‘ঋণ বাড়ছে, মাছ কমছে। তাই ভাবছি এই পেশা ছেড়ে রিকশা চালানো শিখবো,’বলতে গিয়ে কণ্ঠে ভেঙে পড়ার আভাস।
নিষেধাজ্ঞার প্রভাব শুধু জেলেদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়,এর ঢেউ লেগেছে পুরো উপকূলীয় অর্থনীতিতে।
মহিপুর মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের কর্মচারী কবির হোসেন বলেন,‘বাজারের সবকিছুর দাম বাড়তি। আয় না থাকলে সংসার চালানো যায় না। ধার করে চলতে হচ্ছে।’
আলীপুরের মৎস্য ব্যবসায়ী আবদুল জলিল ঘরামী জানান, জ্বালানি সংকটের ধাক্কা কাটতে না কাটতেই নিষেধাজ্ঞা শুরু হওয়ায় ব্যবসায়ীরাও চাপে পড়েছেন। ‘জেলেদের বাঁচিয়ে রাখতে অনেক সময় অগ্রিম দিতে হয়। কিন্তু সবারই সীমা আছে,’ বললেন তিনি।
জেলা মৎস্য অফিসের তথ্যমতে, পটুয়াখালীর আট উপজেলায় নিবন্ধিত কার্ডধারী জেলের সংখ্যা ৬৩ হাজার ১৫৫ জন। এর মধ্যে ৫৩ হাজার ৭৫০ জন ভিজিএফ সহায়তার আওতায় রয়েছেন।


জেলা মৎস্য কর্মকর্তা বিজন কুমার নন্দী জানান, নিষেধাজ্ঞা চলাকালীন প্রতিটি নিবন্ধিত জেলেকে পর্যায়ক্রমে ৭৭ কেজি করে চাল দেয়া হবে।
তিনি বলেন,‘নগদ সহায়তা বাড়ানোর প্রস্তাব ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে, যাতে জেলেরা নূন্যতম চাহিদা মেটাতে পারেন।’
প্রতি বছরই এই নিষেধাজ্ঞা আসে, আবার শেষও হয়। কিন্তু জেলেদের জীবনে জমতে থাকা ঋণ, অনিশ্চয়তা আর হতাশা যেন শেষ হয় না। সমুদ্রের মাছ রক্ষা পাচ্ছে,কিন্তু সেই সমুদ্রের ওপর নির্ভরশীল মানুষগুলো কি বেঁচে থাকছে নিশ্চিন্তে? উপকূলের নীরব ট্রলার আর অপেক্ষমাণ জেলেদের চোখে সেই প্রশ্নটাই এখন সবচেয়ে বড় হয়ে উঠেছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

সাতক্ষীরায় বিজিবির অভিযানে ১০ লাখ টাকার ভারতীয় মালামাল আটক

৫৮ দিনের নিষেধাজ্ঞায় থমকে উপকূল মাছ নেই, আয়ের পথ বন্ধ,পটুয়াখালীর জেলেপল্লীতে বাড়ছে ঋণ, দুশ্চিন্তা আর পেশা বদলের ভাবনা

প্রকাশিত : ০৯:৫১:৪২ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬

পটুয়াখালী প্রতিনিধি: পটুয়াখালীর উপকূলে এখন আর ভোরের আলোয় ট্রলারের গর্জন শোনা যায় না। জেলার উপকূলীয় মহিপুর-আলীপুর মৎস্য বন্দর কিংবা কুয়াকাটার সৈকত চ্যানেলে সারি সারি ট্রলার দাঁড়িয়ে,নিঃশব্দ, কর্মহীন। জেলেদের হাতে এখন জাল নয়, দুশ্চিন্তার ভার।
দীর্ঘদিনের জ্বালানি সংকট কাটিয়ে ওঠার আগেই নতুন করে বিপাকে পড়েছেন উপকূলীয় জেলেরা। ৫৮ দিনের বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হওয়ায় পটুয়াখালীর উপকূলজুড়ে নেমে এসেছে অনিশ্চয়তা।
বঙ্গোপসাগরের জলসীমায় ইলিশসহ সামুদ্রিক মাছের নিরাপদ প্রজনন নিশ্চিত করতে সরকার প্রতি বছরের মতো এবারও ১৪ এপ্রিল মধ্যরাত থেকে ১১ জুন পর্যন্ত সব ধরনের মাছ ধরা নিষিদ্ধ করেছে। পরিবেশ ও মৎস্য সম্পদ রক্ষায় এই সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও, এর প্রভাব পড়েছে হাজারো জেলে পরিবারের জীবনে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, মহিপুর, আলীপুর ও কুয়াকাটার মাছঘাটে জেলেরা ইতোমধ্যে ট্রলার তুলে রেখেছেন তীরে। কেউ জাল সেলাই করছেন, কেউ ট্রলার মেরামত করছেন। কিন্তু কাজের এই ব্যস্ততা কেবল সময় কাটানোর জন্য,আয়ের কোনো পথ নেই।


