ঢাকা ০৭:৫৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬

মিষ্টি-ইশরাকের পর কে? সতর্ক হোন, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারে তারেক রহমানের আপোষ নেই

  • ডেস্ক রিপোর্ট
  • প্রকাশিত : ০৬:৪৮:৪৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬
  • ৪ বার দেখা হয়েছে

জুবাইয়া বিন্তে কবির: ক্ষমতা মানুষকে শুধু সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ দেয় না, নিজের সীমা চিনে নেওয়ার দায়িত্বও দেয়। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এই সত্যটি বারবার প্রমাণিত হয়েছে। আজ যখন দেশনায়ক তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার রাষ্ট্র পরিচালনা করছে, তখন প্রতিটি নেতাকর্মীর আচরণই সরকারের ভাবমূর্তির সাথে যুক্ত। একজন সাধারণ কর্মীর ভুল ব্যক্তিগত থাকে, কিন্তু একজন মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রীর ভুল পুরো সরকারের গায়ে লাগে। এই বোধ থেকেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কঠোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, যা নতুন বাংলাদেশের রাজনীতিতে জবাবদিহির এক নতুন অধ্যায়।

ক্ষমতার চেয়ারে বসা সহজ, কিন্তু সেই চেয়ারের মর্যাদা রক্ষা করা কঠিন। ইতিহাস সাক্ষী, বাংলাদেশে বহু সরকার এসেছে, ক্ষমতার দম্ভে অন্ধ হয়ে নিজের লোকের অপরাধকে প্রশ্রয় দিয়েছে, আর শেষ পর্যন্ত জনগণের ঘৃণা কুড়িয়ে বিদায় নিয়েছে। ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনামলে আমরা দেখেছি, একজন এমপির বিরুদ্ধে খুন, ধর্ষণ, লুটপাটের অভিযোগ উঠলেও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে ফোন করে তাকে বাঁচানো হতো। সেই অন্ধকার অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটেছে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে।
আর সেই অভ্যুত্থানের পর যে নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন নিয়ে ১৭ ফেব্রুয়ারি দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছেন দেশনায়ক তারেক রহমান, তাঁর প্রথম আট মাসের শাসনই বলে দিচ্ছে, এই বাংলাদেশ আর আগের বাংলাদেশ নয়। এই সরকার ব্যক্তির সরকার নয়, আদর্শের সরকার। আমরা যারা বিএনপি পরিবারের সন্তান, আমরা ছোটবেলা থেকে শুনে এসেছি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সেই অমর বাণী – “ব্যক্তির চেয়ে দল বড়, দলের চেয়ে দেশ বড়।” ১৯৭৮ সালে মাত্র ৪৭ বছর আগে যে দলটি তিনি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যার বয়স আজ ৪৭ বছর, যে দলটি ৯ বছর স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন করে, ১৭ বছর ফ্যাসিবাদ বিরোধী লড়াই করে আজ রাষ্ট্রক্ষমতায়, সেই দলের রক্তে আপোষহীনতা। দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া আমাদের শিখিয়েছেন, তিনবার প্রধানমন্ত্রী হয়েও, ৫ বছরেরও বেশি সময় কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে থেকেও কীভাবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে হয়। আর তাঁরই সুযোগ্য উত্তরসূরি, ৫ হাজারের অধিক মিথ্যা মামলা, ১৭ বছরের নির্বাসন, শারীরিক নির্যাতন সহ্য করা দেশনায়ক তারেক রহমান আজ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রমাণ করছেন, তাঁর কাছে ক্ষমতা ভোগের বস্তু নয়, জনগণের আমানত। গত ২৪ সেপ্টেম্বর মিরপুরের রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি স্বাস্থ্যকেন্দ্রের মতো বছরে ৩০ হাজার দরিদ্র মায়ের সেবা দেওয়া প্রতিষ্ঠানে হামলার অভিযোগে সংরক্ষিত আসনের এমপি ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি এবং ১৭ অক্টোবর গেন্ডারিয়ায় মাদকবিরোধী অভিযানে সমন্বয়হীনভাবে আগ্নেয়াস্ত্র হাতে অংশ নেওয়ার অভিযোগে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার ইশরাক হোসেন – পরপর দুইজন জনপ্রতিনিধিকে ৭ দিনের ব্যবধানে পদত্যাগে বাধ্য করার মধ্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশের ৫৪ বছরের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন। এই প্রতিবেদন কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে বিদ্বেষ নয়, এই প্রতিবেদন হলো একটি সতর্কবার্তার দলিল।

তারেক রহমান স্পষ্ট করে দিয়েছেন, তাঁর মন্ত্রিসভায় থাকতে হলে শহীদ জিয়ার সততা, খালেদা জিয়ার আপোষহীনতা এবং ৩১ দফার জবাবদিহি – এই তিন মন্ত্রে দীক্ষিত হতে হবে। যারা পারবেন না, তাদের জন্য এই মন্ত্রিসভায় কোনো জায়গা নেই। প্রশ্ন তাই এখন একটাই, মিষ্টি-ইশরাকের পর কে? সতর্ক হোন, কারণ দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারে দেশনায়কের কোনো আপোষ নেই।

শহীদ জিয়ার আদর্শ: ক্ষমতার চেয়ে আদর্শ বড় : আমাদের প্রেরণার উৎস শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। তিনি ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সিপাহী-জনতার বিপ্লবের মাধ্যমে জাতিকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল- বিএনপি। তাঁর ১৯ দফা কর্মসূচি ছিল আত্মনির্ভর বাংলাদেশের রূপরেখা। তিনি বলতেন, “ব্যক্তির চেয়ে দল বড়, দলের চেয়ে দেশ বড়।” তাঁর মন্ত্রিসভার কোনো সদস্য দুর্নীতি বা ক্ষমতার অপব্যবহার করলে তিনি এক মুহূর্তও সহ্য করতেন না। সেই জিয়ার আদর্শের ধারাবাহিকতাই আজ আমরা তারেক রহমানের মধ্যে দেখতে পাচ্ছি। একজন বিএনপি পরিবারের সন্তান হিসেবে আমি গর্ববোধ করি যে, আমাদের নেতা ক্ষমতার লোভে নয়, আদর্শের প্রশ্নে আপোষহীন।

দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার আপোষহীন শিক্ষা :
আপোষহীন দেশনেত্রী মরহুমা বেগম খালেদা জিয়া আমাদের শিখিয়েছেন, জনগণের ভালোবাসার চেয়ে বড় কোনো শক্তি নেই। ১৯৮২ থেকে ১৯৯০ পর্যন্ত নয় বছর স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে রাজপথে লড়াই, তিনবারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে রাষ্ট্র পরিচালনা, এবং ১/১১ থেকে শুরু করে বিগত ফ্যাসিবাদী আমলে বছরের পর বছর কারাবরণ ও মিথ্যা মামলার নির্যাতন সহ্য করেও তিনি কখনো মাথা নত করেননি। ১৯৯১-৯৬ এবং ২০০১-২০০৬ মেয়াদে তাঁর সরকার প্রমাণ করেছে, বিএনপি ক্ষমতায় এলে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। তিনি নিজের দলের লোক হলেও অনিয়ম করলে ছাড় দেননি। সেই আপোষহীনতার শিক্ষাই আজ তাঁর সুযোগ্য পুত্র দেশনায়ক তারেক রহমানের রক্তে প্রবাহিত।

দেশনায়ক তারেক রহমান: বদলে যাওয়া বাংলাদেশের রূপকার : দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসিত জীবন, ৫ হাজারেরও বেশি মিথ্যা মামলা, শারীরিক নির্যাতন সহ্য করেও তারেক রহমান বাংলাদেশের গণতন্ত্রের প্রশ্নে অবিচল ছিলেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর তিনি জাতিকে যে ‘রাষ্ট্র মেরামতের ৩১ দফা’ দিয়েছেন, তার মূল কথাই হলো জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র। ১৭ ফেব্রুয়ারি দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠনের পর মাত্র আট মাসে তিনি প্রমাণ করেছেন, তিনি শুধু বিএনপির নেতা নন, পুরো জাতির প্রধানমন্ত্রী। তাঁর সকাল ৯টা ১০ মিনিট থেকে দুপুর ১টা ৪১ মিনিট পর্যন্ত রাজধানীর ১৩টি স্থানে আকস্মিক পরিদর্শন, হাসপাতালের নোংরা পরিবেশ দেখে ৭ দিনের আল্টিমেটাম দেওয়া, এগুলো প্রমাণ করে তিনি অফিসে বসে রিপোর্ট পড়া প্রধানমন্ত্রী নন, তিনি মাঠের প্রধানমন্ত্রী।

মিষ্টির ঘটনা: প্রথম কঠোর বার্তা : গত ২৪ সেপ্টেম্বর মিরপুরের রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ছিল অত্যন্ত দুঃখজনক। নিম্ন আয়ের মায়েদের স্বাস্থ্যসেবার এই কেন্দ্রটি বছরে প্রায় ৩০ হাজার মানুষকে সেবা দেয়। সেখানে সংরক্ষিত নারী আসনের এমপি ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির নাম আসার সাথে সাথেই প্রধানমন্ত্রী কোনো কালক্ষেপণ করেননি। তদন্ত চলমান থাকা অবস্থাতেই ১ অক্টোবর তাঁকে স্পিকার বরাবর পদত্যাগপত্র জমা দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়। তিনি অভিযোগ অস্বীকার করলেও প্রধানমন্ত্রী বুঝিয়ে দিয়েছেন, বিএনপিতে অভিযোগ উঠলেই ব্যবস্থা, প্রমাণের অপেক্ষায় বসে থেকে দলের ভাবমূর্তি নষ্ট করা হবে না। এটাই হলো জবাবদিহি।

ইশরাকের বিদায়: দ্বিতীয় এবং আরও স্পষ্ট বার্তা :
গেন্ডারিয়ার ঘটনা ছিল আরও স্পর্শকাতর। ১৭ অক্টোবর মাদকবিরোধী অভিযানে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার ইশরাক হোসেনের আগ্নেয়াস্ত্র হাতে উপস্থিতির ভিডিও ভাইরাল হয়। তাঁর উদ্দেশ্য মহৎ ছিল, মাদক নির্মূল। কিন্তু পদ্ধতি ছিল ভুল। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, সমন্বয় ছাড়াই এই অভিযান হয়েছে। একজন প্রতিমন্ত্রী অস্ত্র হাতে অভিযান চালাতে পারেন না, আইন তা সমর্থন করে না। অস্ত্র আইন ১৮৭৮ অনুযায়ী লাইসেন্স থাকা মানে জনসমক্ষে প্রদর্শন নয়। প্রধানমন্ত্রী ১৮ অক্টোবর রাতেই তাঁকে ডেকে পদত্যাগের নির্দেশ দেন এবং ১৯ অক্টোবর জাতীয় প্রেসক্লাবে তিনি পদত্যাগ করেন। দুই দিনের মধ্যে সিদ্ধান্ত, এটাই তারেক রহমানের স্টাইল।

ইশরাক হোসেন: সম্ভাবনা ও পরিণতিবোধের ঘাটতি : ইশরাক হোসেনের বয়স ৩৯ বছর। তিনি শহীদ মুক্তিযোদ্ধা সাদেক হোসেন খোকার সন্তান। খোকা ভাই অবিভক্ত ঢাকার শেষ মেয়র, সাবেক মন্ত্রী। ২০১৮ সালে ইশরাক রাজনীতিতে সক্রিয় হন, ২০২০ সালে ঢাকা দক্ষিণে মেয়র প্রার্থী হন, ২০২৫ সালের ২৭ মার্চ ট্রাইব্যুনাল তাঁকে মেয়র ঘোষণা করে। ঢাকা-৬ থেকে ২০২৬ সালে এমপি নির্বাচিত হয়ে প্রতিমন্ত্রী হন। তাঁর রাজনৈতিক উত্থান দ্রুত হয়েছে। কিন্তু দ্রুত উত্থানের সাথে যে পরিমিতিবোধ, আইনের প্রতি শ্রদ্ধা থাকা দরকার, সেখানে ঘাটতি ছিল। নগর ভবন ঘেরাও করে নাগরিক সেবা বন্ধ করা থেকে শুরু করে জাতীয় স্মৃতিসৌধে তিন বাহিনীর প্রধানের সাথে স্যালুট দেওয়া, এসব ঘটনাই তাঁর আবেগ বেশি, প্রজ্ঞা কম, তা প্রমাণ করে।

