কালিয়াকৈর প্রতিনিধি: গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার বিভিন্ন হাট-বাজারে বিভিন্ন দেশি ও বিদেশি ফলের দাম অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে সাধারণ ক্রেতাদের নাগালের বাইরে চলে গেছে নিত্যদিনের অতিপ্রয়োজনীয় এসব ফল। বিশেষ করে ক্যান্সার, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, ডায়াবেটিস ও ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের পথ্য হিসেবে চিকিৎসকরা ফল খাওয়ার পরামর্শ দিলেও আকাশচুম্বী দামের কারণে তা কিনতে পারছেন না মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের মানুষ।
মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) কালিয়াকৈর বাজার, চন্দ্রা বাজার, মৌচাক বাজার, সফিপুর বাজার, কালামপুর বাজার, বোয়ালী বাজার, শ্রীফলতলী, আটাবহ, ফুলবাড়িয়া ও লতিফপুর বাজার সরেজমিনে ঘুরে ফলের বাজার দর ও কেনাবেচার এই ভয়াবহ চিত্র দেখা গেছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, বর্তমানে বাজারে প্রতি কেজি বিদেশি কমলা ৫৫০ টাকা, বিদেশি মাল্টা ৪৮০ থেকে ৫০০ টাকা, আপেল ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা, আঙুর ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকা, বেদানা বা আনার ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকা, পাকা পেঁপে ৬০ থেকে ৮০ টাকা, ড্রাগন ফল ১৫০ থেকে ২০০ টাকা, পেয়ারা ৮০ থেকে ১০০ টাকা, দেশি মাল্টা ৭০ থেকে ৮০ টাকা, কাটিমন আম ২০০ থেকে ২৫০ টাকা এবং তরমুজ ৭০ থেকে ৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া প্রতি পিস ডাব বিক্রি হচ্ছে ১৫০ থেকে ১৮০ টাকায়।
সফিপুর বাজারের ফল ব্যবসায়ী আবুল হোসেন বলেন, “ভাই, এ বছর ফলের দাম বেশি। মোকামেই বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। ঢাকার বাদামতলী ও কারওয়ান বাজার থেকে বেশি দামে কিনে আনতে হয়, তাই বেশি দামে বিক্রি করতে হয়। দাম কম থাকলে বেচাকেনা ভালো হয়, লাভও ভালো হয়। এত বেশি দামে ফল কিনে বিক্রি না হলে পচে নষ্ট হয়, ফলে লোকসানে পড়তে হয়।”
মৌচাক বাজারের আরেক ব্যবসায়ী জানান, আগে যেখানে দিনে ২ মণ আপেল-কমলা বিক্রি হতো, এখন সেখানে ২০ কেজিও বিক্রি হয় না। দাম শুনেই ক্রেতারা চলে যান। ব্যবসায়ীরা জানান, ডলারের মূল্যবৃদ্ধি, অতিরিক্ত আমদানি খরচ ও পরিবহন খরচের পাশাপাশি গত ৫ আগস্টের পর থেকে বাজারে মন্দাভাব বিরাজ করায় বেশি দামে কিনে বেশি দামেই বিক্রি করতে হচ্ছে।
কালামপুরের গৃহিণী তৌফিকা নাসরিন (৪০) কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “আমার স্বামী ক্যান্সারের রোগী। ডাক্তার বলেছেন প্রতিদিন আপেল, মাল্টা, বেদানা, আঙুর খাওয়াতে। বাজারে এসে দেখি আপেল ৪০০ টাকা, বেদানা ৫০০ টাকা! আমার স্বামী গার্মেন্টসে কাজ করতো, এখন বেকার। ৮ হাজার টাকায় সংসার চলে না। আমি কেমনে এই ফল কিনমু? আমার স্বামী কি তাহলে ফল না খেয়ে মারা যাবে?”
মৌচাকের অটোচালক জয়নাল আবেদীন (৪৫) বলেন, “আমার মায়ের হার্টের রোগ ও প্রেশার বেশি। ডাক্তার বলেছে ডাবের পানি, পেঁপে, পেয়ারা খাওয়াতে। ডাব ১৫০ টাকা পিস! আগে যা ৪০ টাকায় কিনতাম। এখন প্রতিদিন ৪০০ টাকা আয়ে কেমনে ১৫০ টাকা দিয়া ডাব কিনমু?”
সফিপুরের গার্মেন্টস শ্রমিক রহিমা বেগম (৩৮) বলেন, “আমার ছেলের ডেঙ্গু হয়েছে। ডাক্তার বেশি বেশি মাল্টা, কমলার জুস আর ডাবের পানি খাওয়াতে বলেছে। বাজারে মাল্টা ৫০০ টাকা কেজি। আমার বেতন ৮ হাজার টাকা, ওভারটাইম নাই। আমি কেমনে কিনমু?”
বোয়ালীর ক্যান্সার রোগীর বাবা আব্দুল মালেক (৬০) বলেন, “আমার মেয়ের ঢাকা মেডিকেলে চিকিৎসা চলছে। ডাক্তার প্রতিদিন আপেল, আঙুর, বেদানা খাওয়াতে বলেছে। কিন্তু ৫৫০ টাকার কমলা, ৪৫০ টাকার আঙুর আমার মতো দিনমজুর কেমনে কিনবে? মেয়েটা ফলের দিকে তাকিয়ে থাকে, আমি কিনে দিতে পারি না।”
শ্রীফলতলীর ফাতেমা আক্তার (৩৫) বলেন, “আমার বাচ্চার ডেঙ্গু, প্লাটিলেট কমে গেছে। ডাক্তার ডাব, পেঁপে, মাল্টা খাওয়াতে বলেছেন। ৩টা ডাব কিনতেই ৪৫০ টাকা লাগে! আমার স্বামী অসুস্থ, আমি বাসায় কাজ করি। এত টাকা কই পাব?”
এলাকাবাসীর আকুল আবেদন—ক্যান্সার, হার্ট, প্রেশার, ডায়াবেটিস ও ডেঙ্গু রোগীদের জীবন রক্ষার্থে অবিলম্বে ফলের বাজার নিয়ন্ত্রণে পদক্ষেপ নেওয়া হোক। কালিয়াকৈরের হাট-বাজারগুলোতে নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা এবং হতদরিদ্র মুমূর্ষু রোগীদের জন্য বিশেষ ভর্তুকিতে ফল সরবরাহের ব্যবস্থা করার জোর দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

ডেস্ক রিপোর্ট 






