৫২ বছর বয়সী জেলে রফিক মাঝি জীবনের সব সময় কাটিয়েছেন সাগরে। ছয় সদস্যের পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি তিনি। এখন তার চোখে শুধু অনিশ্চয়তা।
‘ছোটবেলা থেকে মাছ ধরি। অন্য কাজ জানি না। আয় বন্ধ, খরচ তো থেমে নেই,’বলছিলেন তিনি।
চার সন্তানের পড়াশোনা, সংসারের খরচ, সব মিলিয়ে দিশেহারা অবস্থা তার। ইতোমধ্যে প্রায় দুই লাখ টাকা ঋণ নিয়েছেন মহাজনের কাছ থেকে, পাশাপাশি এনজিওর কিস্তিও চালিয়ে যেতে হচ্ছে।
‘নিষেধাজ্ঞার সময় সরকারি সহায়তা শুরুতেই দরকার। আর ঋণের কিস্তি বন্ধ না হলে টিকে থাকা কঠিন,’যোগ করেন তিনি।
৪০ বছর বয়সী জেলে ফারুক মাঝির কণ্ঠেও একই হতাশা। সরকারি সহায়তা হিসেবে চাল পেলেও তা পর্যাপ্ত নয় বলে অভিযোগ তার।
‘৮০ কেজি চাল দেয়ার কথা, কিন্তু বাস্তবে কম পাই। আর চাল দিয়ে তো সব হয় না,তেল, ডাল, ওষুধ,সব লাগে,’বললেন তিনি।
তার মতে, অন্তত নগদ ৫ হাজার টাকা সহায়তা না পেলে এই সময়টা পার করা কঠিন।
‘ঋণ বাড়ছে, মাছ কমছে। তাই ভাবছি এই পেশা ছেড়ে রিকশা চালানো শিখবো,’বলতে গিয়ে কণ্ঠে ভেঙে পড়ার আভাস।
নিষেধাজ্ঞার প্রভাব শুধু জেলেদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়,এর ঢেউ লেগেছে পুরো উপকূলীয় অর্থনীতিতে।
মহিপুর মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের কর্মচারী কবির হোসেন বলেন,‘বাজারের সবকিছুর দাম বাড়তি। আয় না থাকলে সংসার চালানো যায় না। ধার করে চলতে হচ্ছে।’
আলীপুরের মৎস্য ব্যবসায়ী আবদুল জলিল ঘরামী জানান, জ্বালানি সংকটের ধাক্কা কাটতে না কাটতেই নিষেধাজ্ঞা শুরু হওয়ায় ব্যবসায়ীরাও চাপে পড়েছেন। ‘জেলেদের বাঁচিয়ে রাখতে অনেক সময় অগ্রিম দিতে হয়। কিন্তু সবারই সীমা আছে,’ বললেন তিনি।
জেলা মৎস্য অফিসের তথ্যমতে, পটুয়াখালীর আট উপজেলায় নিবন্ধিত কার্ডধারী জেলের সংখ্যা ৬৩ হাজার ১৫৫ জন। এর মধ্যে ৫৩ হাজার ৭৫০ জন ভিজিএফ সহায়তার আওতায় রয়েছেন।


জেলা মৎস্য কর্মকর্তা বিজন কুমার নন্দী জানান, নিষেধাজ্ঞা চলাকালীন প্রতিটি নিবন্ধিত জেলেকে পর্যায়ক্রমে ৭৭ কেজি করে চাল দেয়া হবে।
তিনি বলেন,‘নগদ সহায়তা বাড়ানোর প্রস্তাব ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে, যাতে জেলেরা নূন্যতম চাহিদা মেটাতে পারেন।’
প্রতি বছরই এই নিষেধাজ্ঞা আসে, আবার শেষও হয়। কিন্তু জেলেদের জীবনে জমতে থাকা ঋণ, অনিশ্চয়তা আর হতাশা যেন শেষ হয় না। সমুদ্রের মাছ রক্ষা পাচ্ছে,কিন্তু সেই সমুদ্রের ওপর নির্ভরশীল মানুষগুলো কি বেঁচে থাকছে নিশ্চিন্তে? উপকূলের নীরব ট্রলার আর অপেক্ষমাণ জেলেদের চোখে সেই প্রশ্নটাই এখন সবচেয়ে বড় হয়ে উঠেছে।