রাজনীতিতে অস্ত্র নয়, আদর্শই শক্তি : বিএনপি কখনো অস্ত্রের রাজনীতি করে না। শহীদ জিয়া অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছেন, কিন্তু রাজনীতিতে তিনি কলম ও আদর্শকে শক্তি বানিয়েছেন। তারেক রহমানও বারবার বলেছেন, “জনগণের ভালোবাসাই আমাদের অস্ত্র।” একজন প্রতিমন্ত্রী যখন অস্ত্র হাতে অভিযানে যান, তখন রাষ্ট্রের পুলিশ, র‍্যাব, বিজিবির চেইন অব কমান্ড প্রশ্নবিদ্ধ হয়। মাদক নির্মূল করতে হলে প্রয়োজন সামাজিক আন্দোলন, পুলিশকে সক্রিয় করা, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী দেশে প্রায় ৭০ লক্ষ মাদকাসক্ত, যাদের ৮০ ভাগই তরুণ। এই লড়াই অস্ত্র উঁচিয়ে জেতা যাবে না, জিততে হবে নীতি দিয়ে।

আট মাসের সরকারের জন্য বড় পরীক্ষা : বিএনপি সরকারের বয়স মাত্র আট মাস। এই আট মাসে দেশের মানুষ দেখেছে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে ১০টি উদ্যোগ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতিতে ৩৫% মামলা নিষ্পত্তির হার বৃদ্ধি। কিন্তু দুজন জনপ্রতিনিধির পদত্যাগ সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জও। বিরোধী দল আওয়ামী লীগের পতনের পর ১৮ বছর পর বিএনপি ক্ষমতায় এসেছে, মানুষের প্রত্যাশা আকাশচুম্বী। মানুষ চায়, বিএনপি আগের মতো নয়, নতুন বিএনপি। তারেক রহমানের কঠোরতা সেই নতুনত্বের প্রমাণ। তিনি বুঝিয়ে দিচ্ছেন, ৩১ দফার প্রথম দফাই হলো, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স।

পদত্যাগ মানে অপরাধ প্রমাণ নয়, রাজনৈতিক দায় :
এখানে একটি আইনি বিষয় পরিষ্কার করা দরকার। মিষ্টি বা ইশরাকের পদত্যাগ মানে তাঁরা ফৌজদারি অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন, তা নয়। রাজনৈতিক দায় এবং ফৌজদারি দায় এক নয়। রাজনৈতিক দায় হলো, আপনার আচরণে সরকার বিব্রত। ফৌজদারি দায় নির্ধারণ করবে আদালত। প্রধানমন্ত্রী রাজনৈতিক দায়ে পদত্যাগ করিয়েছেন, কিন্তু আইনি তদন্ত চলবে। এটাই নিয়মভিত্তিক রাষ্ট্রের লক্ষণ। আওয়ামী লীগের আমলে দেখেছি, এমপি-মন্ত্রীরা খুন করেও বহাল থাকত। বিএনপি সেই সংস্কৃতি ভাঙছে।

৩৪২ কোটি টাকার ট্যাবলেট ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রশ্ন :
সম্প্রতি ফ্যামিলি কার্ডের জন্য ৩৪২ কোটি টাকার ট্যাবলেট কেনার অভিযোগ উঠেছে। জাতীয় নাগরিক পার্টির নেতা হাসনাত আবদুল্লাহ অভিযোগ করেছেন, স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুলের ভাতিজার প্রতিষ্ঠান বুরাক ব্রেক লিমিটেডকে কাজ দিতে নৌবাহিনীর ডকইয়ার্ড অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কসকে ব্যবহার করা হয়েছে। ২৪ আগস্টের চুক্তি নিয়ে একটি ইংরেজি দৈনিকে অনুসন্ধানী প্রতিবেদনও এসেছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেছেন, তিনি জানেন না। একজন বিএনপি পরিবারের সন্তান হিসেবে আমার দাবি, এই অভিযোগেরও নিরপেক্ষ তদন্ত হোক। তারেক রহমান যদি এই ক্ষেত্রেও একই কঠোরতা দেখান, তবে জনগণের আস্থা আরও বাড়বে।

মন্ত্রিসভার রদবদল: দায়িত্ব চিরস্থায়ী নয় : গত ২১-২২ আগস্ট তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপনকে সরিয়ে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা করা এবং আন্দালিব রহমান পার্থকে তথ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া প্রমাণ করে, বিএনপি সরকারে পদ কোনো পুরস্কার নয়, দায়িত্ব। ভালো করলে থাকবেন, খারাপ করলে সরতে হবে। এই বার্তাটি ছাত্রদল, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, মহিলা দল, কৃষক দল, শ্রমিক দল, ওলামা দল সহ সকল অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের জন্য প্রযোজ্য।

প্রশাসনের প্রতি বার্তা: জনগণের সেবক হোন : প্রধানমন্ত্রীর ১৩টি স্থানে আকস্মিক সফর শুধু মন্ত্রীদের জন্য বার্তা নয়, প্রশাসনের জন্যও বার্তা। কুয়েত-বাংলাদেশ মৈত্রী হাসপাতালে গিয়ে তিনি যে নোংরা পরিবেশ দেখেছেন, আজিমপুর সরকারি কলোনিতে যে অব্যবস্থা দেখেছেন, তা ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদের জঞ্জাল। তিনি ৭ দিন ও ১৪ দিনের সময় বেঁধে দিয়েছেন। এর অর্থ হলো, বিএনপি সরকার ফাইলে নয়, মাঠে বিশ্বাস করে। ডিসি, এসপি, সচিব, সবার জন্য বার্তা পরিষ্কার, জনগণকে সেবা দিন, নইলে ব্যবস্থা।

বিএনপি কর্মী হিসেবে আমাদের শিক্ষা – ১: সংযম
আমি নিজে একজন বিএনপি পরিবারের সন্তান। আমার বাবা, চাচা, ফুপি, ভাইরা বিএনপি করেন, জেল খেটেছেন। সেই পরিবার থেকে বলছি, ইশরাক ও মিষ্টির ঘটনা থেকে আমাদের প্রথম শিক্ষা হলো সংযম। ক্ষমতা পেয়ে উল্লাস নয়, বিনয়ী হতে হবে। শহীদ জিয়া বলতেন, ক্ষমতার চেয়ারে বসলে মাটির দিকে তাকাও। শিক্ষা – ২: আইনকে সম্মান : দ্বিতীয় শিক্ষা হলো, আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নই। আমার হাতে লাইসেন্স করা অস্ত্র থাকলেও আমি আইন হাতে তুলে নিতে পারি না। পুলিশকে খবর দেব, প্রশাসনকে সক্রিয় করব। নিজে নায়ক সাজতে গিয়ে দলকে ভিলেন বানাব না। শিক্ষা – ৩: দল বড়, ব্যক্তি নয় : তৃতীয় শিক্ষা, দল বড়, ব্যক্তি নয়। ইশরাক ভাই ফেসবুকে লিখেছেন, “মন্ত্রী নয়, মাদক নির্মূল!” এই স্লোগানটি সুন্দর। কিন্তু মন্ত্রী থাকা অবস্থায় দলকে বিব্রত করা যাবে না। পদত্যাগ করে দলকে বাঁচানোই বড় নেতার কাজ। এই ত্যাগের মানসিকতাই বিএনপিকে ৪৭ বছর টিকিয়ে রেখেছে। শিক্ষা – ৪: সোশ্যাল মিডিয়ায় দায়িত্বশীলতা : চতুর্থ শিক্ষা, সোশ্যাল মিডিয়ায় দায়িত্বশীল হতে হবে। আজকের যুগে একটি ভিডিও ১০ মিনিটে ১০ লাখ মানুষের কাছে চলে যায়। তাই কোনো কর্মসূচিতে যাওয়ার আগে ভাবতে হবে, এটি ভাইরাল হলে দলের কী হবে। তারেক রহমান নিজে ডিজিটাল বাংলাদেশের কথা বলেন, কিন্তু ডিজিটাল শৃঙ্খলার কথাও বলেন। শিক্ষা – ৫: জনগণের পালস বোঝা : পঞ্চম ও সবচেয়ে বড় শিক্ষা, জনগণের পালস বোঝা। ‘২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানের পর মানুষ এখন সরকারকে প্রশ্ন করতে শিখেছে। ইশরাকের পদত্যাগ হয়েছে পিপলস পালস ও মিডিয়ার পালসের কারণে।’ তারেক রহমান সেই পালস বুঝেছেন বলেই দ্রুত ব্যবস্থা নিয়েছেন। এটাই গণতন্ত্রের স্পিরিট।

পরিশেষে বলতে চাই, শেষ বিচারে রাজনীতি হলো মানুষের জন্য কাজ করার নাম। অস্ত্র উঁচিয়ে, পেশী দেখিয়ে, হাসপাতাল ভেঙে কিংবা ফুটপাতে ত্রাস সৃষ্টি করে নেতা হওয়া যায় না। নেতা হতে হয় মানুষের হৃদয় জয় করে। শহীদ জিয়াউর রহমান ১৯ দফা দিয়ে মানুষের হৃদয় জয় করেছিলেন, দেশনেত্রী খালেদা জিয়া ৩ বার গণতন্ত্র ফিরিয়ে দিয়ে মানুষের হৃদয় জয় করেছিলেন, আর দেশনায়ক তারেক রহমান ৩১ দফা রাষ্ট্র মেরামতের রূপরেখা এবং জিরো টলারেন্স নীতি দিয়ে মানুষের হৃদয় জয় করছেন।

পরিসংখ্যান বলে, বাংলাদেশে বর্তমানে ৭০ লক্ষ মাদকাসক্ত, যার ৮০ ভাগ তরুণ। প্রতি বছর সরকারি ক্রয়ে প্রায় ২ লক্ষ কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। ১৬ বছরে ফ্যাসিবাদী আমলে ১১ লক্ষ কোটি টাকা পাচার হয়েছে। এই ভয়াবহ বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে একজন প্রধানমন্ত্রী যখন ৩৪২ কোটি টাকার ট্যাবলেট কেনার অভিযোগ ওঠার সাথে সাথেই তদন্তের নির্দেশ দেন, যখন তিনি নিজে সকাল ৯টা ১০ মিনিটে বেরিয়ে সাড়ে চার ঘণ্টায় ১৩টি হাসপাতাল, স্কুল, কলোনি পরিদর্শন করে ৭ দিনের আল্টিমেটাম দেন, তখন বুঝতে হবে, এই প্রধানমন্ত্রী গতানুগতিক নন। ইশরাক হোসেন এবং ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির পদত্যাগ আমাদের জন্য লজ্জার নয়, আমাদের জন্য গর্বের। কারণ বিশ্বকে আমরা দেখাতে পারছি, বিএনপি ভুল করলে ভুল স্বীকার করে। বিএনপি নিজের লোককে শাস্তি দিতে দ্বিধা করে না। আওয়ামী লীগের মতো নিজের এমপি খুন করলেও তাকে বাঁচাতে সংসদে দাঁড়িয়ে মিথ্যা বলে না। এটাই শহীদ জিয়ার বিএনপি আর শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগের মধ্যে পার্থক্য। একজন বিএনপি পরিবারের সন্তান হিসেবে, একজন অর্থনীতিবিদ ও কলামিস্ট হিসেবে আমি বিশ্বাস করি, তারেক রহমানের এই কঠোরতা সাময়িক কোনো কৌশল নয়, এটি একটি দর্শন। এই দর্শনের নাম হলো – জবাবদিহিমূলক গণতন্ত্র। যেখানে প্রধানমন্ত্রীও জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য, যেখানে মন্ত্রীও ভুল করলে পদত্যাগ করতে বাধ্য। তাই ছাত্রদল, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, মহিলা দল, শ্রমিক দল, কৃষক দল, ওলামা দল সহ বিএনপির প্রতিটি অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের প্রতিটি নেতাকর্মীর প্রতি আমার আহ্বান – আসুন, আমরা দেশনায়ক তারেক রহমানের এই বার্তাকে হৃদয়ে ধারণ করি। মনে রাখি, আমাদের পরিচয় এমপি-মন্ত্রী নয়, আমাদের পরিচয় আমরা শহীদ জিয়ার সৈনিক, আমরা খালেদা জিয়ার কর্মী, আমরা তারেক রহমানের সহযোদ্ধা। ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়, আজ আছে কাল নেই। কিন্তু তারেক রহমানের মতো একজন সৎ, আপোষহীন, জবাবদিহিমূলক নেতার নেতৃত্বে যদি আমরা নিজেদের শুধরে নিতে পারি, তবে বাংলাদেশের ১৮ কোটি মানুষের ভালোবাসা চিরস্থায়ী হবে। মিষ্টি-ইশরাকের পর আর কাউকে যেন পদত্যাগ করতে না হয়, সেই সতর্কতাই হোক আমাদের আগামী দিনের শপথ। মনে রাখবেন, দেশনায়ক তারেক রহমান দেখছেন, জনগণ দেখছে, ইতিহাস দেখছে। দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারে তাঁর কোনো আপোষ নেই, ছিল না, ভবিষ্যতেও থাকবে না।

লেখক : জুবাইয়া বিন্তে কবির
অর্থনীতিবিদ, গবেষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট

জনপ্রিয় সংবাদ

মিষ্টি-ইশরাকের পর কে? সতর্ক হোন, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারে তারেক রহমানের আপোষ নেই

মিষ্টি-ইশরাকের পর কে? সতর্ক হোন, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারে তারেক রহমানের আপোষ নেই

প্রকাশিত : ০৬:৪৮:৪৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬

জুবাইয়া বিন্তে কবির: ক্ষমতা মানুষকে শুধু সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ দেয় না, নিজের সীমা চিনে নেওয়ার দায়িত্বও দেয়। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এই সত্যটি বারবার প্রমাণিত হয়েছে। আজ যখন দেশনায়ক তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার রাষ্ট্র পরিচালনা করছে, তখন প্রতিটি নেতাকর্মীর আচরণই সরকারের ভাবমূর্তির সাথে যুক্ত। একজন সাধারণ কর্মীর ভুল ব্যক্তিগত থাকে, কিন্তু একজন মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রীর ভুল পুরো সরকারের গায়ে লাগে। এই বোধ থেকেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কঠোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, যা নতুন বাংলাদেশের রাজনীতিতে জবাবদিহির এক নতুন অধ্যায়।

ক্ষমতার চেয়ারে বসা সহজ, কিন্তু সেই চেয়ারের মর্যাদা রক্ষা করা কঠিন। ইতিহাস সাক্ষী, বাংলাদেশে বহু সরকার এসেছে, ক্ষমতার দম্ভে অন্ধ হয়ে নিজের লোকের অপরাধকে প্রশ্রয় দিয়েছে, আর শেষ পর্যন্ত জনগণের ঘৃণা কুড়িয়ে বিদায় নিয়েছে। ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনামলে আমরা দেখেছি, একজন এমপির বিরুদ্ধে খুন, ধর্ষণ, লুটপাটের অভিযোগ উঠলেও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে ফোন করে তাকে বাঁচানো হতো। সেই অন্ধকার অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটেছে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে।
আর সেই অভ্যুত্থানের পর যে নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন নিয়ে ১৭ ফেব্রুয়ারি দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছেন দেশনায়ক তারেক রহমান, তাঁর প্রথম আট মাসের শাসনই বলে দিচ্ছে, এই বাংলাদেশ আর আগের বাংলাদেশ নয়। এই সরকার ব্যক্তির সরকার নয়, আদর্শের সরকার। আমরা যারা বিএনপি পরিবারের সন্তান, আমরা ছোটবেলা থেকে শুনে এসেছি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সেই অমর বাণী – “ব্যক্তির চেয়ে দল বড়, দলের চেয়ে দেশ বড়।” ১৯৭৮ সালে মাত্র ৪৭ বছর আগে যে দলটি তিনি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যার বয়স আজ ৪৭ বছর, যে দলটি ৯ বছর স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন করে, ১৭ বছর ফ্যাসিবাদ বিরোধী লড়াই করে আজ রাষ্ট্রক্ষমতায়, সেই দলের রক্তে আপোষহীনতা। দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া আমাদের শিখিয়েছেন, তিনবার প্রধানমন্ত্রী হয়েও, ৫ বছরেরও বেশি সময় কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে থেকেও কীভাবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে হয়। আর তাঁরই সুযোগ্য উত্তরসূরি, ৫ হাজারের অধিক মিথ্যা মামলা, ১৭ বছরের নির্বাসন, শারীরিক নির্যাতন সহ্য করা দেশনায়ক তারেক রহমান আজ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রমাণ করছেন, তাঁর কাছে ক্ষমতা ভোগের বস্তু নয়, জনগণের আমানত। গত ২৪ সেপ্টেম্বর মিরপুরের রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি স্বাস্থ্যকেন্দ্রের মতো বছরে ৩০ হাজার দরিদ্র মায়ের সেবা দেওয়া প্রতিষ্ঠানে হামলার অভিযোগে সংরক্ষিত আসনের এমপি ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি এবং ১৭ অক্টোবর গেন্ডারিয়ায় মাদকবিরোধী অভিযানে সমন্বয়হীনভাবে আগ্নেয়াস্ত্র হাতে অংশ নেওয়ার অভিযোগে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার ইশরাক হোসেন – পরপর দুইজন জনপ্রতিনিধিকে ৭ দিনের ব্যবধানে পদত্যাগে বাধ্য করার মধ্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশের ৫৪ বছরের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন। এই প্রতিবেদন কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে বিদ্বেষ নয়, এই প্রতিবেদন হলো একটি সতর্কবার্তার দলিল।

তারেক রহমান স্পষ্ট করে দিয়েছেন, তাঁর মন্ত্রিসভায় থাকতে হলে শহীদ জিয়ার সততা, খালেদা জিয়ার আপোষহীনতা এবং ৩১ দফার জবাবদিহি – এই তিন মন্ত্রে দীক্ষিত হতে হবে। যারা পারবেন না, তাদের জন্য এই মন্ত্রিসভায় কোনো জায়গা নেই। প্রশ্ন তাই এখন একটাই, মিষ্টি-ইশরাকের পর কে? সতর্ক হোন, কারণ দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারে দেশনায়কের কোনো আপোষ নেই।

শহীদ জিয়ার আদর্শ: ক্ষমতার চেয়ে আদর্শ বড় : আমাদের প্রেরণার উৎস শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। তিনি ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সিপাহী-জনতার বিপ্লবের মাধ্যমে জাতিকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল- বিএনপি। তাঁর ১৯ দফা কর্মসূচি ছিল আত্মনির্ভর বাংলাদেশের রূপরেখা। তিনি বলতেন, “ব্যক্তির চেয়ে দল বড়, দলের চেয়ে দেশ বড়।” তাঁর মন্ত্রিসভার কোনো সদস্য দুর্নীতি বা ক্ষমতার অপব্যবহার করলে তিনি এক মুহূর্তও সহ্য করতেন না। সেই জিয়ার আদর্শের ধারাবাহিকতাই আজ আমরা তারেক রহমানের মধ্যে দেখতে পাচ্ছি। একজন বিএনপি পরিবারের সন্তান হিসেবে আমি গর্ববোধ করি যে, আমাদের নেতা ক্ষমতার লোভে নয়, আদর্শের প্রশ্নে আপোষহীন।

দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার আপোষহীন শিক্ষা :
আপোষহীন দেশনেত্রী মরহুমা বেগম খালেদা জিয়া আমাদের শিখিয়েছেন, জনগণের ভালোবাসার চেয়ে বড় কোনো শক্তি নেই। ১৯৮২ থেকে ১৯৯০ পর্যন্ত নয় বছর স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে রাজপথে লড়াই, তিনবারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে রাষ্ট্র পরিচালনা, এবং ১/১১ থেকে শুরু করে বিগত ফ্যাসিবাদী আমলে বছরের পর বছর কারাবরণ ও মিথ্যা মামলার নির্যাতন সহ্য করেও তিনি কখনো মাথা নত করেননি। ১৯৯১-৯৬ এবং ২০০১-২০০৬ মেয়াদে তাঁর সরকার প্রমাণ করেছে, বিএনপি ক্ষমতায় এলে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। তিনি নিজের দলের লোক হলেও অনিয়ম করলে ছাড় দেননি। সেই আপোষহীনতার শিক্ষাই আজ তাঁর সুযোগ্য পুত্র দেশনায়ক তারেক রহমানের রক্তে প্রবাহিত।

দেশনায়ক তারেক রহমান: বদলে যাওয়া বাংলাদেশের রূপকার : দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসিত জীবন, ৫ হাজারেরও বেশি মিথ্যা মামলা, শারীরিক নির্যাতন সহ্য করেও তারেক রহমান বাংলাদেশের গণতন্ত্রের প্রশ্নে অবিচল ছিলেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর তিনি জাতিকে যে ‘রাষ্ট্র মেরামতের ৩১ দফা’ দিয়েছেন, তার মূল কথাই হলো জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র। ১৭ ফেব্রুয়ারি দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠনের পর মাত্র আট মাসে তিনি প্রমাণ করেছেন, তিনি শুধু বিএনপির নেতা নন, পুরো জাতির প্রধানমন্ত্রী। তাঁর সকাল ৯টা ১০ মিনিট থেকে দুপুর ১টা ৪১ মিনিট পর্যন্ত রাজধানীর ১৩টি স্থানে আকস্মিক পরিদর্শন, হাসপাতালের নোংরা পরিবেশ দেখে ৭ দিনের আল্টিমেটাম দেওয়া, এগুলো প্রমাণ করে তিনি অফিসে বসে রিপোর্ট পড়া প্রধানমন্ত্রী নন, তিনি মাঠের প্রধানমন্ত্রী।

মিষ্টির ঘটনা: প্রথম কঠোর বার্তা : গত ২৪ সেপ্টেম্বর মিরপুরের রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ছিল অত্যন্ত দুঃখজনক। নিম্ন আয়ের মায়েদের স্বাস্থ্যসেবার এই কেন্দ্রটি বছরে প্রায় ৩০ হাজার মানুষকে সেবা দেয়। সেখানে সংরক্ষিত নারী আসনের এমপি ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির নাম আসার সাথে সাথেই প্রধানমন্ত্রী কোনো কালক্ষেপণ করেননি। তদন্ত চলমান থাকা অবস্থাতেই ১ অক্টোবর তাঁকে স্পিকার বরাবর পদত্যাগপত্র জমা দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়। তিনি অভিযোগ অস্বীকার করলেও প্রধানমন্ত্রী বুঝিয়ে দিয়েছেন, বিএনপিতে অভিযোগ উঠলেই ব্যবস্থা, প্রমাণের অপেক্ষায় বসে থেকে দলের ভাবমূর্তি নষ্ট করা হবে না। এটাই হলো জবাবদিহি।

ইশরাকের বিদায়: দ্বিতীয় এবং আরও স্পষ্ট বার্তা :
গেন্ডারিয়ার ঘটনা ছিল আরও স্পর্শকাতর। ১৭ অক্টোবর মাদকবিরোধী অভিযানে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার ইশরাক হোসেনের আগ্নেয়াস্ত্র হাতে উপস্থিতির ভিডিও ভাইরাল হয়। তাঁর উদ্দেশ্য মহৎ ছিল, মাদক নির্মূল। কিন্তু পদ্ধতি ছিল ভুল। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, সমন্বয় ছাড়াই এই অভিযান হয়েছে। একজন প্রতিমন্ত্রী অস্ত্র হাতে অভিযান চালাতে পারেন না, আইন তা সমর্থন করে না। অস্ত্র আইন ১৮৭৮ অনুযায়ী লাইসেন্স থাকা মানে জনসমক্ষে প্রদর্শন নয়। প্রধানমন্ত্রী ১৮ অক্টোবর রাতেই তাঁকে ডেকে পদত্যাগের নির্দেশ দেন এবং ১৯ অক্টোবর জাতীয় প্রেসক্লাবে তিনি পদত্যাগ করেন। দুই দিনের মধ্যে সিদ্ধান্ত, এটাই তারেক রহমানের স্টাইল।

ইশরাক হোসেন: সম্ভাবনা ও পরিণতিবোধের ঘাটতি : ইশরাক হোসেনের বয়স ৩৯ বছর। তিনি শহীদ মুক্তিযোদ্ধা সাদেক হোসেন খোকার সন্তান। খোকা ভাই অবিভক্ত ঢাকার শেষ মেয়র, সাবেক মন্ত্রী। ২০১৮ সালে ইশরাক রাজনীতিতে সক্রিয় হন, ২০২০ সালে ঢাকা দক্ষিণে মেয়র প্রার্থী হন, ২০২৫ সালের ২৭ মার্চ ট্রাইব্যুনাল তাঁকে মেয়র ঘোষণা করে। ঢাকা-৬ থেকে ২০২৬ সালে এমপি নির্বাচিত হয়ে প্রতিমন্ত্রী হন। তাঁর রাজনৈতিক উত্থান দ্রুত হয়েছে। কিন্তু দ্রুত উত্থানের সাথে যে পরিমিতিবোধ, আইনের প্রতি শ্রদ্ধা থাকা দরকার, সেখানে ঘাটতি ছিল। নগর ভবন ঘেরাও করে নাগরিক সেবা বন্ধ করা থেকে শুরু করে জাতীয় স্মৃতিসৌধে তিন বাহিনীর প্রধানের সাথে স্যালুট দেওয়া, এসব ঘটনাই তাঁর আবেগ বেশি, প্রজ্ঞা কম, তা প্রমাণ করে।

রাজনীতিতে অস্ত্র নয়, আদর্শই শক্তি : বিএনপি কখনো অস্ত্রের রাজনীতি করে না। শহীদ জিয়া অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছেন, কিন্তু রাজনীতিতে তিনি কলম ও আদর্শকে শক্তি বানিয়েছেন। তারেক রহমানও বারবার বলেছেন, “জনগণের ভালোবাসাই আমাদের অস্ত্র।” একজন প্রতিমন্ত্রী যখন অস্ত্র হাতে অভিযানে যান, তখন রাষ্ট্রের পুলিশ, র‍্যাব, বিজিবির চেইন অব কমান্ড প্রশ্নবিদ্ধ হয়। মাদক নির্মূল করতে হলে প্রয়োজন সামাজিক আন্দোলন, পুলিশকে সক্রিয় করা, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী দেশে প্রায় ৭০ লক্ষ মাদকাসক্ত, যাদের ৮০ ভাগই তরুণ। এই লড়াই অস্ত্র উঁচিয়ে জেতা যাবে না, জিততে হবে নীতি দিয়ে।

আট মাসের সরকারের জন্য বড় পরীক্ষা : বিএনপি সরকারের বয়স মাত্র আট মাস। এই আট মাসে দেশের মানুষ দেখেছে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে ১০টি উদ্যোগ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতিতে ৩৫% মামলা নিষ্পত্তির হার বৃদ্ধি। কিন্তু দুজন জনপ্রতিনিধির পদত্যাগ সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জও। বিরোধী দল আওয়ামী লীগের পতনের পর ১৮ বছর পর বিএনপি ক্ষমতায় এসেছে, মানুষের প্রত্যাশা আকাশচুম্বী। মানুষ চায়, বিএনপি আগের মতো নয়, নতুন বিএনপি। তারেক রহমানের কঠোরতা সেই নতুনত্বের প্রমাণ। তিনি বুঝিয়ে দিচ্ছেন, ৩১ দফার প্রথম দফাই হলো, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স।

পদত্যাগ মানে অপরাধ প্রমাণ নয়, রাজনৈতিক দায় :
এখানে একটি আইনি বিষয় পরিষ্কার করা দরকার। মিষ্টি বা ইশরাকের পদত্যাগ মানে তাঁরা ফৌজদারি অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন, তা নয়। রাজনৈতিক দায় এবং ফৌজদারি দায় এক নয়। রাজনৈতিক দায় হলো, আপনার আচরণে সরকার বিব্রত। ফৌজদারি দায় নির্ধারণ করবে আদালত। প্রধানমন্ত্রী রাজনৈতিক দায়ে পদত্যাগ করিয়েছেন, কিন্তু আইনি তদন্ত চলবে। এটাই নিয়মভিত্তিক রাষ্ট্রের লক্ষণ। আওয়ামী লীগের আমলে দেখেছি, এমপি-মন্ত্রীরা খুন করেও বহাল থাকত। বিএনপি সেই সংস্কৃতি ভাঙছে।

৩৪২ কোটি টাকার ট্যাবলেট ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রশ্ন :
সম্প্রতি ফ্যামিলি কার্ডের জন্য ৩৪২ কোটি টাকার ট্যাবলেট কেনার অভিযোগ উঠেছে। জাতীয় নাগরিক পার্টির নেতা হাসনাত আবদুল্লাহ অভিযোগ করেছেন, স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুলের ভাতিজার প্রতিষ্ঠান বুরাক ব্রেক লিমিটেডকে কাজ দিতে নৌবাহিনীর ডকইয়ার্ড অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কসকে ব্যবহার করা হয়েছে। ২৪ আগস্টের চুক্তি নিয়ে একটি ইংরেজি দৈনিকে অনুসন্ধানী প্রতিবেদনও এসেছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেছেন, তিনি জানেন না। একজন বিএনপি পরিবারের সন্তান হিসেবে আমার দাবি, এই অভিযোগেরও নিরপেক্ষ তদন্ত হোক। তারেক রহমান যদি এই ক্ষেত্রেও একই কঠোরতা দেখান, তবে জনগণের আস্থা আরও বাড়বে।

মন্ত্রিসভার রদবদল: দায়িত্ব চিরস্থায়ী নয় : গত ২১-২২ আগস্ট তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপনকে সরিয়ে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা করা এবং আন্দালিব রহমান পার্থকে তথ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া প্রমাণ করে, বিএনপি সরকারে পদ কোনো পুরস্কার নয়, দায়িত্ব। ভালো করলে থাকবেন, খারাপ করলে সরতে হবে। এই বার্তাটি ছাত্রদল, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, মহিলা দল, কৃষক দল, শ্রমিক দল, ওলামা দল সহ সকল অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের জন্য প্রযোজ্য।

প্রশাসনের প্রতি বার্তা: জনগণের সেবক হোন : প্রধানমন্ত্রীর ১৩টি স্থানে আকস্মিক সফর শুধু মন্ত্রীদের জন্য বার্তা নয়, প্রশাসনের জন্যও বার্তা। কুয়েত-বাংলাদেশ মৈত্রী হাসপাতালে গিয়ে তিনি যে নোংরা পরিবেশ দেখেছেন, আজিমপুর সরকারি কলোনিতে যে অব্যবস্থা দেখেছেন, তা ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদের জঞ্জাল। তিনি ৭ দিন ও ১৪ দিনের সময় বেঁধে দিয়েছেন। এর অর্থ হলো, বিএনপি সরকার ফাইলে নয়, মাঠে বিশ্বাস করে। ডিসি, এসপি, সচিব, সবার জন্য বার্তা পরিষ্কার, জনগণকে সেবা দিন, নইলে ব্যবস্থা।

বিএনপি কর্মী হিসেবে আমাদের শিক্ষা – ১: সংযম
আমি নিজে একজন বিএনপি পরিবারের সন্তান। আমার বাবা, চাচা, ফুপি, ভাইরা বিএনপি করেন, জেল খেটেছেন। সেই পরিবার থেকে বলছি, ইশরাক ও মিষ্টির ঘটনা থেকে আমাদের প্রথম শিক্ষা হলো সংযম। ক্ষমতা পেয়ে উল্লাস নয়, বিনয়ী হতে হবে। শহীদ জিয়া বলতেন, ক্ষমতার চেয়ারে বসলে মাটির দিকে তাকাও। শিক্ষা – ২: আইনকে সম্মান : দ্বিতীয় শিক্ষা হলো, আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নই। আমার হাতে লাইসেন্স করা অস্ত্র থাকলেও আমি আইন হাতে তুলে নিতে পারি না। পুলিশকে খবর দেব, প্রশাসনকে সক্রিয় করব। নিজে নায়ক সাজতে গিয়ে দলকে ভিলেন বানাব না। শিক্ষা – ৩: দল বড়, ব্যক্তি নয় : তৃতীয় শিক্ষা, দল বড়, ব্যক্তি নয়। ইশরাক ভাই ফেসবুকে লিখেছেন, “মন্ত্রী নয়, মাদক নির্মূল!” এই স্লোগানটি সুন্দর। কিন্তু মন্ত্রী থাকা অবস্থায় দলকে বিব্রত করা যাবে না। পদত্যাগ করে দলকে বাঁচানোই বড় নেতার কাজ। এই ত্যাগের মানসিকতাই বিএনপিকে ৪৭ বছর টিকিয়ে রেখেছে। শিক্ষা – ৪: সোশ্যাল মিডিয়ায় দায়িত্বশীলতা : চতুর্থ শিক্ষা, সোশ্যাল মিডিয়ায় দায়িত্বশীল হতে হবে। আজকের যুগে একটি ভিডিও ১০ মিনিটে ১০ লাখ মানুষের কাছে চলে যায়। তাই কোনো কর্মসূচিতে যাওয়ার আগে ভাবতে হবে, এটি ভাইরাল হলে দলের কী হবে। তারেক রহমান নিজে ডিজিটাল বাংলাদেশের কথা বলেন, কিন্তু ডিজিটাল শৃঙ্খলার কথাও বলেন। শিক্ষা – ৫: জনগণের পালস বোঝা : পঞ্চম ও সবচেয়ে বড় শিক্ষা, জনগণের পালস বোঝা। ‘২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানের পর মানুষ এখন সরকারকে প্রশ্ন করতে শিখেছে। ইশরাকের পদত্যাগ হয়েছে পিপলস পালস ও মিডিয়ার পালসের কারণে।’ তারেক রহমান সেই পালস বুঝেছেন বলেই দ্রুত ব্যবস্থা নিয়েছেন। এটাই গণতন্ত্রের স্পিরিট।

পরিশেষে বলতে চাই, শেষ বিচারে রাজনীতি হলো মানুষের জন্য কাজ করার নাম। অস্ত্র উঁচিয়ে, পেশী দেখিয়ে, হাসপাতাল ভেঙে কিংবা ফুটপাতে ত্রাস সৃষ্টি করে নেতা হওয়া যায় না। নেতা হতে হয় মানুষের হৃদয় জয় করে। শহীদ জিয়াউর রহমান ১৯ দফা দিয়ে মানুষের হৃদয় জয় করেছিলেন, দেশনেত্রী খালেদা জিয়া ৩ বার গণতন্ত্র ফিরিয়ে দিয়ে মানুষের হৃদয় জয় করেছিলেন, আর দেশনায়ক তারেক রহমান ৩১ দফা রাষ্ট্র মেরামতের রূপরেখা এবং জিরো টলারেন্স নীতি দিয়ে মানুষের হৃদয় জয় করছেন।

পরিসংখ্যান বলে, বাংলাদেশে বর্তমানে ৭০ লক্ষ মাদকাসক্ত, যার ৮০ ভাগ তরুণ। প্রতি বছর সরকারি ক্রয়ে প্রায় ২ লক্ষ কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। ১৬ বছরে ফ্যাসিবাদী আমলে ১১ লক্ষ কোটি টাকা পাচার হয়েছে। এই ভয়াবহ বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে একজন প্রধানমন্ত্রী যখন ৩৪২ কোটি টাকার ট্যাবলেট কেনার অভিযোগ ওঠার সাথে সাথেই তদন্তের নির্দেশ দেন, যখন তিনি নিজে সকাল ৯টা ১০ মিনিটে বেরিয়ে সাড়ে চার ঘণ্টায় ১৩টি হাসপাতাল, স্কুল, কলোনি পরিদর্শন করে ৭ দিনের আল্টিমেটাম দেন, তখন বুঝতে হবে, এই প্রধানমন্ত্রী গতানুগতিক নন। ইশরাক হোসেন এবং ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির পদত্যাগ আমাদের জন্য লজ্জার নয়, আমাদের জন্য গর্বের। কারণ বিশ্বকে আমরা দেখাতে পারছি, বিএনপি ভুল করলে ভুল স্বীকার করে। বিএনপি নিজের লোককে শাস্তি দিতে দ্বিধা করে না। আওয়ামী লীগের মতো নিজের এমপি খুন করলেও তাকে বাঁচাতে সংসদে দাঁড়িয়ে মিথ্যা বলে না। এটাই শহীদ জিয়ার বিএনপি আর শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগের মধ্যে পার্থক্য। একজন বিএনপি পরিবারের সন্তান হিসেবে, একজন অর্থনীতিবিদ ও কলামিস্ট হিসেবে আমি বিশ্বাস করি, তারেক রহমানের এই কঠোরতা সাময়িক কোনো কৌশল নয়, এটি একটি দর্শন। এই দর্শনের নাম হলো – জবাবদিহিমূলক গণতন্ত্র। যেখানে প্রধানমন্ত্রীও জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য, যেখানে মন্ত্রীও ভুল করলে পদত্যাগ করতে বাধ্য। তাই ছাত্রদল, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, মহিলা দল, শ্রমিক দল, কৃষক দল, ওলামা দল সহ বিএনপির প্রতিটি অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের প্রতিটি নেতাকর্মীর প্রতি আমার আহ্বান – আসুন, আমরা দেশনায়ক তারেক রহমানের এই বার্তাকে হৃদয়ে ধারণ করি। মনে রাখি, আমাদের পরিচয় এমপি-মন্ত্রী নয়, আমাদের পরিচয় আমরা শহীদ জিয়ার সৈনিক, আমরা খালেদা জিয়ার কর্মী, আমরা তারেক রহমানের সহযোদ্ধা। ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়, আজ আছে কাল নেই। কিন্তু তারেক রহমানের মতো একজন সৎ, আপোষহীন, জবাবদিহিমূলক নেতার নেতৃত্বে যদি আমরা নিজেদের শুধরে নিতে পারি, তবে বাংলাদেশের ১৮ কোটি মানুষের ভালোবাসা চিরস্থায়ী হবে। মিষ্টি-ইশরাকের পর আর কাউকে যেন পদত্যাগ করতে না হয়, সেই সতর্কতাই হোক আমাদের আগামী দিনের শপথ। মনে রাখবেন, দেশনায়ক তারেক রহমান দেখছেন, জনগণ দেখছে, ইতিহাস দেখছে। দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারে তাঁর কোনো আপোষ নেই, ছিল না, ভবিষ্যতেও থাকবে না।

লেখক : জুবাইয়া বিন্তে কবির
অর্থনীতিবিদ, গবেষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট